জঙ্গলমহলের ত্রাতা "গরাম বাসুলি"

 

জঙ্গল মহলের ত্রাতা গরাম হলেন বনের দেবতা।প্রাচীন কাল থেকেই এই পূজায় মাতোয়ারা হন জঙ্গল মহলের আপামর জনগণ।গ্রামের সুখ শান্তির উদ্দ্যেশে এই পূজা করা হয়। তবে বিভিন্ন গ্রামে গরাম বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করেছে।পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড়ে বুড়োবাবা ,পীড়াকাটা সংলগ্ন গ্রাম পীড়রাকুলিতে বড়াম,তেমনি পীড়রাকুলি সংলগ্ন জামবনী গ্রামে গরাম নামে পূজিত হন ।এখানে জামবনী গ্রামের "গরাম" আয়োজিত পূজা পদ্ধতিটি তুলে ধরলাম।

সাধারণত একটি বিশাল বৃক্ষের তলে মাটির তৈরি হাতি ঘোড়া সহযোগে এই পূজার আয়োজন।প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিনেই পূজার প্রচলন।পূজা করেন ঠাকুরের স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত কোন ব্যক্তি।এই পূজা মন্ত্র হীন।স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তি একমাত্র পূজার নিয়ম পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত।এই পূজার পূর্বে পূজারী গ্রামের সুখ-শান্তি,সুবিধা-অসুবিধা,সমস্যা জানিয়ে বেলপাতা আতপ চাল কলা বাতাসা দুধ সমেত একটি মাটির হাতির মাথায় চাপিয়ে দেন।হাতি ঠাকুরের মাথা থেকে ফুল পড়লে পূজার অনুমতি মেলে ।তখন শুরু হয় মূল পূজা।সমস্ত হাতির মাথায় ফুল দিয়ে শুরু হয় প্রসাদ বিতরণ ।তারপর শুরু হয় পাঁঠা বলি ।পূজারী নিজে বলি করেন ।বলি করা হয় টাঙ্গি দিয়ে ।পাঁঠা ছেদ হওয়ার পর শুরু হয় মোরগ বলি।

এই পূজার বিশেষ প্রসাদ মকর।মকর হল সকল প্রকার কুচোনো ফল,আতপ চাল বাটা,গুড় এবং কাঁচা দুধের সমন্বয়ের মিশ্রণ।
গ্রামের মানুষ কোন কিছু মঙ্গলের জন্য মানত করেন শাঁখা,সিঁদুর,কাপড়,মাটির হাতি,মাটির ঘোড়া,পাঁঠা,মোরগ,ঢাক ইত্যাদি।

এখান কার মানুষের বিশ্বাস এই গরাম ঠাকুরের জন্যই তাদের বহে নিশ্বাস।ওনার আশীর্বাদেই তাদের জীবনে নেমে আসতে পারে শান্তির বারি,ওনার ইচ্ছায় গ্রামের উন্নতি,ওনার দৃষ্টিতেই গ্রামটি বিপদের হাত থেকে রক্ষা পায়।মরা মানুষের মুক্তি মেলে ওনার আশীর্বাদেই।এই মন্দিরে এসে নিজের বিপদ জানিয়ে কাঁদলেই নাকি মুশকিল আসান।

গরামের স্ত্রী বাসুলি।গরামের পূজা সম্পন্ন হলে শুরু স্ত্রীর আরাধনা।একই পদ্ধতিতে অন্য একটি বৃক্ষের তলে বাসুলির পূজা হয়।এখানে মোরগ ছেদ করা হয়।

পঁচাত্তর বছরের শিশু ঠাকুমার কাছে জানতে পারলাম এই দেবতা গেরুয়া বসন পরে ঘোড়ায় উপবিষ্ট হয়ে সাক্ষাত দেন বিপদের সময়।গরাম বাবা দেখতে লম্বা সুঠাম ,গলায় নামাবলি চোখে দীপ্তি ।

সত্তর বছরের রেনু ঠাকুমার কাছে জানতে পারলাম যদি পূজার কোন ত্রুটি হয় তাহলে ফুল দেয় না তখনই শুরু হয় ঝুপার।ঝুপার কে আমরা বলি ভর হওয়া ।গ্রামের কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিরই ঝুপার হয়।ঝুপারের মাধ্যমেই পূজার দোষ ত্রুটি জানিয়ে দেন দেবতা।রেনু বলেন দেশের সকল মানুষের পূজা না আসলে ,ঢাক সঠিক সময়ে না আসলে,অশুচি অবস্থায় কেহ প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলে ইত্যদি বিভিন্ন কারণে শুরু হয় ঝুপার। একবার এক গিন্নি তার স্বামীর দেওয়া দক্ষিণার কিছু অংশ পূজা দিতে যাবার সময় খড়ের গাদাতে লুকিয়ে রাখে নিজের জন্য।তারপর ফুল না পড়তেই শুরু হয় ঝুপার;জানিয়ে দেন গিন্নির কারসাজি। তবে নিয়ম শুদ্ধ হলেই পূজার অনুমতি দিয়ে দেন গরাম।

প্রতি বছর খামার ভরা ধান,ক্ষেত ভরা রবি ফসলের সময় তাদের মন স্নিগ্ধ হয়ে উঠে।আর এসময়েই তারা আনন্দের ঝর্ণা ধারায় স্নাত হয়।যারা রুটি-রুজির টানে বাইরে থাকেন তারা ফিরে আসেন গরাম বাবার টানেই।কারন গরাম প্রভুর আশীর্বাদই তাদের পথ চলার ছন্দ।

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com