একজন মানুষের জঙ্গি হয়ে ওঠার কারণ ও প্রক্রিয়া

একজন মানুষের জঙ্গি হয়ে ওঠার কারণ ও প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বব্যাপী নানা গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে।

এর রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যক্তির মনোজাগতিক অবস্থাও বিবেচ্য।

তরুণদের জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হওয়ার এই বৈশ্বিক সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব

প্রেক্ষাপট তরুণদের জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হওয়া বা র‍্যাডিক্যালাইজেশনের প্রক্রিয়া নিয়ে আমার লেখা

কেন একজন ব্যক্তি জঙ্গি হয়ে ওঠে? কোনো ব্যক্তির জঙ্গি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি কী? যখনই জঙ্গি

তৎপরতার খবর পাওয়া যায়, যখনই কোনো জঙ্গি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়, তখনই সাধারণ মানুষের মনে এসব প্রশ্ন জাগে। তাঁরা বুঝতে চান ঠিক কীভাবে একজন ব্যক্তি জঙ্গি হয়ে উঠেছে। তার পেছনে কী ধরনের ঘটনা বা প্রবণতা কাজ করেছে। নীতিনির্ধারক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সন্ত্রাসবাদ দমনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা তো অবশ্যই, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও

মনোবিজ্ঞানীরাও এ বিষয়ে কমবেশি সব সময়ই চিন্তাভাবনা করেন। তাঁরা সবাই এর একটা

সন্তোষজনক উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেন।

 

জঙ্গি হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে আলোচনার শুরুতে আমাদের কয়েকটা বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত, এটি

একটি প্রক্রিয়া; অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি অকস্মাৎ জঙ্গি হয়ে ওঠে না। দ্বিতীয়ত, এটি একটি প্রক্রিয়ার

চূড়ান্ত পর্যায়; অর্থাৎ এই পর্যায়ে যাওয়ার অনেক আগেই এর সূচনা হয় এবং বিভিন্ন ধাপের মধ্য

দিয়ে ওই ব্যক্তিকে যেতে হয়। তৃতীয়ত, এই প্রক্রিয়া একরৈখিক নয়; অর্থাৎ একবার এই প্রক্রিয়ার

অংশীদার হলে সেখান থেকে ফেরার পথ নেই বা যে প্রক্রিয়া জঙ্গি তৈরি করে, সেই পথের সব

অংশগ্রহণকারীই যে শেষ পর্যন্ত জঙ্গি হবেন তা পূর্বনির্ধারিত নয়। এই প্রক্রিয়াকে আমরা বলতে পারি

র‍্যডিকালাইজেশন।

 

র‍্যডিকালাইজেশন হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি এমন ধরনের আদর্শ ও

বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচিত হন যা তাঁকে মধ্যপন্থী, মূলধারার চিন্তাধারা থেকে চরমপন্থী চিন্তার দিকে

সরে যেতে সাহায্য করে। আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে র‍্যডিকালাইজেশন ধারণার দুটো দিক

আছে। একটি হচ্ছে সহিংস র‍্যডিকালাইজেশনের পথ; যে ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের

জন্য সহিংসতাকে কেবল যৌক্তিক বলে বিবেচনা করা হয় না, সহিংসতাকেই প্রধান এবং একমাত্র পথ

হিসেবে বেছে নিয়ে সেভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এই পথ অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাজনীতি

এবং নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি।

 

অন্যটি বৃহত্তর অর্থে র‍্যডিকালাইজেশন; সমাজ ও রাজনীতিতে ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের

লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন এবং তাতে অংশগ্রহণ করা। ফলে এটা মনে রাখতে হবে

যে র‍্যডিকাল মানুষ মাত্রই জঙ্গি নন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা র‍্যডিকালাইজেশন বলতে

সহিংস র‍্যডিকালাইজেশন বোঝায়। সহিংস র‍্যডিকাল পথের সবাই যে ব্যক্তি হিসেবে সহিংসতার

পথ বেছে নিয়ে জঙ্গি হবেনই, এমনও বলা যায় না। র‍্যডিকালাইজেশন-বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ

তথ্যনির্ভর আলোচনাগুলোতে মোটা দাগে দুটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। একটি হচ্ছে র‍্যডিকালাইজেশন

কারণ এবং অন্যটি র‍্যডিকালাইজেশন প্রক্রিয়া। এই দুইয়ের মধ্যে যে একটি গভীর সম্পর্ক আছে

সেটা অনস্বীকার্য। দুই ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই যে গবেষকেরা চেষ্টা করছেন কতকগুলো সাধারণ

প্রবণতা বা স্তর চিহ্নিত করতে। কারণ হিসেবে প্রবণতাগুলোকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞান,

মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে উগ্র সহিংস পন্থা,

জঙ্গিবাদ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী তৎপরতা ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দেশ বা সংগঠনভিত্তিক যেসব কেস

স্টাডি হয়েছে তার সারসংকলন করেই এসব সাধারণ প্রবণতার তালিকা তৈরি করার চেষ্টা করা

হয়েছে। র‍্যডিকালাইজেশন প্রক্রিয়া-বিষয়ক বেশির ভাগ কেস স্টাডি পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিম

জনগোষ্ঠীর, বিশেষত তরুণদের, র‍্যডিকালাইজেশন পথ বোঝার আগ্রহ থেকেই তৈরি হয়েছে। কিন্তু

এগুলোর সঙ্গে ক্রমান্বয়ে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করা হয়েছে।

 

জঙ্গি হয়ে ওঠার পেছনের ইতিহাস

 

কোনো ব্যক্তির জঙ্গি হয়ে ওঠার ঘটনা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়, সেই প্রক্রিয়াকে

র‍্যাডিক্যালাইজেশন বলে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ার কারণ কী, সে বিষয়ে গত কয়েক

দশকে পরিচালিত গবেষণার আলোকে যে তত্ত্বগুলো গড়ে উঠেছে, তাকে আমরা মোটা দাগে দুই ভাগ

করতে পারি। প্রথমত, যেগুলো সমাজে বিরাজমান কতিপয় অবস্থা ও প্রবণতাকে প্রধান বলে মনে

করে; দ্বিতীয়ত, যেগুলো রাজনীতিকেই প্রধান উপাদান বলে মনে করে। যাঁরা মনে করেন যে

সামাজিক দিকটি প্রধান, তাঁদের মতে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগতভাবে বা গোষ্ঠীগতভাবে রিলেটিভ

ডিপ্রাইভেশন বা আপেক্ষিক বঞ্চনার অভিজ্ঞতা বা বোধ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ বা উপাদান।

আপেক্ষিক বঞ্চনা হচ্ছে যখন একজন ব্যক্তি নিজের জীবনে বা তাঁর চারপাশের সমাজে এমনকি

বৈশ্বিকভাবে যে সমাজের অংশ বলে নিজেকে মনে করেন, তার প্রতি অসম আচরণ দেখতে পান।

তিনি যখন অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করেন এবং দেখতে পান যে অন্যরা তুলনামূলকভাবে

ভালো আছেন, তখন তাঁর ভেতরে একধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

 

এই ভালো থাকাটা হতে পারে বৈষয়িক, হতে পারে সাংস্কৃতিক, হতে পারে সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে।

সমাজে এসব বিষয়ে পার্থক্য থাকাটাই যথেষ্ট নয়। কেননা, যেকোনো যুক্তিসম্পন্ন মানুষই জানেন যে

পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই পার্থক্যকে যখন অন্যায় ও অন্যায্য বলে মনে হয়, তখনই এই

পার্থক্যের বিষয়টি মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এই আপেক্ষিক বঞ্চনার বোধ তৈরি হয়

যখন একজন ব্যক্তি দেখেন যে অতীতে যেসব অধিকার তিনি ভোগ করে এসেছেন তা সীমিত হচ্ছে

বা অন্যরা এখন তাঁর চেয়ে বেশি অধিকার ভোগ করছেন। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সমাজে

একীভূত হওয়ার বা ইন্টিগ্রেশনের অভাব। তাঁরা মনে করেন যে সমাজকাঠামো ও বিরাজমান ব্যবস্থা

তাঁকে ও তাঁর সম্প্রদায়কে আলাদা করে রাখছে এবং বঞ্চিত করছে। বাস্তবে বিরাজমান পরিস্থিতিই

তাঁদের এই ধারণার জন্ম দেয়।

 

বিভিন্ন দেশে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তরুণদের একটা বড় অংশ যে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত

হওয়া সত্ত্বেও জঙ্গি হয়ে উঠেছে, তার একটা কারণ এই আপেক্ষিক বঞ্চনা বলে আমার ধারণা। এ

ক্ষেত্রে ‘বঞ্চনা’কে কেবল যাঁরা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, তাঁদের অবস্থান থেকে দেখলে বোঝা যাবে

না। কোনো ব্যক্তি তাঁর চারপাশে বিরাজমান ব্যবস্থাকে অন্যায্য মনে করছেন কি না, সেটা

বিবেচনায় নেওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে একটি অন্যতম দিক হচ্ছে তাঁর আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। অর্থাৎ,

ব্যক্তি হিসেবে তিনি নিজেকে কোনো পরিচয়ের অংশীদার ভাবছেন; তিনি এই সমাজ থেকে নিজেকে

বিচ্ছিন্ন ভাবছেন কি না। বিচ্ছিন্নতাবোধের গভীরতা, বৈষম্যবোধের তীব্রতা এবং সে বিষয়ে ক্ষোভের

মাত্রা র‍্যাডিক্যালাইজেশনের সম্ভাবনা তৈরি করে। এখানে সম্ভাবনা কথাটি আমাদের বিশেষভাবে

নজরে রাখতে হবে। কেননা, এখনো এটা প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণিত নয় যে এই বোধই

র‍্যাডিক্যালাইজেশনের জন্য যথেষ্ট।

 

সার্বিক ভাবে তরুণদের র‍্যাডিক্যালাইজেশনের জন্য রাজনৈতিক কারণের দিকে যাঁরা আমাদের

মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন, তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে অসন্তোষ ও ক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা একে

সামাজিক-মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বলেও চিহ্নিত করতে পারি; যার অর্থ হচ্ছে, নৈরাশ্য থেকে সৃষ্ট

আগ্রাসী মনোভঙ্গি বা অপমানবোধ থেকে প্রতিহিংসাপরায়ণতা হচ্ছে র‍্যাডিক্যালাইজেশনের কারণ। এই

বিবেচনায় পশ্চিমা দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতি একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতি, জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের

‘ওয়ার অন টেরর’ এবং গত দেড় দশকের বিভিন্ন যুদ্ধ প্রমাণ করে যে পশ্চিমা দেশগুলো

একধরনের দুমুখো নীতি বা ডবল স্ট্যান্ডার্ড প্রয়োগ করে এসেছে এবং অন্যায়ভাবে যুদ্ধে লিপ্ত

হয়েছে। এই ক্ষোভ যে কেবল পশ্চিমা দেশের বিরুদ্ধেই প্রযুক্ত, তা নয়। যখন সংশ্লিষ্ট দেশের

সরকার ওই ধরনের নীতির সমর্থক হয় কিংবা ওই ধরনের নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ

সীমিত হয়ে আসে কিংবা মনে হয় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এ ধরনের শক্তি দ্বারা সমর্থিত কিংবা

সমাজে এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণে প্রতিবাদ তৈরি হচ্ছে না, তখন তা–ও সমাজের একাংশের ভেতরে

উগ্রপন্থার প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। পশ্চিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া বা সেই লক্ষ্যে নিজ

অবস্থান থেকেই সেই যুদ্ধে শরিক হওয়াকে তাঁরা সঠিক বিবেচনা করে থাকেন। সমাজে

র‍্যাডিক্যালাইজেশনের জন্য এগুলো ইতিবাচক উপাদান বলেই বিবেচনা করা উচিত। এ ধরনের

মনোভাব কেবল দূরের ঘটনাপ্রবাহের জন্যই কার্যকর থাকে তা নয়, বরং আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহও

কোনো ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে। কাশ্মীরের ঘটনা প্রবাহকে এভাবে বিবেচনা করার দৃষ্টিভঙ্গি মোটেই

বিরল নয়। রাজনৈতিক অসন্তোষ ও ক্ষোভ নিজ দেশের ভেতরে বিরাজমান রাজনীতি থেকেও উদ্ভূত

হয়। নাগরিকের অধিকার সীমিত হয়ে এলে ক্ষোভ-অসন্তোষ প্রকাশের পথ হিসেবে উগ্রপন্থা

অবলম্বনের উদাহরণ মোটেই নতুন ঘটনা নয়।

 

অসন্তোষ ও ক্ষোভ থাকলেই তা সহিংস ইসলামপন্থী র‍্যাডিক্যালাইজেশনের পরিণতি লাভ করবে এমন

নয়, এ ধরনের মনোভাবের কারণে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রাজনীতিতে (যেমন উগ্র বামপন্থী বা

অহিংস ইসলামপন্থী) যোগদানের উদাহরণও রয়েছে। যেখানে মূলধারার রাজনীতির মধ্যেই এই ক্ষোভ

প্রকাশের উপায় আছে, সেখানে সেই পথ গ্রহণই স্বাভাবিক। কিন্তু তার অনুপস্থিতি ভিন্ন অবস্থার

সুযোগ তৈরি করে।

 

সাধারণত কোনো ব্যক্তিকে সহিংসতার পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

পালন করে থাকে। প্রথমত, ব্যক্তিজীবনের কোনো সংকট বা ঘটনা যা অনুঘটক (বা ক্যাটালিস্ট)

হিসেবে কাজ করে। এই সংকট বা ঘটনা যে ওই ব্যক্তির নিজের জীবনেই ঘটতে হবে তা নয়, তাঁর

পরিবারে, অন্যের জীবনে বা সমাজে সংঘটিত কোনো ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করাও অনুঘটকের কাজ

করতে পারে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে সামাজিক নেটওয়ার্ক।

 

একজন ব্যক্তির সহিংসতায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে গ্রুপ বা গোষ্ঠী, সামাজিক সম্পর্ক, যোগাযোগ ও

বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব গবেষণায় স্পষ্ট যে র‍্যাডিক্যালাইজেশন যেমন

ঘটে সুসংগঠিত সন্ত্রাসী সংগঠনের পক্ষ থেকে সদস্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কার্যক্রমের মধ্য

দিয়ে, তেমনি ঘটে বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের স্বপ্রণোদিত গোষ্ঠী তৈরির মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে

স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘটনার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

 

শুধু ধর্মের মধ্যে সমস্যা খোঁজা নয়

 

র‌্যাডিকালাইজেশন একটি রাজনৈতিক বিষয়। এটি কেবল ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতেই আছে, এমন মনে

করার কারণ নেই। গত এক শ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে বিভিন্ন আদর্শভিত্তিক

র‌্যাডিকালাইজেশনের ধারা ও প্রবণতা সহজেই চোখে পড়ে। যদিও এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যে

ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি ধারাই র‌্যাডিকালাইজেশনের প্রধান পথ হয়ে উঠেছে এবং উগ্র

ইসলামপন্থীরা একে ধর্মীয় বাতাবরণে ঢেকে প্রচার করছে, তথাপি একে ইসলাম ধর্মের প্রকাশ মনে

করলে বা এর উৎস ইসলাম ধর্মের মধ্যে অনুসন্ধানের চেষ্টা করলে তা উগ্রপন্থীদের যুক্তিকেই বৈধতা

প্রদান করবে।

 

প্রকৃতপক্ষে সাধারণভাবে ইসলামপন্থী রাজনীতি ইসলাম ধর্মের একটি ব্যাখ্যা হাজির করে এবং তাকে

রাজনৈতিক আদর্শে পরিণত করে। ‘ইসলামপন্থী’ বলার ক্ষেত্রে এটাও আমাদের মনে রাখা দরকার যে

ইসলামপন্থী রাজনীতি কোনো একক ধারা নয়, এই রাজনীতির মধ্যে বিভিন্ন ধারা খুব সহজ করে

দেখলে দেখা যাবে যে ইসলামপন্থী রাজনীতির বিভিন্ন ধারার মধ্যে এই বিষয়েও মতৈক্য নেই যে

‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে । ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের বিবেচনায় যেমন তেমনি

বিশ্বাসের কতিপয় দিক থেকেও ইসলাম ধর্মের ভেতরে রয়েছে বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্য কেবল শিয়া-

সুন্নির পার্থক্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন ধরনের মাজহাব এবং মাসলাকের উপস্থিতি, হাদিসের বিভিন্ন

ব্যাখ্যা, ইসলামি আইনের বিভিন্ন ব্যাখ্যা এই পার্থক্যের ও বৈচিত্র্যের সাক্ষ্য দেয়।

 

সেই অন্য উপাদানগুলোকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি: পারিপার্শ্বিক অবস্থাজনিত উপাদান,

কৌশলগত উপাদান ও আদর্শিক উপাদান। এই বিভাজনের কাঠামো বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্থা

ক্রেনশর ১৯৮১ সালে কম্পারেটিভ পলিটিকস জার্নালে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত রচনা এবং এ বিষয়ে

গবেষক ম্যাথুইউ ফ্রান্সিসের ২০১২ সালের আলোচনার আলোকে তৈরি। ক্রেনশ এবং ফ্রান্সিসের

আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে এই উপাদানগুলোর মধ্যে আবার উপবিভাগ রয়েছে। যেমন

পারিপার্শ্বিক অবস্থাজনিত উপাদানের কিছু হচ্ছে পূর্বশর্ত আর কিছু এ ধরনের প্রবণতাকে ত্বরান্বিত

করে। কৌশলগত উপাদানকে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি হিসেবে ভাগ করা যায়। তৃতীয় উপাদান

হচ্ছে আদর্শিক, যেগুলো হচ্ছে অপরিবর্তনীয়।

 

এই উপাদানগুলোর মধ্যে অনুকূল পরিবেশ হচ্ছে যেকোনো সমাজে র‌্যাডিকালাইজেশনের অত্যাবশ্যকীয়

পূর্বশর্ত। আমরা যদি অনুপ্রেরণামূলক অবস্থাকে অনুঘটক বলে বিবেচনা করি তবে

র‌্যাডিকালাইজেশনের ট্রিগার বা সূচনাকারী বলে চিহ্নিত করতে হবে ত্বরান্বিতকরণের

উপাদানগুলোকে। কিন্তু এগুলো তখনই ট্রিগারের কাজ করতে পারে, যখন পূর্বশর্তসমূহ পূরণ হয়েছে।

ফলে র‌্যাডিকালাইজেশনের পথ বন্ধ করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে পারিপার্শ্বিক অবস্থাজনিত

উপাদানগুলোকে মোকাবিলা করা। সেটা না করা গেলে ব্যক্তির সহিংস র‌্যাডিকালাইজেশনের পথ

উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। অন্যভাবে বললে তখন শুরু হয় ব্যক্তির র‌্যাডিকালাইজেশনের প্রক্রিয়া।

 

একজন মানুষ কীভাবে জঙ্গি হয়ে ওঠে?

 

একজন মানুষ কীভাবে জঙ্গি হয়ে ওঠে? কী প্রক্রিয়া তাকে জঙ্গিতে পরিণত করে? এই প্রশ্নের উত্তর

খুঁজতে গিয়ে গত কয়েক দশকে, বিশেষত গত দেড় দশকে, বিস্তর গবেষণা হয়েছে; অনেকগুলো

মডেল প্রস্তাবিত ও আলোচিত হয়েছে। এসব মডেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে

চারটি—ড্যানিশ গোয়েন্দা সংস্থার প্রস্তাবিত মডেল (পিইটি মডেল), নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের জন্য

মিচেল ডি সিলবার ও অরবিন্দ ভাটের তৈরি করা মডেল (এনওয়াইপিডি মডেল), মার্ক

সেইজম্যানের মডেল (‘একগুচ্ছ লোক’ মডেল) ও মনোবিজ্ঞানী ফাতালি মোঘাদ্দামের প্রস্তাবিত মডেল

(স্টেয়ারকেস মডেল)। এর বাইরেও অনেক মডেল আছে, যা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এসব

মডেলের আলোচনায় যেটা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে তা হলো, কোনো ব্যক্তির জঙ্গি হয়ে

ওঠা মানে হচ্ছে র‍্যাডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়া, কিন্তু এই প্রক্রিয়ার

সূচনায় থাকার অর্থ এই নয় যে, ওই ব্যক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবেই; বরং উল্টোটাই ঘটে—প্রতিটি

স্তর থেকেই কিছু মানুষ ঝরে যায়।

 

পিইটি মডেলে র‍্যাডিক্যালাইজেশনকে চার স্তরে ভাগ করা হয়েছে। এর প্রথম স্তরে রয়েছে

র‍্যাডিক্যাল চিন্তা গ্রহণে উৎসাহী একজনের সঙ্গে এমন কোনো ব্যক্তির যোগাযোগ ঘটে, যে

র‍্যাডিক্যাল পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক সংগ্রহ করছে; দ্বিতীয় স্তরে উৎসাহী ব্যক্তির আচরণে

ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটে, যার মধ্যে আছে তার ধর্মীয় আচরণে বদল এবং যোগাযোগের নতুন

অভ্যাস (যেমন ইন্টারনেট ব্যবহারের) তৈরি হওয়া। তৃতীয় পর্যায়ে তার সামাজিক জীবন ক্রমশ

সীমিত হয়ে আসে, যেখানে সে কেবল সমমনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকে এবং বিপরীতক্রমে তার

পরিবার ও পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চতুর্থ স্তরে ওই ব্যক্তি

নৈতিকতার প্রশ্নে একধরনের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। এই চার স্তরের মডেলের ক্ষেত্রে স্তরগুলো

একের পর এক ঘটে।

 

এনওয়াইপিডি মডেলের প্রথম ধাপ হচ্ছে যেকোনো সাধারণ অবস্থা, যাকে বলা হয়েছে

র‍্যাডিক্যালাইজেশন-পূর্ব অবস্থা। এই স্তরে ব্যক্তিটি হচ্ছে একেবারেই সাধারণ মানুষ, সাধারণ

চাকরিতে নিয়োজিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অতীতে অপরাধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনো

ইতিহাস নেই। দ্বিতীয় স্তর, যাকে বলা হচ্ছে সচিহ্নিতকরণ স্তর, যে স্তরে ব্যক্তি নিজস্ব ধারা বিষয়ে

অনুসন্ধানী হয়ে ওঠে, তার পুরোনো পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে এবং তার

সমমনাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই পর্যায়ে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে কোনো সংকট কিংবা

মানসিকভাবে নতুন ধারণা গ্রহণের প্রস্তুতি এবং ট্রিগার বা সূচনাকারী বিষয় হতে পারে সামাজিক

(যেমন বঞ্চনা, বৈষম্য), রাজনৈতিক বা একেবারেই ব্যক্তিগত কোনো দিক। তৃতীয় স্তর হচ্ছে

মতদীক্ষা স্তর (ইনডকট্রিনেশন)। এই স্তরে ব্যক্তি ক্রমাগতভাবে তার ধর্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করে,

নতুন মতাদর্শ গ্রহণ করে এবং এই উপসংহারে পৌঁছায় যে জঙ্গি কার্যক্রম ‘আবশ্যক’। চতুর্থ স্তরকে

বলা হয়েছে, জিহাদীকরণ। এই স্তরে গ্রুপের সদস্যরা ‘জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য তাদের নিজ নিজ

ব্যক্তিগত দায়িত্ব গ্রহণ’ করে এবং গ্রুপ প্রায়োগিক পরিকল্পনা বা অপারেশনের ছক আঁকা শুরু করে।

এই মডেল বিষয়ে যেসব সমালোচনা আছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, এখানে ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে

প্রক্রিয়াটি একমুখী এবং কনভেয়ার বেল্টের মতো।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com