সাদা রক্ত

নিভাননী খাটের জানলার দিকে ঘেঁষে বসে আছে। ঘরে আর কেউ নেই। বাইরের সানাই বাজছে। সন্ধ্যে ছ’টা। শীতকাল, পুরো অন্ধকার হয়ে গেছে চারদিক। বাইরে হইহুল্লোড়। আজ বউভাত অনিকেতের, নিভাননীর একমাত্র ছেলে। সবাই সুপুত্রই বলে। 
    নিভাননীর গায়ে একটা সাদা বেণারসী। বেশ দামী। ছেলে কিনে এনে দিয়েছে। নিভাননীর মুখে পান। উঠে গিয়ে জানলা দিয়ে পিক বাইরে ফেলতে যাবে, যেমন রোজ যায়, আজ জানলার কাছে এসে থমকালো। বাইরের রাস্তাটায় দারুন লাইট লাগিয়েছে তো! খেয়ালই করেনি, কি আশ্চর্য্য, এত খেয়াল কমে যাচ্ছে কেন! মাথা নীচু করে রাস্তাটা দেখল নিভাননী। তার সামনে তাদের বাড়ির উঠোন, বিশাল উঠোন। এখানে ওখানে টুকরো টুকরো জমায়েত। বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে। কে একটা আঙুল তুলে নিভাননীকে দেখালো। সরে এলো জানলা থেকে। পিক মুখেই রয়ে গেল। মুখ থেকে হাতে নিল। খাটের নীচে ছুঁড়ে ফেলে দিল চিবানো পান সমেত। 
   খাটে এসে বসল আবার। সামনে স্বামী গৌরিশঙ্করের ছবি। চন্দন, মালা দিয়ে সাজিয়েছে কে। বিমলাই হবে। তার ছোট জা, টাটায় থাকে, নিঃসন্তান। ছবিটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ছবির কাঁচে তার নিজের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, তাতে আবছা দেখা যাচ্ছে তার স্বামীর মুখ। 
   গা গুলিয়ে উঠল হঠাৎ। মনে হল হিসি করার জায়গাটা চুলকাচ্ছে। বমি পাচ্ছে। দৌড়ে বাথরুমে ঢুকল। আলো জ্বালার সময়ও হল না। হাঁটু গেড়ে বসে ওয়াক ওয়াক করতে লাগল। অজান্তেই পেচ্ছাপ বেরোলো। পেচ্ছাপ না রক্ত? নিভাননী উঠে আলো জ্বালল। আবার রক্ত! সাদা বেণারসীটা দেখল, দাগ লাগেনি তো! না লাগেনি। এটা আশ্চর্য, রক্ত বেরোয়, লাল হয় মেঝে, আবার সাদা হয়ে যায়! কি করে হয়? 
    ফুলশয্যার রাত। তার দুটো হাত খাটের বাটামের সাথে বাঁধা। মজা হবে। সব সময় মজা হত। মুখে নোংরা মোজা পুরে, গায়ে লক্ষীর সামনে থেকে ধুপকাঠি নিয়ে এসে ছ্যাঁকা দিয়ে, শরীর খারাপের সময়টাতেও...কত মজা মজা খেলত লোকটা। সে খেলতে পারত না। বনগাঁ থেকে আরো চোদ্দ কিলোমিটার গেলে একটা গ্রামে নিভাননী মানুষ। এত খেলা শেখেনি কখনো। তাকে কতবার গাঁইয়া ভুত বলেছে। 
       নিভাননী বাইরে বেরিয়ে আসে। খাটে শুয়ে পড়ে। পাদুটো মেঝের দিকে ঝুলছে। 
“ওরে গতরখাগি মাগী...ওঠ...এই অবেলায় ঘুমুলি নাকি...বলি এ কোন বাড়ির অলুক্ষুণে মাগী গো...খেলি তো এক হাঁড়ি ভাত...”
   মিথ্যে কথা। খেতে দেয়নি তো! ভাত ছিল দুমুঠো...ডাল নাম মাত্র...আর তাতে একটা মাছকে দুটুকরো করে তার আর বিমলার পাতে দিত বুড়ি...শাশুড়ি...কাত্যায়নী...তার শাশুড়ি বঙ্কুবালা নাকি মাছটুকুও দিত না, শুধু ঝোলের আঁশটে গন্ধে ভাতটুকু খেয়ে উঠে পড়তে হত... 
    জা পালিয়ে বাঁচল। তার স্বামী ছিল মানুষ, টাটাতে চাকরি নিয়ে পালালো। পালালোই তো...

  নিভাননী ঘুমিয়ে পড়েছিল। উঠে বসল। শাড়ীটা ঠিক করল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। দরজার দিকে তাকালো, বন্ধ, যাক মানে কেউ ঘরে আসেনি তা হলে। নিভাননী খাটের ধারে হেলান দিয়ে পাদুটো ছড়িয়ে দিল। ডান হাতের তর্জনীটা বাঁ নাকের মধ্যে দিল। কি যেন খুঁজছে। কিছু একটা পেলে খুব ভালো লাগে নিভাননীর। আগে দুপুরবেলা, তার জা চলে যাওয়ার পর, সারা দুপুর কি করবে? বসে বসে নাকের মধ্যে আঙুল দিয়ে খুঁড়তো। মনে হত ওটা একটা আলাদা রাজ্য। কিছু একটা পেলে সেটা কাগজে লাগিয়ে রাখত। তারপর লুকিয়ে গিয়ে শাশুড়ির পানের চুনের মধ্যে মিশিয়ে দিয়ে আসত, খা বুড়ি খানকি, সিকনি খা!

    নিভাননী উঠে বসল। নীচে প্রচুর লোকজনের আওয়াজ। জানলার কাছে গেল, নাক অবধি আঁচল আড়াল করে দাঁড়াল। কতলোক! এরা সব আত্মীয়? এরা সব কোথায় ছিল তখন, যখন জোর করে তার সব গয়না নিয়ে ওর ননদের বিয়েতে দিয়ে দিল, তার স্বামী মরে গিয়েছিল বলেই না! কই সে ননদটা? এসেছে? ও আসবে কি করে? সে তো মারা গেল না গত বছর ক্যান্সারে, তার বরের মত! 
  এদের সবার ক্যান্সার হয়। তারও হয়েছে। তলপেটে, হিশির সাথে রক্ত বেরোয়। প্রথমে লাল, তারপর সাদা। আবার হিসি করে দেখবে? আবার বাথরুমে গেল। উবু হয়ে বসল। কই হিসি? সসস...আওয়াজ করল...পাচ্ছে না তো! জোরে কুঁথলো কয়েকবার। হচ্ছে না। আঙুল দিয়ে ভিতরে বুলিয়ে এনে আলোয় দেখল, এই রক্ত...চাপচাপ রক্ত...খোকা!!!! 
   কেউ শুনলো না। খোকার বউকে পাতে কেউ সিকনি দিয়ে দেবে নাতো!...বউ যদি অন্যের পাতে দিয়ে দেয়? তার পাতে? খোকা বউকে খাটে বেঁধে মজা মজা খেলবে নাতো!...ও তো পুরুষ, ও কি করে জানবে ওতে খুব লাগে যে...বউকে বলতে হবে স্ক্রু ড্রাইভার, পেন্সিল ঘরে না রাখতে, খুব লাগে ওতে...পরেরদিন পায়খানা করতেও কষ্ট হয়...এগুলো কে বলবে ওদের? ...সানাই বাজছে যে! মানে বিয়ে হয়ে গেল তো!...
   নিভাননী দৌড়ে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতে লাগল...চীৎকার করতে লাগলেন...খোকা...বিমলা...মালতী(কাজের মেয়ে)...

কেউ শুনছে না...জানলার কাছে এসে শাড়ি খুলে ফেলল, সায়াও। পা গলিয়ে দিল জানলার গারদের মাঝখান দিয়ে। তাকে নামতেই হবে। 
   নীচ থেকে কারোর চোখে পড়ল। দৌড়ে এসে দরজা খুলল ছেলে। রেগেমেগে মুখ লাল করে, চীৎকার করে বলল, বলেছি না আজ সারাদিন ঘুমের ওষুধটা দিয়ে রাখতে, না তো শিকল দিয়ে বাঁধতে হবে আবার...
   বিমলা দৌড়ে ঘরে ঢুকল...নিভাননীকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শক্ত করে চেপে ধরল...তার চোখের কোল বেয়ে জল ভেজাচ্ছে নিভাননীর মুখ...বিমলা বলল, দিদি এই তো আমি...তুমি শান্ত হও...
       বিমলা সবাইকে ঘর থেকে বের করে খিল দিল। নিভাননী বিমলাকে আঁকড়ে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে বলতে লাগল, বিমলা তুই বল, খোকা যেন ব্লেড না নিয়ে শোয়ার ঘরে যায়...ওখানে চিরলে লাগে বিমলা... 
   বিমলার তখন বুকজ্বালা কান্না, চোখ-নাক ভাসিয়ে কাঁদছে, বলছে, সবকথা কেন ভুলতে পারলে না দিদি...কেন কেন কেন? তুমি মরো দিদি...মরলে না কেন..
    নিভাননী আর্তনাদ করে কাঁদছে আর বলছে...আমি মরে যাচ্ছি বিমু...আমার হিসিতে রক্ত...প্রথমে লাল...পরে সাদা...

 

           তাদের কান্না কেউ শুনলো না। সানাইয়ে তখন মারু বেহাগ। বাড়ি  ম ম করছে আতর আর ফুল আর নানা খাবারের গন্ধে...

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com