নোটবাতিলঃদৃষ্টি বহুদূর

 

৮ই নভেম্বর কেন্দ্রীয় সরকার যখন ৫০০/১০০০ টাকার নোট বাতিল করলেন, তখন অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। এদের সকলেরই ধারণা ছিল, এর ফলে বাজারে কালো টাকা ও জাল টাকার উৎপাত বন্ধ হবে। সেই সময় থেকেই আমি লাগাতার বলে আসছিলাম কালো টাকায় হাত দেবার আদৌ কোনো ইচ্ছে সরকারের নেই। কেননা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত S.I.T তার রিপোর্টে যে সব পদক্ষেপের কথা বলেছিল, তার একটাও সরকার গ্রহণ করে নি। আবার S.I.T তার রিপোর্টে নোট বাতিলের কথা আদৌ বলে নি; অথচ সরকার ঠিক সেটাই করল। S.I.T.-এর সুপারিশ না মানার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, কালো টাকা প্রতিরোধের জন্য নয়, অন্য কোন কারণে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিখ স্নেইডার বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে ধারণা করেছিলেন ভারতের কালো টাকার অর্থনীতি মোট জাতীয় উৎপাদন (GDP)-র ২৩% - ২৬%।(১) এই হিসাবে ৯৬টি বিকাশশীল দেশে কালো টাকার অর্থনীতির এই শতাংশ ছিল ৩৮.৭%। পরবর্তীকালে সমস্ত রিপোর্টেই স্নেইডারের ধারনাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে ভারতের GDP ছিল ২০৭৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার(২) সেই হিসাবে ভারতের কালো টাকার অর্থনীতির বহর হবে ৪৭৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫৩৯ বিলিয়ন ডলার। অথচ ২০১৫ সালেই CBI এক রিপোর্টে জানায় ভারতের ৫০০ বিলিয়ন ডলার কালো টাকা বিদেশে সঞ্চিত আছে। (৩) পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদে জানান যে CBI-এর এই রিপোর্টই সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা হয়েছিল। (৪) তাহলে দেশের মধ্যে কালো টাকার পরিমাণ কতো?

এই অঙ্ক থেকে একটা কথাই বোঝা যাচ্ছে যে কালো টাকার বড় অংশটাই বিদেশে পাচার হয়ে যায়। তবে দেশের মধ্যে ঠিক কী পরিমাণে কালো টাকা আছে, সেই অঙ্কটা আন্দাজ করা মুশকিল। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণে কালো টাকা যে ভারতের মধ্যেও আছে, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যে পরিমাণে কালো টাকা নগদে থাকবে, নোট বাতিলের ফলে সর্বোচ্চ সেইটুকুই নষ্ট হতে পারে। যে অংশটা ইতিমধ্যেই সম্পত্তি বা সোনায় পরিবর্তিত হয়ে গেছে, নোট বাতিলের জন্য তাকে কোনো আঘাতই করা যাবে না। নিঃসন্দেহে এটা বলা যায়, কালো টাকার খুব সামান্য অংশই নগদে জমানো থাকে। কেননা নগদে অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখলে প্রতিদিন সেই টাকার মূল্য কমে যায়।

ভারতে টাকার মূল্য ধারাবাহিকভাবেই হ্রাস পেয়ে চলেছে। ২০১৫-১৬ অর্থ-বছরের শেষে সেই হ্রাস অর্থাৎ Inflation-এর মাণ ছিল ৪.৮%।(৫) তার মানে কী? অর্থাৎ ২০১৪-১৫ অর্থ-বছরের শেষে ১০০ টাকার মূল্য ১০০ টাকা হলে, এক বছর পরে তার মূল্য হয়ে গেছে ৯৫.৪২ টাকা। তাহলে আগের বছরে যদি কেউ ১০ লক্ষ কালো টাকা নগদে সরিয়ে রাখেন তাহলে ২০১৫-১৬ সালের শেষে তার দাম দাঁড়াবে ৯,৫৪,২০০ টাকা। অর্থাৎ তার স্পষ্ট ৪৫,৮০০ টাকা ক্ষতি হবে। এই কারণেই নগদে কালো টাকা সাধারণত জমিয়ে রাখা হয় না। যাদের নিতান্ত সম্পত্তি বা সোনায় রূপান্তরের সুযোগ নেই, একমাত্র তারাই এভাবে নগদে টাকা লুকিয়ে রাখেন।

আমরা যদি কালো টাকার বহর GDP-র ২৬%-ই ধরে নিই এবং বিদেশে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যেই সরে যাওয়ার রিপোর্টকে মেনে নিই, তাহলে দেশের মধ্যে আছে ৩৯ বিলিয়ন ডলার বা ২,৬৫,২০০ কোটি টাকা। এর খুব কম পরিমাণই যে নগদে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় জমানো থাকতে পারে, সেটা আমরা আগেই দেখেছি। ধরে নেওয়া যাক সেই অংশটা হোলো ১০%। বাকিটা সম্পত্তি, সোনা বা এমনকি ব্যবসাতেও বিনিয়োগ হয়ে গেছে। তাহলে নগদ কালো টাকার পরিমাণ হবে ২৬,৫২০ কোটি টাকা। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হিসাব অনুযায়ী ৮.১১.২০১৬ মধ্যরাত পর্যন্ত ভারতের বাজারে মোট নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ১৬,১৮,০০০ লক্ষ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে বাজারের মোট অর্থের ১.৬৯% হোলো নগদে জমানো কালো টাকা। নোট বাতিল করে এটাকেই কব্জা করা যাবে; যদিও সবটাই জালে ধরা পড়বে কিনা, সেটাও জানা নেই।

নগদ টাকা বনাম খাতার টাকা

৮.১১.২০১৬ থেকে আমি লাগাতার বলে আসছি যে সরকারের আসল উদ্দেশ্য হোলো বাজারে নগদ টাকার যোগান কমানো। কালো টাকাকে ঘায়েল করাই যদি লক্ষ্য হোতো তাহলে নতুন নোট ছাপানো আগেই সেরে রাখা হোতো যাতে বাতিল করার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন টাকা বাজারে চলে আসে। কিন্তু সেটা যে এখনো হয় নি, সেটা আমরা সবাইই জানি। নগদ টাকার অভাবে বাজার অনেকটাই থমকে গেছে; নাভিশ্বাস উঠছে দরিদ্র মানুষদের। তাহলে কি কালো টাকা এদের কাছেই ছিল? এদেরকে জব্দ করার জন্যই এত আয়োজন? যারা কালো টাকার সম্ভাব্য মালিক, তাদের তো জীবনধারণের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। না, সাধারণ মানুষকে এভাবে নাকানিচোবানি খাওয়ানোর কোনো ইচ্ছে সরকারের ছিল না, সেটা সুনাগরিক হিসাবে আমরা নাহয় ধরেই নিই। তাহলে?
নোট বাতিল পরবর্তী পর্যায়ের পদক্ষেপ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত এতবার বদলেছে যে আজকের সিদ্ধান্ত আগামী কাল বহাল থাকবে কিনা, সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। এর থেকে একটাই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে বাজারে নগদ অর্থের কতটুকু কালো টাকা, সেই নিয়ে সরকারের কোন কাজচালানো গোছেরও ধারণা ছিল না। দৈনন্দিন বাণিজ্যে যে কী পরিমাণে নগদ টাকা ব্যবহৃত হয়, সেটার কোনো আন্দাজই ছিল না। তাই একেকবার একেকরকম নির্দেশ জারি করে যাচ্ছে। আর সমস্ত নির্দেশেরই একটাই লক্ষ্য, মানুষের হাতে কী পরিমাণে নগদ অর্থ দেওয়া হবে, তার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। কেন? দেশের নগদ অর্থের ৮৬% রাতারাতি বাতিল করে দেবার পরও এই নিয়ন্ত্রণ কেন? শুধুই কি কালো টাকার উপর নিয়ন্ত্রণ জারি করা? তাহলে দেখা যাক।

The Indian Express পত্রিকায় ৯ই নভেম্বর প্রকাশিত একটি রিপোর্টে কেন্দ্রীয় রাজস্ব সচিব শ্রী হাসমুখ আধিয়াকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে – “One more good thing that will happen now is that because of the liquidity crunch, people will start using plastic money and they will use more of bank transactions. They will get used to using cheques and online transfers and payment wallets for day to day use. This will force people to use this. That will be a long term benefit and subsequently people may not like to handle any cash. That would also promote India to be a less-cash economy. Now with bank accounts with poor people, they are not affected,” .

নতুন করে আর কিছু বলার নেই। এটাই যে সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, সেটা প্রকাশ হয়ে গেছে। অনেকে এতেও উল্লসিত হয়ে ইউরোপ-আমেরিকার উদাহরণ টেনে এনে বলছেন, এতে নাকি দেশেরই ভালো হবে। নগদের বদলে অন্য কোনোভাবে লেনদেন করতে গেলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা আবশ্যিক। এদেশের ১৩৩.৬০ কোটি মানুষের ৭৩% থাকেন গ্রামে। তাহলে গ্রামীন মানুষের সংখ্যা হোলো ৯৭.৫২ কোটি। এদেশে গ্রামের প্রশাসনিক একক হোল পঞ্চায়েত। ভারতবর্ষে মোট পঞ্চায়েতের সংখ্যা হোলো ২,৩৯,৫৮২। অথচ ভারতে সমস্ত ব্যাঙ্ক মিলিয়ে গ্রামীন শাখার মোট সংখ্যা হোলো ৩৭,৯৫৩। তাহলে এরা কিভাবে লেনদেন করবেন? কেউ কেউ বলছেন, রদের জন্য নগদ টাকা অবশ্যই থাকবে। মুশকিল হোলো টাকা এদের হাতে পৌঁছায় “Trickle down” পদ্ধতিতে। কি রকম সেটা? একটা উদাহরণ নেওয়া যাক।

ধরুন, আপনি একটি সরকারি দপ্তরে চানরি করেন। আপনার মাইনে সরাসরি আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে আসে। আপনি তার খানিকটা কার্ডের মাধ্যমে খরচা করেন, কয়েকটা চলতি বিল (যেমন ইলেক্ট্রিসিটির বিল বা এল আই সি-র প্রিমিয়াম) চেকে মেটান। আর খানিকটা খরচ আপনাকে নগদেই করতে হয়। যেমন রোজের সবজিবাজার, বাসভাড়া, মুচির খরচ, চায়ের দোকান ইত্যাদি। আমরা সব্জিবাজারকেই ধরে নিই। ধরা যাক গতকাল আপনি ১০০ টাকার সবজি কিনেছেন। তার থেকে ২০ টাকা সবজিওয়ালার লাভ আর বাকি ৮০ টাকা সে দিয়েছে ফড়েকে। ফড়ে আবার সেখান থেকেই প্রকৃত কৃষককে দিয়েছে ধরা যাক ৬০ টাকা। কৃষক সেই টাকা দিয়ে তার গ্রামের মুদিখানা থেকে তেল-নুন কমেছে এবং ৫০ টাকা সেই দোকানদার সেই বাবদ পেয়েছে। অর্থাৎ আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢোকা মাসমাইনে এভাবেই গ্রামের একটি মুদিখানায় পৌছে গেল, যাকে হয়তো আপনি জীবনে দেখেন নি। আপনি বলতেই পারেন, কেন ও চেক না নিক, মোবাইল ওয়ালেটে তো দাম নিতে পারে। আসুন, তাহলে দেখা যাক।

২০১১ সালের সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী দারিদ্র সীমার নিচে বাস করেন ২৭% মানুষ, যাদের মাসিক আয় ৮১৬ টাকা বা তার কম, অর্থাৎ বছরে ১০ হাজার টাকারও কম। এই সামান্য টাকাই যার উপার্জন, তার পক্ষে ব্যাঙ্কের মাধ্যমে লেনদেন কি আদৌ সম্ভব? মোবাইল ওয়ালেটের গল্পও তার কাছে আকাশকুসুম। আবার ২০১০ সালের NCAER-CMAR রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে দেড় লক্ষ টাকার কম উপার্জন করেন এমন মানুষের সংখ্যা ৫৭%। এদের থেকে দারিদ্র সীমার নিচে অবস্থানকারীদের বাদ দিলে পড়ে থাকে ৩০% মানুষ যাদের বার্ষিক আয় ১০,০০০ টাকা – ১,৫০,০০০ টাকা। অর্থাৎ দৈনিক আয় ৩০ টাকা থেকে ৪১৫ টাকা। এদের পক্ষেও নিত্য ব্যাঙ্ক বা বিভিন্ন কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করা কতটা সম্ভব?

ব্যাঙ্কের চেক ব্যবহার করতে গেলে সেটাকে পূরণ করতে হয়। তার জন্য একটা ন্যুনতম শিক্ষা প্রয়োজন। ২০১১ সালের সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের স্বাক্ষরতা হার ৭৪.০৪% হলেও সরকারি ফর্ম পূরণের ক্ষমতা আছে কতজনের? দেখা যাক, সেন্সাস রিপোর্ট শিক্ষার স্তর সম্পর্কে কী বলছে। যদি ধরে নেওয়া যায়, মাধ্যমিক স্তর পেরোনোর পরই সরকারি ফর্ম পূরণের সক্ষমতা আসে, তাহলেও দেখা যাবে সেই যোগ্যতা আছে ২৮.৩ শতাংশের। সোজা কথায়, সর্বোচ্চ এই ২৮.৩% শতাংশ মানুষের মধ্যেই নগদহীন লেনদেন চলতে পারে। তাহলে বাকি ৭১.৭% মানুষের কী হবে? সরকার কি এদের জন্য কোন ব্যবস্থা করবে না? এঁরা কি তাহলে দেশ থেকে চলে যাবে?

মাল্টি-ন্যাশনাল মুদিখানা

আর এখানেই উঠে আসবে একটা চক্রান্তের কাহিনী। বাজারে নগদের যোগান কমিয়ে দিলে শহুরে মানুষের একটা বড় অংশ যে চেক বা বিভিন্ন কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করতে বাধ্য হবে, সেটা পরিষ্কার। কিন্তু লেনদেন করবে কার সাথে? ভারতের বাজারে শহর-গ্রাম নির্বিশেষে ছোট ও মাঝারি দোকানের দাপট রয়েছে। এই অসংগঠিত বাণিজ্য ক্ষেত্রই ভারতের খুচরো বিক্রির বাজারের অন্তত ৫০% নিয়ন্ত্রণ করে। এদের পক্ষে সবসময় চেক বা কার্ডের মাধ্যমে দাম নেওয়া সম্ভব নয়। তার পরিকাঠামোই এদের নেই। সবথেকে বড় কথা এদেরও অধিকাংশের সেইটুকু শিক্ষা নেই। তাহলে নগদের অভাবে এদের ব্যবসা কমতে বাধ্য। এবং গত তিন সপ্তাহের ইতিহাস সেটাই প্রমাণ করে যাচ্ছে। তাহলে কার্ডধারী খদ্দেররা যাবেন কোথায়?

তাদের জন্য পশরা সাজিয়ে বসে আছে বিভিন্ন শপিং মল, বড়বড় কোম্পানির আউটলেট । কিন্তু সেই সংখ্যাটাও এখনো খুব বেশি নয়। নব্বইয়ের দশকে নয়া অর্থনীতি চালু হবার পর থেকেই ভারতে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে প্রতিটি সরকারই পাগল হয়ে উঠেছে। বিদেশি পুজিকে কতো বেশি ভারতে নিয়ে আসা যায়, তার জন্য নানান সুযোগসুবিধা দেবার নানা প্রকল্প বিভিন্ন সময়ে ঘোষিত হয়েছে। ভারতে বিদেশি পুজি পরিষেবা, পরিবহন ইত্যাদি বুনিয়াদি ক্ষেত্রে বা শেয়ার বাজারে প্রচুর পরিমাণে এসেছে। প্রতি বছর তার বহর বাড়ছে। কিন্তু খুচরো বিক্রির বাজারে তাদের পা রাখার সুযোগ করে দেবার জন্য বহু বছর ধরেই ভারত সরকারের উপর চাপ আসছে। ২০১১ সাল পর্যন্ত খুচরো ব্যবসায়ে বিদেশি বিনিয়োগে ভারত সরকার সম্মতি দেয় নি। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে একক ব্র্যান্ডের খুচরো ব্যবসার ক্ষেত্রে ১০০% বিদেশি বিনিয়োগের সম্মতি দেওয়া হয়। যদিও শর্ত দেওয়া হয়, অন্তত ৩০% পণ্য ভারতে উৎপাদিত হতে হবে। আবার সেই বছরই ৭ই ডিসেম্বর একাধিক ব্র্যান্ডের খুচরো ব্যবসায়ে ৫১% বিদেশি বিনিয়োগের সম্মতি দেওয়া হয়।

বর্তমান ভারত সরকার প্রথম থেকেই “Make In India” শ্লোগান তুলে আরও বেশি করে বিদেশি পুঁজি যাতে ভারতে আসে তার জন্য উদ্যোগী হয়। এবং সেটা যে কাজে দিচ্ছে একটা পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাবে। এপ্রিল ২০০০ থেকে মার্চ ২০১৬ পর্যন্ত ভারতে মোট বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে ৪২৪,১৬৭ মিলিয়ন ডলার। সেখানে ২০১৬র এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিনিয়োগ এসেছে ২৯,০১৬ মিলিয়ন ডলার।(৬) তার মানে আগের সময়ের তুলনায় ২০১৬র আলোচ্য সময় হোলো ৩.১৩% আর বিনিয়োগ হোলো ৬.৮৪%। অথচ ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষের তুলনায় ২০১৫-১৬ সালে বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি বেড়েছে ২১.৮২%। (৭) দীর্ঘদিন ধরেই খুচরো ব্যবসায় বিদেশি পুজির অনুপ্রবেশের সমস্ত বাঁধা তুলে নেবার জন্য নানান মহল থেকে চাপ দেওয়া হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালের বাজেটে একাধিক ব্র্যান্ডের খুচরো ব্যবসাতেও ১০০% বিদেশি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘোষনা করা হয়। অবশ্য একটা শর্ত রাখা হয় যে সমস্ত পণ্যই ভারতে তৈরি হতে হবে। এরপরই ওয়ালমার্ট, IKEA, ক্যারেফোর, টেস্কোর মতো একাধিক ব্র্যান্ডের খুচরো ব্যবসায়ে অগ্রনী বহুজাতিক সংস্থাগুলো ভারতে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

এইসব বহুজাতিকের বাণিজ্য সম্ভাবনার সামনে সবথেকে বড় বাঁধা এদেশের অসংগঠিত খুচরো বিক্রির বাজার। এখন যদি বাজারে অর্থের যোগান কমিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে নগদ অর্থের অভাবে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমতে বাধ্য। এদের একটা অংশ হয়তো ইলেকট্রনিক লেনদেনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হবে; কিন্তু অধিকাংশের পক্ষেই সেটা সম্ভব হবে না। আবার বহুজাতিকদের দোকানে যেহেতু কার্ডে লেনদেন অবাধে চলবে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে ক্রেতার ভিড় জমবে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের ফলে কালো টাকার অধিকাংশটাই নাগালের বাইরে থেকে গেলেও, খুচরো ব্যবসায়ে বহুজাতিকদের মুনাফাকে কিন্তু সুনিশ্চিত করেছে। এই কারণেই ইউরোপ ও আমেরিকার বাণিজ্যমহল ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দু হাত তুলে সমর্থন করছে।

না, শহুরে মধ্যবিত্তদের একটা অংশ এখনো টের পান নি। তাদের অনেকেই ইতিমধ্যেই ডিজিটাল লেনদেনে কমবেশি অভ্যস্ত। কিন্তু এই পদ্ধতির ফলে কাল হোক বা পরশু, তাদেরও টান ধরতে বাধ্য। ইতিমধ্যেই নগদের অভাবে রবিশস্যের চাষ আক্রান্ত হয়েছে। সামলানোর জন্য সরকার ঘোষণা করেছেন, সার-বীজের দোকানে পুরনো ৫০০ টাকায় কেনাবেচা করা যাবে। মুশকিল হোলো ভারতে বীজ আর কীটনাশকের বাজারে সবথেকে বড় দুই খেলোয়াড় হোলো বহুজাতিক মনস্যান্টো এবং দ্যু পঁ। কাজেই এই সিদ্ধান্তের ফলে তাদের ব্যবসা কিন্তু অব্যাহত থাকবে। কৃষক শুধু দিতে পারবেন না ক্ষেতমজুরের মজুরি, ট্র্যাক্টর বা স্যালোর ভাড়া। অর্থাৎ বহুজাতিক ভালো থাকবে, মরবে নিরন্ন মানুষ। এটাই হোলো ডিমানিটাইজেশনের মূল কথা।

সূত্র-
(১) – Freidrich Schneider – Shadow Economies and Corruption All Over the World: What Do We Really Know – Institute for the Study of Labor (Sept, 2006)
(২) Trading Economics
(৩) "India 'loses $500bn to tax havens'". BBC News. Retrieved 29 July 2015.
(৪) "In an attempt to curb black money, PM Narendra Modi declares Rs 500, 1000 notes to be invalid". news. The Economic Times. 9 November 2016.
(৫) The Times of India, 12.04.2016
(৬) Dept of Industrial Policy & Promotions ওয়েবসাইট

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com