তৈরাশিক

ব্যালকনির রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো তিস্তা।থেকে থেকেই দমকা হাওয়া এসে গায়ে  লাগছে আর সাথে গুঁড়ো বৃষ্টির ছাঁট।শরৎ আকাশের এমন ভারী মুখ বড়ই স্বভাব বিরূদ্ধ।তিস্তার মনের ভিতরটাতেও ঝোড়ো তোলপাড়।এতদিন সে তো একাই সব ঝড়ঝাপটা সামলে এসেছে,সব প্রতিকূলতার বিরূদ্ধে একাই লড়েছে কিন্তু আজ—আজ যেন সব’টা ঘাঁটাঘাঁটি হয়ে গেল।
দশ বছর আগে সৈকত এসেছিল ওর জীবনে।প্রথম প্রেম আর বন্যায় আগল ভাঙার মত ভেসে গেছিল তিস্তা।তিস্তা প্রেগনেন্ট হয়,সৈকত দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে;ভাঙণ ধরে ওদের সম্পর্কে।তিস্তা ভালোবেসে ঠকেছিল কিন্তু নিজের শরীরে প্রতিতিলে বেড়ে ওঠা একটা নিষ্পাপ জীবনের সাথে অবিচার করতে পারেনি সে।
বাড়ির অমতেই মা হয় তিস্তা।আইনত স্বীকৃতি পেলেও সমাজ মেনে নেয়নি তার এই বলিষ্ঠ মাতৃত্ব।তবু সব নিন্দে অপবাদ লোকলজ্জার হেমলক গিলে সে একাই মানুষ করে আসছে আরূষি’কে।সুচারুভাবে পালন করেছে প্রতিটা দায়িত্ব।মায়ের স্নেহ এবং পৈতৃক নিরাপত্তা কোনোটারই অভাব হতে দেয়নি সে।তবে, মাথার উপর বাবার প্রশ্রয় না থাকার দরূন’ই হোক আর দৈবক্রমেই হোক আরূষিও যেন ওর সমবয়সীদের তুলনায়  একটু বেশিই পরিনত। এইটুকু বয়সেও ও তিস্তাকে পুরোদস্তুর বোঝে,বোঝে তার একানে জীবন যুদ্ধটাকে। মা-মেয়ের এমন বোঝাপড়া সম্পর্কের অভিধানে হয়ত বা বিরল।

গেটের সামনে গাড়িটা এসে থামল।অভীক আরূষিকে পুজোর সপিং করিয়ে এনেছে। আরূষির দায়িত্বের অনেকটাই ইনাদীং কতকটা জোর করেই সে নিয়ে নিয়েছে তিস্তার থেকে।নাহ,একজন অসহায় সিঙ্গেল মাদারের প্রতি নিছক করুণা নয় এ এক আলাদা অভিব্যক্তি।পাশের ফ্ল্যাটের মল্লিকাদি তো সেদিন অযাচিতভাবেই উপদেশের মোড়কে মন্তব্য হাঁকিয়ে গেল, “ঐ সব সফিস্টিকেটেড ব্যাচেলররা খুব একটা সুবিধের হয়না বুঝলে,দেখ হয়ত কোনো অ্যাডভান্টেজ নেবে বলেই—”
কথাগুলো মানতে পারেনি তিস্তা।ওদের অফিসে তো সুন্দরী মেয়ের অভাব নেই, অভীকের প্রতি আকৃষ্টও অনেকেই।তবু সবাইকে ছেড়ে কেন ওর মত একটা মেয়ের জন্য—
তিস্তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল অভীক,আরূষিকে অ্যাডপ্ট করে বৈধ স্বীকৃতিও দিতে চেয়েছিল কিন্তু তিস্তা রাজি হয়নি।আসলে বিশ্বাসটা যে কাঁচের আয়নার মতই ঠুনকো, একবার ভাঙলে সহজে জোড়া লাগে না।তবু প্রত্যাখ্যাত হয়েও তো সে একই ভাবে জড়িয়ে আছে ওদের জীবনের সঙ্গে।এসব কি তবে শুধুই সুযোগ-স্বার্থে?এমন হাজারো প্রশ্ন হিজিবিজি কেটে যাচ্ছে, বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোটানা জেরবার করে রেখেছে তিস্তার  অন্তঃকরণকে। 
এত অল্প সময়ে আরূষিও কত গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে অভীকের সাথে।একটা কথা মনে পড়তেই ধক করে উঠল তিস্তার স্নায়ুটা, “ মামমাম,অভীক আঙ্কেল আমার  পাপা হতে পারে না?”প্রশ্নের প্রচ্ছদে এই প্রথম সে নিজে থেকে তার সুপ্ত কোনো বাসনা প্রকাশ করেছিল তিস্তার কাছে।
নীচে নেমে দরজা খুলে দাঁড়ালো তিস্তা।শপিংএর প্যাকেটগুলো তার হাতে দিয়ে অভীক বলল, “আর ঢুকব না রে,একটু তাড়া আছে।আচ্ছা আরূ মা আজ তাহলে আমি আসি।”তার গালে চুমু দিয়ে আরূষি বলল, “কাল আবার এসো কিন্তু” সম্মতি জানিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল অভীক; তিস্তা পিছু ডাকল, 
-অভীক, কাল আসবি তো?
তিস্তার স্বরে আজ একদম অন্য উত্তাপ।অবাক হয়ে তার চোখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল অভীক তারপর আলতো হেসে বলল, “আসব”
জীবনের সব অঙ্ক গণিতের নিয়ম মানে না।তিস্তা তাকিয়ে দেখল মেঘ সরে গিয়ে শরতের আকাশটাও আবার ঝলমলিয়ে উঠেছে।
 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com