রবীন্দ্রনাথের বিশ্বচেতনা এবং বিশ্বপ্রেম

রবীন্দ্রনাথের বিশ্বচেতনা এবং বিশ্বপ্রেম এক মহত্তর, বৃহত্তর, সীমাহীন জীবনের অভিমুখে নিরন্তর ছুটে চলার উদাত্ত আহ্বান। এই আহ্বান জীবনের প্রথম প্রভাতেই বিহ্বল আবেগে উল্লাসভরে ধ্বনিত হয়েছিল তরুণ কবির চিত্তে। সব সংস্কার, বাধা, ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হয়ে জগতের অনন্ত সৌন্দর্য ও বিশ্বের প্রাণলীলাকে ‘প্রভাতসংগীতের’ কাল থেকে তিনি তাই অনুভব করেছিলেন আপন অন্তরে -                                                                                   ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর                                                                                কেমনে পশিল প্রাণের পর                                                                                           কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখীর গান                                                                                                 না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ!(নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ)                                     এই পর্যায়ে কবির মনে হয়েছে এক দুর্দান্ত প্রাণাবেগের জোয়ারে ভেসে, চারপাশের বাধাবন্ধন অতিক্রম করে তিনি অকস্মাৎ ছড়িয়ে পড়েছেন সমস্ত জগৎ জুড়ে। তাঁর অন্তরাবেগের স্পর্শে পর্বত ছুটে চলেছে জড়তার স্থানুত্ব ভেঙে। খসে পড়ছে রাশিরাশি শিলার স্তর। ভূধর কেঁপে উঠছে থরথর করে। ফেনিল সলিল অকূল সমুদ্রের কোলে শত সহস্র ডানা মেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে উন্মাদ গর্জনের ভেতর দিয়ে। এবং এরপরেই  অন্তরের রূপসাগরে ডুব দিয়ে কবি বুঝেছেন, নিখিলজগৎ বস্তুজগতের বিষয় হয়ে নয়, ধরা দিয়েছে তাঁর মনোজগতেরই অংশ হয়ে -                                                                                                                            হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি                                                                                                                                                    জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি।(প্রভাত উৎসব)                                    অনন্তের মহাসাগরে মিলনের আকাঙ্ক্ষা, অনন্তপ্রসারি বিশ্বপ্রাণের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বাসনা, প্রেম-সৌন্দর্যের অভিনবরূপে ধরা দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের চেতনায়। পরবর্তীকালে এই চেতনা কবির অন্তরে বেদনার অনুভবে, কল্পনা, কামনায় ও কর্মে স্পন্দিত হয়েছিল অবিরাম। সমগ্র জগতকে ভালোবেসে, সমস্ত মানবকে ভালোবেসে, সকলের সঙ্গে পরম আত্মীয়তা অনুভব করে কবির বিপুল চৈতন্যের আলোকিত ক্ষেত্র পূর্ণতা পেয়েছিল অনিবারভাবে। নিজের খণ্ড জীবনের সঙ্গে অখণ্ড মহাজগতের যোগ উপলব্ধি করে তিনি তাই বলেছেন -                                                                                                                                                                                                          সব ঠাঁই মোর ঘর আছে, আমি                                                                                                                                                             সেই ঘর মরি খুঁজিয়া।(প্রবাসী)                                                                                                                                                                               এবং বিশ্বের সর্বত্র নিজের আপনজন খুঁজতে খুঁজতেই কবি দেশ হতে দেশঅন্তরে, কাল হতে কালান্তরে, লোক হতে লোকান্তরে এক অন্তর্নিহিত গতির আবেগে ভেসে ভেসে চঞ্চল হয়ে সুদূরের পিয়াসি হতে চেয়েছেন-                       আমি চঞ্চল হে,                                                                                                                                                          আমি সুদূরের পিয়াসি।(আমি চঞ্চল হে)                                                                                                                          

চিরচঞ্চলের এই আবেগ রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়ে গেছে চিরকাল। তিনি দেখেছেন ঝড়ের মধ্যে যে গতির উন্মাদনা, বলাকার উন্মত্ত ডানায় যে উদ্দাম চঞ্চলতা, চঞ্চলা নদীবক্ষে যে নিরন্তর প্রবাহমানতা তার সবই বিশ্বের এক অন্তহীন প্রা্ণশক্তির বিচ্ছুরিত আবেগ। এরা প্রত্যেকে শাশ্বত সত্তার সঙ্গে মিলনের উদ্দেশ্যে, খণ্ডিত সত্তা থেকে পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য অন্তহীনকাল ধরে নিয়ত ধাবমান। গতিবেগের এই আবেগ নির্বিশেষের অনুভবে আলোড়ন তুলেছিল কবির রোমান্টিক মনে। তিনি তাই দেখেছেন - নক্ষত্র, অরণ্য, পর্বত, দ্বীপ সবই দৃষ্টির অগোচরে অগ্রসর হয়ে চলেছে নিরবধিকাল ধরে। একই বিশ্বচেতনার আবেগ বিচ্ছুরিত হচ্ছে সর্বত্র। জগতে কিছুই তাই অচল নয়। কারণ গতিমানতাই বিশ্বের মূলতত্ত্ব। গতিই বিশ্বের ধর্ম। বিশ্বসৃষ্টির মৌলিক অনুভব। গতির মধ্যেই প্রাণশক্তির বিকাশ ঘটে। গতিবেগ আছে বলে অন্ধকারের কারাগার ভেঙে সূর্যের আলো ফোটে। আবর্তিত হতে হতে এক অজানা থেকে আরেক অজানার পথে ছুটে চলে নক্ষত্রপুঞ্জ। সুপ্তির বন্ধন ভেঙে, মাটির গহ্বর ছেড়ে ঊর্ধ্বমুখে মাথা তোলে লক্ষ লক্ষ প্রাণের বীজ। গতি আছে বলেই ঋতু যায়, ঋতু আসে। ফুল ফোটে, ফুল ঝরে। জীবজীবনে আসে জন্মজন্মান্তর। চলে জন্মমৃত্যুর দোলায় চড়ে নব নব জীবনের মধ্যে আবর্তন বিবর্তনের খেলা -                                                                                                                                                                                                                                                         এ আমার শরীরের শিরায় শিরায়                                                                                                           যে প্রাণতরঙ্গমালা রাত্রিদিন ধায়                                                                                                                                                                সেই প্রাণ ছুটিয়াছে বিশ্বদিগবিজয়ে,                                                                                                                                                                                                            বিশ্বব্যাপি জন্মমৃত্যু সমুদ্র-দোলায়                                                                                                                         দুলিতেছে অন্তহীন জোয়ার-ভাঁটায়।(প্রাণ, নৈবেদ্য)                                                          

রবীন্দ্রনাথের বিশ্বচেতনাই বিশ্বপ্রেম হয়ে রোমান্টিক সৌন্দর্যানুভূতি ও আনন্দের ভেতর দিয়ে তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে, ব্যবহারিক জীবনে প্রকাশ পেয়েছে চিরকাল। কারণ স্বভাবগত দিক থেকে তিনি মূলত রোমান্টিক। অজানার প্রতি, সুদূরের প্রতি, বিশ্বের সুগভীর রহস্য আর বিচিত্র সৌন্দর্যের প্রতি কবির ভালোবাসা অফুরন্ত। আকর্ষণ দুর্নিবার। এক্ষেত্রে তিনি সৌন্দর্য, প্রেম এবং কল্যাণের আনন্দদূত। তাঁর সূক্ষ্ম অনুভূতিলোকে বিশ্বপ্রকৃতির রস ও রহস্য আলোড়ন তুলেছিল অপূর্ব ভাবতরঙ্গে। ভাষায়, সুরে, ছন্দে সেই ভাবতরঙ্গকেই মূর্ত করে কবি স্পর্শ করেছেন বারবার। বিশ্বের রসলোক আর স্বপ্নলোক তাই কেবল বস্তুজগতের অংশ হয়ে নয়, ধরা দিয়েছে তাঁর মনোজগতের সঙ্গে একীভূত হয়ে। বাইরের বিশ্ব তাঁর মানসসরোবরে প্রেম, আনন্দ আর সৌন্দর্যের আধার হয়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠেছে পুষ্পিত পুষ্পের মতো। তাই পদ্মাতীরে ভাঙনলাগা খাড়াপাড়ির গর্তে বনঝাউয়ের অন্তরালে গাঙশালিকের বাসায় মুগ্ধ দৃষ্টিপাতে মহাবিশ্বের রূপের তরঙ্গকেই বয়ে যেতে দেখেছেন কবি। বিশ্বস্রষ্টার লীলারহস্য দেখেছেন, নিরুৎসুক আলস্যে দুপুরের ক্লান্ত রোদে পল্লীপথে চরে বেড়ানো গোবৎসদের লেজের ঝাপটায়। তাদের উত্যক্ত করা দুরন্ত মাছির আনাগোনায়। দেখেছেন, উৎসব সমারোহে কেমন করে জীবননির্ঝরের স্পর্শ পেয়ে আনন্দময় মূর্তি ধরে ফুটে উঠেছে শিউলি, করবী, কদম্ব অথবা নাগকেশরের দল। কিংবা কেমন করে পূর্ণিমার চাঁদ পুলকিত সৌন্দর্যে হাস্যময় করে তুলেছে প্রফুল্লময়ী ধরণীকে।                                                                                                                                           

জগতের সব ঘটনাপ্রবাহ, দৃশ্যমান সব দৃশ্যাবলীকে অনন্ত সত্তার অখণ্ড মাধুর্যের প্রকাশরূপে আপন অন্তরের মধ্যেই দখেতে পেয়েছিলেন কবি। বসুন্ধরার শ্যামলিমা, দূর আকাশের নীল নীলিমা, বিকেলের অস্তরাগে কলসি কাঁখে গাঁয়ের বধূর ঘরে ফেরা সবই তাঁর কাছে সেই একক চৈতন্যশক্তির ছন্দময় ঘাত প্রতিঘাতেরই এক একটি অবস্থা বলে পরিগণিত হয়েছিল। কবির রোমান্টিক চিত্তের স্পর্শে মৃত্তিকাবক্ষে এরা সকলেই মোহনীয়, রমনীয় হয়ে উঠেছিল অবিচ্ছিন্ন আনন্দের মাধুরী হয়ে। কবি তাই বলেছেন - ‘বিশ্বে যা রমনীয়, যা মধুর দেখেছি, যার থেকে রস উপভোগ করেছি তারা চিত্তের বাইরের কোনে বিচ্ছিন্ন সুন্দর বস্তু নয়। আমার মনের মধ্যে যে স্বাভাবিক শক্তি আছে তাই এসবকে সুন্দর করেছে। বিশ্বের গাছপালা দেখে যে ভালো লাগছে, সেই ভালোলাগাটাই হচ্ছে তার সৌন্দর্য’।

আর এই কারণেই কবির বিশ্বচেতনা শুধুমাত্র বিজ্ঞানের তাত্ত্বিকতায় আবদ্ধ থাকেনি। গতি কেবল গতিতেই পর্যবসিত থাকলে বিশ্বসৃষ্টির সার্থকতা থাকে না। অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত হওয়া, নিরাকার থেকে সাকার হওয়াই তার লক্ষ্য। কেননা বিশ্বরহস্যের অন্তরালে যে রূপ এবং রস রয়েছে তাকে উপভোগ্য করে তোলাই বিশ্বস্রষ্টার উদ্দেশ্য। তাই নদী যেমন অবিচ্ছিন্ন অবিরল সমুখের পানে চলতে চলতে অকস্মাৎ কায়াহীন প্রবাহের প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে নিজেই নিজের বুকে পুঞ্জপুঞ্জ বস্তুফেনা জাগিয়ে তোলে, তেমনি যে অন্তহীন চেতনাপ্রবাহ জগতে সমস্ত জীবনধারার উৎস, তাঁর অবাধ বাধাবন্ধনহীন গতিপ্রবাহ হঠাৎ-হঠাৎ প্রতিহত করেই ক্ষুদ্র খণ্ড বস্তুরূপে দৃশ্যমান ওঠে এই জগৎ।   

                   স্পন্দনে শিহরে শূন্য তব রুদ্র কায়াহীন বেগে                                                               বস্তুহীন প্রবাহের প্রচণ্ড আঘাত লেগে                                                                       পুঞ্জপুঞ্জ বস্তুফেনা ওঠে জেগে,                                                                         আলোকের তীব্রচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া উঠে বর্ণস্রোতে                                                       ধাবমান অন্ধকার হতে,                                                                                        ঘূর্ণাচক্রে ঘুরে ঘুরে মরে                                                                                           স্তরে স্তরে                                                                                         চন্দ্র সূর্য তারা যত                                                                                               বুদুবুদের মত।(চঞ্চলা)                                    

রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বচেতনা বিশ্বপ্রেমে পরিণত হয়ে রোমান্টিক কবি হৃদয়ের অলক্ষ্য স্পর্শে রূপেরসে একীভূত হয়ে গেছে সসীমের বন্ধন ভেঙে দেশকালের সীমানা পেরিয়ে। নিখিলজগতের সর্বত্রই তিনি তাই নিজ অস্তিত্বের অনুসন্ধান খুঁজে পেয়েছেন। সম্ভবত সে কারণেই কবি বলেছেন -                                                                                                         আমি পাগল হইয়া বনে বনে ফিরি, আপন গন্ধে মম                                                                                                        কস্তুরী মৃগসম।(উৎসর্গ)                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                ক্ষুদ্রতা থেকে, খণ্ডতা থেকে মুক্ত হয়ে অখণ্ড মহাজীবনের আস্বাদ পেতে কল্পনায় কবি দেশ হতে দেশান্তরে নব নব জীবনের মধ্যে নিরন্তর বিচরণ করে ফিরেছেন। কখনো উষ্ট্রদুগ্ধ পানকারী মরু আরবের দুর্দম সন্তান হয়েছেন। কখনো হয়েছেন গোলাপকাননবাসী দ্রাক্ষাপায়ী পারসিক। কখনো তিনি অশ্বারোহী নির্ভীক তাতার। কখনো আবার শিষ্টাচারি সতেজ জাপানী। কবি কখনো হিংস্র ব্যাঘ্র অটবীর। অরণ্যমেঘের অন্তরালে অগ্নিদীপ্ত বজ্রের মতো বিদ্যুৎবেগে তীব্র হিংসায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ভীত শিকারের ওপরে। আবার পরক্ষণে লঘু তরীসম প্রাণের আবেগে ছুটে চলে গেছেন সেই নিরুদ্দেশের পথে, যেখানে দ্বিধাদ্বন্দ্বহীন উন্মুক্ত জীবনস্রোতে ভাসতে ভাসতেই তিনি দেখেছেন - ব্যাকুল আবেগে সকরুণ চোখে, ভালোবাসায় প্রেমে বিগলিত হয়ে মৃত্তিকা ধরণী চেয়ে আছে তাঁরই মুখের পানে। পরমাত্মীয় ভেবে কলহাস্যে নদীর জল সহসা বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যগ্র ব্যাকুল হাত। আকাশ তাঁরই জন্য জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে সুন্দরী চামেলীর লাবণ্য বিলাস হয়ে। থরে-থরে, ভারে-ভারে অন্তরের সৌগন্ধে ফুল ফুটেছে কবিকেই প্রেম বিলিয়ে দেবার জন্য। কেননা এদের প্রত্যকের সঙ্গেই তাঁর অন্তরের পরম আত্মীয়তা। সবার সঙ্গেই আত্মার সুগভীর বন্ধন।                                                                      

বিশেষ থেকে নির্বিশেষে এভাবেই রবীন্দ্রনাথ ছড়িয়ে পড়েছেন অখণ্ড মহাজীবনের স্তরে স্তরে। অনুভব করেছেন বিশ্বসৃষ্টির বিরামহীন মহাস্রোত। নিরবধিকাল ধরেই যা বয়ে চলেছে বিশ্বভুবন জুড়ে। স্বার্থপরতাহীন অবিকার প্রেমে, অফুরন্ত প্রাণের প্রাচুর্যে অনন্তের(বিশ্বস্রষ্টার)মহাসাগরে মিলিত হলেই কেবল এই বৃহত্তর, মহত্তর বিশ্বপ্রেম আস্বাদন করা যায়।‘রক্তকরবীর’ নন্দিনী তাই বলদর্পী রাজাকে আহ্বান জানিয়েছে, স্বার্থকামনায় লোলুপ ক্ষুদ্র সংকীর্ণ জীবন ছেড়ে জনতার স্রোতে বেরিয়ে আসতে। প্রত্যেকের হৃদয়দুয়ারে ধাক্কা দিয়ে এই বার্তাই সে দিতে চেয়েছে বারবার - স্বার্থহীন ভালোবাসাই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষঙ্গী। যার অভিব্যক্তিতে শ্রীময় হয়ে ওঠে জগৎ ও জীবন। নন্দিনী এই শ্রীময় ভালোবাসার প্রতীকিরূপ। যার প্রেরণায় যক্ষপুরীর আবদ্ধ মানুষগুলো বাঁচার অনুপ্রেরণা লাভ করেছে। বদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে সবার সঙ্গে মিলন ঘটলে যে প্রাণশক্তির বিকাশ ঘটে এই বোধোদয় নন্দিনীর সংস্পর্শেই জাগ্রত হয়েছে সাধারণ মানুষের চেতনায়।  

সংকীর্ণতার, আবদ্ধতার কঠিন প্রাচির ডিঙিয়ে নিজেকে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত করার প্রেরণা রবীন্দ্রনাথের উদার চিত্তে জাগ্রত ছিল প্রথম জীবন থেকেই। বিশ্বের সকল পাত্র থেকে সৌন্দর্য আর ভালোবাসার আনন্দমদিরা পান করার বাসনা কবির অন্তরে জন্মলাভ করেছিল তাঁর সার্বজনীন ও সার্বভৌমিক মহামিলনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। পরবর্তী জীবনে বারবার তিনি তাই প্রবাসযাত্রা করেছেন। ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। ভাব এবং জ্ঞানের আদানপ্রদান করে সংঘাতহীন মিলন ঘটাতে চেয়েছেন প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মধ্যে। মানব জীবনের মিলন ও সাম্যের সত্যানুসন্ধানে তিনি ব্যাপৃত হয়েছেন লোককল্যাণের ব্রত নিয়ে। নানান জাতি,  নানা ধর্মমত, নানা ভাষার ভারতবর্ষকে অনুভব করেছেন মহামানবের মিলনক্ষেত্র বলে। তাই বিশ্বজননীর অখণ্ড সত্তারূপে উপলব্ধি করেছেন ভারতবর্ষকে। দেখেছেন বিশ্বময়ীর, বিশ্বমাতার আঁচল পাতা রয়েছে তাঁর স্বদেশজননীর অঙ্গেই। ভালোবাসায় শ্রদ্বায় স্বদেশজননীকে প্রণাম করেছেন কবি।                                     

সংকীর্ণ স্বাদেশিকতা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, ধর্মের ভয়ংকর চিন্তাচেতনাকে চিরকাল চরম দুর্গতির কারণ বলে মনে করেছেন কবি। বলেছেন - ‘যুক্তিহীন গোঁড়ামি, নিষ্ঠুর ভেদবিচ্ছেদ আনন্দের পরিবর্তে কেবলই জন্ম দেয় দুঃখের। সংর্ঘর্ষের ক্রুর রেষারেষিতে মানবাত্মার অপমান’। এই বক্তব্য তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘গোরা’এর নায়ক গোরার মুখ দিয়ে বহুবার ব্যক্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বলেছেন -‘মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন হলেই আসে আনন্দ, আসে জীবনের সার্থকতা। বিভেদে কেবলই দুঃখ, বিচ্ছেদে শুধুই বেদনা’।

কিশোর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের অন্তরে সাম্যচেতনাবোধে এই বিশ্বপ্রেমের অংকুরোদ্গম হয়েছিল -                                                                                                 কবে দেব এ রজনী হবে অবসান?                                                                                                                                                                                                                                       অযুত মানবগণ এক কণ্ঠে দেব                                                                                                                                                                                    এক গান গাইবেক স্বর্গ পূর্ণ করি?                                                                                                                                দূর ভবিষ্যৎ সেই পেতেছি দেখিতে                                                                                                                     যেইদিন একপ্রেমে হইয়া নিবদ্ধ                                                                                                       মিলিবেক কোটি কোটি মানবহৃদয়!(কবিকাহিনী)                                                        ‘ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা’ প্রবন্ধে তিনি তাই লিখেছিলেন -‘অসভ্যতার অন্ধকারে পৃথিবীর যে সকল দেশ নিদ্রিত আছে তাহাদের ঘুম ভাঙাইতে আমার দেশ বিদেশে ভ্রমণ করিব। বিজ্ঞান, দর্শন, কাব্য পড়িবার জন্য দেশ বিদেশের লোক আমাদের ভাষা শিক্ষা করিবে। আমাদের দেশ হইতে জ্ঞান উপার্জন করিতে এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় দেশ বিদেশের লোকে পূর্ণ হইবে’।

জগৎস্রোতে ভেসে, সবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংকীর্ণতার বন্ধন থেকে মুক্ত হবার এই আদর্শই বিশ্বপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন তাঁর আরও এক অমর কীর্তি ‘বিশ্বভারতীর’ মাধ্যমে। বিশ্বভারতীর মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে বিশ্বহৃদয়ের, ভালোবাসার সঙ্গে জ্ঞানের, সাম্যের সঙ্গে প্রজ্ঞার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন গড়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। যা জ্ঞান সাধনা ও জ্ঞান বিনিময়ের মহাতীর্থক্ষেত্র বলে পরিগণিত আজ। অনন্তপথের যাত্রী কবি বিশ্বসৃষ্টি এবং মানবজীবনের স্বরূপ সন্ধানে বারংবার বস্তুজগতের সীমা অতিক্রম করে অসীমের পথে প্রেম ও সৌন্দর্যের সাধক হয়েছেন আজীবন। কিনতু তাঁর সেই অসামান্য বিশ্বচেতনা যে নিছক ভাবাবেশ নয়, প্রেমের আনন্দদৃষ্টি দিয়ে জীবনের ধ্রুব সত্যকেই যে তিনি অনুভব করেছিলেন, তার স্বরূপ তিনি উন্মোচন করলেন আপনার বিশাল কর্মসম্ভার দিয়ে। বিশ্বমানবের সঙ্গে বিশ্বমনের মিলন ঘটিয়ে, অনন্তের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বকবি নিজের স্বরূপও উদঘাটন করে গেলেন বিশ্বজনেরই হৃদয়ের কাছে।                                                                                                                                                    

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com