স্কিতজোফ্রেনিয়া

(১)
        হোস্টেলের প্রবেশপথের সবগুলো তালা একে একে পরীক্ষা করে দেখে মেট্রোন রাজিয়া সুলতানা । মাঝখানে পুকুরটাকে রেখে পূর্ব এবং পশ্চিমপাশের মেয়েদের হোষ্টেলগুলো তৈরি হয়েছে।সবচেয়ে পুরাতন হোস্টেল এর বয়স কলেজের বয়সের কাছাকাছি। রাজিয়া সুলতানা এই হোস্টেলের দায়িত্বে আছেন প্রায় পনের বছর । হোস্টেলের লম্বা করিডোরের দুদিকে শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আছে আরো অসংখ্য ছোট ছোট করিডোর ।সেই ছোট ছোট করিডোরে পাশাপাশি ছাত্রীদের কক্ষ । একেক কক্ষে চারজন করে ছাত্রী অবস্থান করে ।
       রাজিয়া সুলতানা টর্চ জ্বালিয়ে হোস্টেলের রান্নাঘরের পেছনের দরজাটা ভালো করে দেখেন । ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো । তবুও কেন যেন তার মনটা খুতখুঁত করতে থাকে । ইদানিং রাত যত বাড়তে থাকে রাজিয়া সুলতানার গা কেমন ছমছম করতে থাকে ।পুরো হোস্টেলে প্রায় পাঁচশত ছাত্রীর বাস । তবুও ভয় কাটেনা রাজিয়া সুলতানার । এই পনের বছরের চাকুরী জীবনে গত এক মাসে দু' দুটো চাঞ্চল্যকর ঘটনা তাকে ভীষণভাবে মুষড়ে দিয়েছে । প্রায় মাসখানেক আগে এক সকালে হোস্টেলের সামনের পুকুরে ভেসে ওঠে দীপার লাশ । হতবিহ্বল হয়ে পড়ে পুরো কলেজ ক্যাম্পাস । কত জল্পনা, কল্পনা, থানা, পুলিশ, মিডিয়া, তদন্ত কমিটি- শেষমেশ জানা গেলো দীপা আত্মহত্যা করেছে । কিন্তু আজ অবধি খোলসা হয়নি দীপার আত্মহত্যার কারণ । কেউ কেউ কানাঘুষা করেছে- পরকীয়ার জের হিসেবেই আত্মহত্যা করেছে দীপা ।
      রান্নাঘরের দরজাটা পরীক্ষা করতে করতে রাজিয়া সুলতানা ভাবতে থাকেন- গেটে সারারাত দারোয়ান মফিজ থাকে, সবগুলো কলাপসিবল গেট ভেতর থেকে লক করা থাকে, সারারাত করিডোরে আলো জ্বলে- এর মাঝে দীপা, সাফিয়া কেমন করে বেরিয়ে গেল !
        সাফিয়া খাতুন থাকতো একশত পাঁচ নম্বর কক্ষে । হঠাৎ এক দুপুরে অচেনা এক মহিলা এসে তুমুল হৈ চৈ বাধিয়ে দেয় সাফিয়াকে ঘিরে । সুনিদৃষ্ট অভিযোগ মহিলার । তার ব্যাবসায়ী স্বামীর সাথে নাকি অবৈধ সম্পর্ক আছে ভূগোল বিভাগের স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্রী সাফিয়া খাতুনের। সাফিয়া মহিলার কোন কথার তেমন উত্তর দেয়নি । চুপচাপ বিছানায় বসে ছিলো হাত পা গুটিয়ে । প্রতিবাদ করেছে সাফিয়ার হয়ে অন্য রুমমেটরা । কাকন নামের বাংলা বিভাগের ছাত্রীতো  মহিলার দিকে তেড়ে মেড়ে  এসেছিলো- আপনার এতো বড় স্পর্ধা ! হোস্টেলে ঢুকে আপনি আমাদের বন্ধুকে অপমান করতে এসেছেন ! যদি তেমন কোন ঘটনাই ঘটে থাকে, যান আপনি আপনার স্বামীকে সামলান ।
- দেখেন আপা ! আপনি একটা মেয়ে , আমিও একটা মেয়ে । কোনদিন আমি সাফিয়া আপারে অপমান করতে আসতাম না । আপা আমার বিয়া হইছে অল্প বয়সে । তেমন লেখাপড়া করি নাই । আমার তিন সন্তান । আমার স্বামীর অনেক টাকা হইছে, এখন তার আর আমারে ভালো লাগেনা । টাকার দেমাগে যখন তখন বিয়া করার হুমকি দেয় , গায়ে হাত তোলে ।সংসারের দিগে হ্যার কোনই খেয়াল নাই । এহন যদি সাফিয়া আপারে বিয়া করে তয় আমি আমার পোলাপান লইয়া মরন ছাড়া উপায় থাকবো না । আমার বড় মাইয়্যাডার বিয়া ঠিক হইছে- বিয়াডাও ভাইঙ্গা যাইবো । একটা মাইয়্যা হইয়া সাফিয়া আপা কেন এতো বড় ক্ষতি করবো আরেক মাইয়্যার ? আমিতো হ্যার কোন ক্ষতি করি নাই । হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে মহিলা ।
      সেদিনের মতো সাফিয়ার রুমমেটরা বুঝিয়ে শুনিয়ে ভদ্র মহিলাকে বিদায় করে । ভদ্র মহিলা বিদায় হবার পর বন্ধুরা সব সাফিয়াকে নানান প্রশ্নে জর্জরিত করলেও নিরুত্তর থাকে সাফিয়া । এসব ঘটনা রাজিয়া সুলতানা জানতে পারেন যখন পরের দিন একইভাবে এই পুকুরেই ভেসে ওঠে সাফিয়ার লাশ !

 

 (2)
     হোস্টেলের ফুল বাগানে মালির কাজ করে স্বল্পভাষী, সুঠামদেহী রশিদ নামের চব্বিশ, পঁচিশ বছরের এক যুবক । ছয় মাস আগে রাজিয়া সুলতানা হোস্টেল সুপারের কাছে সুপারিশ করে কাজে নিয়েছে রশিদকে ।সারাদিন বাগান পরিচর্যা করে বিকেলটা কলেজের গেটে দারোয়ানদের সাথে কাটায় রশিদ । প্রথম প্রথম অবসর সময়টা রশিদ নিজের ঘরেই শুয়ে বসে কাটাতো ।  হোস্টেলের পেছন দিকে বাউন্ডারি ওয়ালের সাথে স্যাঁতস্যাঁতে একটা টিনের চালায় থাকে রশিদ আর দারোয়ান মফিজ। মফিজই রশিদকে বলে কয়ে  বিকেলটা মূল গেটে বসে থাকতে রাজি করিয়েছে। কলেজ টাইমের পর হোস্টেলের ছাত্রীদের কাছে নানান ধরনের অতিথি আসে । পাঁচ, দশ টাকার বিনিময়ে রশিদসহ বেশ ক' জন মিলে কাগজের স্লিপ নিয়ে পৌঁছে দেয় ছাত্রীদের কক্ষে । যদিও আবাসিক ছাত্রীদের সাথে অভিভাবকদের দেখা করার জন্য হোস্টেল কর্তৃপক্ষের  নির্ধারিত দিন ও সময়সূচি দেয়া আছে তবুও আড়ালে আবডালে অন্যদিনগুলোতে বাড়তি পয়সা উপার্জনের সুযোগ করে নিয়েছে দারোয়ানসহ আরো অনেকেই । এই অনিয়ম কলেজ কর্তৃপক্ষ জানা সত্ত্বেও তেমন কোন কড়াকড়ি ব্যাবস্থা তারা নেয়না ।
      সারা বিকাল স্লিপ পৌঁছে দেয়ার বদৌলতে রশিদ এখন হোস্টেলের অনেক ছাত্রীর নাড়িনক্ষত্র জানে । কার বাবা এলো,কার প্রেমিক, কে কখন বাইরে যায়, কখন ফেরে তাও রশিদের মুখস্ত । অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে রাত নেমে এলেই রশিদের মাথা ঝিমঝিম করে। ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতো ওর অতীত এসে ওকে ঝাপটে ধরে ।আট ফুট বাই দশ ফুট ঘরটার কোণে রাখা চৌকিটার উপর পড়ে থাকে গুটিসুটি মেরে। খিলগাঁও রেললাইনের ভাঙাচোরা বস্তিঘর , পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা, আর সৎমা ! উহঃ ! কোনমতেই রশিদ ভুলতে পারেনা ওর বাবার অসহায় মুখ । কোনমতেই ভুলতে পারেনা সৎমা রাহেলার চকচকে লোভী চোখ । একটু চোখ লেগে এলেই ওর চোখের সামনে অট্টহাসি হাসে সৎমা রাহেলা ।
         বস্তির নোংরা ঘরটায় বসে বসে রশিদ সারাদিন ওর বাবার যন্ত্রণা দেখতো । দরজায় দাঁড়িয়ে যখন দেখতো বস্তির অন্য বাচ্চারা ঘুড়ি ওড়ায়, কানামাছি খেলে, ফুটবল খেলে - রশিদের খুব মন চাইতো খেলতে। কিন্তু রশিদ খেলতো না- ওর বাবা যে একদম একা । নিজে পানি ঢেলেও খেতে পারেনা । রশিদের আরেকটা ভাইয়ের জন্মের সময় মারা যায় রশিদের মা । তারপর রশিদের বাবা কোথা থেকে যেন নিয়ে আসে সৎমা রাহেলাকে । ভবন তৈরির রাজমিস্ত্রির জুগালির কাজ করতে করতে একদিন ছয়তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যায় রশিদের বাবা । জানটা বেঁচে গেলেও মেরুদণ্ডের আঘাতজনিত কারণে পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায় মানুষটা । কিছুদিন পর্যন্ত নানান এনজিও থেকে সাহায্য  সহযোগিতায় দিন চলে ওদের । একটা সময় সব বন্ধ হয়ে গেল । রাহেলা দিনে এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে ঘরে ফিরে শুরু করে চিৎকার চেঁচামেচি । পঙ্গু স্বামী আর সতীনের সন্তানের পেটের খোরাক জোগাতে তার ভীষণ অনীহা । কথায় কথায় রশিদের উপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন । 
       সন্ধ্যার পরেই নোংরা শাড়ি পাল্টে ট্রাংকে রাখা শাড়ি পরে রাহেলা । খলফার বেড়ায় টাঙানো ভাঙা আয়নাতে নিজের মুখখানা সাজাতে বসে । লিপিষ্টিক দেয়, কাজল লাগায় চোখে । রশিদ বাবার শিয়রের কাছে বসে সৎ মায়ের সাজগোজ দেখে । নিত্যদিনকার বাধা রুটিন যেন ! একসময় শুরু হয় রশিদের বাবার আহাজারি । তেড়ে আসে রাহেলা। চামচ, হাতা যা পায় তাই দিয়ে বেদম মারে রশিদকে । সচল বা'হাতখানা দিয়ে রশিদের বাবা বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে রাখে ছেলেকে । গর্জাতে গর্জাতে একসময় ধুপধাপ করে বেরিয়ে যায় রাহেলা , ফেরে সকালে ।

 

    একদিন রাতে হঠাৎ করে দরজায় টোকা পড়ে । ঘুম ঘুম চোখে রশিদ দরজা খুলে দেয় । রাহেলা ঘরে ঢোকে সাথে একজন পুরুষ মানুষকে নিয়ে । মানুষটার শরীর থেকে ভোটকা গন্ধে দম বন্ধ হয়ে যায় রশিদের । এই লোকটাকে মাঝে মধ্যে ওদের ঘরের সামনে রাহেলার সাথে হেসে হেসে কথা বলতে দেখেছে রশিদ। রাহেলা ঘরে ঢুকেই চৌকির উপর থেকে টেনে হিঁচড়ে রশিদের বাবাকে নিচে নামায় । দরজার কাছে একটা চাদর বিছিয়ে রশিদ আর ওর বাবাকে শুতে দেয় রাহেলা । চৌকির উপর শোয় সেই লোকটা ।সকালে ছোট্ট রশিদের ঘুম ভাঙে পাশের ঘরের বিনু খালার ধাক্কায় । টানতে টানতে রশিদকে বিনু খালা রেললাইনে নিয়ে যায় । মানুষ ঠেলে ঠেলে রশিদ দেখতে পায় রেল লাইনের পাশে পড়ে আছে ওর বাবার ছিন্ন ভিন্ন দেহ । নিজের চোখকে সেদিন বিশ্বাস হয়নি রশিদের । সবাই বলছিলো - পঙ্গুত্বের জ্বালা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে রশিদের বাবা । কিন্তু রশিদ জানে-ওকে একলা ফেলে ওর বাবা কোনোমতেই আত্মহত্যা করতে পারেনা ।আর অসাড় দেহটা কি করে এতোদূর এলো ! মানুষটাতো নড়তেই পারতো না !
       ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই কাটে রশিদের রাতদিন। বৃষ্টিতে ভেজে, রৌদ্রে শুকায় । যেখানটায় বাবার মৃতদেহ পড়েছিল- রশিদ ঘন্টার পর ঘন্টা সেখানে বসে থাকে । দয়াপরবশ হয়ে কেউ খেতে দিলে খায়, নাহয় উপোস কাটে সকাল, দুপুর, রাত ।ষ্টেশনের হাজারো মুখের ভিড়ে রশিদ রাহেলাকে খোঁজে । কোথায় গেল ওর সৎমা ? প্রচন্ড ঘৃণা আর বিদ্বেষ নিয়ে আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে ছোট্ট রশিদ । রমজানের দোকানে কাপ, প্লেট ধোয়ার বিনিময়ে রশিদের দুবেলার অন্নের সংস্থান হয় ।

(৩)

     ফুল বাগানের আগাছা সাফ করার ফাঁকে ফাঁকে ছাত্রীদের নানান ফুট ফরমায়েশ খাটে রশিদ । বাইরের দোকান থেকে সাবান, টুথপেস্ট, শ্যাম্পু, বিস্কুট আরো নানান জিনিস সে এনে দেয় ।  ছাত্রীদের কক্ষের সামনে গিয়ে আড়চোখে রশিদ ভেতরে তাকায় । মেয়েরা ছোট খাটো পোশাক পরে কেউ শুয়ে থাকে, কেউ পড়াশুনা করে, কেউবা চুটিয়ে আড্ডা দেয় । যুবক রশিদের গা শিরশির করে। পরীর মতন সুন্দর মেয়েগুলো খলবল করে, নেচে নেচে বেড়ায় রশিদের চোখের সামনে । কখনো কখনো পণ্য আদান প্রদানের সময় হঠাৎ কোন এক মেয়ের হাতের স্পর্শে চমকে ওঠে রশিদ। রোমকূপগুলো সজাগ হয়, তোলপাড় করে বুকের গভীরে। রশিদের ভেতর লুকিয়ে থাকা হিংস্র এক হায়েনা যেন বেরিয়ে আসতে চায় লোকালয়ে ।কান মাথা গরম হয়ে উত্তাপ ছড়াতে থাকে । সব কাজ ফেলে রশিদ ফিরে যায় নিজের স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে । দরজা বন্ধ করে  পড়ে থাকে চৌকির উপর । চোখের সামনে সবগুলো মেয়ে হয়ে ওঠে এক একজন রাহেলা । ওরা রশিদকে বড় বড় নখ দিয়ে আঁচড় কাটে, দাঁত বের করে কামড়াতে আসে, মাথার চুল ছিঁড়তে থাকে, টেনে হিঁচড়ে ওকে চৌকি থেকে নিচে ফেলে দিয়ে পায়ে পিষতে থাকে । বালিশে মুখ গুজে গোঙাতে থাকে রশিদ । নিজের হাতে নিজের চুল ছেড়ে।
       চায়ের দোকানের মালিক রমজান খুব আদর করতো রশিদকে । রমজান প্রথম টের পেয়েছিলো ভয়ঙ্কর এক অসুখ বাসা বেঁধেছে রশিদের শরীরে ।  মরা মাছের মতন ফ্যাকাশে চোখ নিয়ে সারাদিন কাজ করে রশিদ । রাত হয়ে এলেই এই রশিদ হয়ে যায় অন্য এক মানুষ । নিজে উদ্যোগ নিয়ে রশিদকে ডাক্তার দেখায় রমজান। সিজোফ্রেনিয়া নামক অসুখটা যে কি-  ঠিক বোঝেনা রমজান । তবে ডাক্তার বলেছে নিয়মিত ঔষধ খেলে ভালো থাকবে রশিদ । 
        কাজে কর্মে চটপটে রশিদকে বলে কয়ে হোস্টেলের কাজে লাগাতে রমজান নিয়ে আসে রাজিয়া সুলতানার কাছে ।দুঃসম্পর্কের ভাইয়ের অনুরোধ ফেলতে পারেনা রাজিয়া সুলতানা । রমজান আরেকটু সচ্ছলতার তাগিদে পাড়ি জমায় সৌদি আরব । নিরীহ, গোবেচারা টাইপের স্বল্পভাষী রশিদকে খুব স্নেহ করেন রাজিয়া সুলতানা । নারী জাতির উপর প্রচন্ড বিদ্বেষ নিয়ে বেড়ে ওঠা রশিদের কিনা কাজ জুটলো নারী হোস্টেলে !
       

(৪)
     সকাল হতেই মেয়েরা যখন দল বেঁধে ক্লাসে ছোটে পিয়া নামের মেয়েটা তখন সেজেগুজে বেরিয়ে যায় বাইরে  । প্রতিদিন কলেজ গেটের অদূরে তার জন্য অপেক্ষা করে একেক দিন একেক ব্রান্ডের গাড়ি । প্রতি সকালে রশিদের দায়িত্ব পিয়াকে বাগান থেকে তরতাজা একটা গোলাপ ছিঁড়ে দেওয়া । বিনিময়ে রশিদ পায় দশ টাকা । সেই ফুল চুলে গুঁজে, হাওয়ায় ডানা মেলে রশিদের পাশ দিয়ে উড়ে উড়ে চলে যায় পিয়া । ফেরে রাত ন'টায়- যখন পিয়ার চুলে সতেজ গোলাপটার আর কোন অস্তিত্বই থাকেনা । আজও রশিদ ফুল নিয়ে এসে দাঁড়ায় পিয়ার দরজার সামনে । হিন্দি গানের সুর তুলে, খুশি খুশি মনে লাস্যময়ী পিয়া রশিদের হাত থেকে গোলাপ নিয়ে একটা দশ টাকার নোট এগিয়ে দেয় । রশিদ টাকাটা না নিয়ে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকে
- আফামনি, আপনারা শিক্ষিত মানুষ , এইসব না কইরাও তো সুন্দর একটা জীবন কাটাইতে পারেন ! থমথমে গলায় বলতে থাকে রশিদ।
- কি বললি ? আবার বল ! রাগে ফেটে পড়ে পিয়া ।কোমরে হাত রেখে রশিদের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বল, আবার বল !
- নষ্টামী না কইরাতো একটা চাকরি বাকরি করতে পারেন ! রূঢ়কণ্ঠে বলে ওঠে রশিদ।
- হারামজাদা ! যত  বড় মুখ নয় ততবড় কথা ! সামান্য একটা মালি হয়ে তোর এতো বড় সাহস ! আমারে জ্ঞান দেস ! বলেই ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দেয় পিয়া রশিদের গালে । হাতের গোলাপটা ফ্লোরে ফেলে জুতা দিয়ে পিষতে থাকে পিয়া ।
       সমস্ত শরীরে আগুন জ্বলতে থাকে রশিদের । মাথার ভেতর ভোঁ ভোঁ শব্দে ছুটে চলে হাজার মৌমাছি । চোখে মুখে অন্ধকার নেমে আসে মুহূর্তে । কোথা থেকে যেন উদয় হয় রাহেলা । খুন্তি, চামচ,  লাঠি হাতে ছুটে আসছে হাজার রাহেলা ।লম্বা লম্বা পা ফেলে রশিদ এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে নিজের অন্ধকার কুঠুরিতে । ঝিকঝিক , ঝিকঝিক শব্দে ছুটে চলছে ট্রেন... .... ছুটছে প্রবল গতিতে.... জীবন্ত মানুষটার শরীরের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে ট্রেনের চাকা । দুহাতে কান বন্ধ করে ফেলে রশিদ । একটা রক্তাক্ত শরীর...আহঃ ! বাবার ছিন্নভিন্ন দেহ... ... কতগুলো উৎসুক চোখ... ... অট্টহাসি হাসছে হাজার রাহেলা ! গোঙাতে থাকে রশিদ ।
        চৈত্রের গভীর রাত । হোস্টেলের সব গেট চেক করে এসে শুয়ে পড়ে রাজিয়া সুলতানা । সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ঘুমে তলিয়ে যায় অল্প কিছুক্ষনের মাঝেই । হোস্টেলের রান্নাঘরের পাশেই স্টোর রুম। সেখানে রান্নার সামগ্রী মজুত রাখা হয় । পেছনের দিকের জানালাটা নড়বড়ে হয়ে আছে বহুদিন যাবৎ । দৃষ্টিসীমানার বাইরে বলে কেউই জানেনা আলগা হয়ে গেছে জানালার শিক । ঝোপ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অন্ধকার জানালার পাশে  নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় রশিদ ।
         চিৎকার চেঁচামেচিতে খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে যায় রাজিয়া সুলতানার । প্রথমে কিছুই বুঝতে না পেরে আলুথালু বেশে ছুটে চলে হোস্টেলের বাইরে । কোলাহল লক্ষ্য করে পৌঁছে যায় পুকুর ধারে ।মাঝ পুকুরে ভাসছে পিয়ার মৃতদেহ ! পুকুরপাড়ে বসে পড়েন রাজিয়া সুলতানা ।সেদিন থেকে নিখোঁজ হয় রশিদ ।
        প্রায় পাঁচ বছর পরে একদিন দুপুরে পলাশীর মোড়ে রাজিয়া সুলতানার রিকশার সামনে এসে পড়ে বদ্দ উন্মাদ এক যুবক । মাথাভর্তি জটা পাকানো নোংরা চুল, মুখে লম্বা দাড়ি, ছেড়া গেঞ্জি আর শতছিদ্র তালিমারা প্যান্ট ।দাঁতে খুঁটছে হাতের নোংরা নখ ! রাজিয়া সুলতানার দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে পাগল মানুষটা । শিউরে ওঠেন রাজিয়া সুলতানা । খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পাগলটা চলে যায় রাস্তার ওধারে- বিহ্বল চোখে পাগলটার চলে যাওয়া দেখতে থাকেন তিনি ।

Tags:

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com