#আমি-কালো-মেয়ে#

 

জীবনে অনেক কিছু দেখেছে অপু৷ নিখিলের মত ভালো বন্ধু৷ বাবুর মত স্বার্থপর ভাই৷ লোভী পুরুষ, যারা কালো মেয়েকে বৌ না করতে চাইলেও বিছানায় টানতে আপত্তি নেই৷ 
ব্যবসাসূত্রে, সুবিধাবাদী দালাল৷ কত মানুষ৷ কিন্তু আজ তার বরুন কে দেখে প্রনাম করতে ইচ্ছা হলো৷ কতদূর থেকে ছুটে এসেছে দাদার খোঁজ নিতে৷ কিন্ত অপুর তো এখনও অবাক হবার বাকি আছে৷

অপু- বসো ভাই৷ কি হয়েছে অরুন বাবুর?
বরুন- দাদা গতকাল বাড়ি থেকে চলে এসেছেন৷ ঐখানে তো বেরোতেনই না৷ এখানে আগের সব বন্ধুদের কাছে যদি আসেন তাই৷ 
অপু- আমার কথা কে বলবো তোমাকে?
বরুন- আপনার মানে দাদার অফিসের বস৷ 
অপু- ও৷ না ভাই ওনাকে শেষবার দেখেছিলাম হরিদ্বারে৷অনেক বছর আগে৷ তা বছর পনের আগে৷
বরুন- হরিদ্বার!! (মনে মনে বলে)
সেই সময় দাদা ডিপ্রেসনে ছিলেন৷ তাহলে আপনার ..
অপু- তোমাকে তুমি বলছি আসলে তুমি তো ছোট আমার থেকে৷ তা অরুন বাবু কিছু বলে যাননি? 
বরুন- ওসব কথা রাখুন, আপনি কি জানেন দাদা আপনাকে ভালোবাসতেন?
অপু-( দাঁড়িয়ে)মানে??
বরুন- মাপ করবেন৷ আমি আমার দাদাকে খুব ভালোবাসি৷ বড়দা খুব কষ্ট করেছেন জীবনে৷ কিন্তু দাদা আপনাকে ভালোবাসতেন খুব৷ 
অপু- হুম হয়ত সে জন্য হরিদ্বারে আমাকে দেখে চলে আসেন৷ আমাকে একটা প্রনাম অবধি করতে দেননি৷ 
বরুন- প্রনাম! দাদা তো এ্যাকসিডেন্টের পরে কারোর প্রনাম নিতেন না৷ আসলে একটা পা বাদ গেছিলো তো৷ 
অপু- নিথর, র্নিবাক৷ কানে শুধু সো সো করে আওয়াজ হচ্ছে আর বরুন বলে যাচ্ছে৷ যেদিন দাদা ফিরছিলো ট্রেনের তলায়........... ......একটা পা বাদ দিতে হয়.................. ছোটদি সেই রাতেই আত্মহত্যা করে.......................দাদা নিজের চাকরিটা আমাকে দেন....... কিন্তু আমি 
অপু- আর কিছু বলোনা৷ আমি সব বুঝেছি৷ আর কিছু বলোনা৷ কিছুই কি বলে যায়নি?
বরুন- চিঠি দিয়ে গেছেন৷

অপু হাত বাড়িয়ে চিঠি নিয়ে বার বার পড়ে৷ তোমাকে আমার অনুরোধ বরুন, কোন খবর পেলে আমাকে দিও৷ 
বরুন হা করে কিছুক্ষণ অপুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে আচ্ছা৷ স্বপ্নাবিষ্টের মত অপু চুপ করে বসে থাকে৷ মনে হয় যুগের পর যুগ পার হয়ে যাচ্ছে৷

অরুন কোলকাতা আসে বিকাল বেলায়৷ একটা সস্তার লজে ওঠে৷ কাল রাতের ট্রেন হরিদ্বারের৷ একটু বিশ্রাম করে৷ পরদিন রাতে বেরোনোর আগে বরুন কে এস এ মেস করে জানায় সে ঠিক আছে৷ তারপর ফোনটা অফ করে রাখে৷ বরুন ম্যাসেজ পেয়েই বরুন আগে অপুকে ফোন করে, বরুন বলে বড়দা হরিদ্বার যাচ্ছেন৷আজ রাতের ট্রেন৷ অপু ছোটে.... গাড়িতে অপুর বুকটা হাপরের মত হাপাতে থাকে৷ স্টেশনে পড়িমড়ি করে দৌড়ে অপু খু্ঁজতে থাকে৷ বরুনও কোলকাতায় ছিলো সেও ট্যাক্সি ধরে রওনা দেয়৷ অপু মনে হয় টেনশানে প্রানটা বেরিয়ে যাবে৷ যদি না পায় অরুন কে? অপু হরিদ্বার যাবার ট্রেনে উঠে পরে৷ খু্ঁজতে থাকে অরুন কে৷ পাগলের মত তন্নতন্ন করে৷একটি জায়গায় এসে দ্যাখে অরুন চুপচাপ বসে আছে৷ সোজা তার সামনে যায়৷ অপুকে দেখে অরুন অবাক!৷ অপুর চোখে আজ এতগুলো বছরের আগুন৷ অরুন আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়৷ অপু তার সামনে গিয়ে আগে গালে ঠাস করে দুটো চড় মারে৷ অরুন নিরব৷ 
অপু- কি মনে করো তুমি নিজেকে? সিনেমার নায়ক? বাংলাছবির রঞ্জিত মল্লিক? কি মনে করো? কে তোমাকে অধিকার দিয়েছে আমাকে ছেড়ে চলে যাবার? এত সাহস কি করে হয়? আমি কি খেলনা? কেন বলোনি আমাকে? কেন? কেন? এতবড় ঘটনা হলো আমাকে জানালে না?আমি কি তোমার কেউ ছিলাম না? আচ্ছা হতেনা বোঝা৷ বোকা, বন্ধু হয়ে থাকতাম, সারাজীবন চোখের দেখা তোমাকে তুমি দেখতে দিলে না? কি নিষ্ঠুর তুমি! কি মনে করেছিলে আমি তোমাকে বোঝা ভাববো? জীবনটা কেটে গেলো তোমাকে নিয়ে জানো সেটা? মেয়ে আছে আমাদের জানো তুমি?
জামার কলার টেনে বলে, আমাদের মেয়ে , তোমার মেয়ে, কোন সাহসে দিলে আমাকে এত যন্ত্রণা? আর আজ যখন সব শেষ জীবনের কটা দিন বাকি কেউ জানেনা তখনও তুমি আমাকে ফেলে..... আর কথা জোগায় না অপু হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে৷ অরুন চুপ, অরুন হতবম্ব! অরুনের বুকে অপু কাঁদতে থাকে৷ লোকে দেখছে একজন পঞ্চাশের উপর বয়স মহিলা আর একজন ষাট বছরের বয়স্ক লোকের মিল৷ অনেকে উঁকি দিচ্ছে৷ কিন্ত অপুর খেয়াল নেই সে অরুনের বুকে পরে কাঁদছে৷ অরুনের জামা ভিজে যাচ্ছে অপুর থেমে থাকা কুঁড়ি বছরের কান্নায়৷ পিছন থেকে যখন বরুন বললো চেন টেনে দেবো বড়দা? অপুর সম্বিৎ ফেরে৷ আস্তে আস্তে সরে গিয়ে একটা সিটে বসে৷ অরুন অপুকে জল দেয়৷ বরুন কে বলে, অপুকে কোথায় পেলি? 
বরুন- সব পরে বলবো৷আগে বাড়ি চলো৷ 
অরুন- হুম৷
অপু- আগে আমার বাড়িতে চলো৷

তিনজনে রওনা দেয় বাড়িতে৷ অরুনের চোখ শুধু অপুর মেয়েকে খোঁজে৷ তার মেয়ে, অপু বলেছে৷ অপু বাড়িতে গিয়ে দিদি কে বলে, দিদি ইনি অরুন মিত্র৷দিদি অরুনের অবস্থা দেখে মোটামুটি বুঝতে পারেন৷ অপু বলে , বরুন তুমি খাওয়া দাওয়া করে ঘুমাও৷ দিদি গেস্টরুমটা খুলে দিস৷ আর তুমি চলো আমার সাথে৷ অপু অরুন কে নিয়ে গটগট করে নিজের ঘরে নিয়ে যায়৷ বরুন মনে মনে বলে, আজ দাদা টের পাবে বৌয়ের ঝাড় কাকে বলে৷

সারারাত দুজনে কত কথা বললো , তার লেখাজোকা নেই৷ কখনও অপু কাঁদলো৷ কখনও অরুন৷ জীবনে দ্বীতিয় বার দুজনে একসাথে ভোর দেখলো৷ দোতলার থেকে যখন নেবে এলো তখন দিদি আর বরুন নিচের বারান্দায় চা খাচ্ছে৷ বুবুন আর অনু ঘুমাচ্ছে৷
অপু- অনু কই?
দিদি- ঘরে৷ কাল তোর কথা জিজ্ঞাসা করছিলো৷ আমি বলেছি তুই ঘুমাচ্ছিস৷ 
অরুন- অনুকে আমি দেখবো একবার৷ 
বরুন- বড়দা সবাই মিলে বাড়ি চলো৷ বৌদি অনু সবাই৷ 
অপু- না ভাই৷সে আর হয়না৷ আমার মেয়ে তার পিতৃ পরিচয় পায়নি৷ আজ সে অন্যের মেয়ে৷ সেইখানে আজ তো তাকে বলা যায়না সে অরুনের মেয়ে৷ তার জীবনে তো ঝড় আসবে৷ আর নিখিল অনুকে বড় ভালোবাসে৷ 
দিদি- তাহলে কি হবে? জীবনের বাকি দিনগুলোও কষ্টে কাটাবি?
অপু- আর কষ্ট নেই দিদি৷ সব মুছে গেছে৷ 
অরুন- বরুন আমি "নতুন জীবন" বৃদ্ধাশ্রমে থাকবো৷ 
বরুন- অসম্ভব!! আমি বেঁচে থাকতে তুমি বৃদ্ধাশ্রমে থাকবে? 
অরুন- প্লিজ বরুন৷ আমাকে বাঁধিস না ৷ সেখানে আমার মত অনেক লোক আছে৷ আর অপু আছে৷ 
বরুন- তাহলে আর কিছু বলার নেই৷ অনেক করেছো বড়দা, আমি চাই বাকি জীবনটা তুমি অপুদির বন্ধু হয়ে কাটাও৷ আমিও আসবো কিন্তু দেখা করতে৷ 
অপু- সবসময়৷ ওটা বৃদ্ধাশ্রম নয় শুধু তুমি আসলে বুঝবে৷ 
অরুন- সেটাই ভালো হবে৷ 
অপু- বসো চা খাও৷ 
মা কাল কোথায় ছিলে? 
বরুন আর অরুন দুজনেই অবাক, একটি কুঁড়ি বাইশ বছরের মেয়ে ঠিক অরুনের মুখের আদল৷ অরুনের বুকে এক ঝলক রক্ত ঝলকে উঠলো৷

চলবে....

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com