‌রাঙিয়ে দিয়ে যাও

04.03.2018

পড়ন্ত বিকেল আর আসন্ন সন্ধের রঙ আমূল পাল্টে দিয়ে শরীরে আদরের পরশ বুলিয়ে যায় ফাগুনের ফুরফুরে মিঠি বাতাস। গণসরস্বতী বন্দনা, প্রেমদিবস পেরিয়ে আমরা পৌঁছে যাই দোলদুয়ারে! আজ চারপাশে অঢেল রঙের উৎসব! লিখলেন অনীশ ঘোষ বসন্ত এসে গেছে। ফাগুনের হাত ধরেই সে এসেছে যথারীতি। পড়ন্ত বিকেল বা মনখারাপ সন্ধের রঙ পাল্টে দিয়ে হঠাৎ হঠাৎই শরীর ছুঁয়ে কোথায় পালিয়ে যায় ফুরফুরে বাতাস! তার মিঠিমিঠি আমেজ। প্রথম প্রেমের রঙে চোবানো গণসরস্বতী বন্দনা বাবা–ঠাকুর্দারও আগের আমল থেকেই ছিল, দিশি আচার হিসাবে বাঙালির ঘরে ঘরে। ছিল স্লেটের গায়ে কচি হাতের বর্ণখড়ি। নতুন শতকে এই কৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রেম–ভরপুর ভ্যালেন্টাইনস ডে! যাকে আদর করে বাঙালি নাম দিয়েছে প্রেমদিবস। প্রেমের দোহাই দিয়ে এ হেন গণহিস্টিরিয়া (‌গণদুষ্টুমি!)‌–র চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সরস্বতী আরাধনার মতোই করে ফেলেছে বাঙালি। আর এই সব রঙের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে প্রায় পিছু পিছু চলে আসে গণদোল। রঙে–ঢঙে বাঙালির দোল তো আবার ন্যাশনাল হোলিও! এও আমাদের মহাজনদের আরেক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত! ফি বছর বসন্তের চিঠি নিয়ে আসে আগুনে ফাগুন। সে চিঠিতে ঠিকানা লেখা থাকে রবিকবির শান্তিনিকেতন, প্রেমময় বৃন্দাবনের। রাধামাধবের বসন্তোৎসবের। কোথাও মাটি তার গায়ে লাল মেখে সেজে থাকে, কোথাও বাতাস নেচে ওঠে কৃষ্ণবাঁশির মাতাল করা সুরে। শিমুল–পলাশের লাল–হলুদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে সবুজ মাঠঘাট, উদাসী বাতাস। থাকে দোয়েল–কোয়েল, কৃষ্ণচূড়া–রাধাচূড়ার দল। গোটা প্রকৃতি জুড়ে যেন এক অনাবিল রঙ মিলান্তি পরানখেলা! উথালপাতাল ফাগুনের এই বিশ্বপ্রেমিকের ভূমিকায় কবির কলমও মাতোয়ারা— ‘দোলে দোলে দোলে প্রেমের দোলন–চাঁপা হৃদয়–আকাশে,/দোল–ফাগুনের চাঁদের আলোয় সুধায় মাখা সে।।... দখিন–হাওয়ায় ছড়িয়ে গেল গোপন রেণুকা।/গন্ধে তারি ছন্দে মাতে কবির রেণুকা।’ অনুষঙ্গ মিঠে হাওয়া, শিমুল–পলাশ–কৃষ্ণচূড়া–রাধাচূড়ার রঙিন বাহার। গাছের–ফুলের নামেও এ সময় জেগে ওঠেন প্রেমপ্রতীক রাধামাধব যুগলে, প্রেম ঘনঘোর বসন্তে! শ্রীপঞ্চমী, প্রেমদিবস এবং বসন্তোৎসব বা দোল— রঙে রঙে ঢলে পড়া এক–একটি পরমাদর আমাদের— কৈশোর–যুবা–তারুণ্যের দুষ্টুমির সিগনেচার! বিপুল খুশি আর রঙের তুফানে সত্যিই যেন কবির গানে বেজে ওঠে পূজার একতারা— ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে, আনন্দবসন্তসমাগমে।।’ ফাগুন মানেই দারুণ এ সময়! ‘আজি পল্লবে পল্লবে বাজে—/দূরে গগনে কাহার পথ চাহিয়া/আজি ব্যাকুল বসুন্ধরা সাজে।/মোর পরানে দখিনবায়ু লাগিছে’— এ সময় চোখে আর মনে কেমন যেন ঘোর লেগে যায়! কী জানি কী হয় এমন একটা ভাব যেন! ফাগুন মানেই তো আগুন! মন পোড়ায়, চোখ টাটায়! ফাগুনের ফুরফুরে দিন বনে বনে ধরায় মুকুল, মনে মনে দক্ষিণ হাওয়া। বাতাসে কবির গান ভেসে বেড়ায়— ‘‌আজি দখিন–দুয়ার খোলা— এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো।’‌ ফাগুনের গান অবশ্য আরও অনেকটাই বিস্তৃত করা যায়! সে অবকাশ ফাগুনই গড়ে দিয়েছে, বসন্তের বাতাস আর মনোরম পরিবেশের পিছু ধরে। বিবাহ নামের এক সামাজিক রীতি/প্রথাও যে পাঁজিপাথি দেখে বাঙালি বা হিন্দু জন্ম–জন্মান্তরের বন্ধন গড়ে দেয়, সেখানেও কিন্তু বোশেখ–শ্রাবণের থেকে ফাগুনের পয়েন্ট অনেক বেশি! প্যাচপেচে ঘেমো গরম নয়, স্যাঁতসেঁতে ভেজা বর্ষা নয়, শীতের হিমঠান্ডায় হাড়ে হাড়ে ঠকঠকানিও নয়— একমাত্র ফাগুনেই ফুরফুরে হয়ে দুজনের একান্ত কুজন মধুর শুরুয়াতের সুর বাঁধে জীবনতারে, পুলকিত মনে একে অপরকে বরণমালা পরিয়ে দেওয়ার অপার আনন্দে উথলে ওঠে মন। সঙ্গীসাথী, অভ্যাগতদেরও ডেকে নেওয়া হয়— কাগজে–কলমে, আগুনকে সাক্ষী রেখে ‘‌প্রজাপতির নির্বন্ধে’‌। ফাগুনে সেজে সুখ, খেয়ে সুখ, বিয়ে করে সুখ, বিয়ে দেখেও সুখ! মাঘীপঞ্চমীতে সরস্বতীর গণআবাহনে জেগে ওঠা প্রেমের রঙ ফাল্গুনের শুরুতেই আরও ঘন হয়ে ওঠে বটে প্রেমদিবসের ঘনঘোর হিস্টিরিয়ায়, এর পর বিয়ের পিঁড়ি হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে কত শত মন থেকে মনে। মাঝখানে বয়ে যায় বসন্তবাহারি হোলির অঢেল রঙসাগর। আসলে শত লক্ষ মন জুড়ে ভালবাসার আগুন জ্বালায় ফাগুনই। এর পরই সেই আগুনে ঘি ঢালতে চলে আসে রঙের উৎসব! মানে বাতাসে বাতাসে উড়ে বেড়ানো ফাগুয়ার পরান পোড়ানো বসন্তরঙবাহার! এ সময় বুক চিতিয়ে কেউ কেউ বলতেই পারে— ‘এত দিন যে বসেছিলেম পথ চেয়ে আর কাল গুনে/দেখা পেলাম ফাল্গুনে।’ এমনিতে সাউথ সিটি, এক্সিস, সি সি ওয়ান–টু, তন্ত্রাটন্ত্রা, হ্যাংআউট ইত্যাদি ইত্যাদিতে জমিয়ে আড্ডা, ফস্টিনস্টি— সবই মজুত থাকে বছরভর। ‘ফোন আভি ব্যস্ত্‌ হ্যায়’–এর ফাঁকফোকরে ফেসবুকে এ–ওর ছবি বা স্ট্যাটাসে ‘লাইক’ আর ‘কমেন্ট’–এর ছড়াছড়িও থাকে তুমুলভাবেই! হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার, ইনস্ট্রা, ইমোর ভার্চুয়াল দুনিয়া জুড়ে ঢলে পড়ে কত না প্রেমবার্তা। যারা চায়, গোটা বছরই ‘এসেছ প্রেম, এসেছ আজি কী মহাসমারোহে’ গেয়ে উঠতেই পারে! কিন্তু ফাগুন পড়তে না পড়তেই এই যে একে একে রোজ, প্রোপোজ, চকোলেট, টেডি, হাগ, কিস আর ফাইনালি ভি ডে— মানে হপ্তাভর ভুবনজোড়া প্রেমের ফাঁদ পেতে রাখার বন্দোবস্ত মহাজনেরাই করে দিয়ে গেছেন, সেই মোহজাল যে আজ দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক প্রসার পেয়ে গেছে— এও তো অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই আর! বালকবেলা বা সদ্য যুবকবেলার ট্রায়াল রান বা খেপ খেলার দিনগুলোকে খাতা থেকে বেমালুম লোপাট করে দেওয়া অত সহজে যায় নাকি! সরস্বতীর বাজারদরও কিন্তু আজকের অত্যাধুনিক ‘‌হান্ড্রেড পার্সেন্ট লভ’‌–‌এর জোয়ারে এতটুকু টাল খায়নি, বরং স্বস্রোতে ভেসে আছে!‌ কিশোরবেলায় সেখান থেকেই হাত পাকিয়ে আজ এই বড়বেলার প্রেমদিবসে পৌঁছনো! সেকালের লুকোছাপা সরস্বতী–প্রেম একালের ভ্যালেন্টাইন্সের সিলমোহর পেয়ে আজ একেবারে স্বমহিমায় বিদ্যমান! বসন্ত এসে গেছে সত্যিই!‌ এ ঋতুতে যেমন পুলক আছে, তেমনই আবার অনেক বেদনাও আছে। রোগভোগের (‌গুটিবসন্ত, সোয়াইন ফ্লু!)‌ বেদনা, প্রেমরোগের বেদনা। তবু বসন্ত হল বসন্তই! কোনও কথা হবে না! যদিও শহর থেকে অবশ্য কবেই পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছে রাধাচূড়া–কৃষ্ণচূড়ারা। বড় বড় হাইরাইজ, মল, শোরুম ইত্যাদিকে সসম্মানে জায়গা করে দিয়ে তারা এখন গঞ্জবাসী!‌ আর শিমুল–পলাশকে এ শহর শেষ কবে দেখেছে, ইতিহাস ঘাঁটতে হবে। কিন্তু এটা তো ঠিক যে, এদের বাদ দিয়ে বসন্ত জাস্ট হয় না! তা বলে শহর কি পিছিয়ে থাকবে বসন্ত–পালন থেকে! হুজুগ এবং মস্তি–ফুর্তির জায়গিরদারদের পক্ষে কখনও কি তা সম্ভব? ওদের রঙে এদের রঙ মিললে তবেই না বসন্ত এসে গেছে বলে পুলকিত হয়ে ওঠা যায়! সেই সঙ্গে বৈকালিক ফুরফুরে মিঠে বাতাসের অনাবিল আদরও খাওয়া যায় শরীরে, মনে! তবে হ্যাঁ, শহরের ইট–সিমেন্টের জঙ্গলে, কাঠখোট্টা চেহারায় মন না বসলে, উচাটন আনচান রঙের হাওয়া এ সময় ছুটিয়ে নিয়ে যেতেও পারে দূরে কোথাও দূরে দূরে...। পরান পোড়া বসন্তকে বরণ করে নিতে আমরা এজ–সেক্স নির্বিশেষে হাপিত্যেশ একটা বছর কাটিয়ে এসেছি যে! এখন সোয়াইন, বার্ড এ সব চমকালে হবে! রোদ–বৃষ্টি–জলকাদার সঙ্গে ঘর করতে করতে বোর থেকে বোরস্ব হয়ে, শীতে খানিক হাঁফ ছেড়ে, হেমন্তের এতটুকুও খোঁজখবর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বসন্তের এই ক্ষণিকের হাত ধরা!‌ অল্পই কয়েকটা দিন তো মাত্র!‌ তা হোক না কেন, এ কটা দিনই তো গোটা বছরের ফুয়েল— বিশ্বমানবপ্রেমিক হয়ে আবার একটা বসন্তের জন্য দিন গুনে যাব সকলে! দখিন দুয়ার কবে খুলে যাবে ফের, হৃদয়দোলায় কবে লাগবে দোলা— তার জন্যই তো বসন্তের আবাহন বনমল্লিকাকুঞ্জে। তা হলে যদি এই ফাল্গুনী বসন্ত বাতাসে মনটা খানিক দুলু দুলু হয়ে ওঠে, সেটা ফাগুনের দোষ নয়! দোষ বসন্তেরও নয়! ফলত ফাগুন ছিল, আছে এবং থাকবে। এবং বসন্তও তাই। ছিল, আছে এবং থাকবে! বিশ্বায়ন, ঊষ্ণায়নের বাড়বাড়ন্ততেও থাকবে। দুনিয়া জুড়ে প্রেমিক–প্রেমিকারা যে বিদ্যমান চিরকাল! সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার! অঙ্কে কখনওই অন্যরকম কিছু হয় না। এমন এক বর্ণময় দিন দিয়ে এবং যার আগে–পরে বাঙালি তরুণ–তরুণী প্রায় গণউন্মাদনায় দুলে ওঠে সরস্বতী বা বাসন্তীপ্রেমের উত্তাল ঢেউয়ের দাপটে— আর প্রেম বা ভালবাসার রঙ নিয়ে যার পর পরই দুয়ারে কড়া নাড়ে বসন্তের উৎসব বা দোলের রঙে মাতাল দিন— আগে–পরের এক্সটেন্ডেড হোলি ধরে— সে মাসে যে মাঝে মাঝেই মন উচাটন হবে, সাধ জাগবে একটুখানি দুষ্টুমিকে ঝালিয়ে নেওয়ার— এ কথা লেখাই বাহুল্য ভাই! কিচ্ছু করার নেই। মহাজনেরা, মানে বড়রাই তো বর্ণিল ফাগুন, রঙিন বসন্ত, ফুরফুরে মলয় বাতাসের অনুষঙ্গের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাঘ–ফাগুনে শ্রীপঞ্চমী, মানে শ্রীময়ী সরস্বতীর বন্দনা কিংবা একেবারে ফিক্সড তারিখ ধরে ১৪ ফেব্রুয়ারিটাকে প্রেমের দিন বা ইন্টারন্যাশনাল ভ্যালেন্টাইন্স ডে বানিয়ে দিয়েছেন! বদলে তো ১৪ জুন বা ১৪ সেপ্টেম্বরকে বেছে নেননি! জুন বা সেপ্টেম্বর নয়, ওটা যে ফেব্রুয়ারিই হওয়া উচিত— অর্থাৎ এই ভরাফাগুনে, মানে চোখে–মনে ঘোর লাগা বসন্তেই— সেটা ক্যালকুলেশন করেই তো এই দিনটার এমন আয়োজন বা নামকরণ! এর সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দোল বা হোলির রঙদার উৎসবটাকেও কেষ্ট ঠাকুর নির্দিষ্ট করে রেখেছেন এই আগুনে ফাগুনেরই কোনও একটা দিনের জন্য। শ্রীরাধিকা ও তাঁর সখীদের সঙ্গে রঙের খেলায় প্রমোদে পরান ঢালিয়া দেওয়ার জন্য। ফলে এখন এই বসন্তের বাতাস গায়ে মাখতে মাখতে ছেলেছোকরারা যদি একটু রঙে রঙে ঢলে ঢলে পড়তে চায়, তাতে তো চোখ টাটালে চলবে না কো বাপু! একদম ইর্ষের চোখে ওদের দিকে তাকিও না! ফাগুন কিন্তু চোখে আগুন ঢেলে দেবে! তার অভিশাপ খেয়ে চোখে কয়লার গুঁড়ো কিচকিচাবে! সুতরাং ওদেরকে ওদের মতোই থাকতে দাও! তোমার যদি জীবনে কিছু না হয়ে থাকে, তাতে ওরা কী দোষ করল ভাইয়োঁ আউর বহিনো! তুমি বুঝি বুড়ো হয়ে গেলে!‌‌ দেখো, শেষ বয়সে মনটাকে কোনওভাবে একটুস রাঙিয়ে নেওয়া যায় কিনা! বসন্ত এসে গেছে বলে কথা...। একটু ফুয়েল নিয়ে জীবনযন্ত্রটিকে সচল, চাঙ্গা করে নিতে পারলে দেখে কে!‌ এই যে বড়বেলায় বা বয়স্কবেলায় পৌঁছে প্রেমরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়া হঠাৎ হঠাৎই, সরস্বতীতে আনমনা হওয়া— হাতেখড়ি তো সেরে রেখেছিলে সেই কিশোরবেলাতেই! তখন থেকেই ভালবাসার চাতক হয়ে উড়ু উড়ু মন! তাতে অবশ্য কেউ পাস, কেউ ফেল! কী আর করা যাবে! তা বলে বিদ্যাদেবীর পায়ে বই–খাতা–কলম সঁপে, অঞ্জলিটা কোনওক্রমে ফুঁকে, সকালের লুচি–ছোলার ডালটা সেঁটে সেই যে টো টো কোম্পানির হার্ডকোর কর্মী বনে যাওয়া— মাঝে ইধার–উধার প্রসাদের শশা–কুল— দুপুরের ব্রেকে নিজের বা বন্ধুর বাড়িতে আলু–ফুলকপি–কড়াইশুঁটির আলাদা রূপে–রসে জমে ওঠা খিচুড়ির আহা মরি সোয়াদ, সঙ্গে বেগুন এবং পাঁপড়ভাজা, টোপা কুলের অম্বল বা চাটনি— এসবে মুখ নাড়া বা মুখ দেখানোর লাঞ্চ টাইম কাটিয়ে বিকেলে–সন্ধেয় ফের পাড়া–বেপাড়াতুতো চক্কর— ফুচকা–আলুকাবলি, প্রথম ধূমপান বা মদ্যপানও— এবং সবশেষে অবসন্ন দেহখানি লয়ে বাড়ি ফিরে বিছানায় অবগাহন— ঢালাও প্রেমের বদহজম বা ঢেঁকুর সহযোগে ভরপেটে থাকা রাতের ডিনারে আর মন নাই— নো মিল— সেই বালক বা সদ্য যুবকবেলার ট্রায়াল রান বা খেপ খেলার দিনগুলোকে খাতা থেকে বেমালুম লোপাট করে দিলে তো চলবে না বাপু! বুড়ো হয়েছ বলে শরম লাগে একটু? ছেলেছোকরাদের অবাধ মেলামেশা দেখে আঙুল কামড়াও নাকি! সেকালের লুকোছাপা সরস্বতী–প্রেম একালের ভ্যালেন্টাইন্সের সিলমোহর পেয়ে কেমন স্বমহিমায় বিরাজমান— অবাক চোখে তা দেখে বদহজমে ভুগছ ভাইটি! এতক্ষণ ফাগুনবসন্তের ইতিহাস–ভূগোল–রসায়ণ— সবই তো শুনলে, মনে মনে মানলেও ধরে নেওয়া যায়। এবার তা হলে পেশ করি ফাল্গুন, বসন্ত, সর্বোপরি প্রেমের সর্বশেষ এবং সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্তটি। বিশ্ববন্দিত মহান দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের হকেরও হক কথা যা— ‘ভালবাসতে ভয় পাওয়া মানে জীবনকে ভয় পাওয়া। আর যারা জীবনকে ভয় পায়, তারা তো তিন ভাগ মরেই আছে!’ সুতরাং, প্রেম ভাস্বর! এবং তারই সঙ্গে অমলিন চিরদিনের সরস্বতী পুজো, এই সময়ের বাড়বাড়ন্ত ভ্যালেন্টাইন্স ডে বা প্রেমদিবস এবং সর্বজনীন দোল বা হোলি। এবং টোপর পরা, মালাবদলের মতো ফাটাফাটি কিছু রিচুয়ালের সঙ্গে ফাউ বাসরঘরের খুনসুটি–সহ বিয়ের রাতের জমাটি দিনলিপি। আগুনে ফাগুন এই অনুষঙ্গেই যে বছর বছর ফিরে ফিরে আসে, বসন্ত–বাতাস নিয়ে। প্রেম আর রঙ নিয়ে। ফুরফুরে দখিনা বাতাস নিয়ে। রাধাচুড়া–কৃষ্ণচূড়া, পলাশ–শিমুল নিয়ে। সর্বোপরি পক্স (‌মায়ের দয়া?)‌ কিংবা সোয়াইন ফ্লু নিয়ে! হ্যাঁ, বসন্ত এসে গেছে এবারও, এই সব কিছু নিয়েই! চলুন বিশ্বপ্রকৃতিপ্রেমিককুল, আমরা সযত্নে তার হাত ধরি! বলি, ‘‌এত দিন যে বসেছিলেম পথ চেয়ে আর কাল গুনে/দেখা পেলেম ফাল্গুনে।’‌ বয়স হয়েছে? হোক না! বসন্তের ফুল দিয়ে জয়ের মালা গেঁথে নিতে নবফাল্গুনের দিনে পরানসখার কথা তো অন্তরঘরেও গুনগুন করা যায়! যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে/এই নব ফাল্গুনের দিনে— জানি নে, জানি নে। তবে এটুকু হলফ করেই সকলে জানি— শরীর বাধ সাধলেও মন সজাগ থাকে— কবে উতল হাওয়ায় বসন্তগান গেয়ে উঠবে পাখিরা, বাতাসে তার সুর ঝরে পড়বে, নতুন পাতায় লাগবে দোল, রঙ লাগবে মর্মে এবং সকল কর্মে— সে আমাদের নবপ্রজন্মের মনে এবং প্রাণেই হোক না— আমাদেরও প্রাণ কি গোপনে তখন ফুলের গন্ধে, বাঁশির গানে এতটুকুও চঞ্চল হয়ে উঠবে না! নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগতে দেখেও কি আমরা সর্বহারা বেদনা নিয়েই শুধু ঘরের কোণে মুখ আর শরীর লুকোব! বাকি কাল একখানা ভাঙা মানুষের মতো অতিবাহিত করব রোগজর্জর, মনখারাপের বেলা নিয়ে! যৌবনের কাছে হার মানাতেও যে অফুরান সুখ— সেই মন্ত্র শোনাতেই তো ফিরে ফিরে আসে বসন্ত। তাই তো কবি বললেন— ‘ফাগুন–হাওয়ায় রঙে রঙে পাগল ঝোরা লুকিয়ে ঝরে/...রক্তে আমার তোমার পায়ের রঙ লেগেছে কিসের তরে।’ আমরা যে আদ্যন্ত রঙপাগল, বসন্তফাগুনকে আমাদের তো তাই বুকে টেনে নিতেই হবে!

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com