মার্কিন সুপ্রীম কোর্টে ফের এ্যাবরশন বিতর্ক

প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্টে আবার নতুন করে বিতর্কের ঢেউ তুলেছে এ্যাবরশন
ইস্যু। ১৯৭৩ এর ২২শে জানুয়ারি গর্ভপাতের বিষয়টি সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাজদের দ্বিধাবিভক্ত
মতামত নিয়েই একটি আইনী সুরাহা পেয়েছিল। এই ঐতিহাসিক বক্তব্যে জানানো হয়েছিল - ‘women as
part of their constitutional right to privacy, can terminate a pregnancy during its
first two trimesters. Only during the last trimester, when the fetus can survive
outside the womb, states would be permitted to regulate abortion of a healthy
pregnancy’.অর্থাৎ সাংবিধানিক অধিকারে প্রথম এবং দ্বিতীয় ট্রিমেস্টার পর্যন্ত(তিন মাসে এক ট্রিমেস্টার)
নারীরাই তাদের ইচ্ছে অনুসারে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবত পারবেন। তবে শেষ ট্রিমেস্টারে কোনো
স্বাস্থ্যসম্পন্ন প্রেগন্যান্সির এ্যাবরশনের বিষয়টি নির্ভর করবে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব গর্ভপাতের প্রচলিত
আইন অনুসরণ করে। এবং সেটা হতে হবে যখন গর্ভের বাইরেই unborn baby বেঁচে থাকতে পারবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সুপ্রীম কোর্টের এই আইনী সিদ্ধান্ত এ্যাবরশনের পক্ষে-বিপক্ষের দ্বিধাবিভক্তির অবসান
আজও ঘটাতে পারেনি।বরং তীব্র আবেগের বিষয় হওয়ায় দস্তুরমতো সেটা পাবলিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
যারা প্রো-চয়েসে(গর্ভপাতের পক্ষে)বিশ্বাসী, তাদের পক্ষে যেমন শতাব্দীকাল ধরেই জনসমর্থনের অভাব নেই,
তেমনি প্রো-লাইফের(যে কোনো অবস্থাতেই এ্যাবরশনের বিপক্ষে)ক্ষেত্রেও রয়েছে সমর্থনকারীদের আশীর্বাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের জনসমাজে গর্ভপাত নিয়ে বরাবরই তাই দুই বিরুদ্ধ অভিমত প্রবলভাবে বর্তমান। যার প্রভাব
স্পষ্টভাবে আমেরিকার রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সাধারণ মানুষের আদর্শগত ভাবনায়, সামাজিকতায় আর
ধর্মীয় বিশ্বাসে একটি দৃশ্যমান সীমারেখা টেনে দিয়েছে। বর্তমানে ৫৭% আমেরিকান বিশ্বাস করেন, সর্বক্ষেত্রে
অথবা বেশিরভাগ অবস্থাতেই গর্ভপাতকে আইনী বৈধতা দেওয়া উচিৎ। অন্যদিকে ৪০% নাগরিক মনে
করেন, বেশিরভাগ পরিস্থিতিতে, এমনকি প্রয়োজনে শতভাগ ক্ষেত্রে এ্যাবরশনকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করা
দরকার। কারণ গর্ভস্থ শিশু হত্যা অনৈতিক অপরাধ। প্রাণী হত্যা না করে বরং নারীদের উচিৎ গর্ভধারণ
এবং গর্ভপাতের বিষয়ে সর্বদা সংযত আর সতর্ক থাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যেই এ্যাবরশন প্রক্রিয়া আইনতভাবে বৈধ। ফিনল্যাণ্ড, গ্রেট ব্রিটেন, সুইডেন প্রভৃতি
সুউন্নত দেশের তুলনায় এখানকার এ্যাবরশন আইনও এখনো পর্যন্ত অনেক বেশি নমনীয়। এদেশে প্রতি বছর
৬ মিলিয়ন নারী গর্ভধারণ করেন। যাদের ৫০% প্রেগন্যান্সিই অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটে যাওয়া বলে ধরে নেওয়া
হয়। ১৯৮৭ সালের একটি জরিপ থেকে জানা যাচ্ছে, আমেরিকায় মোট গর্ভপাতের ৩৮% সংঘটিত হয় -
বাড়তি সন্তানের প্রয়োজন নেই বলে। ৩২% এই পদ্ধতি গ্রহণ করেন সন্তান পালনের প্রস্তুতি না থাকায়। আর
২৫% এ্যাবরশনের কারণ, অবৈধ সম্পর্ক সমাজের কাছে গোপন রাখার অভিপ্রায় থেকে। এদের মধ্যে
বহুসংখ্যকই আছেন, যারা গর্ভপাত ঘটিয়ে কোনোরকম অনুশোচনায় যন্ত্রনাক্লিষ্ট হন না। বরং কৃতজ্ঞতা
প্রকাশ করেন এ্যাবরশন এজেন্সিগুলোর কাছে। এ্র জন্য প্রতিটি স্টেটে কমপক্ষে একটি করে ক্লিনিক রয়েছে।
এবং বিষয়টি পাবলিক ইস্যু হওয়ায় বর্তমান শতাব্দীতে রাজনৈতিক পরিকল্পনার জন্যও এক বিরাট ফ্যাক্টর
হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশির দশক থেকে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে যার প্রবল প্রচারণা শুরু।

সেই থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থীদের রীতিমতো এই বিষয়ের ওপর তর্কবিতর্ক চালাতে হয়, সতর্ক এবং
স্পর্শকাতর বক্তব্য রেখে। ভারসাম্যতা রক্ষা করে নারী ভোটের পরিসংখ্যান নিয়ে আরম্ভ হয় আপাদমস্তক
পলিটিক্স। এই পলিটিক্স কেবল ডেমোক্র্যাট দলের ক্লিন্টন অথবা ওবামা নন, রিপাবলিকান দলের রিগ্যানসহ
দুই বুশও করে গেছেন ইলেকশনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের লক্ষ্য নিয়ে। অতএব এ্যাবরশন ইস্যু যত
বেশি ফেডারেল গভর্নমেন্টের প্রোটেকশন পেয়েছে, একে কেন্দ্র করে ততোই ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়েছে লবিং,
গ্রুপিং, বিজনেস, রাজনীতি, পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক, জনসমাজের দ্বিধাবিভক্তি, ধর্মীয় সংঘাত এবং ভোটের
মেরুকরণ। এ কথা সর্বজনবিদিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় বিউটি কেয়ার ইন্ডাস্ট্রিগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন
ডলার রোজগার করছে শুধুমাত্র মানবভ্রূণের টিস্যু দিয়ে তৈরী বিভিন্ন ধরনের ক্রিম প্রোডিউস করে। বিভিন্ন
মেডিক্যালসংক্রান্ত কারখানায় মানবদেহের সেল দিয়ে চলেছে অফুরান গবেষণা। অতএব বিতর্কের ক্ষেত্রে
গর্ভপাতের বিষয়টি এখন শুধু এ্যাবরশন বনাম ক্যাথলিক চার্চ, রাজনীতি, বিজনেস, জন্মনিরোধ কিংবা
শিশুহত্যার মতো অনৈতিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে নেই। অনাদিকাল ধরে সন্তানের সংস্পর্শে মানবীর মাতৃত্বে
উপলব্ধির যে অপরূপ স্বর্গীয় অনুভব, তার ওপরেও এক অব্যাখ্যাত নিষ্পেষণ!
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে চল্লিশ শতাংশ মানুষ আপাতত গর্ভপাতের বিপক্ষে সরব রয়েছেন, তারা মূলত মানবীর
মানবিকতার অবক্ষয়ের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। মায়ের সঙ্গে শিশুর বন্ধনের চিরন্তন আবেগের
দিকটি এভাবে ক্ষয়ে যেতে থাকলে সমাজে যে প্রেমহীন সভ্যতার বিস্তার ঘটবে, তার বিরুদ্ধেই এরা বিতর্ক
তুলেছেন। ২০১৭ এর মে মাসে নতুন করে এ্যাবরশনের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে মামলা তুলে যিনি নতুনভাবে
বিষয়টাকে উত্তাল করে দিয়েছেন, তাঁর যুক্তিতর্কের পেছনেও কাজ করছে চিরন্তন মানবিকতা। হার্ভার্ড ল স্কুল
স্টুডেন্ট জশ ক্রাডক, সুপ্রীম কোর্টে মামলা করে সংবিধানের চোদ্দতম অ্যামেণ্ডমেন্ট থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে
বলেছেন, গর্ভপাতকে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
কারণ, The 14th amendment guarantees - ‘that no State shall make or enforce any law
which shall abridge the privileges or immunities of citizens of the United States, nor shall
any State deprive any person of life, liberty or property without the due process of law’.
সংবিধানের চোদ্দতম অ্যামেন্ডমেন্ট নিশ্চিত করছে, প্রচলিত আইনী পদ্ধতি অনুসরণ না করে কোনো
অঙ্গরাজ্য এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রয়োগ করতে পারবে না, যাতে নাগরিকেরা বাঁচার অধিকার, বাক
স্বাধীনতাসহ সব রকম মৌলিক সুবিধা এবং তাদের সম্পদ ও নিরাপত্তালাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
এই ব্যাখ্যায় এ্যাবরশন সমর্থনকারীদের পাল্টা প্রশ্ন হলো - Unborn person সম্পর্কে এখানে কোথায় কোন
নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ রয়েছে? জশ উত্তরে বলেছেন -সাংবিধানিক ব্যাখ্যা নির্ভর করে মানবিক দৃষ্টিকোণ
থেকে বিশ্লেষণের ওপরে! জশ কি পারবেন মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটিয়ে নির্বিচারে শিশুহত্যার অবসান ঘটাতে?
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিশ্চয়ই প্রয়োজন রয়েছে গর্ভপাতের। সেখানে নারীর স্বাধীনতাও শতভাগ কাম্য। কিন্তু
নারীকেও ভুলে গেলে চলবে না, সংযম সভ্যতার প্রধান লক্ষণ! গর্ভ সন্তানের প্রথম আশ্রয়! মাতৃত্ব জগতে
সর্ব শ্রেষ্ঠ!

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com