মানুষ মানুষের জন্যে

04.04.2018

"হিন্দু হ্যাঁয় হাম,হিন্দুস্থান হ্যাঁয় হামারা। জোরসে বোলো জয় শ্রী রাম"। রামনবমীর মিছিলের মাঝে চলা লরির ওপর থেকে একরাশ যুবকের সাথে পাগলের মতো চিৎকার করছিলো মহেশ্বর। 

হঠাৎ জোরে ব্রেক। 

টাল সামলাতে না পেরে লরির ওপর থেকে নিচে পড়লো সে। 

মাথায় জোরালো আঘাত, সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন। হসপিটালে ছুটল কয়েকজন। বাকিরা রামনামের মিছিলে মত্ত। 

হসপিটালের ডিউটি সেরে বেরুচ্ছিলেন অভিজ্ঞ ডাক্তার ইউসুফ। 

মাথার শ্রীরাম ফেট্টি, গেরুয়া জামায় রক্তমাখা মহেশ্বরের অবস্থা দেখে বুঝলেন জরুরী চিকিৎসা দরকার। 

দ্রুত হসপিটালের ভিতরে ফিরে এলেন। 

৩ঘণ্টা লড়াইয়ের পর জয় হোল তাঁর। 

বাইরে বেরিয়ে দেখেন মহেশ্বরের পরিবার উৎকণ্ঠিত। 

ভরসা দিলেন তিনি। 

মহেশ্বরের বাবা একচোখ জল নিয়ে হাত ধরে বললেন, 

আপনারা আছেন, তাই পৃথিবীটা আজও বেঁচে আছে।

 

দাউদাউ করে জ্বলছে বাসটা। আগুন সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিয়েছে। 

ভেতরে আটকে আছে হেল্পার রমেশ। 

ড্রাইভার সেলিম সমানে চিৎকার করছে বেরিয়ে আয়, বেরিয়ে আয়। অগ্নিকুণ্ডের ভিতর থেকে রমেশ বলল আর একটু। 

আরও তিন মিনিট পর যখন বেরিয়ে এলো রমেশ, তখন ঝলসে গেছে সে। দাঁড়াতে পারছেনা আর। বুকে জড়ানো শিব আর কাবার ছবি দুটো। 

সেলিম বলল কী দরকার ছিল বলতো ! 

রমেশ বলল, রুটি রুজির জন্য, অ্যাকসিডেন্ট না হবার জন্য রোজ সকালে যাদের কাছে প্রার্থনা করি, তাদের কি ফেলে আসা যায় ? 

সেলিম এক চোখ জল নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, 

ইয়া আল্লা, তোমার ভক্তকে বাঁচাও।

 

স্কুল থেকে স্কুটি নিয়ে ফিরছিলো রেবেকা। 

কিছু দূরের হাইস্কুলের দিদিমনি সে। 

আচমকা রাস্তা দিয়ে দুড়দাড়িয়ে উন্মত্তের মতো লোক ছুটছে। 

হাতে কাটারি, বল্লম, তরোয়াল আরও কতো কী। 

ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকান। মানুষ চিৎকার করছে দাঙ্গা লেগেছে। 

আর অস্ত্রধারীরা বলছে আজ কাউকে ছাড়বো না। 

অসহায় ভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পরে রেবেকা। সম্পূর্ণ হিন্দু পাড়া। 

কী করবে এখন ? 

ইতিহাসের দিদিমনি  ভালোই জানে দাঙ্গায় মহিলারা কীভাবে টার্গেট হয়। ভেবেই আতঙ্কের স্রোত বয়ে যায় শরীর দিয়ে। 

অসহায় ভাবে তাকায় চারদিকে। 

কোথায় যাবে, কাকে ভরসা করবে ? 

পাশের মন্দিরওয়ালা বাড়ির দরজা খুলে যায়। 

লালপাড় সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা ডেকে বলেন 

এই দিদিমনি, চলে এসো আমার বাড়ি। দেখছনা কী অবস্থা। 

রেবেকা তাঁর বাড়িতে ঢুকে হাত ধরে বলে, 

মা আপনি না থাকলে যে আজ কী হতো !

 

পূজায় বসেছেন বদ্রিনারায়ন।

বিহারের এক বিখ্যাত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত তিনি। 

যে মন্দিরের দরজায় বড় করে লেখা,"অহিন্দু প্রবেশ নিষেধ।" 

ধর্মের ব্যাপারে খুব কঠোর বদ্রিনারায়ন। 

সেই তিনি আজ মনপ্রান দিয়ে ডাকছেন কুলদেবতাকে। 

তাঁর ছোট ছেলে বাইক অ্যাকসিডেন্টে ভর্তি হসপিটালে। 

অবস্থা খারাপ। 

রক্ত লাগবে। কিন্তু ছেলের বিরল গ্রুপের এই রক্ত মিলছেনা কোথাও। 

তাই ভগবানের কাছে ছেলের জীবন ভিক্ষা চাইছেন তিনি। 

এমন সময় ছুটে এলো বড় ছেলে। 

বাবা ডোনার পাওয়া গেছে, কিন্তু সে মুসলিম। নাম আখতার। 

তার রক্ত কী দেবো ভাইয়ের শরীরে। 

উত্তেজনায় লাফিয়ে ওঠেন বদ্রিনারায়ন। 

মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে এক চরম সত্য,... 

"দে দে, ধর্মের চেয়ে জীবনের দাম অনেক বেশি।"

 

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই কথা বলার সময় এসেছে জোর গলায়। 

ধর্মের নামে দাঙ্গা নয়, মানবিকতার জয় হোক। 

সম্প্রীতি থাকুক বাংলায়।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com