এই কি শাসকের বেটি বাঁচাওয়ের নমুনা?

সাত দিন ধরে ছয় জন মিলে পাশবিক গণধর্ষণের পর নৃশংসভাবে একটি আট বছরের শিশুকে খুন করল-
তারপরেও হতভাগ্য শিশুটির উপর এরকম নির্যাতন ও মৃত্যু নিয়ে চলছে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতি৷ জম্বু-
কাশ্মীরে কাঠুয়ার এই ঘটনার প্রতিবাদে যখন দেশবাসী উত্তাল, রাষ্ট্রসংঘের প্রধান থেকে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান
বিচারপতি- যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিতে উদ্বিগ্ন, তখন সামান্য একটি বিবৃতি দিয়ে দায় সারলেন প্রধানমন্ত্রী৷
অন্যদিকে, আক্রান্ত শিশুটির ধর্মের পরিচয় সামনে রেখে বিবৃতি দিচ্ছে বিজেপির নানা স্তরের নেতা-নেত্রীরা।
শিশু ও নারীর প্রতি এমন চরম অমানবিক লাঞ্ছনাকেও কিভাবে রাজনীতির বিষয় করে তোলা যায়? তার
থেকেও বড় এটাই যে রাজনীতির জন্যেই বাচ্চাটির উপর এভাবে নির্যাতন করা হয়, খুন করা হয়। আরও বড়
ঘটনা হল,বিজেপি কাশ্মীরে সরকারের অন্যতম জোটসঙ্গী৷ এই ঘটনায় তারা আক্রান্তর পরিবর্তে অভিযুক্তকে
বাঁচাতেই রাস্তায় নামে।তাই কাঠুয়া গণধর্ষণ কান্ডে শাসকের এমন ভূমিকার পর খুব সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন ওঠে-
এরপর দেশের মেয়েরা কার ভরসায় ঘর থেকে বেরবে? বিশ্বাস করব কাকে?
জীবনের স্বার্থেই বিশ্বাসটা দেশবাসীকে রাখতেই হয়- প্রশাসনের প্রতি৷ রাজনীতিকদের উপর, আইনজীবীদের
প্রতি৷ কিন্তু এই ঘটনায় দেখা গেল রাজনীতির কোপে পড়ে নখদন্তহীন প্রশাসন বোবা, আর ন্যায় বিচারের
জন্য শপথ নেওয়া আইনজীবীরা অভিযুক্তকে বাঁচাতে চার্জশিটই দিতে দিচ্ছেন না৷ উল্টে এমন পরিস্থিতি যে
আক্রান্তের হয়ে লড়াই করতে উদ্যোগী মহিলা আইনজীবীকে এমন আতঙ্কে রাখা হয়েছে যে তিনিও আক্রান্ত ও
ধর্ষিতা হতে পারেন বলে নিরপত্তা চাইছেন। এদিকে ঘন ঘন বদলে যাচ্ছে পুলিশের বয়ান৷ প্রাথমিক তদন্তে
প্রকাশ, আক্রান্ত ও নিহত শিশুটির ধর্ষণকারী ও হত্যাকারীদের বাঁচাতে তাঁর পরণের রক্ত ও কাদামাখা
জামাকাপড় ধুইয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করেছেন খোদ তদন্তকারী পুলিশ অফিসার৷ তারপর ঘটনা প্রকাশ্যে
আসার পর যা জনসমক্ষে পুলিশ বলছে তা নিয়ে নানা অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট যে প্রশাসন হয়ে
গেছে পুতুল৷ তাকে নাচানো হচ্ছে অন্তরাল থেকে। এখানেই প্রশ্ন, কে নাচাতে পারে? কেন?
ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, অভিযুক্ত ছয়জনের মধ্যে মূল চক্রী সঞ্জি রাম৷ জম্বু-
কাশ্মীরের কাঠুয়া এলাকায় তার বসবাস৷ সেখানে মুসলিম যাযাবর শ্রেণি বখরাওয়াল গোষ্ঠীর বসবাসের
বিরুদ্ধে খুব সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তুলছিলেন৷প্রাথমিক অনুমান, হিন্দু অধ্যুষিত ওই অঞ্চল থেকে উপজাতি
শ্রেণিটিকে হঠাতে তাদের ছোট্ট মেয়েটিকে সফট টার্গেট বানানো হয়৷ ধর্ষণ এখানে যা হয়েছে সেটা শুধুমাত্র
বিকৃত কোন মনোভাবের জন্য নয়, সংখ্যালঘু ওই জনগোষ্ঠীকে আতঙ্কগ্রস্ত করে এলাকা ছাড়া করতেই ওই
নৃশংস কাজটি করে খুব পরিকল্পনা করেই করানো হয়েছিল৷ ষড়যন্ত্রীরা বুঝতে পারে নি জঙ্গলে লাশ পুঁতে
দেওয়ার পরেও তা এভাবে প্রকাশ্যে এসে যাবে। দেশময় আলোড়ন সৃষ্টি করবে৷ প্রশাসনের সাজানো মুখোশটি
খসে পড়বে দেশে বিদেশে প্রবল গণপ্রতিবাদে৷ পুলিশের বয়ানে বলা হয়, ছোট্ট মেয়েটিকে দিনের পর দিন
মন্দিরে রেখে ধর্ষণ করা হয়৷ স্থানীয় গ্রামবাসীদের বক্তব্য, এটা অসম্ভব৷ কারণ একতলা মন্দিরের তিনটি
জানলাই গ্রিল দিয়ে ঘেরা৷ জানালাগুলি পাল্লাহীন৷ তাই বাইরে থেকেই ভিতরে কী রয়েছে বা হচ্ছে তা
সাধারণের চোখে পড়ে৷ তাছাড়া সঞ্জি রাম ছাড়াও মন্দিরের চাবি পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষদের কাছেও থাকে৷
এইরকমভাবে একটি মন্দিরের ভিতর শিশুর উপর অত্যাচার হলে তারা জানতে পারবেন না তা কখনও হয়
না৷ পুলিশের বয়ান নিয়ে সঞ্জি রামের মেয়ে ও নানা প্রশ্ন তুলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে৷ এমত অবস্থায় সুপ্রিম

কোর্ট সত্য উদ্ঘাটনে এগিয়ে এসেছে৷ নিজের পর্যবেক্ষণে ও তত্ত্বাবধানে পুরো ঘটনাটি পরীক্ষা করে দেখে
উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রধান বিচারপতি৷ কিন্তু কোন পক্ষই সিবিআই তদন্ত নিরপেক্ষ হবে
বলে বিশ্বাস করতে পারছে না৷ সেখানেও বিশ্বাসভঙ্গের কঠিন বাস্তবতা৷ সিবিআই যে কেন্দ্রের!! সেখানেও
তো বিজেপি!

৩ পৃষ্ঠার লেখা কোথায়?

আমার মেয়ে কি শুধু আমারই, সে কি হিন্দুস্থানের বেটি নয়? দুজনেই সংবাদমাধ্যমের কাছে
জানিয়েছে, তাদের জীবিকা ভেড়া-ঘোড়া- ছাগল চড়ানো৷ “ওরা হুমকি দিচ্ছে- এবার ভেড়া-ঘোড়াগুলোকও
মেরে ফেলবে৷ আমার তো আরও একটা মেয়ে আছে? আমাদের কে বাঁচাবে? আমাদের কি অপরাধ কেউ
বলতে পারেন?আজ যদি এর উত্তর দেশবাসী দিতে না পারে, তাহলে অনেক বেশি দাম চুকিয়ে এর উত্তর
খুঁজতে হবে নিজেদের সন্তানকে এক আতঙ্কগ্রস্ত সমাজে বড় হতে দিয়ে৷ সমাজটাকে ক্রমশ ধর্মের ভিত্তিতে ভেঙে
সংখ্যালঘুদের বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে যেন,এমন ভাবনা যেন আর দানা বাঁধতে না পারে সেটা দেখার দায়
শাসকের। বিরোধীদের অভিযোগ,বিজেপির এটাই রাজনৈতিক এজেন্ডা।তারই অঙ্গ হিসেবে অসহায় শিশু আর
নারী আজ শিকার।জবাব শুধু নয়,বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে এটা বুঝেই বাস্তব সম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে
সাধারণ মানুষের বিশ্বাস আর আস্থা সরকারের প্রতি অটুট থাকে।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী এখন বলছেন, অপরাধীরা শাস্তি পাবে৷মানেক গান্ধী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের
দায়িত্বে।তিনি শিশুর উপর এমন জঘন্য অপরাধের শাস্তি হিসেবে চেয়েছেন মৃত্যুদন্ড।তার জন্যে মন্ত্রিসভায়
প্রস্তাব দেবেন বলে জানিয়েছেন।পিডিপি সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে বলে কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
তা সত্বেও নির্যাতিতার মা-বাবা- পরিবারকে তাদের ঘর বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে কেন আতঙ্কে ? চলে
যেতে হয়েছে তাদের বাধ্য হয়ে৷ একই অবস্থা তাদের আশেপাশের পরিবারের বাখরাওয়াল গোষ্ঠীর মানুষদের৷
আতঙ্কে তাঁরাও এলাকা ছেড়েছে৷ ঠিক যেভাবে উত্তরপ্রদেশের উন্নাওতে নির্যাতিতার মেয়ের হয়ে প্রতিবাদ
করায় খুন করা হল বাবাকে, তারপরেও মেয়েটির আতঙ্ক: এবার হয়ত খুন হতে হবে তাঁকেও৷ এখানেও
অভিযুক্ত বিজেপি বিধায়ক৷ যার কেসটা প্রবল গণ প্রতিবাদে সিবিআইকে দিতে হলেও সেখানকার সরকার ও
প্রশাসন প্রকাশ্যেই ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত বিধায়ককেই বাঁচাতে ব্যস্ত৷ এখানেই তো শেষ নয়৷ কাঠুয়ার মতোই
একই ভাবে গুজরাটে একটি এগারো বছরের বালিকার উপর গণধর্ষণ চলে ৮ দিন ধরে, তারপর তাকে খুন
করা হয় নৃশংসভাবে৷ ঝাড়খন্ডে অষ্টমশ্রেণির একটি মেয়েকে বন্দুক ঠেকিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করল
তিন মোটরবাইক আরোহী- সর্বত্রই অভিযুক্ত বিজেপি নেতা কিংবা তাদের পরিচালিত বা সমর্থিত সরকার৷
নিত্যই এরকম ঘটনা ঘটে চলেছে৷ আসলে নীরব প্রশাসন৷কেন্দ্র-রাজ্য কিংবা স্থানীয় স্তরের নেতারা রাজনীতির
হিসেবে বিবৃতি দিচ্ছেন,কিন্তু অপরাধীকে রক্ষা করার কাজটি করে চলেছেন আড়াল থেকে।তাই অপরাধী
জানে,তাকে রক্ষা করার জন্য আছে তার দল, দলের সরকার। এই কি বেটি বাঁচাওয়ের নমুনা!!

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com