পামুক: দ্যা রেড হেয়ারড ওম্যান

“The well bottom is like the bottom of the sea. Things down here stay very still, keeping their original forms, as if under tremendous pressure, unchanged from day to day.”-  Haruki Murakami, The Wind-Up Bird Chronicle 

মুরাকামির এই উপন্যাসের মতো ওরহান পামুকের দ্যা রেড-হেয়ারড ওম্যান-উপন্যাসেও কুয়োর একটা ভূমিকা আছে। মুরাকামির কুয়ো বিচ্ছিন্নতা বা আইসোলেশনের প্রতীক। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ আবার বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেওয়া বোধ নয়। পামুকের উপন্যাসে কুয়ো হতে পারত উন্নয়নের প্রতীক। জলের সমস্যা মেটানোর জন্যই কুয়ো খোঁড়ার কাজে নেমেছিলেন এক জিওলজিস্ট মি. মাহমুদ। এই কাজে তাঁর সঙ্গী ছিল কেম নামে ১৬ বছরের একটা ছেলে। এপ্রেনটাইসের বাংলা প্রতিশব্দ এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না। 

ন্যারেটিভ ভার্সানে লেখা এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কেম লেখক হতে চেয়েছিল। কেমের জীবনের কিছু ঘটনা ও মাইথোলজিক্যাল দুটো চরিত্র ওয়দিপাস ও রোস্তাম  ওর জীবনের অনেকটা সময় ওকে এক অদ্ভুত অপরাধ বোধের  মধ্যে বেঁধে রাখে। এবার আসা যাক, মূল গল্পে। কেমের সাথে ওর বাবার সম্পর্ক সাধারণ পিতা-পুত্রের সম্পর্কের মতো ছিল না। পামুকের উপন্যাসে তুরস্কের রাজনীতি, সমাজ ও আন্তর্জাতিক স্তরে তার অবস্থান, আরো নানা খুঁটিনাটি  মিশে থাকে। এক অদ্ভুত দক্ষতায় পামুক তাঁর উপন্যাসের মধ্যে একটা গোটা দেশকে ভরে দেন। 

কেমের বাবার একটা ফার্মাসির দোকান ছিল। কিন্তু রোজগারপাতিতে তাঁর খুব একটা মন ছিল না। তুরস্কে নিষিদ্ধ লেফট রাজনীতির প্রতি কেমের বাবার আগ্রহের জন্য পুরো পরিবারকে বারবার বিপদগ্রস্ত হতে হত। শেষে একদিন এই কারণেই তাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যায়। কেম ও তার মায়ের দুর্ভাগ্যের জন্য বাবাকেই দায়ী করে তারা দুজন। ১৬ বছর বয়সে এপ্রেনটিস হিসাবে মাহমুদের সঙ্গে কুয়ো খোঁড়ার কাজে যোগ দেয় সে। 

মিথ বারবার কেমের জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে জুড়ে থাকে। যেখানে তারা কুয়ো খোঁড়ার কাজ করছিল তার পাশের গ্রামে এক থিয়েটার কন্যা রেড-হেয়ারড ওম্যানের প্রতি অদ্ভুত এক আকর্ষণ বোধ করতে থাকে সে। কেমের প্রায় মায়ের বয়সী এই মহিলাও ওর মোহগ্রস্ততাকে প্রশ্রয় দেয়। মাহমুদেরও কি রেড-হেয়ারড ওম্যানকে ভাল লাগত? উপন্যাসের একেবারে শেষে গিয়ে জানা যায়, কেন রেড-হেয়ারড ওম্যান কেমকে এই প্রশ্রয় দিয়েছিল। মুগ্ধতা আর একধরণের বিজাতীয় টিন-এজ আকর্ষণে কেম সর্বক্ষণ অন্যমনস্ক থাকত। আর এইভাবেই একদিন অসাবধানতাবশত কুয়োর ভেতরে ভুল করে অনেকখানি মাটি ফেলে দেয় সে। কুয়োর ভেতরে তখন মাহমুদ খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করতে নেমেছিল। মাহমুদ মারা গেছে ভেবে খুব ভয় পেয়ে যায় কেম। পালিয়ে আসে অনেক দূরের শহরে। 

এই ঘটনা তিরিশবছর ধরে কেমের মনে একটা অপরাধবোধ জাগিয়ে রাখে। মাহমুদের মৃত্যুর সঙ্গে ওয়দিপাসের নিজের পিতাকে হত্যা আর শোহরাবের নিজের ছেলে রুস্তমকে হত্যা দুটোর মিল যেন সে খুঁজে পায়। অথবা, এই দুটো মিথোলজিক্যাল ঘটনাকে সে নিজের অপরাধবোধের জাস্টিফিকেশন হিসাবে নিজের কাছেই ব্যবহার করে। 

পরবর্তীকালে যেখানে সে গেছে সেখানেই ওয়দিপাস বা রুস্তমকে যেন খুঁজে পেয়েছে ও। কখনও নিজের মধ্যে, কখনও রেস্তোরাঁয় মালিক তার কর্মচারীদের বকলে ওর মনে হত মালিক যেন শোহরাব আর কর্মচারী ছেলেটি রুস্তম। কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই যে নিজের পিতার হাতে খুন হবে। অথবা এই বচসার বদলা নিতে ওয়দিপাসের পিতৃহত্যার মতোই হোটেলের মালিককে খুন করবে বয়সে ছোট কর্মচারীটি। 

এইভাবে চলতে চলতে তিরিশবছর বাদে ইঞ্জিনিয়ার কেম যখন আবার কোন এক কাজের জন্য সেই কুয়ো খোঁড়ার জায়গায় আসে তখন অনেক রহস্যের সমাধান হয়ে যায়। রেড-হেয়ারড ওম্যান থেকে মাহমুদের হত্যা পুরোটাই। অপরাধবোধ থেকে কি কেম মুক্ত হল? 

ইউরোপিয় ইউনিয়নে তুরস্কের যোগ দেওয়া নিয়ে র‍্যাডিকালিস্ট আর ইসলামিস্টদের মধ্যে যে বিরোধ, গৃহযুদ্ধ, প্রাণহানি- কার দোষ? কারই বা অপরাধ? এ বিচার হয় কখনো? 

এই উপন্যাস পড়ে দুটো কথা মনে পড়ে গেল। একবার আমার ছেলে ঋজু বলেছিল, ‘মা যুদ্ধে কোন দলই নিজেকে দোষী ভাবেনা। তাই কার দোষ বলা যায় কি?’ খেলতে গিয়ে দুই দলের বিবাদ সম্বন্ধে মা’র কাছে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কথাগুলো ও বলেছিল। শঙ্খ ঘোষের ‘বাস্তু’ কবিতার একটা লাইন মনে পড়ে গেল- ‘কিন্তু আমি দোষ দেব কাকে?’

 

 

 


কাকে?’

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com