বদলে যাচ্ছে আমেরিকা

09.05.2018

 

দীপিকা ঘোষ

 

আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতি যত বেশি জটিল হচ্ছে, যত বেশি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সংকীর্ণ চেতনা প্রবলতা পাচ্ছে, পৃথিবীব্যাপি অস্থিরতার অনুপাতও ক্রমাগত ততই বেশি প্রচণ্ড হয়ে উঠছে। অনিশ্চিত পথের অনির্দিষ্ট নিশানা ধরে চলতে চলতে বদলে যাচ্ছে মানবসভ্যতা। পরিবর্তনের প্রবণতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। এখানকার বিজ্ঞানপ্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা বরং পরিবর্তনের পথ ধরে এগিয়ে চলাকেই সমর্থন করেছে বরাবর। কিন্তু সেই পরিবর্তনে যদি কখনো জীবনের সুনির্দিষ্ট নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রশ্নগুলো সঙ্গত কারণেই উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সেটাই এখন ঘটে চলেছে। সমাজ পর্যবেক্ষকদের ধারণা- আমেরিকা বদলে যাচ্ছে এমন একটি অস্থিরতার পথ ধরে, যাতে তার নৈতিক মূল্যবোধ বিপর্যস্ত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা তাই প্রকাশ পাচ্ছে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনায়। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে এখানকার সমাজসংস্কৃতির ঐতিহ্য ভালো মন্দের পথ ধরে গড়ে উঠেছিল, নৈতিক মূল্যবোধের যে স্তম্ভগুলোকে অবলম্বন করে মার্কিনীদের জাতিসত্তা গঠিত হয়েছিল, তাতে ফাটল ধরেছে রীতিমতো।

এতদিন আদর্শগত অবস্থান থেকে মার্কিনীরা বিশ্বাস করতেন - সেই জাতিই সুউন্নত এবং সুসভ্য, যে জাতি জন্মভূমির যে কোনো জাতীয় ইস্যুকেই পারস্পরিক সহযোগিতায় দায়িত্বশীলভাবে সমাধান করতে সংঘবদ্ধ। এ যাবৎকাল সব রকম কার্যক্ষেত্রে এই বিশ্বাসে তেমন কোনো ফাঁক ছিল না। প্রয়োজন অনুসারে মানব জীবনের অন্তর্নিহিত গুণাবলী এতকাল তাদের সংঘবদ্ধ করে রেখেছিল দেশাত্মবোধের চেতনায়। কেননা বহু জাতির সমন্বয়ে গঠিত আমেরিকানদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদ, জাতি, গোষ্ঠি কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়নি। হয়েছিল-(১)দায়িত্ব এবং কর্তব্যপরায়ণতা(Care and Responsibility), (২) সব নাগরিকের সমঅধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষণের সদিচ্ছা (Fairness and Equality), (৩)  ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাহসিকতা (Freedom and Courage), (৪) পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিশ্বাস (Cooperation and Trust), (৫) সততা ও স্পষ্টতা (Honesty and Openness), ইত্যাদি পার্থিব গুণাবলীর চর্চা এবং আত্মীকরণের ভেতর দিয়ে।

জাতীয়তাবাদের সংস্কৃতিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্বদেশপ্রেম আর দেশাত্মবোধের আবেগ থেকে। বদলে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সমাজমানস এই মানবিক মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলছে দ্রুগতিতে। রক্ষণশীলরা চেঁচাচ্ছেন -`Help us to save American Heritage' বলে। কিন্তু ঐতিহ্য রক্ষা করায় সংঘবদ্ধ সাহায্যের হাত প্রসারিত হওয়ার কোনো লক্ষণই তাতে দেখা যাচ্ছে না। বরং সুসংস্কৃত ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে রাষ্টের স্বার্থ রক্ষার বিষয়কে অবজ্ঞা করে মার্কিন জনতা বর্তমানে বিভাজনের দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে। ডেমোক্র্যাট দলের সমর্থনকারীরা, বিশেষত বাম থেকে অতি বাম আদর্শে আস্থাশীল এলিটরা বিভক্তির দায়ভার অন্ধভাবে চাপিয়ে দিতে চাইছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব রকম কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিয়ে। এই প্রসঙ্গে ২০১৭ এর ২৯ শে নভেম্বর ‘ওয়াশিংটন পোষ্টে’ প্রকাশিত একটি বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। যেখানে বলা হয়েছিল -`Great nations and proud democracies fall when their systems become so corrupted that the decay is not even noticed’. জগতে মহান জাতি এবং তাদের গৌরবময় গণতান্ত্রিক অর্জনগুলো অজান্তেই বিনষ্ট হয়, যখন রাষ্ট্রের সবগুলো প্রতিষ্ঠান নীতিভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। এরপরে বলা হয়েছিল -প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠিক এমন পরিস্থিতিই সৃষ্টি করে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন জাতিকে।

এ কথা ঠিক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতালাভ প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন রাজনীতির অলিগলিকে।  ২০১৬ এর নির্বাচনে মিসেস ক্লিন্টনের শোচনীয় পরাজয় সুগভীর ক্ষত তৈরী করে ক্ষিপ্ত করেছে ট্রাম্পবিরোধী জনসমাজকে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগও সন্দেহ, সংশয়ে নতুন পরিবর্তনের সূচনা করেছে আমেরিকায়। কিন্তু তারপরও বাস্তবতা হলো সমাজের মর‌্যালিটি ক্ষয়ে যাওয়ার এই চালচিত্র বর্তমানের কোনো ঘটনা নয়। অবক্ষয়ের নানা চিত্র কয়েক যুগ ধরেই উঠে আসছে সমাজবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণার তথ্যপ্রমাণে। ১৯৯১ সালে ভার্জিনীয়া ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রফেসর জেমস ডেভিসন হান্টার, তাঁর প্রখ্যাত -`Culture Wars: The Struggle to Define America' গ্রন্থে লিখেছিলেন -‘The notion of a country deeply and fundamentally divided over the core moral and political values soon made its way into politics’. প্রফেসর হান্টার উল্লেখিত সেই বাস্তবতাই এখন বিরাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে। অন্তর্নিহিত সেই নৈতিক চেতনা এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের ভিত জনজীবনের একেবারে শেকড় থেকেই আজ গভীরভাবে বিভক্ত। আর বিভাজনের এই আবেগ মার্কিন জনতা বতর্মান রাজনীতিকে কেন্দ্র করে উন্মত্তভাবে প্রকাশ করছে ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও স্বদেশের স্বার্থকে অবদলিত করে। ডেমোক্র্যাটিক দলের যাঁরা সমর্থক তাঁদের বক্তব্য হলো -ট্রাম্পের মতো নীতিহীন, অনভিজ্ঞ ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্যই এদেশের রাজনীতির ভিত পচে গেছে সম্পূর্ণ। ভূ-রাজনীতিকেও তিনি বিনষ্ট করছেন তাঁর অনভিজ্ঞতার কারণ দিয়ে।  

ওদিকে ট্রাম্পের সমর্থনকারীদের মন্তব্য হলো- টন টন কথা বলিয়ে এই যাবৎকালের রাজনীতিকদের চেয়ে কার্যক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক বেশি শ্রেয়। বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের যোগ্যতা তাঁর রয়েছে। সাধারণভাবে খেটে খাওয়া মানুষের কথা তিনি গভীরভাবে ভাবেন। আমেরিকার নিরাপত্তা সংরক্ষণে পুলিশ-মিলিটিারি বিভাগের প্রতিও বিশেষভাবে যত্নবান তিনি। তাঁর দেশপ্রেম শতভাগ খাঁটি। অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে তিনি বদ্ধপরিকর। ঐতিহ্য রক্ষায় তাঁর আন্তরিকতা প্রসংশনীয়। ট্রাম্প নিজেকে সেভাবেই প্রকাশ করতে সক্ষম, ঠিক তাঁকে আমরা যেভাবে চোখের সামনে দেখতে পাই। আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা আবারও ভালো হচ্ছে। চাকরির বাজার আগের চেয়ে অনেকখানি উন্নত। ধনতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অর্থনীতি আর গণতন্ত্র যদি উন্নয়নের চাবিকাঠি হয়ে থাকে, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবনতি ঘটার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তারপরও ডান থেকে মধ্যপন্থী, বাম থেকে অতি বাম প্রত্যেকেরই স্ব স্ব অবস্থান থেকে পারস্পরিক দোষারোপের অভিযোগটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। একই সঙ্গে সমাজমানসের নৈতিকতা মূল্যায়নের কম্পাসটিও নিচের দিকে নামছে। ডেমোক্র্যাট বনাম রিপাবলিকানদের আদর্শগত বিভক্তির ফারাক আজ এতটাই বিশাল আকার ধারণ করেছে যে সেখান দিয়ে শত শত অনৈতিক ব্যাপারগুলো অনায়াসেই হুহু করে প্রবেশ করছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে।

ক্ষমতা, রাজনীতি, নেতৃত্ব আর আদর্শের দ্বন্দ্ব নিয়ে যে সংঘাত এখন জোরেসোরে চলছে, সেটাই আমেরিকার বদলে যাওয়া চেহারাটাকে বিশ্বের সামনে প্রকট করছে কুচ্ছিতভাবে। আর এতে নিত্যনতুন রসদ যোগাচ্ছেন, হলিউডের তারকা থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সাধারণ জনতা থেকে সংবাদপত্রের ব্যক্তিত্ব, ইউনিভার্সিটির শিক্ষক থেকে শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থী, এফবিআই-এর ডিরেক্টর থেকে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের কাউন্সেলর, ব্যবসায়ী থেকে গায়ক, প্রত্যেকেই। রাষ্ট্রের প্রভাবশালী মানুষগুলো ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার নামে, বাস্তবতাবর্জিত উদারতার নামে এক অনিশ্চিত অস্থিরতার দিকে সমাজকে ঠেলে দিতে চাইছেন। বিভাজনের এই ইতিহাস অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত আজ। আর এটাই শংকার প্রধান কারণ। কেননা ‘Disaster comes when elites push society toward instability'(Political Science by Rachel Nuwer).

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমের তিক্ত সমালোচনা শুরু থেকেই চলছে। অবশ্য নিক্সন থেকে ওয়াকার বুশ, ক্লিন্টন থেকে ওবামা সবাইকেই তাদের আক্রমণের ধার ক্ষতাক্ত করেছে কম বেশি। কিন্তু এখন এদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়তই যে জিজ্ঞাসা উঠে আসছে সেটা হলো - মূলধারার গণমাধ্যম  মিথ্যাচার করছে কি? নাকি এরা আজ দুর্নীতিগ্রস্ত? কেন তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এবং সফলতার সংবাদগুলো পরিহার করে মিথ্যে সংবাদ প্রচার করায় ব্যস্ত রয়েছে এভাবে? কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল কিংবা নির্দিষ্ট গ্রুপের মানুষের সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই কি?

এসব জিজ্ঞাসার উত্তর সম্ভবত, যে কোনো দেশের সমাজ থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে জীবনদর্শন সবই নাটকীয়ভাবে বদলে দেবার সাধ্য রাখে সে দেশের পরিবর্তিত জনসমাজ। জনতার কারণেই রাষ্ট্রে ক্ষমতায়ন, পলিটিক্সসহ সব রকম প্রশাসাশনিক ব্যবস্থা বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি ইতিমধ্যেই সেই কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করে ফেলেছে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে পরিবর্তনের প্রবল ঢেউ বিপুলভাবে প্লাবিত করেছে আমেরিকার সমাজসংস্কৃতিকে। ওবামার আমলেই পরিবর্তনের এই জোয়ার অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়েছিল। এখন ক্ষমতা বদলের পট পরিবর্তনে সেটা প্রচণ্ডরূপে দৃশ্যমান। 

পরিশেষে বলা চলে, জীবনের চাহিদা এবং প্রয়োজনীয়তার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে মানুষ যখন ব্যর্থ হয়, তখন নৈতিক মূল্যবোধ অজান্তেই হারিয়ে যায় সমাজসংস্কৃতি থেকে। সভ্যতার মাপকাঠি যেমন পর্যায়েরই হোক অতীতের অনেক ঘটনাই প্রমাণ করেছে, মানবসমাজের ইতিহাস বার বার বদলে যায় ভুল পথে পরিচালিত হলে। বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত, যোগ্য নেতৃত্ব, কল্যাণমূলক রাজনীতি আর সম্মিলিত শুভ ইচ্ছের দ্বারা অবশ্যই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। কিন্তু এমন দ্বিধাবিভক্ত জাতি ও সমাজের পক্ষে সেটা সম্ভব হবে কিনা, সেটাই আজ জটিল প্রশ্ন। 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com