কাদম্বরী

 

 

১৯ এপ্রিল ১৮৮৪ রবীন্দ্রনাথের নতুুন বৌঠান অাফিম খেলেন প্রচুর পরিমাণে, তিনি মারা গেলেন দু-দিন
পরে...

সন্ধের পর থেকে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িটা নিস্তব্ধ। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাসাদে বসবাস করলে
সকলে একটু চুপচাপ হয়ে থাকে। মহর্ষি বেশি শব্দ করে হাসাহাসি, জোরে কথা বলা ঘোরতর অপছন্দ করেন।
মহর্ষি যে মহলে রয়েছেন প্রাসাদের সেই অংশটি তাই নীরব হয়ে রয়েছে।
একটা কালো ঢাকাই মসলিনের শাড়ি পরে অায়নার সামনে বসে রয়েছেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের অতুল
প্রতিভাসম্পন্ন সন্তান জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী। তাঁর সর্বক্ষণের ছায়া সহচর তাঁর কনিষ্ঠ
দেবর রবীন্দ্রর কয়েকটি লেখা তিনি হাতে ধরে রয়েছেন। রোজ সকালে কিছু লিখে ফেলেই দুপুরে সেটা
কাদম্বরীকে পড়াতে ছুটে অাসত রবি। কখনো অাবার নিজের লেখায় সুর বসিয়ে সেটা গেয়ে প্রথম শোনাতে
বৌঠানকে। একবার ব্রজবুলিতে একটা পদ লিখে রবি সুর দিয়ে গাইবার পর কাদম্বরী বলেছিলেন : বাহ বেশ তো
যাত্রাদলের সখিদের মতোন গলা হয়েছে তোমার রবি। জ্যোতিদাকে বলব নাকি ওর থিয়েটারে সখিদের গান গুলো
তোমাকে দিয়ে গাওয়াতে? সখিদের মতো গলা হয়েছে শুনে তখন কী রাগ রবির। বলল : তোমাকে অার কোনোদিন
কিছু শোনাবনে বৌঠান। যে কখনো ভালকে মন খুলে ভাল বলতে জানেনা তারসঙ্গে কিসের কথা বৌঠান।
এসমস্ত কথাই এখন বুঝি অতীত হয়ে গেছে! সেই রবি এখন নতুন বন্ধু পেয়েছে। বরির বিয়ে হয়ে গেছে চারমাস
অাগে। প্রথমে বিয়ে করতে চায়নি সে, কিন্তু বিয়ে করে ফেলবার পর থেকে অার যেন কাদম্বরীর দিকে তাকিয়ে
কথা বলতেও সঙ্কোচবোধ করছে রবীন্দ্র। জোড়াসাঁকো বাড়িতে সে থাকছেওনা। তার প্রায় বালিকা স্ত্রীকে
ঠাকুর বাড়ির মতো করে গড়ে পিঠে নিতে হবে। সেইজন্যে মেয়েটিকে নিজের কাছে রেখেছেন রবির মেজ বৌঠান
জ্ঞানদানন্দিনী। কাদম্বরীর সন্তান নেই। স্বামীও শুধু দিনে নয়, রাতেও ব্যস্ত; কোনো না কোনো থিয়েটারের
মহড়া সেরে প্রায় সব রাতেই নটীদের কক্ষেই থেকে যান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। বহুদিন তাঁর কথাও হয়না নিজের
স্বামীর সঙ্গে।
হাতের বইগুলো নামিয়ে রাখলেন কাদম্বরী। কোন ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে এসেছিলেন এই বাড়িতে। প্রায় উনিশ কুড়ি
বছর অাগেকার কথা। কত কথা অাজ মনে পড়ছে। বিয়ে হয়ে যখন এসেছিলেন সেই বালিকা বয়েসে সকলের সব
কথার অর্থ বুঝতেননা কাদম্বরী। একটু বড়ো হয়ে বুঝলেন তাঁর জা ননদেরা কেউ কেউ তাঁকে যেন অবলীলায়
ছোটখাট অপমান করছেন। তাঁর অাড়ালে কখনো বা তাঁর সামনেই বলে উঠছেন : বাড়ির চাকরের মেয়ের সঙ্গে
নতুনের মতো ব্রাইট একটা ছেলের বিয়ে হোল! এটা কী করলেন বাবামশাই। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রূপবান গুণবান
ঠাকুর বাড়ির উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেই জ্যোতির সঙ্গে ঠাকুর বাড়ির ভৃত্যর মেয়ের বিয়ে হোল ঘটনাটা কুড়ি
বছরেও এই বাড়ির অনেকে হজম করতে পারেননি। আগে রোজ সকালে কদাম্বরী দেখতেন দু-হাতে দুটো ভারি মোট
নিয়ে বাজার করে নিচের মহলে ঢুকছেন তাঁর বাবা। তারপর একদিন সকলের বেশ সম্মানে লাগল বাড়ির কোনও
বধূর বাবাকে দিয়ে বাজার হাট করাতে। তখন তাঁর বাবাকে বদলি করা হোল অন্য আত্মীয়র বাড়ি ভৃত্যর কাজের
জন্য। তাতে তবু খানিকটা স্বস্তি পেলেন কাদম্বরী। কারণ এ-বাড়িতে কাদম্বরীর সামনে তাঁর বাবাকে অপমান
করবার একটা দস্তুর চালু ছিল মহিলা মহলের একাংশে। হয়তো কোনওদিন তাঁর বাবা বাজার করে সদর দিয়ে
ঢুকছেন, ওমনি ঠাকুরবাড়ির এক বধূর নিজস্ব পরিচারিকা তাঁর বাবাকে বললেন : ওই উঠোনের সামনেটা জল
ঢেলে পরিস্কার করে দাও তো। তারপর তরকারি গুলো ধুয়ে কেটে ফ্যালো। চটপট করো সব কাজ।

কাদম্বরী লক্ষ করেতেন তাঁর সামনে তাঁর বাবাকে নানারকম অপমান করবার একটা দস্তুরমতো নিয়ম এ-বাড়ির
অনেক বউ মেয়েরা পালন করেই চলেছেন। কাদম্বরীর স্বামী যে তাঁর প্রতি প্রায় নিরাসক্ত এবং কাদম্বরীর
অপমানে বলবার যে কেউ নেই সেটা যেন এ-বাড়িতে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটিও জেনে যায়।
তবে রবি প্রতিবাদ করত। সকলের সামনে যতটা প্রতিবাদ করা যায় রবি করত। কিন্তু রবির নিজেরই তখন
পায়ের তলায় মাটি নেই। দু- দুবার বিলেতে গিয়ে কোনো ডিগ্রি না নিয়েই সে ফিরে এসেছে বলে মহর্ষি যথেষ্ট
বিরক্ত তার ওপর। তাই রবির প্রতিবাদ কে শুনবে? উল্টে বাড়ির বৌ মেয়েরা রবিকেই চারকথা শুনিয়ে ছাড়ত।
কাদম্বরী নিচে নামলেই তাঁর বাবাকে তাঁর সামনে বেশি অপমানিত হতে হয় বলে একসময় নিজের ঘর থেকে
বেরোনো বন্ধ করে দিলেন কাদম্বরী।
বাড়িতে কোনো পার্টি বা জমায়েত হলেও অার যেতেননা। রবি এসে তাঁকে বারবার নিয়ে যেতে চাইত। হাত ধরে টেনে
নিয়ে বলত : তুমি কেন একা ঘরে বসে থাকবে বৌঠান? এতো ভারি অনাচার। কাদম্বরী যেতেননা। বলতেন শরীরটা
ভাল লাগছেনা রবি। তুমি যাও। তোমার গান শুনবে বলে সকলে বসে রয়েছে। রবি মুখ কালো করে ফিরে গিয়েছে।
ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়েছেন কাদম্বরী।
সেই রবিও এখন কত দূরে সরে গেল। একবার তাঁর খাঁচার একটা ময়নাকে কেউ উড়িয়ে দিল। কাদম্বরী ছাদে উঠে
দেখলেন চারদিকে শুধু কাক অার ময়নাটার পালক উড়ছে কয়েকটা। ছাদ থেকে প্রায় পড়ে যেতেন তিনি সেদিন।
রবি এসে ধরে না ফেললে। রবি তাঁর চেয়ে প্রায় দেড় বছরের ছোট। তবু তাঁকে সে তখন কত ভোলাতে চেয়েছিল
সেবার। বলেছিল : বৌঠান পাখিটাকে অামি ছেড়ে দিয়েছি। নিজে দেখেছি ও অনেকদূরে উড়ে গিয়েছে সোঁ সোঁ করে।
কোনো কাকপক্ষী ওকে ছুঁতে পারেনি। এ বাড়ির কোনো অদৃশ্য হাত যেন কাদম্বরীর সমস্ত ভালবাসাকে
ছিন্নভিন্ন করে দিতে চায়।
তার বুড়ো পাখিটাকে কেউ ছেড়ে দেয় নাহলে।
রবির দিদি স্বর্ণকুমারী সারাদিনরাত লেখালিখি নিয়ে থাকেন। তাঁর ছোট্ট মেয়েটা একা একা ঘুরত সারা বাড়ি।
কাদম্বরী মেয়েটাকে চান করিয়ে দিতেন, খাইয়ে দিতেন। ঠিক সেই মেয়েটাই সিঁড়ি থেকে পড়ে গেল। সে কী রক্ত
চাপ চাপ। এ বাড়ির অলিন্দ খিলান থেকে শোনা গেল কেউ বলছে, একটা অাঁটকুড়ে অপয়া মেয়েছেলে নিজের
ছেলেপিলে নেই তাই স্বর্ণদিদির মেয়েটাকেও রাক্ষুসিটা খেল।
স্বর্ণদিদির মেয়ে ঊর্মিলার ওরকম রক্তাক্ত মৃত্যুর পর থেকে নিজের ঘরে একেবারে যেন গুটিয়ে গেলেন
কাদম্বরী। নিজের ঘরে বসে বসে অাফিম খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন।
রবি ছুটে ছুটে অাসত। কাদম্বরী যাতে দুঃখে ডুবে না যান সেজন্য গান গাইত। কবিতা পড়ত। রবির এই অাচরণ
সহ্য হোলনা অনেকের। কাদম্বরীকে একেবারে একা না করে দিলে কারুর কারুর বুক ফেটে যায়।
রবির বিয়েই শুধু হয়ে গেল নয়। রবিকে জোড়াসাঁকো ছেড়ে থাকতে কার্যত বাধ্য করা হোল।
কাদম্বরী একদিন দেখলেন রবি জোড়াসাঁকোয় এল, কিছু দরকারি কাগজ পত্র নিয়ে আবার বেরিয়ে গেল।
কাদম্বরী যে জোড়াসাঁকোয় বসবাস করেন তা বোধহয় নানা ঘটনার ঘনঘটায় ভুলে গিয়েছে রবি, কাদম্বরী
দেরাজ থেকে একটা শিশি বের করে শিশি থেকে সবগুলো অাফিমের বড়ি মুখে দিলেন। জল খেলেন তারপর। কোনো
চিঠি তিনি লিখলেননা কাউকে। জোড়াসাঁকোর খিড়কি অলিন্দ অার রবিঠাকুর তাঁর না লেখা চিঠি হয়ে রয়ে যাবে
যুগের পর যুগ। এই শহর থেকে কত কী মুছে যাবে। কিন্তু তাঁর এই না লেখা চিঠির চিহ্ন কোনোদিন মুছবেনা।
ঘরেটা নিস্প্রদীপ করে দিলেন কাদম্বরী।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com