অনন্য মৃণাল সেন

 

বাড়ি ছাড়ার পূর্বে যিনি আমাদের সম্পত্তি ক্রয় করেছিলেন তার কাছে বাবা ছোট্ট একটা অনুরোধ করেন:
‘আপনাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে না … কিন্তু চেষ্টা করে দেখবেন … যদি সম্ভব হয় … পুকুরের পাশে যে-
ছোট্ট স্মৃতিস্তম্ভটি আছে, তা যেন রক্ষা পায়।’

স্মৃতিস্তম্ভটি হলো আমাদের ছোট বোন রেবার। সে পাঁচ বছর বয়সে মারা যায়। সে পা পিছলে পুকুরে পড়ে যায়
এবং ডুবে মারা যায়।"
~ ‘অলওয়েজ বিইং বর্ন’/ মৃণাল সেনের আত্মজীবনী

সিনেমা জাদুকর, চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও লেখক মৃনাল সেনের ৯৫তম জন্মবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা
এবং বিনম্র শ্রদ্ধা : 

(১) জীবনের ৯৪টি বছর পূর্ণ করে এখনো নিজেকে মনেপ্রাণে তরতাজা যুবক মনে করেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র
নির্মাতা মৃণাল সেন। প্রতিনিয়ত নিয়ম ভেঙ্গে নতুন নিয়ম সৃষ্টিতে যার ছিল অদম্য নেশা এখনো তার ভাবনায়
সব সময় সিনেমার ভাষা। আজ এই ৯৪ বছর বয়সেও তিনি সমানভাবে ঋজু তার ভাবনাতে। এখনও প্রতিদিনই ঘুম
থেকে উঠে মনে মনে ভাবেন ছবি বানানোর কথা। তার শেষ ছবি তৈরির পর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। এর মাঝে
মাঝে ছবি তৈরির জন্য তেড়েফুঁড়ে উঠেছেন। কিন্তু বয়সের কথা ভেবে আর সাহস করে উঠতে পারেন না। দক্ষিণ
কলকাতার পদ্মপুকুরের কাছে এক বহুতলের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে মৃণাল সেন এখনও সচেতন সিনেমা ভাবনা নিয়েই
নিজেকে নিবদ্ধ রেখেছেন। কিংবদন্তি এই বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও লেখক মৃনাল সেনের
৯৪তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

(২) বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন ১৯২৩ সালের ১৪ মে বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরের একটি
শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদপুরেই কেটেছে মৃণাল সেনের ছোটবেলা। এখানে উচ্চবিদ্যালয়ে লেখা পড়া শেষে
উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশ বিভাগের সময় তারা সপরিবারে কলকাতায় আসেন এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা পড়াশোনা করেন তিনি। ছাত্রাবস্থায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির
সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত হন। যদিও তিনি কখনও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন নি। চল্লিশের দশকে
তিনি সমাজবাদী সংস্থা আইপিটিএর (ইন্ডিয়ান পিপ্‌লস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন) সঙ্গে যুক্ত হন। কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবার পর তিনি একজন সাংবাদিক, একজন ওষুধ বিপননকারী এবং চলচ্চিত্রে শব্দ
কলাকুশলী হিসাবে কাজ করেন।

ভারতীয় চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে ২০০৪ সালের শেষভাগে। দিল্লিস্থ স্টেলার
পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ৩১০ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির নাম ‘অলওয়েজ বিইং বর্ন’। ইংরেজি থেকে অনূদিত
নির্বাচিত অংশটিতে মৃণাল সেন দেশভাগ, কলকাতা গমন, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে নিজের পুরনো বাড়ি

পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা, কবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাকার বিষয় সম্পর্কে বর্ণনা
নীচে দিলাম:

আমার পিতা-মাতা কখনোই ভাবেননি তাদের প্রিয় স্বদেশ ছাড়তে হবে। কিন্তু নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিল
এবং পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলো। পরিস্থিতির ফেরে বাধ্য হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন সব সম্পত্তি বিক্রি
করে দিয়ে দেশত্যাগ করবেন। জলের দরে সব বিক্রি করে দিয়ে তারা সপরিবারে কলকাতায় উপস্থিত হলেন,
‘উদ্বাস্তু’ পরিচয়ে। বাড়ি ছাড়ার পূর্বে যিনি আমাদের সম্পত্তি ক্রয় করেছিলেন তার কাছে বাবা ছোট্ট একটা
অনুরোধ করেন: ‘আপনাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে না … কিন্তু চেষ্টা করে দেখবেন … যদি সম্ভব হয় …
পুকুরের পাশে যে-ছোট্ট স্মৃতিস্তম্ভটি আছে, তা যেন রক্ষা পায়।’

স্মৃতিস্তম্ভটি হলো আমাদের ছোট বোন রেবার। সে পাঁচ বছর বয়সে মারা যায়। সে পা পিছলে পুকুরে পড়ে যায়
এবং ডুবে মারা যায়।

রেবা আমাদের সব ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিল। সাত ভাই ও পাঁচ বোনের বিরাট পরিবারে সে বড়ো
হচ্ছিল। আমি ভাইদের মধ্যে ষষ্ঠ ছিলাম এবং রেবা বোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল। আর সে ছিল সবচাইতে
আদরের, প্রতিবেশীরাও তাকে খুব ভালবাসতো। যতদূর মনে পড়ে সেই দুর্ভাগা দিনটি ছিল এক ছুটির দিন, আমরা
সবাই দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম। রেবা ঘাটে গিয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে ঘাটটি চমৎকার ছিল —
কয়েকটি ধাপ পুকুরের পানিতে নেমে গেছে; পানির কয়েক ইঞ্চি ওপরে ধাপের সঙ্গে বাঁশনির্মিত একটি মাচা —
পুকুরের এক-চতুর্থাংশ অঞ্চল মাচাটি অতিক্রম করে গেছে। আমরা সবাই বাঁশের মাচা ধরে হাঁটতে পছন্দ
করতাম। হাঁটার সময়ে দুপাশে পানিকে অতিক্রম করে যেতাম, কখনো পানিতে পা ডুবিয়ে মাচায় বসতাম। রেবাও
তাই করতো। আর সে মাচার একেবারে সামনের প্রান্তে বসে গুনগুন করে গান গাইতে পছন্দ করতো। কিন্তু
সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল কেউ জানে না, কারণ কেউ সেখানে ছিল না। আমরা সবাই পরে ধরে নিই মাচার একেবারে
সামনে গিয়ে পানিতে পা ডুবিয়ে সে বসেছিল এবং হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে আমরা তাকে
অনেকক্ষণ ধরে দেখছিলাম না, প্রতিবেশীদের বাড়িতে তাকে খোঁজা হলো এবং পাওয়া গেলনা; অবশেষে মেজদা,
আমার সাঁতারু দাদা, পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন — অল্পক্ষণের মধ্যেই তাকে উদ্ধার করলেন, মৃত অবস্থায়।
পানির নিচেই তার মৃত্যু হয়েছিল।

রেবার মৃত্যুর খবর দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সবাই দেখতে আসে, কারণ সবাই তাকে ভালবাসতো। কলকাতা
থেকে আমাদের সবচেয়ে বড়ো ভাই শৈলেশদা আসলেন। তার সঙ্গে এলেন তার প্রিয় বন্ধু জসীমউদ্দীন।
জসীমদার কাছে রেবা ছিল অনেক কিছু। জসীমদা আমাদের কারো কাছ থেকে একটা-দুটো কথা শুনলেন এবং সময়
নষ্ট না করে ঘাতক-ঘাটের কাছে গেলেন। তাকে চা খেতে বলা হলো, তিনি রাজি হলেন না। দুপুরে তাকে খেতে দেয়া
হলো, সামান্যই খেলেন। খুব সামান্য। বিকেলে তিনি আমার মাকে ডাকলেন। মা ঘাটের কাছে গেলেন এবং মাকে
জড়িয়ে ধরে জসীমদা শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন। তারা কিছুণ নীরব রইলেন এবং এরপর জসীমদা মাকে রেবার
একটি অজানা কথা জানালেন। রেবার এরকম অনেক গোপন কথা ছিল যা কেবল জসীমদাই জানতেন। তিনি এক
মাস আগে জসীমদাকে বলা রেবার একটি অজানা কথা মাকে জানালেন। তিনি জানালেন, রেবা তাকে প্রতিজ্ঞা
করিয়েছিল যে একবার তাকে সারারাত জাগার সুযোগ দিতে হবে এবং দেখতে দিতে হবে রাতের বেলা কীভাবে ফুল
ফোটে।

 

অনেক পরে মা রেবা-সম্পর্কিত এইসব বিবিধ ঘটনা আমাদের শুনিয়েছিলেন।

জসীমদার যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়েন, তখন থেকেই তার মধ্যে একটা কবি-ভাব ছিল। বয়সকালে তিনি বিখ্যাত
কবি হয়ে ওঠেন এবং রবীন্দ্রনাথও আমাদের জসীমউদ্দীনকে অনেক মূল্য দিতেন। তার অনেকগুলো ক্লাসিক
কাব্যোপন্যাসের মধ্যে নকশী কাঁথার মাঠ অবলম্বনে সম্প্রতি কলকাতায় একটি উঁচুমানের কাব্যনাটক
মঞ্চস্থ হয়েছে। তার সব কবিতা ও গান পল্লীর মাটি থেকে উৎসারিত হয়েছে।

সেইদিন সূর্যাস্তের পরে জসীমদা ঘাট থেকে ফিরে আসেন এবং আমাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান। আমাদের
বাসা থেকে চার-পাঁচ মাইল দূরে গোবিন্দপুর গ্রামের পিতৃনিবাসে যাবার পূর্বে তিনি মার হাতে ঘাটে বসে থাকা
অবস্থায় লিখিত দীর্ঘ একটি কবিতা দিয়ে যান। তিনি মাকে বলে যান সেটা কিছুতেই তিনি যেন প্রকাশ না করেন,
কখনোই নয়। এটা কেবল তার কাছেই থাকবে। কবিতাটি ছিল রেবাকে নিয়ে।

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মা কবিতাটি তার নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। এটা একটি
খামে এতবছর ধরে রক্ষিত ছিল। এমনকি যখন তিনি বাবার সঙ্গে দেশত্যাগ করছেন, তখনও তিনি সেটা সঙ্গে
নিতে ভোলেননি। তার দাহের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাটিও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

সুদীর্ঘ সময় পরে, ১৯৯০ সালে, দেশত্যাগের ৪৭ বছর পার হয়ে যাবার পরে সেই ছোট শহরের সেই বাড়ির সামনে
আমি আর আমার স্ত্রী দাঁড়াই। এটি এখন এক স্বাধীন রাষ্ট্র, নাম বাংলাদেশ। এ হলো সেই বাড়ি যেখানে আমি
আমার শৈশব এবং বেড়ে ওঠার কাল কাটিয়েছি। ৪৭ বছরে মালিকবদল হয়েছে, কিন্তু মাত্র একবার। যে-
ব্যক্তিটি আমার বাবার কাছ থেকে বাড়ি ও অন্যান্য

(৩) গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বিশেষ বন্ধু মৃণাল সেন ছবি করেছেন বিদ্রোহী মেজাজে। তার পরিচালিত
প্রথম ছবি রাতভোর মুক্তি পায় ১৯৫৫ সালে। যদিও ছবিটি বেশি সাফল্য পায় নি। তবে তাঁর দ্বিতীয় ছবি নীল
আকাশের নীচে তাঁকে স্থানীয় পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর তৃতীয় ছবি বাইশে শ্রাবন থেকে তিনি আর্ন্তজাতিক
পরিচিতি পান। তারপরের ২০ বছরে একের পর এক ছবি করেছেন প্রচলিত ধারণার বাইরে বেরিয়ে এসে।
আকাশকুসুম, মৃগয়া অন্যযাত্রা, কলকাতা-৭১, আকালের সন্ধানে, একদিন প্রতিদিন, মহাপৃথিবী, খারিজ,
খণ্ডহর, ওকাউরি কথা ও অন্য ভুবন-এ মৃণাল ছুঁয়ে গেছেন সময়কে। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে মৃণাল
যেভাবে সাহসের সঙ্গে তার ছবিতে তুলে ধরেছেন তা অন্য কোন ভারতীয় পরিচালক পারেননি। রাজনৈতিক ছবি
নির্মাণ করলেও তার ছবি কখনো রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েনি। অর্থাৎ রাজনৈতিক বিরূপ সমালোচনায় পড়তে
হয়নি। কেননা রাজনীতির গভীরে যেয়ে তার মূল অন্বেষণ করাই ছিল তার লক্ষ্য, ছবির রাজনীতিকরণ নয়। তাই
‘ভুবন সোম’ এ তিনি আমলাতন্ত্রকে আঘাত করতে চেয়েছেন। আমলাতান্ত্রিকতার ভেতরের ভাঁপা দিকগুলো
উন্মোচন করতে চেয়েছেন ১৯৬৯ সালে তাঁর পরিচালিত ছবি ভুবন সোম মুক্তি পায়।

চল্লিশের দশকে গণ নাট্যসংস্থার (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন/আইপিটিএ) এর সঙ্গে যুক্ত
হন। এ সংস্থার সঙ্গে কাজ করেই মূলত তার শিল্প মানস তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি সাংবাদিকতার
সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

মৃণাল সেন নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র রাতভোর। প্রথম সিনেমায় খুব একটা সাফল্য ছড়াতে পারেননি তিনি। তবে
প্রথম ছবি নির্মাণের চার বছর পর ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায় মৃণাল সেন পরিচালিত দ্বিতীয় ছবি নীল আকাশের
নিচে। মূলত দ্বিতীয় সিনেমার মাধ্যমেই তিনি নির্মাতা হিসেবে সবার নজরে আসেন।

এরপর ১৯৬০ সালে মুক্তি পায় মৃণাল সেনের তৃতীয় ছবি বাইশে শ্রাবণ। এরপর শুরু হয় বাংলা চলচ্চিত্রে মৃণাল
সেনের নান্দনিক কর্মযজ্ঞ। ভুবন সোম সিনেমার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রচলিত ধারাকে বদলে দেন
তিনি। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবিটিতে অভিনয় করেন শক্তিমান অভিনেতা উৎপল দত্ত।

বনফুলের একটি বড় গল্প থেকে নির্মিত ছবি ‘ভুবন সোম’ এর নায়ক ভুবন সোম রেল বিভাগের উর্ধতন,
ডাকসাইটে একজন কর্মকর্তা। অবিবাহিত। অত্যন্ত সৎ। সততার কারণে নিকট আত্মীয়কেও বরখাস্ত করতে
দ্বিধাবোধ করেন না। তাই রেলের একজন অসাধু টিকেট কালেক্টার যাদব প্যাটেলের ঘুষ গ্রহণের কারণে তার
বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি করে তার শাস্তির ব্যবস্থা করেন। এই ছবিতে বিখ্যাত অভিনেতা উৎপল দত্ত অভিনয়
করেছিলেন। এই ছবিটি অনেকের মতে ‘ভুবন সোম’মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ ছবি।

(৪) বাংলা ভাষা ছাড়াও হিন্দি, ওড়িয়া ও তেলেগু ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন মৃণাল সেন । ১৯৬৬ সালে
ওড়িয়া ভাষায় নির্মাণ করেন মাটির মনীষ, যা কালীন্দিচরণ পাণিগ্রাহীর গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়। ১৯৬৯
এ বনফুলের কাহিনী অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় নির্মাণ করে ভুবন সোম। ১৯৭৭ সালে প্রেম চন্দের গল্প
অবলম্বনে তেলেগু ভাষায় নির্মাণ করেন ওকা উরি কথা। ১৯৮৫ সালে নির্মাণ করেন জেনেসিস, যা হিন্দি,
ফরাসি ও ইংরেজি তিনটি ভাষায় তৈরি হয়।

(৫) বাংলা চলচ্চিত্রের ট্রিলোজিতে সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের পাশেই রয়েছেন মৃণাল সেন। সমাজ
বাস্তবতাকে মৃণাল সেন সব সময়ই গুরুত্ব দিয়েছেন। আর তাই তার ছবিতে নকশাল আন্দোলন যেমন এসেছে,
তেমনি এসেছে শ্রেণীদ্বন্দ্ব, এসেছে দরিদ্র আদিবাসীদের কথাও। তাঁর কলকাতা ট্রিলোজি অর্থাৎ ইন্টারভিউ
(১৯৭১), ক্যালকাটা ৭১ (১৯৭২) এবং পদাতিক (১৯৭৩) ছবি তিনটির মাধ্যমে তিনি তৎকালীন কলকাতার
অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরেছিলেন। মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে মৃণাল সেন তুলে ধরেন তাঁর খুবই
প্রশংসিত দুটি ছবি এক দিন প্রতিদিন (১৯৭৯) এবং খারিজ (১৯৮২) এর মাধ্যমে। খারিজ ১৯৮৩ সালের কান
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮০ সালের চলচ্চিত্র আকালের সন্ধানে।
এই ছবিতে দেখানো হয়েছিল একটি চলচ্চিত্র কলাকুশলীদলের একটি গ্রামে গিয়ে ১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দের
দুর্ভিক্ষের উপর একটি চলচ্চিত্র তৈরির কাহিনী। কিভাবে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের কাল্পনিক কাহিনী মিলেমিশে
একাকার হয়ে যায় সেই গ্রামের সাধারণ মানুষদের সাথে সেটাই ছিল এই চলচ্চিত্রের সারমর্ম। আকালের
সন্ধানে ১৯৮১ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার হিসাবে রুপোর ভালুক
জয় করে। মৃণাল সেনের পরবর্তীকালের ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহাপৃথিবী (১৯৯২) এবং অন্তরীন (১৯৯৪)।
এখনও অবধি তাঁর শেষ ছবি আমার ভুবন মুক্তি পায় ২০০২ সালে। আজন্ম মার্কসবাদে বিশ্বাসী হলেও তিনি
রুদ্ধ কমিউনিস্টের জীবনদর্শনে বিশ্বাসী নন। আর তাই সারা জীবন ধরে তিনি স্পষ্টভাবে সবকিছু বলে
গিয়েছেন।

(৬) জীবনে দেশে বিদেশে অজস্র পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন মৃণাল সেন। ১৯৮১ সালে তিনি ভারত সরকার
দ্বারা পদ্মভূষণ পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৫ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান। তিনি ১৯৯৮ থেকে
২০০৩ অবধি ভারতীয় সংসদের সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেন। ফরাসি সরকার তাঁকে কম্যান্ডার অফ দি
অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস (Ordre des Arts et des Lettres ) সম্মানে সম্মানিত করেন। এই সম্মান
ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান। ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁকে অর্ডার অফ
ফ্রেন্ডশিপ সম্মানে ভূষিত করেন। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলি প্রায় সবকটি বড় চলচ্চিত্র উৎসব থেকে
পুরস্কার জয় করেছে। তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল ফেডারেশন অফ দি ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত
হয়েছিলেন। ভারত এবং ভারতের বাইরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান
করেছে।

(৭) জীবনের ৯৪টি বছর পূর্ণ করে এখনো নিজেকে মনেপ্রাণে তরতাজা যুবক মনে করেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র
নির্মাতা মৃণাল সেন। প্রতিনিয়ত নিয়ম ভেঙ্গে নতুন নিয়ম সৃষ্টিতে যার ছিল অদম্য নেশা এখনো তার ভাবনায়
সব সময় সিনেমার ভাষা। আজ এই ৯৪ বছর বয়সেও তিনি সমানভাবে ঋজু তার ভাবনাতে। এখনও প্রতিদিনই ঘুম
থেকে উঠে মনে মনে ভাবেন ছবি বানানোর কথা। তার শেষ ছবি তৈরির পর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। এর মাঝে
মাঝে ছবি তৈরির জন্য তেড়েফুঁড়ে উঠেছেন। কিন্তু বয়সের কথা ভেবে আর সাহস করে উঠতে পারেন না। দক্ষিণ
কলকাতার পদ্মপুকুরের কাছে এক বহুতলের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে মৃণাল সেন এখনও সচেতন সিনেমা ভাবনা নিয়েই
নিজেকে নিবদ্ধ রেখেছেন।

 

 

গত ১৪ ই মে ২০১৮ তে ছিল কিংবদন্তি এই বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও লেখক মৃনাল সেনের
৯৫তম জন্মবার্ষিকী। তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা।তাঁর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধায় এই লেখাটি বাংলাদেশের ঢাকা থেকে
লিখেছেন ইফতেখার খালিদ।

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com