কতজন 'রিঙ্কি'-র আত্মহত্যায় বদলাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা?

রিঙ্কি ঘোষ নামটা কি চেনা লাগছে?ভোটে রাজনৈতিক নেতাদের দাপাদাপির চাপে রিঙ্কিরা যে হারিয়ে যাবেন তা স্বাভাবিক। একটা সূত্র ধরিয়ে দিই। মেদিনীপুর ঘাটালের ওই তরুণী পিয়ারলেস নার্সিং কলেজের বিএসসি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। এবার চিনতে পেরেছেন? যিনি অপমানে আত্মঘাতী হয়েছিলেন। ঘটনাটা ফের মনে করিয়ে দিচ্ছি। পরীক্ষার ভল ভাল হয়নি। ডাকা হয়েছিল অভিভাবককে। অভিভাবকে কলেজ কর্তৃপক্ষ অভিযোগ জানিয়েছিল, সোশ্যাল নেটওয়ার্কের চক্করেই খারাপ হয়েছে আপনার মেয়ের রেজাল্ট। এরপরেই বাবার অপমানে নিজেকে দায়ী করে আত্মঘাতী হন চব্বিশ বছরের রিঙ্কি ঘোষ। এরপরেই উঠে আসে আসল তথ্য। রিঙ্কির সহপাঠীদের অভিযোগ এর পেছনে রয়েছে পিয়ারলেস কর্তৃপক্ষের সীমাহীন অত্যাচার ও দুর্ব্যবহার।

রিঙ্কির সঙ্গে যা ঘটেছে, তা আপনার মেয়ের সঙ্গেও ঘটবে না এই গ্যারান্টি দেওয়া যায় না। শান্ত ও সহজ স্বভাবের মেয়ে রিঙ্কি। শেষের দিকে প্রায়ই বলতো, মরে যাবে ও, এই চাপ আর নেওয়া যাচ্ছে না। কিসের চাপ? বছরে দেড় লাখ টাকা খসিয়ে  পিয়ারলেস'এর মত বেসরকারি জায়গায় নার্সিং পড়তে আসা একজন পড়ুয়ার চাপ শুধু অ্যাসাইনমেন্ট, ইন্টারনাল আর সেমিস্টারের চাপ নয়। তারচেয়েও বড় চাপ   পিয়ারলেসের হাসপাতালের  নার্সের কাজ সামলানোতে। হ্যাঁ, এই পড়ুয়াদের দিয়েই নার্সদের কাজের অনেকটাই করানো হয়। ট্রেনিংএর নামে বিনা পয়সায় নার্স। এটা শুধু পিয়ারলেসেই ঘটে এমন নয়। কেপিসি ও আমরি নার্সিং কলেজের পড়ুয়াদের দিয়ে এই একরকম কাজ করান হয়।  রিঙ্কির সহপাঠীদের অভিযোগ, রাতে ১২ ঘণ্টা ডিউটি করে সকালে ১৫ মিনিট দেরি করে ক্লাসে আসার জন্য ফের ৮ ঘণ্টার ডিউটিতে পাঠানো হয় একজনকে। হস্টেলে একের পর এক পক্স'এ ভুগতে থাকা ছাত্রীদের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা,সহজে ছুটি মঞ্জুর হয় না। যেকটা দিন কামাই, সব রবিবারে ডিউটি করিয়ে উশুল করে নেওয়া হয়। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে দূর্ব্যবহার। বিনা পয়সায় নার্সের কাজ করার পরে, রিঙ্কির মতো মেয়েদের আর পড়াশোনার মতো শক্তি থাকেনা। ফলে পরীক্ষার ফলের ওপর তার প্রভাব পড়ে। আর ফল খারাপ হলে কর্তৃপক্ষ তাঁদের ওপরই দোষ চাপায়। এই জাঁতাকলে পড়ে রিঙ্কিরা আত্মঘাতী হয়। পিয়ারলেস, আমরি, কেপিসি- এই সমস্ত বেসরকারি নার্সিংহোমের একই ছবি। যে পরিমাণ বেড এরা রাখে, সেই অনুপাতে না থাকে ডাক্তার, না থাকে নার্স। সবাই জানে, ডাক্তারদের পাশাপাশি নার্সদের দিনরাত এক করে রুগির খেয়াল রাখতে হয়, চোখের পলকে ছুটে বেড়াতে হয় ওয়ার্ড থেকে ওয়ার্ডে। ইঞ্জেকশন থেকে সদ্যজাতের ডেলিভারি, সবেতেই অসম্ভব খাটনি হয় এদের। সেই কাজের জন্যও প্রয়োজনমত লোক রাখে না এই সব সংস্থাগুলি। লাখ লাখ টাকা খরচা করে পড়তে আসা এই পড়ুয়াদের দিয়ে বেআইনি ভাবে ট্রেনিং'এর নাম করে খাটানো হয় অমানবিক ভাবে। আর সামান্যতম ভুল ঘটলে? যাবতীয় রোষের শিকার এরাই। এভাবেই চলছে বেসরকারি নার্সিং কলেজগুলো।

রিঙ্কি এই সিস্টেমের শিকার। এ রকম অসংখ্য রিঙ্কি মুখ বুঝে সহ্য করছে এই অত্যাচার। বদল চাই এই শিক্ষা ব্যবস্থার যা সারাক্ষণ মুনাফা খোঁজে।

 

বেসরকারি চিকিৎসায় বেআইনি কার্যকলাপে লাগাম পড়াতে রাজ্য সরকার ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিসমেন্ট বিল 2017র পাশাপাশি হেল্থ রেগুলারিটি কমিশনও তৈরি করে। তারপরেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নিয়ন্ত্রনে আনা যায়নি। কারণ স্বাস্থ্য একটি জরুরী পরিষেবা। বেশি বাড়াবাড়ি করলে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা ভেঙে পড়তে পারে এমনই অভিমত স্বাস্থ্য দফতরের বেশ কিছু আধিকারিকের। নিয়ন্ত্রনে যে আনা যায়নি তার সাম্প্রতিক উদাহরণ পিয়ারলেস নার্সিং কলেজের কাণ্ড। পড়ুয়াদের গুরুতর অভিযোগ তাঁদের দিয়ে নার্সের কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে।  সামান্য ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটলে জুটছে তিরষ্কার ও মানসিক অত্যাচার। অথচ নার্সিং সিলেবাস অনুযায়ী পড়ুয়াদের প্রোজেক্ট সাপেক্ষে প্রাকটিক্যাল হওয়ার কথা। ফার্মাসি, ক্লিনিক্যাল ল্যাব ও ওটিতে প্রাকটিক্যাল হওয়ার কথা। নার্সিং পড়ুয়ারা যে অভিযোগ করেছেন,তার অন্যদিকটা আরও ভয়ঙ্কর। হাসপাতালে যাঁরা স্বাস্থ্য পরিষেবা নিতে এসেছেন তাঁদের ঠকানো হচ্ছে। পাস করা নার্সের পরিবর্তে পড়ুয়াদের দিয়ে কাজ করান হচ্ছে। এখন প্রশ্ন এর প্রতিকার কী? বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিং হোমগুলির বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ। রাজ্য সরকার নতুন বিল ও কমিশনের সাহায্যে তা বন্ধ করার চেষ্টা করছে। যিনি মনে করছেন ঠিকঠাক পরিষেবা পাননি বা তাঁকে ঠকানো হয়েছে তা হলে তিনি কমিশনে আবেদন জানাতে পারেন। অনেকেই এই হাঙ্গামায় যেতে চান না। আর একটা বিষয় এখানে উঠে আসছে,স্বাস্থ্য দফতর থেকে ঠিকমতো নজরদারীও করা হয় না। পাশাপাশি এইসব বেসরকারি হাসপাতালগুলি বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে নেয়। যখন সাধারণ মানুষ গর্জে ওঠে তখনই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com