চাই বহুত্বের সংস্কৃতি

   

 

 

   মধ্যযুগের ইউরোপে ধর্মবিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করত একটি কেন্দ্রীভূত প্রতিষ্ঠান, যার নাম ক্যাথলিক চার্চ এবং যার সর্বেসর্বা ছিল ভ্যাটিক্যান সিটির প্রশাসন। আধুনিকতার সূচনায় এই কেন্দ্রীভূত প্রতিষ্ঠানের সাথে আরেকটি নতুন গড়ে ওঠা কেন্দ্রীভূত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, সেই নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম আধুনিক রাষ্ট্র, জটিল সংগঠিত আমলাতন্ত্র যার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই দুই প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্বে ফলে তৈরি হয় অনেকগুলো নতুন মতাদর্শ, যেমন, লুথারবাদ, যা ক্ষয়িষ্ণু সামন্তপ্রভুদের স্বার্থরক্ষার দর্শন হয়ে ওঠে, কিংবা প্রেসবিটারিনিজম ও পিউরিটানিজম, যেগুলো উদীয়মান বণিক শ্রেণীর উত্থানকে বৈধতা দেয়, এবং আরও অনেক কিছু।  এদের মধ্যে পরবর্তীকালে সবথেকে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সেকুলারিজম (যার বাংলা করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ)।  সামন্ততন্ত্রের দুর্বলতার সুযোগে তখন রাজতন্ত্র অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।  এই নতুন ধরনের রাজতন্ত্রের প্রধান শত্রু ছিল চার্চ, তাঁর ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী। এতদিন সামন্তপ্রভুদের বাড়বাড়ন্তের যুগে চার্চ সমাজের প্রত্যেকটা বিষয়ে দাদাগিরি করত, রাজাও ছিলেন দুর্বল, তিনি চার্চের সাহায্যে সামন্তদের সামলাতেন, আর সামন্তদের সাহায্যে চার্চকে সামলাতেন।  অর্থাৎ তখন ইউরোপের রাজনীতি ছিল একটা সমবাহু ত্রিভুজের মতো, রাজা, চার্চ, আর সামন্তপ্রভুরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে নিজের আখের গোছাত।
   

   রেনেসাঁসের কিছু আগেপরে ইউরোপের সামন্ততন্ত্র ক্ষয় পেতে শুরু করে। বণিক শ্রেণি তখন সবে মাথা তুলছে, তাঁর ভিত তখনও শক্ত হয় নি।  মাঝখান থেকে রাজা তাঁর ক্ষমতাকে ক্রমশ নিরঙ্কুশ করতে চাইছেন, তাঁর প্রধান বাধা চার্চ। পোপের সাথে ঝামেলা বাঁধছে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির, তিনি নিজের দেশে যাজকদের মঠ দিচ্ছেন ভেঙে। তাঁর মেয়ে রানি এলিজাবেথ পোপের বিরুদ্ধে তৈরি করছেন অ্যাংলিকান চার্চ। ওদিকে জার্মানিতে ক্রমশ বাড়ছে প্রোটেস্ট্যান্টরা। মোট কথা, রাজা চাইছেন চার্চকে ঝেড়ে ফেলে নিরঙ্কুশ হতে, আর দরবারি চিন্তাবিদরা তাঁর জন্য নতুন নতুন দর্শন উদ্গীরণ করছেন। ইংল্যান্ডে টমাস হবস, ফ্রান্সে জাঁ বোদাঁ বলছেন রাষ্ট্রের থেকে ধর্মবিশ্বাসকে আলাদা করতে হবে। রাজা চার্চের ব্যাপারে নাক গলাবেন না, চার্চ রাজার কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করবে না। এইভাবে জন্ম নিচ্ছে নতুন মতাদর্শ - যার নাম সেকুলারিজম। তাহলে একটা ব্যাপার প্রথম থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেকুলারিজমের উদ্ভবের সাথে গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই।   এর জন্ম হয়েছিল রাজতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ করার জন্য, আরও সহজভাবে বললে, স্বৈরতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ করার জন্য। পরবর্তীকালে বুর্জোয়া রাষ্ট্রও সেকুলারিজমকে একটি প্রধান রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করে নেয়। এই স্বীকৃতির উদ্দেশ্য ছিল চার্চকে দমিয়ে রেখে পুঁজিপতি শ্রেণির রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার।
   

   আমাদের দেশের প্রেক্ষিত ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ধর্মবিশ্বাসেরই এখানে কেন্দ্রীভূত সংগঠন ছিল না।  হিন্দুধর্ম প্রথম থেকে বিকেন্দ্রীভূত, আর মধ্যযুগে ইসলামকে একাধিকবার কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করেও শাসকরা সফল হয়নি।  সুলতানি আমলে খলিফার স্বীকৃতি নেওয়া থেকে শুরু করে আকবরের মাহজারনামা ঘোষণা কোনোটাই ভারতীয় সমাজে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি, এবং সেগুলির রেশ দিল্লির রাজনীতিতেও খুব অল্পদিন স্থায়ী ছিল। এছাড়া মূলস্রোতের বাইরেও আমাদের দেশে অনেকগুলো ধর্মবিশ্বাস, যেমন বৌদ্ধ, জৈন, ইহুদি, পার্সি, তারপর প্রত্যেকটি আদিবাসী উপজাতির আলাদা আলাদা বিশ্বাস, এবং সেগুলিও খুব সমৃদ্ধ।    আমাদের দেশেও প্রাগাধুনিক যুগে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বারবার বিরোধ লেগেছে, কিন্তু দু’টি প্রতিষ্ঠানই যেহেতু ছিল অত্যন্ত অসংগঠিত, তাই সেই বিরোধ কখনও সর্বাত্মক হয়ে উঠে ভারতের সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতিকে ইউরোপের মতো নাড়িয়ে দেয়নি। তাই আমাদের দেশে যখন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠল, সরাসরি ইউরোপের সেকুলারিজমকে নেওয়া সম্ভব হল না। আমাদের দেশে সেকুলারিজমের অর্থ তাই  ‘রাষ্ট্র কর্তৃক সব ধর্মবিশ্বাসের সমান পরিপোষণ’,  ইউরোপের মতো কখনই ‘রাষ্ট্রের থেকে ধর্মের বিযুক্তিকরণ’ নয়।   
   

   গণতন্ত্র হল সেই ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র জনগণকে সবচেয়ে কম শাসন করে।  আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে, ‘secularism’-র অজুহাতে (এক হোক বা একাধিক হোক) দেওয়ানি বিধি তৈরি করে, প্রয়োগ করে, প্রয়োজনে সেই বিধি সংশোধন করে, জনগণকে নিছক ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে গণ্য করে রাষ্ট্র তার কর্তৃত্ব  ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে। এইভাবে ভারতীয় রাষ্ট্র নিজেই ইউরোপের কেন্দ্রীভূত চার্চের ভূমিকা পালন করছে, পার্থক্য একটাই, সেখানে একটি প্রতিষ্ঠান (চার্চ) একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক জীবনে হস্তক্ষেপ করত, আমাদের দেশে একটি প্রতিষ্ঠান (রাষ্ট্র) ধর্মীয় সম্প্রদায় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সামাজিক জীবনে হস্তক্ষেপ করে।  

 

   ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতাও রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করেছে, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতাও সেটা করেছে অন্যভাবে।  গণতন্ত্রের প্রসার ঘটাতে গেলে জনগণের জীবনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ক্রমশ কমানোর জন্য সক্রিয় হতে হবে আমাদের। তাই সেকুলারিজম নয়, আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে বহুত্ববাদের ওপর, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর। সেকুলারিজম রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত, আর বহুত্ববাদ সংস্কৃতির সাথে। গণতন্ত্রের ভিত্তি কখনই রাষ্ট্র হতে পারে না, কারণ, রাষ্ট্র সবসময়েই চায় নিজের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে। তাই গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে আমাদের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়াই সব  বিরুদ্ধ মতামতকেই সমান মর্যাদা দেবার অভ্যেস করতে হবে। যাতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমাদের ক্রমশ রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে।                  

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com