রজনীগন্ধা

এখনও ঝরোঝরো বৃষ্টি দিনে, সম্পদের আবেগী গলায় "ইন্দ্রানী"ডাকটি হাওয়ায় ভেসে আসে।মনের অলক্ষ্যে ইন্দ্রাণীর হৃদয়ে বেজে ওঠে---"আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল,শুধাইলো না কেহ মোরে।"
চল্লিশোর্ধ ইন্দ্রাণী, রানাঘাট মিউনিসিপালিটিতে কর্মরতা।
বিয়ের কিছুটা আগে থেকে।সম্পদের সাথে পরিচয় হয়েছিলো, চাকরী পাওয়ার পরে পরেই।বৃষ্টি মুখর শ্রাবণের কোলাহলকে অতিক্রম করে।
ভীড়ে ঠাসা ট্রেনের কামরায়।সেই শান্তিপুর লোকালে আজও ছুটতে হয় ইন্দ্রানীকে রোজই।শুধু হারিয়ে ফেলেছে সে সম্পদের নিরাপত্তার হাতের ছোঁওয়া।
ট্রেনের ভীড়ে বসেও কখন যেনো সম্পদ ও ইন্দ্রাণী, একে অপরের অন্তনীড়ে মিশে গিয়েছিলো, তা শুধু সময়ের বৃষ্টি ছাপ জেনেছিলো।
সম্পদের জীবনে চিরটাকাল সুখের উপমা হয়ে থাকার জন্য ইন্দ্রাণী সম্পদকেই স্বামীরূপে বেছে নিয়েছিলো।ভালোবাসার বিয়েতে প্রায়শঃই আবেগের টান বেশী থাকে, কিন্তু এ সবকিছু ছাপিয়েও ইন্দ্রাণী ও সম্পদের জীবনে, শ্রদ্ধা ভাবের পরিশীলিত অনুভবটি , পরম অন্তরঙ্গতার সাথে মিশে ছিলো।
ট্রেনের দুরন্ত গতিতে চলছিলো তাদের জীবনযান।

            কিন্তু ভাগ্যের বিপথরেখায় টলে পড়লো ইন্দ্রাণীর জীবনের চাকা।
বিয়ের ছ বছরের মাথায় সম্পদের মারণ ব্যাধি ধরা পড়লো।তাদের ছেলে সম্রাটের তখন বছর দুয়েক বয়েস।
ইন্দ্রাণীর সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে সম্পদ নেমে গেলো বেনামী কোনো স্টেশনে।
কাঁপা কাঁপা, দুর্বল হাতে ইন্দ্রানী ধরে রাখতে পারলো না আর সম্পদকে।
যাত্রাপথ আরো বাকি,তাই নামা হলো না ইন্দ্রানীর।প্রতিদিনের সফরে শুধু সঙ্গী হলো সাতবছরের সম্পর্কে জড়ানো, সম্পদের একবোঝা স্মৃতি।

         সম্পদ চলে যাওয়ার বছর দুয়েক পরের ঘটনা।অবিকল সম্পদের আদলে গড়া, এক ভদ্রলোকের সাথে ইন্দ্রাণীর হঠাৎই দেখা রেলের কামরায়।প্রথমে তো সে চমকেই উঠেছিলো।চমক ভাঙ্গতেই বুঝলো, কতো মানুষই তো একইরকম প্রতিচ্ছবিতে সামনে এসে দাঁড়ায়।সম্পদের চলে যাওয়াকে আরো বেশী করে মনে পড়ায়। 
তবে এই ব্যক্তি হিমাংশুবাবু যেনো সম্পদের-ই রূপান্তর।
সেই একই রকম চাপা গলা,অচেনা নারীর প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা।
চোখে চোখ পড়লে সরিয়ে নেওয়া।
একদিন সব সঙ্কোচ অতিক্রম করে ইন্দ্রাণী জিজ্ঞেস করলো হিমাংশুবাবুর জীবনের ইতিকথা।তাঁর এমন চেয়ে থাকার মানে।অবাক দৃষ্টিতে।
জানতে পারলো হিমাংশুবাবুর স্ত্রীকে
নাকি তাঁরই মতো অনেকটা দেখতে ছিলো।চলে গেছেন, প্রায় আট বছর হলো।স্মৃতির রূপরেখায় ইন্দ্রাণী হয়তো হিমাংশুবাবুর মৃতা স্ত্রীর শূন্যতাকে ভরাট করে।ক্ষণিকের মায়াবিনীর বেশে।

তারপর রোজই হালকা কথোপকথন ও নীরব দৃষ্টি বিনিময়।কেউ কোনোদিন না এলেই,অপরজনের মনে জমতো নীরব অভিমান।এ ভালোলাগায় নেই কোনোই দুর্বার আবেগ, আছে শুধু দুজোড়া স্নিগ্ধ চোখের অনুনয়।
এমনই চলছিলো বেশ।মন্থর গতিতেই
ছিলো ট্রেনের স্পীড।তাও প্রবল ঝাঁকুনিতে পড়ে গেলো ইন্দ্রাণী।
মনকেমন করা বৃষ্টি রাতে হিমাংশুবাবুর ফোন।
বললেন বেশ উদাস গলায় যে কাল থেকে আর ওই লাইনে তিনি যাতায়াত করবেন না।আজই কলকাতার ট্রান্সফার অর্ডার হাতে পেয়েছেন।

   একটিবারের জন্য ইন্দ্রাণী তাঁকে দেখা করতে বললো পরেরদিন।
ইন্দ্রাণীর বাড়ির কাছে, কল্যাণী স্টেশনে।ইন্দ্রাণীর অফিস ফেরার পথে।হ্যাঁ, একমুখ মলিন হাসি নিয়ে হিমাংশুবাবু অপেক্ষা করছিলো ইন্দ্রাণীর জন্য।একগোছা সতেজ রজনীগন্ধার সাথে।কিন্তু একী?
ইন্দ্রাণীর হাতেও তো মৌনমুখর রজনীগন্ধার তোড়া।তবে কি?
দুজনের মনের কাকতালীয় সংযোগে,আকাশে আজ বৃষ্টি আমন্ত্রিত।হয়তো বা দুজনের চোখেও।
সামনে এসে ইন্দ্রাণী যা বললো, তাতে সংযোগটা আরো গভীর বলে মনে হলো দুজনের।ইন্দ্রাণীর স্বামীর আজ ষষ্ঠতম মৃত্যুবার্ষিকী।

        হিমাংশুবাবুর দেওয়া একগোছা রজনীগন্ধা যেনো ইন্দ্রাণীর জীবনে,একই সাথে কান্না, হাসির প্রশ্ন প্রহর সাজিয়ে তুললো।জানা নেই তাঁর উত্তর কারোরই।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com