যত মারামারি হচ্ছে,বিজেপি তত বাড়ছে

 

 

রাজ্যের নানা প্রান্তে যত মারামারি হচ্ছে,সেটা যে কারণেই হোক, আর যে স্তরেই হোক, কোনোভাবে তৃণমূল তাতে অভিযুক্ত থাকলে লাভ হচ্ছে বিজেপির। তৃণমূল মারুক না মারুক, সেটার চাইতেও মানুষের কাছে শাসকবিরোধী আশ্রয় হয়ে উঠেছে বিজেপি।তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে এখন এটাই ভাবনার বিষয়।সদ্য শেষ হওয়া পঞ্চায়েত নির্বাচন এই বার্তাই দিয়ে গেছে।

 

খুন ও রক্তারক্তির অভিযোগে পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে মিডিয়া সরব হলেও আসল একটি বিষয় নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি হল  মারামারি যত বাড়ছে, বিজেপির ভোট তত বাড়ছে। ঝাড়খণ্ডি গুন্ডা ঢুকিয়ে নির্বাচনী সন্ত্রাস সৃষ্টি করার অভিযোগটি বিজেপির বিরুদ্ধে এসেছে। পুরুলিয়া ও জঙ্গলমহলে তাঁদের উত্থানে মনে হতে পারে হয়তো পালটা সন্ত্রাস সৃষ্টি করেই বিজেপির আসন বৃদ্ধি ঘটছে। ব্যাপারটি মোটেই তা নয়। ঝাড়খণ্ডি গুন্ডারা আলিপুর দুয়ার, জলপাইগুড়িতে গিয়ে মেরেধরে বিজেপির ভোট বাড়িয়েছে এটা ভাবা দুষ্কর। আসলে শাসক দলের মারের হাত থেকে বাঁচতেই মানুষ বিজেপিতে নাম লেখাচ্ছে। কারণ, সিপিএম বা কংগ্রেস তাদের কাছে বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।  

   ভোট হওয়া আসনে পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, যেখানে লড়াই বেশি ছিল, সেখানে তৃণমূলের কাছে বেশি ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। কিন্তু, তৃণমূল ধাক্কা খেয়েছে নির্দলের কাছে। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল যেখানে ২১১১০টি আসনে জিতেছে, সেখানে বিজেপি জিতেছে ৫৭৪৭টি আসনে, নির্দল ১৮৩০টি আসনে জিতেছে, আর সিপিএম আর কংগ্রেস যথাক্রমে জিতেছে ১৪৭৭টি এবং ১০৬২টি আসনে। শতাংশের বিচারে সিপিএম কংগ্রেসের থেকে অনেক বেশি ভোট পেয়েছে। কিন্তু, আসন পেয়েছে কম। এক্ষেত্রেও ভোট কাটাকাটি করে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে নির্দল প্রার্থীরা। 

 

   এবারের নির্বাচনে এই দু’টি বৈশিষ্ট্যই নজর কেড়েছে। এক, সিপিএম বা কংগ্রেসকে পিছনে ফেলে তৃণমূলের বিরোধী হিসেবে বিজেপির উঠে আসা। দুই, শাসক দলের প্রতি নির্দলদের চ্যালেঞ্জ। সেটা এতটাই যে বহু জায়গায় নির্দলদের হাতে মার খেতে হয়েছে এমনকি খুনও হতে হয়েছে ‘অফিসিয়াল’ তৃণমূল সমর্থকদের। এথেকেই পরিষ্কার, এই ‘নির্দল’রা সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। কোনো সিপিএম কংগ্রেস বিজেপির ছত্রছায়ায় এরা নেই। তাদের সমর্থনপুষ্ট নির্দলের সংখ্যা খুবই কম। মালদা মুর্শিদাবাদের মতো কয়েকটি জেলা ছাড়া এই ধরনের নির্দল দেখা যায়নি। বরং সেই নির্দলদের দেখা গেছে যাদের নাম প্রাথমিকভাবে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাদ গেছে। দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বই এর কারণ। এই কথা স্বীকার করেছেন তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। 

 

   গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তৃণমূলের মধ্যে এতটাই তীব্র হয়েছে যে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত প্রার্থীও হেরে গেছেন পঞ্চায়েত নির্বাচনে।  তিনি সুমনা বিশ্বাস, চাপড়ার মহেশপুর পঞ্চায়েতের বিদায়ী প্রধান। ঘোষিত প্রার্থী ঝর্নাকে বদলিয়ে সুমনাকে প্রতীক দিয়েছিলেন দিদি। প্রতিবাদে পালটা মনোনয়ন পেশ করে ঝর্না বিশ্বাস। ভোটের শেষে দেখা গেল সুমনা পেয়েছে ২৯১টি ভোট, ঝর্না পেয়েছে ৪৫১টি। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, এই নির্দল কারা, এবং জেলায় জেলায় সর্বত্র এভাবেই তারা বেগ দিয়েছে তৃণমূলকে। মনোনয়ন পর্বে  অন্তর্দ্বন্দ্ব ঠেকাতে যুযুধান গোষ্টীগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগি সঠিকভাবে করতে পারেনি নেতারা। তাই শাসকেরই বিক্ষুব্ধ অংশ নির্দল হয়ে শাসকেরই ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। ভোটের পর এই বিরোধীদের দলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তা নিয়েও চলছে তর্জা। আগামী লোকসভা ভোটে এই বিক্ষুব্ধ ‘নির্দল’দের দলে না ফেরাতে পারলে বিজেপি যে আরও জায়গা পেয়ে যাবে সেটাও পরিষ্কার। 

 

   জেলা পরিষদে একটিও আসন না পেলেও গ্রাম পঞ্চায়েতে বিরোধীহীন রাজনৈতিক পরিবেশে বিজেপি ‘একা কুম্ভ’ হয়ে উঠছে মানুষের কাছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, গ্রাম পঞ্চায়েতে বিজেপির আসন বেড়েছে প্রায় দশগুণ। ২০১৩ সালে গ্রাম পঞ্চায়েতে ৫৮৪টি আসনে জয়লাভ করেছিল বিজেপি। ২০১৮তে তারা পেয়েছেন ৫৭৪৭টি আসন। বিজেপির এই উত্থানের পিছনে মানুষের ক্ষোভই সবচেয়ে বড় কারণ। আদিবাসী অঞ্চলে তাঁর প্রতিধ্বনি শোনা গেছে বেশি। জঙ্গলমহলের দুই জেলা পরিষদ পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রামে বিদায়ী সভাপতিরা হেরে গিয়েছেন বিজেপি প্রার্থীর কাছে। ‘রাস্তায় দাঁড়িয়ে উন্নয়ন’ যে জঙ্গলমহলে ফাঁকা আওয়াজ ছিল, তা এথেকেই প্রমাণিত। 

 

   সবচেয়ে বড় সত্য এই নির্বাচন যেটা দেখিয়ে দিয়ে গেল, সেটা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে যথেষ্টই ভাববার মতো। মুসলমানরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে দলে দলে। মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলিতে ভোট বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। গণনার সময়  সম্পূর্ণ বিরোধী দলের প্রার্থীহীন অবস্থায় ভোট হয়েছে, গণনাও হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল মীনাখাঁয়। সেখানে পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদে এক হাজার সাতটি ভোটের মধ্যে। ৬৫০-এর কাছাকাছি ভোট পেয়েছে তৃণমূল, ৩৫০ বিজেপি এবং মাত্র ১৬ থেকে ৪৬-এর মধ্যে দু’টি স্তরে ভোট পেয়েছে সিপিএম। হাজার হাজার আসনের মধ্যে কোনো একটি আসনের তথ্যে কিছুই প্রমাণিত হয় না। তবুও এই তথ্য তুলে ধরা হল একটি বিরাট সত্যকে সামনে আনার জন্য। কারণ, এটি ব্যতিক্রম নয়। আগামী রাজনৈতিক আবহাওয়া বুঝতে গুরুত্ব দাবি করে। 

 

    ফাঁকতালে এই ভোটবৃদ্ধিকেই বিজেপি তাদের শক্তিবৃদ্ধি হিসেবে দেখাতে চাইছে পশ্চিমবাংলায়। তৃণমূলের মুখে শুধু উন্নয়নের স্লোগান ছিল, বিজেপি পক্ষ থেকে কোনো বিকল্প কর্মসূচি তুলে ধরা হয়নি। তৃণমূলের বিরুদ্ধে কেন বিজেপি বাংলায় প্রয়োজন, মানুষকে সেকথা বলতে পারেনি তাদের নেতৃবৃন্দ। তাই পঞ্চায়েত নির্বাচনের এই ফলাফলে প্রকৃতই বিজেপির শক্তি কতটা বৃদ্ধি হল, এটা বলা যাবে না। কারণ, পঞ্চায়েতের স্থানীয় পরিস্থিতিতে যে ইস্যুগুলি নির্বাচনে নির্ধারক হয়ে ওঠে, তার সবটাই নিচু তলার লড়াইকে কেন্দ্র করে। সেখানে লড়াইটা জীবন-জীবিকার টিকে থাকার লড়াই। কোনো রাজনৈতিক ইস্যুভিত্তিক ভোট নয়। লোকসভা ভোট হয় রাজনৈতিক হিসেবে। সেদিক থেকে জেলা পরিষদে প্রাপ্ত ভোটের চিত্র কিছুটা ইঙ্গিতবাহী। জেলা পরিষদে বিজেপি জিতেছে মাত্র ২৩টি আসনে যেখানে তৃণমূল ৫৪৪টি। একটি দু’টি আসন জিতে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন প্রায়। রাজনৈতিকভাবে এই তথ্যই প্রমাণ করে, বাংলা এখনও সবুজ আবিরে মাখা। 
     

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com