নজরুলের ‘লাল ফৌজ’ কি করে হল মুক্তিসেবক দল?

কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশের নবগঠিত ৪৯ নং বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগ দেন। তখন তিনি বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার রানিগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। রোল নং ১।  সামনে মেট্রিকুলেশান পরীক্ষা। অনেকের আশা, পরীক্ষা দিয়ে নজরুল জলপানি পাবে। কিন্তু সকলকে বিস্মিত আর হতাশ করে নজরুল দেশপ্রেমের টানে চলে গেলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে। পরে বোধহয় সেকারণেই লিখেছিলেন--

 

“সবাই যখন বুদ্ধি যোগায়, আমরা করি ভুল
আর সাবধানীরা বাঁধ ভাঙে সব, আমরা ভাঙি কূল।”

 

   নজরুলের প্রিয় বন্ধু মুজফফর আহমদ লিখেছেন ‘বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যে-বাঙ্গালি যুবকেরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের সকলের মনে কি ছিল তা জানিনে, তবে বহু সংখ্যক লোক ভেবেছিলেন যে এটা একটা দেশপ্রেমিক কাজ। নজরুল ইসলামও এই বহুসংখ্যকের একজন ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন যে যুদ্ধে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু বাঁচলে তাঁরা যুদ্ধবিদ্যা ও নতুন নতুন অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার (অবশ্য আর্টিলারির ব্যবহার ভারতীয়দের শেখানো হতো না) আয়ত্ত করেই বাঁচবেন। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এর প্রয়োজনের কথা কে অস্বীকার করতে পারে?’... ফৌজ হতে তরুণ সৈনিকেরা প্রায়ই উদ্দাম স্বভাব নিয়ে ফিরে আসে, কিন্তু নজরুল ইসলাম ফিরেছিল দেশপ্রেমে ভরপুর হয়ে।’ এই রেজিমেন্টটি ১৯২০ সালের মার্চে ভেঙ্গে দেওয়ার আগ পর্যন্ত সৈনিক জীবনের পুরোটাই নজরুল কাটিয়েছেন পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে।

 

   ফৌজ থাকাকালেই নজরুলের দু’টি গল্প ত্রৈমাসিক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য’ পত্রিকায় ছাপা হয়। কার্তিক, ১৩২৫ (নভেম্বর,১৯১৯) সংখ্যায় ছাপা হয় ‘হেনা’ এবং মাঘ, ১৩২৬-তে (জানুয়ারি ১৯২০) ‘ব্যাথার দান’। দু’টিই লিখেছিলেন ‘হাবিলদার’ নজরুল। ব্যাথার দান-এর দুটি চরিত্র ‘দারা ও সয়ফুল মুল্ক’ বেলুচিস্তান হতে আফগানিস্তান পার হয়ে তুর্কিস্তান কিংবা ককেসাসে গিয়ে লালফৌজে যোগ দিয়েছিলেন এবং বিপ্লব-বিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। দুটি গল্পই প্রেমের হলেও হেনা ও ব্যাথার দান-এ অদ্ভূত দেশপ্রেমও জাগিয়েছেন নজরুল। রয়েছে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের ছাপ। তবে ব্যাথার দান-এই তার বেশি প্রভাব। 

 

   বস্তুত, ১৯১৫-এ প্রবাসে প্রথম স্বাধীন ভারত সরকার ‘হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ’-এর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা পরে রাশিয়ায় গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। কেউ কেউ লাল ফৌজেও প্রশিক্ষণ নেন। নজরুল তাঁর লেখাতে ‘লাল ফৌজ’ শব্দটি রাখলেও মুজফফর আহমদ সেটি বদলে দেন। তার স্বীকারোক্তি নিজেই করেছেন, ’ভারতের ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট লালের আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে চারদিক হতে আটঘাট বেঁধে ফেলেছিল যেন অক্টোবর বিপ্লবের কোনো হাওয়াই এদেশে প্রবেশ করতে না পারে। ঠিক এমন সময় একজন ভারতীয় সৈনিকের লেখা গল্পের নায়কেরা যদি লালফৌজে যোগ দেয় তা হলে তার সৈনিক-শৃঙ্খলার দিক হতেও খুব ভালো হতো না। তাই আমি নজরুলকে জিজ্ঞেস না করেই তার লালফৌজ কথা কেটে দিয়েছিলাম। তার জায়গায় মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল লিখে দিয়েছিলাম।’

ভাবা দরকার, এখন ‘ব্যাথার দান’ ছাপার সময়ে ‘মুক্তিসেবক’ শব্দটি বদলে ‘লাল ফৌজ’ করা যায় কি না।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com