নজরুল: যুগের সৃষ্টি এবং স্রষ্টা

 

কবি নজরুল যুগমানসের সৃষ্টি এবং একই সঙ্গে স্রষ্টা। যুগের প্রয়োজনে তাঁর সৃষ্টিপ্রতিভা উদ্দীপ্ত
হয়েছিল। কুড়ি শতকের উত্তাল যুগকে তিনি ধারণ করেছিলেন বিশাল সৃষ্টিসম্ভারে। নজরুল চরিত্রের
সার্বজনীনতা তাঁর সৃষ্টিকে সর্বজনীন করেছিল বলেই দেশাত্মবোধ, তারুণ্যের জয়সঙ্গীত, উদ্দাম
যৌবনের উচ্ছলতা, পরাধীন ভারতের গ্লানি, বিপ্লবীদের বিদ্রোহ, মুসলিম সমাজের মূঢ়তা, কুসংস্কার,
হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্লীবত্ব, আত্মবিস্মৃতি, সভ্যতার অগ্রযাত্রায় কুলিমজুর, কৃষাণ, জেলের ভূমিকা,
সমসাময়িক সমাজ, রাজনীতি এবং ঐতিহাসিক বৃত্তান্তের খুটিনাটি বিষয় সবিস্তারে উঠে এসেছিল তাঁর
রচনায়। বিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষে কবিতার ছন্দ বৈচিত্রে, আবেগের উদ্দাম প্রবাহে যুগ নির্মাতার যে
বিদ্রোহ তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তাতে যুগের আকাঙ্ক্ষাকেই ভাষা দিয়েছিলেন নজরুল।
ঊনিশ শতকের নবজাগরণ তাঁকে নাড়া দিয়েছিল গভীর আন্তরিকতায়। জীবনকে তাই আবিষ্কার
করেছিলেন অপ্রতিহত পৌরুষ আর উদ্দাম হৃদয়াবেগের মধ্যে। তাঁর আবির্ভাবের আগেই ফরাসী
বিপ্লবের সাফল্য জাতীয়তাবাদের জয়জয়কার ছড়িয়েছিল। ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে শ্রমশক্তির আত্মচেতনা
রুশবিপ্লব ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা এনেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক
ও সামাজিক সংকট বিশ্বসংকট হয়ে দেখা দেয়েছিল, তার ভয়াল ছায়া ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতবর্ষ
জুড়েও। সর্বনাশের গ্রন্থি মোচনে বহ্নিদীপ্ত আবেগে দিয়ে নতুন যুগের যুবসমাজকে তাই ডাক
দিয়েছিলেন কবি -‘বন্ধু গো তোল শির / তোমারে দিয়াছি বৈজয়ন্তী / বিংশ শতাব্দীর’। এই নতুন
যুগের চেতনায় ধর্মে-ধর্মে, নারী-পুরুষে, জাতিতে-জাতিতে ভেদাভেদ নেই। আদিঅন্তহীন চেতনাবোধে
মানবিকতার মুক্তিসাধনাই এই যুগের ধর্ম। শাস্ত্রবর্ণিত পাপপুণ্যের পরোয়া সে তাই করে না। জরা,
জড়ত্ব, হীনতা, ক্লীবত্ব থেকে মুক্ত হয়ে এগিয়ে চলাই তার একমাত্র লক্ষ্য। কবির তাই ব্যাকুল আহ্বান
- ‘জাগো দুর্মদ যৌবন/ এসো তুফান যেমন আসে,/ সমুখে যা পাবে দলে চলে যাবে অকারণ
উল্লাসে’।
নজরুলের ওপরে যে যুগমানসের প্রভাব পড়েছিল, সেটা সরাসরি পাশ্চাত্য জগতের আধুনিক লেখক
সম্প্রদায়ের প্রভাব নয়। পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে সেভাবে তাঁর আন্তরিক যোগাযোগ ছিল না। যেমন
ঊনিশ, কুড়ি শতকের ইংরেজিশিক্ষিত অনেক যুবকের ছিল। যাঁরা বাংলা সাহিত্য, শিল্প এবং
সমাজসংস্কৃতিতে জোয়ার তুলেছিলেন নব্য আধুনিকতার স্বভাবজাত প্রাণশক্তির উদ্দামে। কিন্তু এটাও
ঠিক, নজরুলের প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছিল যুগধর্মের অনিবার্য প্রেরণাতেই। বিংশ শতাব্দীর যুগমানস
তাঁকে সৃষ্টি করেছিল। এই শতাব্দীর বাংলার ভেতর-বাইরের রূপ তাই যথাযথ বিধৃত হয়েছিল কবির
কবিতায়, গানে ও সাহিত্যে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর বাংলার সমস্যা-সংকট, জনসমাজের আশা -
আকাঙ্ক্ষা, বেদনা-নৈরাশ্যের যথাযোগ্য চিন্তাধারা অনুস্যুত হয়েছিল তাঁর রচনায়। নজরুল তাই
বাংলাসাহিত্যে কুড়ি শতকের চারণকবি। সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব হঠাৎ ঘটলেও যুগপ্রভাবে তাঁর
প্রতিভার বিকাশ একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না।
যে ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা, ঐতিহাসিক পরিভাষায় তাকে
বলা চলে যুদ্ধপূর্ব ও যুদ্ধোত্তর যুগের বৈপ্লবিক পরিবেশ। তিনি ব্রিটিশশাসিত পরাধীন ভারতে এমন

সময়ে জন্মেছিলেন যখন বাংলায় স্বরাজ ও স্বদেশী আন্দোলন গান্ধীজির অভূতপূর্ব আহ্বানে বিশাল
গণবিপ্লবে পরিণত। উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে শ্রমিক শ্রেনীবাদ, আমজনতার স্বাধীনতালাভের
আকাঙ্ক্ষা রাজশক্তির সঙ্গে অনিবার্য সংঘর্ষে জড়িত। গণআন্দোলন তখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক
এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরী করেছে। ভারতের মুক্তিসংগ্রাম বিপ্লববাদের মাধ্যমে তুমুল
আলোড়ন তুলেছে। সূর্য সেন, যতীন দাস, ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকীসহ অনেক আত্মত্যাগী যুবকদের
দুঃসাহসিক কার্যকলাপে অনুপ্রাণিত নজরুল সমর্থন করতে শুরু করেছেন সহিংস বিপ্লবেকে। বিপ্লবের
মাহাত্ম্য উপলব্ধি করছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সাগ্নিক বীর মহান ঋত্বিক বারীন্দ্রকুমার ঘোষের সংস্পর্শে
এসে।
কুড়ি শতকের গোড়ায় বাঙালী শিক্ষিত সমাজের মনে স্বাদেশিকতা এবং জাতীয়তাবোধের জাগরণ
এসেছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অবদান থেকে। এই পরিবারের সঙ্গে নজরুলেরও নিবিড়
সৌহার্দ্য স্থাপিত হয়েছিল। একইভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন সর্বহারা মজুরদের মুক্তিসংগ্রামের নেতা,
কমরেড মুজাফফ্র আহমেদের সাহচর্যে এসে। কবির অন্তর তখন প্রমত্ত হচ্ছিলো ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরের
মতো। জগতের অন্যায়, অসত্য, হীনতা, অত্যাচার, শোষণ, পীড়নসহ সবরকম অমানবিক আচরণের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হতেই জীবনের প্রকৃত সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন নজরুল - ‘আমি
উন্মাদ, আমি উন্মাদ!/ আমি চিনেছি আমারে,/ আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ।
নজরুলের রচনায় নতুন যুগের যে প্রাণময়তা অভিনন্দিত হয়েছে বারবার, তার উৎসরণ হয়েছিল
‘কালি-কলম, প্রগতি এবং কল্লোল’পত্রিকাকে অবলম্বন করে। বিশেষত কল্লোলকে কেন্দ্র করে শুরু
হয়েছিল নতুন জীবনলাভের সাধনা। কেবল ভাবের দিক থেকে নয়, ভাষার প্রয়োগ এবং রচনাশৈলীর
বৈচিত্রেও। বিংশ শতাব্দীর জাতীয় আন্দোলনের যুগে প্রখরদীপ্ত রবীন্দ্রপ্রতিভা থাকা সত্ত্বেও সাহিত্য
সংস্কৃতির আকাশে এক ঝাঁক উজ্জ্বল নক্ষত্রের উদয় হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সাহিত্যের আঙ্গিক ও
ভাবিক উভয় ক্ষেত্রেই যাঁর প্রভাব নজরুলের ওপরে অতিমাত্রায় পড়েছিল, তিনি ছন্দের যাদুকর
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত(১৮৮২-১৯২২)। প্রচুর ঘরোয়া শব্দের সঙ্গে আরবী ফারসী শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে
তিনিই প্রথম ভারতবর্ষে বাংলা কবিতায় সার্থক বিদ্রোহের আবেগ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নজরুলের সাহিত্যে যে বিদ্রোহ, সাম্যের আকুলতা, শ্রমিকশক্তির বন্দনা, ইসলামের অতীত গৌরব,
প্রাচীন ভারতের উদ্দীপ্ত ঐতিহ্য, সেগুলো সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের রচনাতেই প্রথম বিষয়বস্তু হয়েছিল।
শ্রমিক ধর্মঘটের ওপরেও তিনিই প্রথম কবিতা শুনিয়েছিলেন। মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-
১৯৫২), যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের (১৮৮৭-১৯৫৪)মানসিক ভাবধারা এবং প্রকাশরীতির সঙ্গেও
নজরুলের অন্তরঙ্গতা অনেক বেশী প্রত্যক্ষ। এঁরা প্রত্যেকেই রবীন্দ্রপ্রতিভার সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে মুক্ত
হয়ে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল হয়েছিলেন।
তবে নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথের সার্থক উত্তরসুরী হলেও রোমান্টিকতা তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সে জন্যই
সমাজের উৎপীড়িত, অত্যাচারিত মানুষের যন্ত্রনায় আকুল কবি বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় সর্বব্যাপী
বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েও অনন্যসাধারণ হৃদয়াবেগের বন্যায় বলে উঠেছেন- ‘আমি গোপন প্রিয়ার
চকিত চাহনি/ ছল করে দেখা অনুখন/ আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা/ তার কাঁকন চুড়ির
কনকন্’!
হৃদয়াবেগের এই উচ্চকিত রোমান্টিকতাই রবীন্দ্রনাথের দিকে তীব্র আকর্ষণে টেনেছিল তাঁকে।
নজরুলের রচনায় অনন্যসাধারণ পৌরুষের অহমিকা, যৌবনের জয়ধ্বনি, নবীনের প্রতি আকর্ষণ,

জনজীবনের আশা আকাঙ্ক্ষাকে প্রাণময়তায় রূপায়ণ, এসবের মূলে রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’
কবিতাগুচ্ছের ছায়াপাত অনস্বীকার্য। যে যুগের মধ্যে তাঁর কবি প্রতিভা উদিত এবং অস্তমিত সে
যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, গীতিকার, সুরকার রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র কাব্যসাহিত্যের সূক্ষ্ম দার্শনিকতা এবং
অধরা অরূপের লীলারহস্যের আকাশবিহার নজরুলের রচনায় উপস্থিত নেই। কিন্তু কবিগুরুর
উদ্বোধিত মানবচিত্তের ঘোষণা, মানবিক প্রেম, প্রকৃতিপ্রণয়, বিশেষত স্বদেশপ্রেমের পরিশুদ্ধ আকুতি
প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল নজরুলের সৃষ্টি প্রতিভাকে। ঊনিশ শতকের ইউরোপীয় নবজাগরণের
যে অপূর্ব উচ্ছ্বাস অপরূপ গতিবেগে, অমিত শক্তিতে, মধুর ভঙ্গিমায় আছড়ে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের
‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থের পাতায়, তার ঢেউ সর্ববাধামুক্ত যৌবনের গতিতে বিশ্বাসী নজরুলের অনুভূতিতে
জোয়ার তুলেছিল। নজরুলের রচনায় তাই জরাজীর্ণ বার্ধক্যের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। নতুন যুগের
স্রষ্টা হিসেবে তিনি বারবার আহ্বান জানিয়েছেন উদ্দাত্ত যৌবনকেই - ‘আমি গাই তারই গান/ দৃপ্ত
দম্ভে যে যৌবন আজ ধরি অসি-খরসান/ হইলো বাহির অসম্ভবের অভিযানে দিকে দিকে’।
প্রথম মহাযুদ্ধের পরে বাংলায় যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং
সশস্ত্র বিপ্লবের চিত্র নজরুলের কবিতায় বিধৃত হয়েছে, কবির গদ্যসাহিত্যের প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তুতেও
সেটা লক্ষ্যণীয়ভাবে ধরা পড়ে। কবির ছোট গল্প, নাটক, উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধের বেশিরভাগ
ক্ষেত্রেই তৎকালীন ভারতের অস্থির চিত্র প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় অনুস্যুত হয়েছে। দু চারটি উদাহরণ
দিলেই স্পষ্ট হবে। ‘মৃত্যুক্ষুধা’এবং ‘কুহেলিকা’উপন্যাসের নায়ক আনসার এবং জাহাঙ্গীর। এদের
একজন খিলাফৎ ও অসহযোগ আন্দোলনের ফসল। অপরজন সশস্ত্র বিপ্লবের প্রতিনিধি। মৃত্যুক্ষুধা
উপন্যাসের নায়ক আনসার প্রথম জীবনে ছিল কংগ্রেসপন্থী। ভেবেছিল বিদেশী জিনিষ পরিহার করে
চরকায় সুতো কেটে খিলাফৎ আর গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে গেলেই দেশের মুক্তি
ঘটবে। পরে জেল থেকে ফিরে এসে সে উপলব্ধি করে, ঐক্যবদ্ধ সংহতিতে কুলিমজুর, মেথর,
ঘোড়ার গাড়ীর কোচোয়ান, রাজমিস্ত্রী আর গরুর গাড়ীর গাড়োয়ানরাই হয়ে উঠতে পারে পরাধীন
ভারতের মূল শক্তি। আনসার তাই স্বাধীনতালাভের জন্য শ্রমিকসঙ্ঘ গড়ে তুলতে তৎপর হয়।
কুহেলিকা উপন্যাসের নায়ক জাহাঙ্গীরও সশস্ত্র বিপ্লবী। এসব উপন্যাসের চরিত্রগুলোতে নজরুলের
ব্যক্তিমানসের দৃষ্টিভঙ্গী ও ব্যক্তিজীবনের ঘটনাবলীই স্পষ্টত আলোকপাত করেছে।
নজরুলের বেশীরভাগ ছোট গল্পে কাহিনীরস হৃদয়াবেগের উচ্ছ্বাসে জমাট বাঁধতে পারেনি। তাই
আখ্যানভাগের সচলতা বেশীরভাগ গল্পে অনুপস্থিত। তবে তাঁর কাব্যধর্মী ভাষার মাধুরী গল্পে বেশ
মাদকতা এনেছে। নাটক রচনার ক্ষেত্রেও প্রায়ই একই কথা বলা চলে। বাস্তবজীবনের যে গতিশীল
ঘাত প্রতিঘাত সাধারণত নাট্যচরিত্রগুলোকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তার অভাব নাটকের
রসনিষ্পত্তিতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বারবার। তবে ‘রুদ্রমঙ্গল’এবং ‘দুর্দিনের যাত্রী”প্রবন্ধগ্রন্থে নজরুল তাঁর
স্বাভাবিক ভাবাবেগের প্রাবল্য সত্ত্বেও গণবিপ্লবের ক্ষেত্রে অগ্নিগর্ভ উদ্দীপনা জাগিয়েছেন।
সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে তাঁর সংগীত অসাধারণ। পরিপূর্ণ রসসঞ্চারে নতুন সুরের মাধুর্য মূর্চ্ছনায়
মনোমুগ্ধকর। যে দুর্বার ভাবাবেগের অসংযম তাঁর গদ্যের মতো কবিতার ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝে নিটোল
সাহিত্যসৃষ্টিতে প্রতিবন্ধক হয়েছে, সংগীতের ক্ষেত্রে সে আবেগ সংহত। ভক্তিমূলক গীতি, প্রকৃতিগীত
এবং মানব প্রেমগীতির মতো স্বদেশমূলক গানগুলোতেও কবির সৃষ্টিপ্রতিভা অনেক বেশি বিকশিত।
তাঁর সংগীতের বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে দেশাত্মবোধক গান। বাংলার জাতীয়তাবাদী মুক্তিসংগ্রামে

এই গান জীবনের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে, যুগের আশা আকাঙ্ক্ষায়, রোজকার আনন্দবেদনার অনুভবে
চিরভাস্বর।
পরিশেষে বলা চলে, কুড়ি শতকের যুদ্ধ পরবর্তী সংকট, হিন্দু মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা, কৃষক
শ্রমিকসহ সমাজের নিম্নবিত্ত জীবনের ভাঙনের দৃশ্য এবং ঊনিশ শতকের জাতীয়তাবাদ ও পরাধীন
ভারতে রাজশক্তির বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের প্রতিচ্ছবি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সাহিত্য থেকে সংগীত
পর্যন্ত নজরুল ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নিপুণভাবে। এক্ষত্রে তাঁর সফলতার মূলে ছিল গভীর ও ঘনিষ্ঠ
মানবতাবাদ। সেই কারণেই সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের বিদ্রোহের সুর এবং তাত্ত্বিক সাম্যবাদ সহজ ভাষায়
হৃদয়াবেগের উচ্ছ্বাসে জাতির মর্মমূলে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন নজরুল। ব্যক্তিগত দুঃখ যন্ত্রনায়,
সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলমেশায় এবং প্রথম মহাযুদ্ধে যোগদানের মাধ্যমে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা
সঞ্চিত হয়েছিল, তাকে সাহিত্যের মাধ্যমে আবেগপ্রবণ বাঙালীর অন্তরে সফলভাবে নজরুলই সঞ্চারিত
করেছিলেন। বাঙালীর মনকে যুগধর্মের চেতনা দিয়ে ছুঁয়ে ফেলে সমসাময়িককালের সবচেয়ে বেশি
লোককান্ত কবি হয়েছিলেন তিনি। নিজের আবেগ দিয়েই আবেগপ্রবণ বাঙালীকে তিনি ছুঁয়েছিলেন।
নজরুল তাই শুধু যুগমানসের সৃষ্টি নন, চারণকবি হিসেবে একটি যুগেরও স্রষ্টা।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com