সাহিত্যের রাজনীতি: এসো না গল্প লিখি

   রাজনৈতিক সাহিত্য নিয়ে সাধারণভাবে একটা নাক সিঁটকানোর ভাব অধিকাংশ পাঠক, এমনকি সাহিত্যকারদের মধ্যেও রয়েছে। সাহিত্যের মধ্যে যদি রাজনৈতিক গন্ধ চলে আসে, তাহলে আর সেটা সাহিত্য থাকে না বলেই অনেকেই মনে করেন। ঠিক যেমন বহু মানুষ রাজনীতির ব্যাপারে আলোচনা করা পছন্দ করেন না। এবং এই বিষয়ে তাদের প্রধান যুক্তি, বিষয়টা আদ্যন্ত নোংরা। এই বিষয়ে সাহিত্য তো পরের কথা, আলোচনা করতেও ঘেন্না লাগে।

 

    ঠিক, একদম ঠিক। কিন্তু এই যুক্তির প্রকোপে যে আপনার-আমার সামনে আলোচনার কোনও প্রসঙ্গই পড়ে থাকবে না। ধর্ম নিয়ে আলোচনা করবেন? আশারাম বাপু থেকে শুরু করে বাবা রাম রহিম সেই জায়গাটাতেও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে রেখেছে। আবার এমন নয়, অতীতেও এমন দুর্গন্ধ ছিল না। তাহলে? তাহলে নিশ্চয়ই এই বিষয়েও আলোচনা করবেন না? জানি, আপনি লাফিয়ে উঠে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ বা কবিরের নাম টেনে এনে বলবেন, সবাই এমন নয়। ঠিক, একদম ঠিক। তাহলে রাজনীতির মধ্যেও যে ভালো দিক থাকতে পারে না, এটা কী করে বোঝা হয়ে গেল?

 

      কেউ হয়তো বলবেন, রাজনীতি আর ধর্ম, দুটোই নোংরা। আমি তাই প্রেম নিয়েই ভাবি, প্রেমের সাহিত্যই পড়ি। বেশ, বেশ। আচ্ছা, প্রেম মানে তো একটি নর আর একটি নারীর পরস্পরের হাতে সর্বস্ব তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার, তাই না? তার স্থায়িত্ব কি সারা জীবনের? আপনি তো বলবেন, হ্যাঁ, তাই। কিন্তু মুশকিল হলো এই নেটের যুগে প্রেম বস্তুটার স্থায়িত্ব গড়ে সাড়ে তিন মাস। তারপরেই ব্রেক আপ এবং দুটি নতুন পেয়ারের (ইংরেজি ও হিন্দি- দুটোতেই) জন্ম। পাশে আছে আবার পরকীয়ার বিস্ফোরণ। প্রেম আজকাল প্রায়শই হয়ে উঠেছে দেহতত্ত্বের প্রকাশ্য ও বারোয়ারি সাধনা। সেটি নোংরামি নয়? তাহলে?

 

    জানি, আপনি বলবেন, মহৎ প্রেম এমন নয়। সেখানে চোখের জলে হারিয়ে যাওয়া আছে, নিজেকে পুড়িয়ে শেষ করে দেওয়া আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। যেমন রাধাকৃষ্ণ। মুশকিল, মুশকিল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পড়েছেন? বড়ু চণ্ডীদাসের? তাহলেই দেখতেন রাধাকৃষ্ণের সেই অপার্থিব লীলায় কেমন মাংসল গন্ধ। ঠিক আছে, আপাতত মেনেই নিলাম। তা প্রেমের এত নোংরামির মধ্যেও যদি সাচ্চা প্রেম থাকে, যা আপনাকে আকর্ষণ করে, তাহলে কি রাজনীতির মধ্যেও এমন সাচ্চা কিছু জিনিষ নেই ? আপনি নিশ্চিত? 

 

   একটা কথা বলুন তো, চান বা না চান, রাজনীতির ছোঁয়া বাঁচিয়ে আপনি থাকতে পারেন তো? কোনও ভাবে? ভেবে উত্তর দিন। আপনি কি ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে ছেলেমেয়েকে প্রাইভেট কলেজে পড়িয়েছেন? নাকি সেটাও পারেননি? আপনার সংসার কি মাসিক সুদে চলে? এখন সেখানেও ঘাটা আসছে? আপনার জামাই মাঝেমধ্যে বলছে নাকি, কোম্পানি লোক কমাবে? আপনি কি বেকার? আপনার সর্বস্ব কি চিট ফান্ডে গেছে? এগুলোর একটার পিছনের কারণও কি অরাজনৈতিক? সবই তো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ফসল? তাহলে আপনি রাজনীতির বাইরে কিভাবে থাকতে পারেন?

 

   হ্যাঁ, আপনি বলতে পারেন, এটা বাধ্যবাধকতা। আর সমস্ত জাগতিক বাধ্যতা নিয়ে আলোচনা করতে নেই। সকালে পেট পরিষ্কার হয়েছে কিনা, সেই নিয়ে কি সেমিনার বা কবিতা হয়? ঠিক, একদম ঠিক। আমি-আপনি যখন ভাগাড়ের মাংস হজম করেছি অবলীলায়, তখন এই নিয়ে প্রশ্ন তোলার হিম্মত আছে কার? নেই, একদম নেই। কিন্তু আপনার এই নিতান্ত শারীরিক সমস্যা যখন একটু বাড়তি আকার নেয়, তখন এই আপনিই আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাইকে জ্বালিয়ে মারেন আপনার সমস্যা নিয়ে। অর্থাৎ পরিপ্রেক্ষিত। যেহেতু সমস্যাটা নিছকই আপনার একার, তাই সেটা হয়ে গেল আপনার কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েস স্যার, এটা একটা রাজনীতি। এই রাজনীতিটা আমাদের রক্তের মধ্যে আছে বলেই আমরা সদর্পে বলতে পারি রাজনীতি আমি ঘেন্না করি।

 

   কী বলছেন? এই কচকচি আপনার ভালো লাগছে না। বেশ, আসুন তাহলে একটা প্রেমের উপন্যাসের প্লট ভাবি। ছেলেটি আর মেয়েটি সহপাঠী। তবে একজন হিন্দু, অপরজন মুসলিম। ও দাদা, পারবেন, গেরুয়া আর চাঁদতারার সংক্রমণ বাঁচিয়ে এই প্রেমকে শুধু নিজেদের নাকের জল – চোখের জলে টিঁকিয়ে রাখতে? কী বলছেন? এই প্লটে তো রাজনীতি আসবেই। তাই এই প্লট আপনি লিখবেন না। ভেরি গুড। তাহলে একটু সাবলাইম করে দিই। পাত্রপাত্রী প্রায় সমবয়স্ক এবং অবশ্যই জাতধর্ম মেনেই তারা হৃদয় দান করেছেন। তাহলে আসুন, একটু এগোনো যাক।

 

   মেয়েটির বিয়ের বয়েস হয়ে গেল। কিন্তু ছেলেটার কোনও গতি আর হচ্ছে না। প্রাইমারির পরীক্ষাটা খুব ভালো হয়েছিল। কিন্তু শিঁকে ছেঁড়েনি। অবশ্য ছিঁড়বেও না যে, সেটা জানাই ছিল। দালাল মাত্র আড়াই লাখ টাকা চেয়েছিল। সেটা দেবার ক্ষমতা নেই ওর। এস এস সি লাগেনি। ক্লার্কশিপ কবে বেরুবে কেউ জানে না। সিভিক ভলান্টিয়ার হবার চেষ্টাও করেছিল। নো চান্স। মেয়ের বাড়িতে চাপ বাড়ছে। একটা সম্বন্ধ এনেছে ছোটমাসির ননদ। তার দেওরের ছেলে। রেভিনিউ অফিসার। লোভনীয় পাত্র। কী করবে মেয়েটি? কী করবে ছেলেটি? কী করবেন আপনি স্যার? ম্যাডাম?

 

   জানি, আপনি ‘শেষের কবিতা'র উদাহরণ দিয়ে বলবেন, আছে নাকি এমন জটিলতা! আছে তো। শুধু চশমার কাঁচটা মুছতে হবে ডিটারজেন্ট দিয়ে। অমিত রে যতই ভাবের সাগরে ভাসুক না কেন, খুব ভালই জানতো ওর সমাজে গভর্নেস বউ চলবে না। তাই লাবণ্য আপত্তি করাতে অমিত যে স্বস্তির ঢেঁকুর তুলে মনে মনে লাবণ্যকে দেদার সার্টিফিকেট দিয়েছিল, রবি ঠাকুর সেটা লেখেননি। কিন্তু খেয়াল করেছেন কি, অমিত কিন্তু জেদও ধরে বসেনি, তুমি যদি আমাকে বিয়ে না করো, আমি আর বিয়েই করবো না। উলটে সে দিব্যি গুটিগুটি পায়ে কেটি মিত্তিরের গলায় মালা দিয়েছিল। আমি-আপনি হলে ঠিক বিয়ে দেওয়াতুম। আর তাহলে শেষের কবিতার বদলে নিত্যদিনের ঝগড়া শোনা যেত। এটাকেই বলে Class consciousness, যা রাজনৈতিক বোধেরই অংশ।

 

   আরো একটু এগোবো? মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আজই শেষ দেখা হবে দুজনের। সন্ধ্যার পরে দুজন দেখা করল বড় মাঠটার ধারে। মেয়েটা খুব কাঁদছে; ছেলেটার মাথার ঠিক নেই। কী করবে বুঝতে পারছে না। দুজনের কেউই খেয়াল করেনি, মাঠের মাঝখান থেকে এগিয়ে আসছে চারপাঁচটি ছায়ামূর্তি। বোতলের অগ্নিভ তরল ততক্ষণে তাদের পাকস্থলী ভরাট করে দিয়েছে। স্বভাবতই শূন্য হয়ে গেছে মগজ। কী করবেন এবার? আরেকটা নির্ভয়া কাণ্ড? নাকি ছেলেটা সলমন খানের মতো কেলিয়ে সবকটাকে লাট খাইয়ে দেবে? জানি, এই বেয়াড়া প্লটও আপনি নেবেন না। রিস্ক আছে।তাহলে আসুন গল্পই লিখি। আপনি আপনার মতো, আমি আমার মতো। দিনের শেষে দুটি শিবিরই তো সত্যি, সাহিত্যেও।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com