আর ভয় নেই

   একদিন তখন শেষরাত, পৌষ মাসের হাড়কাঁপানো শীত চলছে তখন, রাত আড়াইটা হবে । একটা মেয়ের প্রচন্ড চিৎকারে ঘুমটা ভেঙে গেল।  ভালো ভাবে সজাগ হয়ে বুঝলাম আমাদের ফ্ল্যাটের কোনো পরিবার থেকে আওয়াজটা আসছে না আসছে বাইরের বড় রাস্তা থেকে।  ঘুমিয়ে পড়লাম কম্বল্টা আবার ভালো করে গায়ে টেনে নিয়ে। সকালে আমাদের পাশের বস্তি থেকে যে বৌটা আমার ফ্ল্যাটে  কাজ করতে আসত শুনলাম  চিৎকারটা ওর ছিল। আমার পরা শাড়িগুলো ভেজাতে ভেজাতে ওর সার্ফ মাখা হাতটা উলটে চোখ মুছতে মুছতে বলল উনি কাল আমাকে ঘর সে বার করে দিয়েছিল ভাবী। এমনি সব ভালো রেগে গেলেতো ওনার মাথার ঠিক থাকে না তাই একটু তখন সামালে চলতে হয়। রুটি একটু পুড়ল, কি ভাত যদি ধোঁয়া না ছাড়ল, পাশের বাড়ির শীলা কাকির জবান দেবর যদি একটু বাতচিত করতে আসল,  কি একটু পরবের দিনে সাজলাম বলে ঘর সে নিকাল দুঙ্গা। কাল তো রাগটা খুব চড়ে গেছিল তাই সাচমুছ ই বার করে দিয়েছিল, ফিরে গিয়ে দরওয়াজার কাছে বসে কত কাঁদলাম সেই যে দরওয়াজা দিল আর খুলল না। আমি বাইরের পা মোছার চটটা গায়ে জড়িয়ে বসে রইলাম।খুব ভয়ে ভয়ে থাকি ভাবী কবে সাচমুচ কে নিকাল দেয় ঘর সে পুরা।   

 

   যে দরজাওয়ালা ঘরটির কথা বৌটি বলছিল সেই ঘরে আমি একদিন ঘরের কাজের মেয়ে ঠিক করতে ঢুকে ছিলাম। ঘরটি সাত আট ফুটের  তিন দিক টিনের জং ধরা দেওয়াল আর এক পাশে অন্য ঘরের ইঁটের দেওয়ালের বাইরের দিকটা  দিয়ে তৈরি।  ঘরে একটা চোকি দুটো ট্রাংক আর ছোট্ট একটা পায়া ভাঙ্গা সিংহাসনে একটা সিঁদুর মাখা শেরওয়ালীর ফ্রেমে বাঁধানো ছবি, একটা স্টোভ আর কড়াই হাড়ি আর কটা মাজা বাসন  উলটে থাকতে দেখেছিলাম। এই ঘরটার অধিকার ও পেয়েছিল সেই বছর সাতেক আগে যেদিন ছাপড়ার কোনো এক গ্রাম থেকে ওর বর মাথা ভর্তি কমলা সিঁদুর দিয়ে ওকে নিয়ে এসেছিল এই বস্তিতে, আর কখোনো যাওয়া হয়নি ওর সেই ছাপরা জেলার ঘরে।

 

   ইদানীং শুনলাম  ওই ঘরটা থেকে বার করে দেওয়ার ভয়টা ওর একদম কেটে গেছে।  সকালে এখন আমাদের ফ্ল্যাটের আরো কটা ঘরের বাসন ধোয় আর রাতে এখন ইচ্ছে মতো ও বৌ বাজারের অনেক লযে যায়, এটা নয় ওটা নানা রঙের দেওয়ালের মাঝখানে নানান ছাপার বিছানার চাদর পাতা বিছানায় ও থাকে, ইচ্ছা মতো রঙের লিপ্সটিক লাগায়, শীলা কাকির দেওরের সাথে কথা বলতে ওর আর গলাটা কেঁপে ওঠে না এখন অনেকের দেওরের সাথে ও প্রাণ খুলে কথা বলে। ও আর ভয় পায়না হারাতে ওর টিনের দেওয়ালের ঘরটা..... ওর চৌকিটা....ওর শেরোয়ালির ছবি রাখা সিংহাসনটা..... ওর স্টোভটা..... কালো কড়াইটা..... হাড়িটা......

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com