যে কোন মূল্যে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতেই হবে

 

 

    সদ্যসমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনের যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখলাম, তা থেকে প্রতিটি সাধারণ মানুষের ধারণা, এর থেকে নির্বাচন না হওয়া ভালো। কিন্তু সংসদীয় গনতন্ত্রে নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই। অর্থাৎ এই ব্যবস্থাকে চালু রাখতে হলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতেই হবে এবং এই নির্বাচনী অশান্তিও তাই বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনি এক অসহ্যকর পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে মানুষের দাবী, হিংসা মুক্ত রক্তপাত হীন নির্বাচনের। এদাবী আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে অবাস্তব মনে হলেও দেশের অন্যান্য প্রান্তে কিন্তু এরকম হিংসা এখন কোথাও হয়না। অতীতে ইউপি, বিহারে বা আরো কিছু অঞ্চলের নির্বাচনে লাঠির প্রভাব যথেষ্ট থাকলেও বর্তমানে তা উধাও। এর কৃতিত্ব অবশ্যই প্রাক্তন নি. কমিশনার টি এন সেশনের। তিনি দেশের সর্বত্র সফল হলেও এরাজ্যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর সময়কালে শুধু কিছুটা হলেও সংযত করতে পেরেছিলেন মাত্র। এরজন্য তৎকালীন শাসকদল সিপিএমের পক্ষ থেকে এমনকি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, জ্যোতি বসু পর্যন্ত তাঁকে পাগল ইত্যাদি বলে তাঁর মনোবল ভাঙতে চেয়েছেন, তাঁকে থামাতে চেয়েছেন এবং সফলও হয়েছেন। ফলে এরাজ্যে নির্বাচন নিয়ে অনাচার নতুন কিছু নয় বরঞ্চ মৃত্যুর সংখ্যা আগের তুলনায় কিছুটা কম।

 

   কিন্তু এবার যে নতুন কিছু ঘটনার আমরা সাক্ষী হলাম তা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। যেমন, প্রার্থীপদ জমা দিতে বাধা দেওয়া ও মারধর, এমনকি মহিলাদেরও রেহাই না দেওয়া এবং গণনার দিন গণনাকেন্দ্রের ভেতর ঢুকে বিরোধী এজেন্টদের বার করে দিয়ে বিরোধী ভোটপত্র ছাপ্পা দিয়ে সেই বিরোধী ভোট বাতিল করার চমকপ্রদ ঘটনার সাক্ষী হলাম আমরা। এসব বিষয় যতই অভিনব হোক আমাদের মূল দাবি হচ্ছে, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে সুনিশ্চিত করতে হবে এবং হিংসামুক্ত, রক্তপাত হীন নির্বাচনের জন্য সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন নি. কমিশনার পদে সঠিক ব্যক্তিকে বসানো। নিয়মানুসারে লোকসভা, বিধানসভার নির্বাচন কেন্দ্রীয় সরকার মনোনীত জাতীয় নির্বাচন পরিচালক মন্ডলী গঠিত হয় একাধিক ব্যক্তিকে নিয়ে যার একজন হন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। আর রাজ্যের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত ও পুরসভার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজ্য নি. কমিশনারকে রাজ্য সরকারের মনোনয়নের ভিত্তিতে। অতীতে দীর্ঘদিন এই সুযোগ ভোগ করেছে সিপিএম সরকার এবং এখন তৃণমূল। প্রকৃতপক্ষে কোন দলই এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়না। ফলে সাধারণ মানুষকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

 

   এখন পঞ্চায়েতের হাতে অনেক টাকা আসছে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্ধ হিসাবে। সেজন্য ক্ষমতা দখলে এমন মরিয়া লড়াই চলছে। যদিও সবাই বোঝে, বর্তমানে শাসকদল এসব অশান্তি ছাড়াই আরামে জিততে পারতো এবং এসব অশান্তির ফলে শুধু তৃণমূল নেত্রীর মুখই পুড়লো। কিন্তু যারা এসব অপকর্ম করছে তারা কি নেত্রীর দুর্নাম নিয়ে খুব চিন্তিত? আদৌ নয়। এরা শুধুমাত্র এদের নিজস্ব স্বার্থ ও ক্ষমতা নিয়ে চিন্তিত। এরা শুধু জানে আমার ক্ষমতা চাই, কোন দল থাকলো না গেল, তাতে বয়েই গেল। তৃণমূল গিয়ে বিজেপি এলে, নৌকো পাল্টাতে এদের বিন্দুমাত্র সময় লাগবে না। আজ প্রায় দু-তিন দশক ধরে এরাই হচ্ছে ক্ষমতার উৎস। এদের বাদ দিতে গেলে দল তুলে দিতে হবে। সব দলের মধ্যেই এরা এতটাই ক্ষমতাশালী যে এদেরকে কোণঠাসা করাও প্রায় অসম্ভব। কারণ দলের উচ্চনেতৃত্বকে এদের উপরেই নির্ভর করতে হয়। দলের প্রচার থেকে শুরু করে বিরোধীদেরকে প্রতিহত করতে সর্বত্র এদের উপরেই নির্ভর করতে হয়। তবু একথা সত্যি যে প্রায় 47000 বুথের অধিকাংশেই শান্তিতে ভোট হয়েছে এবং অশান্তির জন্য সব দোষই একা শাসকদলের নয়, বিরোধীপক্ষের ভূমিকাও বেশ খারাপ। তাহলেও তীব্র আপত্তির জায়গা হচ্ছে শাসকদলের গোটা ঘটনাকেই গুরুত্ব না দেওয়া বা কোনরকম তদন্তের মাধ্যমে সত্যকে সামনে আনতে অনীহা। তাদের মনোভাব হচ্ছে, যাক কোনরকমে কিছু গন্ডগোলের মধ্য দিয়েও যে এই নির্বাচনকে পার করে দেওয়া গেছে, এই যথেষ্ট। প্রায় একই মনোভাব সব বিরোধী দলেরও।

 

   এইভাবে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতেই থাকে তাহলে মানুষ নির্বাচনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রহসনে পরিণত হবে। কোন সমাজ বা তার দায়িত্বশীল নাগরিক এটা হতে দিতে পারে না। গণতন্ত্র ব্যর্থ হলে আমরা স্বাধীনতা হারাবো। স্বৈরতন্ত্র দখল নেবে শাসন ব্যবস্থা। এমনিতেই আমাদের দেশ কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা, সংবিধান ও গণতন্ত্র আজ সংকটের মুখে। মোদি আগামী নির্বাচনে পুনর্বার জিতলে দেশ এক কঠিন হিন্দু মৌলবাদীদের খপ্পরে পড়বে, আমাদের অতীত ঐতিহ্য সব ধ্বংস হয়ে যাবে, তার নমুনা আমরা দেশের সর্বত্র প্রায়শই দেখছি। এর বিরুদ্ধেও আমাদের সচেতন হতে হবে। যে কোন মূল্যে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতেই হবে।

   

   দেশে অর্থাৎ জাতীয় ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে, রাজ্যে রাজ্যেও গণতন্ত্রের পরিবেশকে শুদ্ধ রাখতে হবে, নইলে তার সুযোগ নেবে ফ্যাসিবাদী মনোভাবাপন্ন অগণতান্ত্রিক ধর্মান্ধ শক্তি, একথা সকলকে বুঝতে হবে। আর একাজে এগিয়ে আসতে হবে সমস্ত সচেতন নাগরিককে। এগিয়ে আসতে হবে সমাজ কল্যানে বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে কাজকরা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে, গড়ে তুলতে হবে এক জোরদার যৌথ আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ। লাগাতার আন্দোলন চালাতে হবে এই সুষ্ঠ ও রক্তপাত হীন নির্বাচনের দাবিতে। দাবি করতে হবে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কমিশনকে সাহায্য করতে একটি আইনি বৈধ উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করতে হবে সব পক্ষকে নিয়ে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র নি. কমিশনের উপরই সবটা নির্ভর করবে না। অতীতে আমরা দেখেছি পূর্ববর্তী সরকারের মনোনীত নি. কমিশনার মীরা পান্ডের সাথে রাজ্য সরকারের মতবিরোধের ফলে কোর্টে দূ তরফের তুমুল লড়াই। সর্বজনগ্রাহ্য একটি উপদেষ্টামণ্ডলী থাকলে এসব অন্ততঃ এড়ানো যেত। মনে রাখতে হবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে রক্ষা করতে পারলে লাভ সমাজের, প্রশাসনের এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রের।

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com