'আলোকিত' ভারতে ঘরে ঘরে আঁধার

 

 

ক'দিন আগেই সারা ভারতের সর্বত্র বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছেন। ১০০% গ্রামেই সরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া গেল বলে তিনি দাবি করেন। গত ২৮শে এপ্রিল মণিপুরের একটি ছোট্ট গ্রাম লিসানে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ওই দিনটিকে ভারতের উন্নয়নযাত্রার একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে তিনি মন্তব্য করেন। নরেন্দ্র মোদীর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই মিডিয়াতে প্রবল সমালোচনা হয়। বিদ্যুতায়ন বলতে আসলে মোদী যেটা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা ঘরে ঘরে আলো জ্বলা নয়। কোনো গ্রামের স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ১০% ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ হওয়া মানেই সেই গ্রামটিতে বিদ্যুতায়ন হয়েছে বলে সরকার দাবি করে। এইভাবেই পরিসংখ্যানে দেখানো হয়, সারা দেশে ১০০% বিদ্যুতায়ন সম্ভব হয়েছে। আদৌ বাস্তবে তা নয়। বাস্তবের হিসেবে  এখনো তিন কোটি দশ লাখ ঘরে আলো যায়নি। লক্ষ্য ছিল ১৮৪৫২টি গ্রামে সব ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়ার। এর  মধ্যে মাত্র ১৪১৭টি গ্রামে তা সম্ভব হয়েছে। সরকারি তথ্যই একথা বলছে। অর্থাৎ মোদী তাঁর লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭.৩% পৌঁছতে পেরেছেন।  বিদ্যুতায়নে গত চার বছরে মোদী সরকারের অগ্রগতি কচ্ছপের গতিকেও হার মানায়। 

 

   ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসবার সময় দেশে ১৮৪৫২টি গ্রাম ছিল বিদ্যুৎহীন। বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেব অনুযায়ী পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎসংযোগহীন মানুষের বাস এই ভারতেই। বলাই বাহুল্য বিদ্যুৎহীন গ্রামগুলিতে উন্নয়নের কর্মকাণ্ডও প্রায় নেই বললেই চলে।  ক্ষমতায় আসবার পর মোদী ঘোষণা করেছিলেন এক হাজার দিনের মধ্যে তিনি সব গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবেন। মোদী এখন সেই দাবি করছেন, যদিও গ্রামে গ্রামে মানুষ আঁধারেই আছে। শুধু উত্তরপ্রদেশেই ১ কোটি ৪৬ লক্ষ ঘরে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি। জানাচ্ছেন এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইন্সটিটিউটের অ্যাসোসিয়েট ডিরেকটর দেবজিৎ পালিত। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আসাম, বিহার ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে প্রত্যেকটি রাজ্যে ৬০ লাখ করে বাড়ি বিদ্যুৎহীন। ক্ষমতায় আসবার পর প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে ভারত সরকার ২০১৮ সালে আড়াই কোটি মার্কিন ডলারে সৌভাগ্য প্রকল্প শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল ২০১৯-এর ৩১শে মার্চের মধ্যে সব গ্রামে সব ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। এরকম একটি উদ্দেশ্য শুনতে ভালো, বাস্তবে অসম্ভব জেনেই এটা সরকারি প্রচারযন্ত্রে বারবার বলা হতে থাকে। বাস্তবেও তাই ঘটেছে। সরকারি ঘোষণা মতো প্রয়োজন ছিল প্রতি মাসে প্রায় বিশ লাখ বাড়িতে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে।  কিন্তু দেওয়া গেছে মাত্র ৭৩ হাজারের কাছাকাছি। সৌভাগ্যর সরকারি পোর্টাল থেকেই এই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। 

 

   আসলে যত না মেঘ বর্ষায়, তাঁর থেকে গর্জায় বেশি। ঢক্কা নিনাদের প্রচারে রাজনীতি হয় যতো, আলো তত জ্বলে না। কারণ, শুধু কোনো গ্রামে ট্রান্সফর্মার বসিয়ে সেটিকে বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যোগ করে দিলেই গ্রামের বিদ্যুতায়ন হয় না। তা সম্পূর্ণ করবার জন্যে প্রয়োজন ট্রান্সফর্মার থেকে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সঠিক ভোল্টেজে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। দেশে বহু গ্রাম এবং মফসসল শহর আছে যেখানে  বহু এলাকাতেই বিক্ষিপ্তভাবে ঘরে ঘরে হয় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই নয়তো বিদ্যুৎ সরবরাহে সঠিক মাত্রার ভোল্টেজ নেই। ফলে আলো জ্বলে টিম টিম, পাখা ঘোরে না,  ক্ষুদ্র শিল্পগুলির বিকাশ ঘটে না। 

 

   এরজন্য দায়ী বিদ্যুতায়নের প্রকল্পগুলি। কন্ট্রাকটারদের একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করে। মূলত তাদের চাপে সরকার নিজের সংস্থা দিয়ে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পরেই হাত গুটিয়ে নেয়। বাকিটা বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কাজটি করা হয় কন্ট্রাকটারদের মাধ্যমে। তারা তাদের মতন হিসেবের টাকা না পেলে বিদ্যুৎ সংযোগ করেন না। সমস্যা এইখানে যে দরিদ্র এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারেরই ক্ষমতা থাকে না, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দাক্ষিণ্য না হলেও কোনো আর্থিক ছাড় জোটে না। আরও একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য কারণ হল স্থানীয় অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানিগুলির নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থতা। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড, পশ্চিমবঙ্গে ৫০% গ্রামে বারো ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না।  নরেন্দ্র মোদী সরকার পরিকাঠামো তৈরি করে গ্রামগুলিকে বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার জন্যে উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তার মানেই যে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো নয়, জেনে বা না বুঝে তারা ভুলে থাকার চেষ্টা করেছেন।   এইজন্য সরকারি তথ্যের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার এত ফারাক।  

 

   তাহলে উপায়? দায়িত্ব এখন এসে পড়ে কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্য সরকারগুলি পরিচালিত বিদ্যুৎ সরবরাহ সংস্থাগুলির ওপর।  তাদের ঘরেই লাল বাতি।  টাকাই নেই খুঁটি পোঁতার, বিদ্যুৎ সংযোগের, সরবরাহের। ধারে বিদ্যুৎ কিনেও শোধ দিতে পারে না। কারণ? ব্যাপক অনাদায় এবং বিদ্যুৎ চুরি। ভোল্টেজ ঠিক রাখতে  ইলেকট্রিসি সাবস্টেশনগুলিকে শক্তিশালী করা এবং সাবট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক তৈরি করা দরকার। বিদ্যুতের  যোগানের সঙ্গে সঙ্গে তার কার্যকর পরিচালনার দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।  নইলে সংস্থাগুলি দেউলিয়া হয়ে পড়ে। গ্রাউন্ড লেভেলের অপারেশন ম্যানেজমেন্টে এই ফাঁকগুলি ভর্তি না হলে ঘরে ঘরে বিদ্যুতের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। 

 

   এরজন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ সংস্থাগুলির পরিচালন কাঠামো ঢেলে সাজানো দরকার। সেখানেও অনেক রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতাও আছে। ভোটের ময়দানে দাঁড়িয়ে যারা সরকারে সমালোচনা করে, ক্ষমতায় আসবার পর তারাই বাস্তুঘুঘুর রক্ষাকর্তা হয়ে যায়। আলো  পৌঁছে দেবার আগেই রাজনীতির অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। ফলে, দেশের অসাম্যে দু'টি শ্রেণি তৈরি হয়ে গেছে। একদল যাঁরা বিদ্যুৎ পেয়েছেন, তারা ব্যবহার করতে পারছে কম্পিউটার নেট সহ সমস্ত আধুনিক প্রযুক্তি।  উন্নয়নের সুযোগ তারা পাচ্ছে। অন্যরা রয়ে গেছে অনুন্নয়নের সেই তিমিরেই। এটা ঠিক, চলতি শতকের শুরু থেকে এদেশে এই নিয়ে বিভিন্ন সরকার বিশেষ উদ্যোগ নেয়। ফলে উন্নতিও হয়েছে উল্লেখযোগ্য। ২০০০ সালে ভারতে ৪৩% মানুষ বিদ্যুৎ পেত। সেটা বেড়ে এখন ৮২%-এ পৌঁছেছে। ইন্টারন্যাশানাল এনার্জি এজেন্সি এই তথ্য জানাচ্ছে।  যেভাবে এবং যে হারে এখন কাজ চলছে, তাতে ভারতে সব ঘরে আলো পৌঁছতে আরও পাঁচ বছর লাগবে বলে মনে করেন এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইন্সটিটিউটের বিশেষজ্ঞরা। যদিও নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা মনে করছেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য অর্জন করে ফেলেছেন। "ঘর ঘর জ্যোতি, হর হর মোদী" স্লোগানে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে তাঁরা সাফল্য তুলে ধরতে মরিয়া। 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com