কী বিচিত্র আমেরিকা

   

 

 

 

   প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডার তাঁর তরুণ সেনাপতির কাছে ভারতবর্ষ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন -‘কী বিচিত্র এই দেশ সেলিউকাস’! প্রিয় পাঠক, আজকের ঘটনার সবটুকু বৃত্তান্ত শুনলে আপনারাও বিস্ময়ে ঝরে পড়ে বলবেন -‘কত রঙ্গই জানো তুমি আমেরিকা’! ত্রিশ বছরের সুদর্শন তরুণ, মাইকেল যোসেফ রোটেণ্ডোর দিনগুলো দিব্যি কাটছিল শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত পিতৃগৃহের পরিবেশে। আট বছর আগে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ভালোবাসার অধিকারে যখন ঘরে ফিরেছিল, আজকের তিক্ত পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তখন মনে দুঃস্বপ্নেও উদয় হয়নি। দিনের পরে দিন সে মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। সঙ্গীতের মূর্চ্ছনায় গভীরভাবে তলিয়ে থেকে জমে উঠেছে আবেশে। বাইসাইকেলে চড়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়িয়েছে উন্মক্ত পথ-প্রান্তরে। সংসারের দায়দায়িত্ব কাঁধে না থাকায় স্বপ্নিল জগতের মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরী করে দিব্যি ছিল সে এতকাল। কিন্তু যে দেশের অধিকাংশ মানুষ ত্রিশ বছরের মধ্যেই ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতিষ্ঠা শেষ করে সফল মানুষের স্বীকৃতি পায়, মাইকেলের মতো ভেসে বেড়ানো মানুষেরা সেখানে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে কিসের জোরে?

 

   মাইকেলের বাবা-মা মার্ক এবং ক্রিস্টিনা রোটোণ্ডো, তাদের কীর্তিহীন সন্তানকে সেই অধিকার দিতে চাননি। একই বাড়িতে বসবাস করা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে বাক্যালাপ ছিল না। অতএব ২০১৮ এর ২রা ফ্রেব্রুয়ারি, সোজাসুজি ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার হুঁশিয়ার হুয়িসেলের মতো এক চিঠি লিখে ছেলেকে জানিয়েছিলেন -‘মাইকেল যোসেফ রোটোণ্ডো, আমরা দুজনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এক্ষুনি পাততাড়ি গুটিয়ে আমাদের বাড়ি ছেড়ে যদি চলে না যাও, তাহলে অন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবো! তার জন্য ১৪ দিনের সময় তোমাকে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে কক্ষনো ফিরে আসার চেষ্টা করবে না এখানে! যদি করো, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সব রকম আইনী ব্যবস্থাই গ্রহণ করবো জেনো’! এমন ভাষাকে চিঠি না বলে আইনী পদক্ষেপ বলাই ভালো। কেন, সেটা ক্রিস্টিনা আর মার্কের পরের চিঠিটা পড়লে আরও স্পষ্ট হবে। পরের চিঠির বয়ান শুনুন। তারিখ ১৩ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ‘মাইকেল যোসেফ রোটোণ্ডো, ৪০৮ ওয়েদাররিজ ড্রাইভ, ক্যামিলাস, নিউ ইয়র্ক, এই ঠিকানার বাড়ি থেকে তুমি এখন আইনগতভাবে বহিষ্কৃত। বিনা খরচে দীর্ঘ আট বছর আমরা তোমায় আতিথ্য দিয়েছি। কিন্তু তোমার সঙ্গে এমন কোনো লিজ কিংবা এগ্রিমেন্টসংক্রান্ত চুক্তি কখনো হয়নি, যাতে আমাদের সম্মতি ছাড়া ইচ্ছে করলেই এখানে জীবনভর আতিথ্যের অধিকার ভোগ করতে পারবে। তবে আমাদের উকিলের পরামর্শ অনুযায়ী সবকিছু গুছিয়ে চলে যাওয়ার জন্য আরও ত্রিশ দিন থেকে যাওয়ার সম্মতি তোমায় দেওয়া গেলো’।                                          

 

   এরপর ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আরও তিনখানা উকিলি নোটিশের সঙ্গে বড়সড় উপদেশামৃতের তালিকা অযোগ্য সন্তানকে পাঠিয়েছিলেন মাইকেলের আদর্শ পিতামাতা। উপদেশ নম্বর(এক), তোমার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র শিগগিরি গুছিয়ে নাও এবং সেই সঙ্গে বসবাসের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজে নাও। (দুই), বাড়ি ছাড়ার নির্দিষ্ট তারিখ আর সময় যদি জানাও, তোমার বাবা এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন। (তিন), আপাতত কোথাও আশ্রয় নেবার জন্য ১১০০ ডলার আমরা দিতে পারি। তবে দরকারী টাকা সংগ্রহের জন্য নিজের মূল্যবান জিনিষপত্র, বিশেষত মিউজিকের সব টুলগুলোই তোমাকে বেচে দিতে হবে।(চার), জগতে কাজের কখনো অভাব হয় না। এমনকি তোমার মতো যারা অকেজো মানুষের চরম দৃষ্টান্ত, তারাও চাইলেই কোনো একটা কাজ জুটিয়ে নিতে পারে।

 

   যাই হোক, শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সুমধুর গৃহকোণ পরিত্যাগের কোনো লক্ষণই নাকি মাইকেলের মধ্যে ছিল না। অতএব মার্ক এবং ক্রিস্টিনার মামলার ফলাফল ঘোষিত হলো, ২০১৮ এর ২২শে মে, মঙ্গলবার। নিউ ইয়র্কের ওলোনডগা কাউন্টির সুপ্রীম কোর্টের জজ নিদের্শ দিলেন, মাইকেল যোসেফের কোনো অজুহাতেই মিস্টার এবং মিসেস রোটোণ্ডোর বাড়ি অধিকার করা চলবে না। রায় ঘোষণার পরপরই সাংবাদিকদের প্রশ্ন  উৎসব জমে উঠেছিল তাকে ঘিরে - জজের নির্দেশ শোনার পর তোমার এখন প্রতিক্রিয়া কী মাইকেল? রায় সম্পর্কে কী বলার আছে তোমার?

 

   সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মাইকেলের মুখের ওপর বিস্মিত বিহ্বলতায় বিষাদছায়া ছড়িয়েছিল। মনে হচ্ছিলো, পিতামাতার এহেন আচরণ তখনো তার কাছে আরব্য উপন্যাসের অবিশ্বাস্য গল্পের মতোই এক অভাবনীয় বিষয়। তবে প্রশ্নের উত্তরে কথাগুলো অবশ্য সে গুছিয়েই বলেছিল- ‘শুনুন, আমি কোনো বদ্ধ পাগল নই যে চিরকাল বাপ-মায়ের সংস্পর্শে পড়ে থাকার মতো অদ্ভুত কোনো কাজ করবো! সেটা কোনো আদর্শিক ব্যাপারও নয়! যে কারও জন্যই অত্যন্ত অসুখদায়ক এবং বিব্রতকর! সবকিছু গুছিয়ে নিতে তাই তিন মাস সময় আমি চেয়েছিলাম। তাছাড়া কোনো অকেজো মানুষও আমি নই! ব্যক্তিগত ব্যবসা রয়েছে! এভাবে হঠাৎ গৃহছাড়া করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ আমি তাই খুঁজে পাচ্ছি না!

 

   মাইকেলের সত্যি কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসা রয়েছে কিনা সে অনুসন্ধান এখনো মেলেনি। তবে যেটা বহুজনেরই মর্মে মর্মে উপলব্ধির বিষয় সেটা হলো, ধনতান্ত্রিক আমেরিকার সমাজজীবন এমনই এক বিরামহীন প্রতিযোগিতার মহাক্ষেত্র, যেখানে জন্মালে শৈশব থেকে বার্ধক্য অবধি কারুরই থেমে থাকার উপায় নেই। অবিরাম গতিময়তাই এখানকার জীবনধারার সুগভীর তত্ত্ব। সেটাই বেঁচে থাকার স্বীকৃত শর্ত। হতে পারে মার্ক আর ক্রিস্টিনা তাদের সন্তানকে নিজেদের এমন পরিচিত জীবনধারার স্রোতে ভাসাতেই নিষ্ঠুর হয়েছেন তার ওপরে। যেভাবে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, পাখির রাজা ঈগল তার দুর্বল সন্তানদের ওপরে। এটা এক প্রাকৃতিক নিয়ম, ঈগলের বাসার যে সন্তানটি নির্দিষ্ট সময়ে উড়ে যেতে অক্ষম, মা তাকে অনেক উঁচু বাসা থেকেই ঠেলে ফেলে দেয় শূন্যে। শতভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটে ছানাটির। কিন্তু তাতে এই নিয়মের কোনো হেরফের হয় না। কারণ, মহাশূন্যে ভেসে থাকার জন্য যার জন্ম, জড়তা তার ধর্ম হতে পারে না।

 

    মাইকেল কি ছুটতে পারবে মার্ক-ক্রিস্টিনার এই প্রতিযোগিতার মহা সংগ্রামক্ষেত্রে? এ কথা নিশ্চিত, অসহায় ঈগল ছানার মতো মৃত্যু তার হবে না। কিন্তু অভ্যস্ত স্বপ্নিল জগৎ ছেড়ে কঠিন বাস্তবে নেমে তাকে আসতেই হবে। সেই নিরালা গৃহকোণ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে, যেখানে দাঁড়িয়ে জীবনের সব রকম ঝড় ঝাপটা নিশ্চিন্ত নিরাপদে সে সরিয়ে দিতে পারতো। অনায়াসে হেসে উঠতে পারতো অন্তরের উল্লাসভরে। বাড়ি তো সেখানেই হয়, যেখানে বেদনার অশ্রুধারাও আপনা থেকেই শুকিয়ে আসে। মাইকেলের মতো মানুষের পক্ষে এমন আশ্রয়ের সন্ধান মিলবে কি সহজে?                      

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com