অশোক মিত্র স্মরণে: কবি মনের নিপাট বাঙাল

 

 

কোনও কোনও ব্যক্তি থাকেন, প্রতি ক্ষণেই যারা ভাবনার জগতে বিরাজ করেন। সে ভাবনা-প্রিয় মানুষের আদলগুলি আর পাঁচজনের থেকে কিঞ্চিৎ ভিন্নধর্মী হয়। ফলে, অনেকে তাঁদের কখনও কখনও ভুল বোঝেন। অশোক মিত্র ছিলেন তেমনই এক ভিন্ন বর্ণের মানুষ। গত শতকের চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে বিশ্ব জুড়ে বামপন্থা ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যে জোয়ার এসেছিল তার প্রভাবে এ দেশেও বহু মানুষ নিজেদের এক অন্য আলোকে পরিবর্তিত করেছিলেন। তাবৎকালের সমস্ত ভাবনায় এসেছিল মোড় ঘোরানো পরিবর্তন। সেই নতুন ভাবনার শরিক ছিলেন অশোক মিত্রও। মনন চর্চার তখন এক সুধা সময়। সাবেকি চিন্তাগুলো পিছিয়ে যাচ্ছে দিনান্তের কালাতিপাতে। তরুণরা গ্রহণ করছেন সময়ের আলোকবর্তিকা। তরুণ অশোকের কালক্ষেপের কোনও কারণ ছিল না।

 

   তারপর বহু জট ছাড়াতে ছাড়াতে সন্ধিক্ষণে এসে পড়া। সেই মুহূর্তেও, পুরনোদিনের ব্রতীরা কেউ কেউ যখন হাল ছেড়ে দেবার পথে, তিনি মুঠো শক্ত করে ধরে রেখেছেন তাঁর আশা-বিশ্বাসের সমস্ত পল-অনুপল। দ্বিধা করেননি স্পষ্ট উচ্চারণেও। সে সময়ের আলো-আঁধারেই, এই বছর বারো আগে, তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। নিজেই ফোন করে বললেন, যে পত্রিকা করছি তা তাঁর ভালো লেগেছে। বললেন, লিখব। কিছুটা হতচকিত আমি, অমন প্রমাণ মাপের বড় মানুষ! তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে গেলাম। কাটা কাটা কথা বলেন, ব্যক্তিগত কথা জানতে চান, দেখি, ইনি তো আসলে মায়ায় মেশানো এক নিপাট বাঙাল। কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না আর। যখনই লেখা চেয়েছি, পেয়েছি। ‘কবিতার নির্মাণ’ নিয়ে সংখ্যা করব, উনি বললেন কবিতা আবার নির্মিত হয় নাকি! লিখলেন, ‘নির্মাণ নয়, সৃষ্টি’। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। আমাদের কাগজেই লিখলেন, ‘আদর্শ বনাম আদর্শবিস্মৃতি’। সরকারি ভ্রূকুটিকে অগ্রাহ্য করে প্রেসিডেন্সির মাঠে লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চ আয়োজিত লিটল ম্যাগাজিন মেলার উদ্বোধনে চলে এলেন এক অনুরোধে।

 

   মৃত্যুর মাস দুয়েক আগে শীর্ণ গলায় ফোনে কথা বললেন। মাথাটা লজ্জায় নিচু হল যখন বললেন শরীরের কষ্টে বেরতে পারেন না, নয়তো আমার বাড়িতেই চলে আসতেন। তীব্র এক কষ্টের মোচড় নিয়ে তাঁকে দেখতে গেলাম। বহুদিন পরে গিয়েও দেখি, শীর্ণ, কিন্তু সেই একই বাঙাল মানুষটি। তাঁর ‘আরেককম’এ আরেকটি লেখার জন্য বললেন। এবার বিশেষ ভাবে, বামপন্থীদের দুর্যোগাবস্থা নিয়ে। আমার কিছু ধারণা ওনাকে বললাম। সেগুলিই লিখতে বললেন। নিশ্চল হ্রদয়ে, শরীরী ফুরিয়ে আসা মানুষটির কথাই ভাবলাম আরও কিছুদিন। লেখাটা ভাবতেও শুরু করেছিলাম। কিন্তু কিছুতেই যেন পেরে উঠছিলাম না, ওনার সেই মুঠোভরা বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থেকে তাঁকে ফিরিয়ে দিই শেষ সময়ের আকন্ঠ সংলগ্নতা। এ দেশের বামপন্থীরা তো ফসিল-রূপ হয়ে হারিয়েছে চলমানতার সমস্ত বৈশিষ্ট্য। লেখাটি শুধু ওনার জন্যই সেইভাবেই ভাবতে শুরু করেছিলাম। হঠাৎ এমন ত্বড়িত পতন! স্যার, আমি এক লাইনও লিখতে পারিনি। তবে লিখতাম। কথা দিলাম, লিখব।

 

   যে কাজটির জন্য উনি সমালোচিত হয়েছেন সব থেকে বেশি, আমি তাঁর সেই কাজের অনুরাগী। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ‘অশোক মিত্র কমিশন’এর চেয়ারম্যান হিসেবে উনি প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি ভাষা তুলে দেওয়ার যে প্রস্তাব করেছিলেন (বামফ্রন্ট সরকার তা প্রয়োগও করেছিল) তা সর্বাংশে ছিল এক দুঃসাহসী বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এই ধরনের ভাবনা একমাত্র অশোক মিত্রই ভাবতে পারেন। বাংলা ও ইংরেজি – দুই ভাষার ওপরেই তাঁর যে অগাধ ও অনায়াস বিচরণ, তার জোরেই তিনি এমন স্বচ্ছ ও স্পষ্ট করে ভাবতে পেরেছিলেন। মধ্যবিত্ত বাঙালি সেই প্রস্তাবকে মেনে নিতে পারেনি। সে তার হীনম্মন্যতা ও দুর্বলচিত্তের প্রকাশ। আর অবশ্যই স্কুলশিক্ষার তীব্র অবনমন। চাইলে, এই একটি প্রস্তাবের জোরেই বাঙালি তার প্রথাগত শিক্ষার জগতে অনেক দূর পৌঁছে যেত। সে কথা আজ আর আলোচনা করে লাভ নেই। দুরদর্শী ও স্বাধীনচেতা এই কবি মনের মানুষটিকে মনে রাখব আজীবন।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com