দার্জিলিং-এর ডায়েরি

 

ইসসস!! সাড়ে আটটা বেজে গেল। রাঁধুনি আসেনি। খবর না দিয়ে কেন যে এরা কামাই করে কে জানে!  দুদিন দিব্যি ছুটি নিয়ে তিন দিনের দিন এসে বলবে মেয়েটার জ্বর ছিল দিদি। এসব ছুতো, ছুতো, সব বুঝি। যত সব ভণ্ডামি। আরে জ্বর তো জ্বর,  তাই বলে কি এক ঘন্টা কাজটা করে যাওয়া যায় না? এখন কি করে চলে?  তার উপর কারেন্ট নেই, রাইস কুকার না চললে ভাতটা গ্যাসে হতেই কতো টাইম! আরে মোবাইলটাতেও তো চার্য নেই।অফফ! ট্রেন আজ রাইট টাইম কিনা জানতে ও পারবো না হোয়াটসএপে।সেই রাইট টাইমে ছুটতে ছুটতে গিয়ে বসে থাকো তারপর দেখব পাঁচ মিনিট লেট।এই ভ্যাপসা গরমে রান্না করতে গিয়ে সক্কাল সক্কাল ঘেমে নেয়ে একেবারে মাখামাখি।আর ওই ইয়ে টা যে কোথায় রাখলাম?  ধুস! ফ্যান ছাড়া গরমে মাথার ঠিক থাকে না কি......

 

   না।এগুলো আমার আজকের ডায়লগ না।অন্য অন্যদিনের। আজ আমি ঠিক এই সকাল সাড়ে আটটায় দার্জিলিংএর ম্যালের চেয়ারে বসে গরম কফি খাচ্ছি। জুন হলেও বেশ ঠান্ডা। দার্জিলিংএ ম্যাক্সিমাম ভিড় এখন।রোজকার ওরকম ডেইলি ঝুট ঝ্যামেলার জীবন থেকে সবাই তো চায় একটু ছাড়া পেতে। বিরক্তিকর ব্যাপার থেকে কদিন ছাড়া পাওয়ার জন্যইতো এইদার্জিলিং ট্যুর।যখন এই শৈল শহরটায় এসে পৌঁছোলাম হোটেল থেকে দশ পা দূরে অল্টো গাড়িটি এসে দাঁড়ালো। খুব জ্যাম ওই রাস্তায়টায় তখন।হোটেলের সামনে নো পার্কিং তাই সামনেটায় দাঁড়াতে দেয়নি। হেঁটে আসতে হবে দুমিনিট। সাথে যে লাগেজ সেটা ট্রলি আর হ্যান্ড ব্যাগ।এবার বেড়াতে আসার জন্য ট্রলিটি কেনা। গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ে যেতে সবচেয়ে যে ট্রলিটি সুবিধা হবে ঠিক সেটাই কিনেছি।দামটা বেশ ভালোই নিয়েছে। আমেরিকান টুরিস্টার। আমার পছন্দের হিরো এটার বিজ্ঞাপন দেয়।ওহ! কি স্টাইলিশ লাগে না দেখতে ওকে!  যাই হোক গাড়ি থেকে নামামাত্র এক মাঝবয়সী মেয়ে এসে হাজির।মেয়েটির রোগা শরীরটায় ময়লা ঘুচকে যাওয়া বেগুনী সোয়েটার নীচে সবুজ পাজামা। কাঁধে ঝুলছে মোটামোটা প্যাঁচানো কয়েক গাছি দড়ি। দড়ির কিছুটা অংশে চামড়ার বেল্টের মতো করা।ফর্সা মুখে ভাঁজ পড়েছে অনেকগুলো। রঙটা কোনো এক কালে ফর্সা ছিল বোঝা যাচ্ছিল, এখন ক্যামন একটা ছাই ছাই ভাব।ঠিক মাখা আটা ফ্রিজে দু এক দিন রেখে বার করলে যেমন উপর দিয়ে শুকনো কালছে শক্ত একটা পরৎ পড়ে যায় ঠিক তেমন।

 

   কোন সা হোটেল কোন সা হোটেল?

 

  বুঝিনি প্রথমটায় কি বলছে? 

 

   বললাম, কি? কি চাই??

   সামান দিয়ে আসবো?

 

   আমি কোনো দিন মহিলা কুলি দেখিনি। আমি আমার চেনা জানায় মহিলা কাজের মেয়ে দেখেছি, রাঁধুনি দেখেছি, ধোপানী এমনকি মহিলা হকারও দেখেছি লেডিস কম্পার্টমেন্টে কিন্তু মহিলা কুলি আমার দেখা ছিল না,  তাই প্রথমটায় ভাবতেই পারিনি আমার লাগেজ নিয়ে পৌঁছে দিতে চাইছে।

 

   দরাদরির পর রাজী হল আমার রেটেই।দুটো দড়ির চামড়া মোড়া যায়গাটা মাথায় নিয়ে দড়ির পেছন দিকটায় আমার জামাকাপড় আর আরো সব সাজগোজের আইটেম ভর্তি বোঝাই বিশাল সাইজের ট্রলিটা ঝুলিয়ে দিল, হাতে নিল হ্যান্ডব্যাগ।মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে গেলো। হোটেলটা খাঁড়া কটা সিঁড়ি উঠে বেশ কিছুটা উঁচুতে।যাতে হোটেল থেকে সকালবেলা গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতেই পর্যটকরা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে মনটা বেশ চাঙ্গা করে নিতে পারে তাই এই উচ্চতা।সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় খেয়াল রাখছিলাম লাগেজেগুলোর দিকে। এরকম বেশ কয়েকটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে কাঁচের দেওয়ালে ঘেরা রিসেপসন।পেছনে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো রোধ ঝলমলে সোনালি কাঞ্চনজঙ্ঘার ফটো।ছবির নীচে লেখা 'এঞ্জয় কাঞ্চনজঙ্ঘা'।রিসেপশনে যিনি বসেছিলেন ওদের দিকে তাকিয়ে অপরিচিত ভাষায় কি সব বললেন। তাতে মেয়েটি একটু উত্তর দিল আরো জড়ানো জড়ানো ভাষায়।দুচার মিনিট কথা হল ওদের মধ্যে। কথাগুলোর মধ্যে বেশিরভাগটাই আমার 'স' ' 'স' কানে আসছিলো। কথাটুকুর যতটুকু বুঝলাম তা হল হোটেলের কোনো স্টাফ নেই, আজ সবাই চলে গেছে, রুমে মাল পৌঁছে দেবার কেউই নেই,  তাই চার তলার উপর আমাদের জন্য যে রুমটি পরিষ্কার করে বাছাই করে রাখা হয়েছে ওদেরই সেই রুম অবদি লাগেজগুলো পৌঁছে দিতে হবে।চুপচাপভাবে উঠতে শুরু করল আমার ট্রলিগুলি মাথায় ঝুলে।

 

   পরে হোটেলের রিসেপশনের ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এরা আসে কোথা থেকে।শুনলাম ম্যালের সামনে পাহাড়গুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে যেখানটা আমরা কাপলরা দার্জিলিং বেড়াতে এসে গালে গাল লাগিয়ে সেল্ফি তুলি, সেই ব্যাকগ্রাউন্ডের নীচুর দিকে তাকালে অনেক নিচুতে পাহাড়ের ভাঁজেভাঁজে রঙীন রঙীন ঘর দেখতে পাওয়া যায়।কূয়াশা সরে গেলে দূর থেকে ঘন সবুজের মধ্যে যে সব ঘরগুলো দেখলে দূর থেকে স্বপ্নের বাড়িবা হানিমুন রিসোর্ট মনে হয় ওগুলো আসলে বস্তি। ওরা ওখানটাতে থাকে।পিচের রাস্তা নেই।খাঁড়াই পথ কোনো গাড়ি নামেনা ওদিকে। এতো খাঁড়া রাস্তা আমরা ট্যুরিস্টরা ওখানটাতে নামতেই পারবো না।সারা বছরভর এই শীত আর কুয়াশা ভরা যায়গাটাতে ওই বস্তি থেকে ওই খাঁড়াই পথ আড়াই তিন ঘন্টায় পায়ে হেঁটে ওরা উঠে আসে ম্যালে।ম্যালে ওই হাসিহাসি মুখের ট্যুরিস্ট কাপলদের মাঝখান দিয়ে এসে ওরা গান্ধী রোডের আপার ক্লাব সাইডে দাঁড়িয়ে থাকে ভোর থেকে।যে সব ট্যুরিস্ট নামে আপার ক্লাব সাইডে তাদের সামান পৌঁছে দেয় হোটেল অবদি।

 

   যাই হোক দোতলার পর যখন তিনতলার সিঁড়িগুলো পেরোচ্ছে আমার ব্লু ট্রলিটা যেন ৬০ ডিগ্রী থেকে ৫০ কি ৪৫ ডিগ্রিতে হেলে গিয়ে উপর দিকে উঠতে থাকলো, মেয়েটির গলার স্বর ওই যা শুনেছিলাম রিসেপসনের কাছে আর একবার কোনো টু শব্দটি  শুনলাম না ওর গলায়।

 

   ব্লু ট্রলিটা শোরুমের ঝকঝকে আলোয় যখন দেখেছিলাম শোরুমের অন্য ট্রলিগুলির থেকে সব থেকে সুন্দর লেগেছিল দেখতে।তাই ওটাই নিয়েছিলাম। তখনই বেশ প্ল্যান করেছিলাম ওটা নেওয়ার সময় স্কাই ব্লু স্কিনটাইট জিন্স আর হোয়াইট স্লিভলেস কিছু পড়ব।আজ আমার বেস্ট পছন্দের ওই ব্লু ট্রলিটা বাঁকাত্যাড়াভাবে মাথা থেকে মোটামোটা দড়ির মধ্যে ঝুলতে দেখে ক্যামন অন্যরকম লাগছিল। একদম অন্য রকম। আমার সেই পছন্দের ট্রলি ওটা নয় মনে হচ্ছিল।ওই মেয়েটির ওই বেগুনী সোয়েটার দড়ি আর সবুজ ঢোলাঢোলা পাজামার সাথে বোধ হয় মানাচ্ছিল না একদম আমার সাধের ওই ট্রলিটা....

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com