খাদ্য সংকট

 

 

আজ অবধি জনবিস্ফোরণের সমস্যা নিয়ে যেমন বিতর্কের অবসান ঘটেনি, তেমনি খাদ্য সংকটের মূল কারণ নিয়েও সমালোচকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। একদলের বক্তব্য- ‘The world's population continues to grow, but the Earth's surface doesn't. And already one in nine people around the world suffers from hungerÕ [১].  জগতে অবিরাম জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে পৃথিবীর আকার বড় হচ্ছে না। এবং এর ফলে প্রতি নয়জনের ভেতর একজন মানুষ ক্ষিধের যন্ত্রনা ভোগ করছে। এ সম্পর্কে অন্যপক্ষের মন্তব্য হলো - দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির জন্য জনসংখ্যা দায়ী নয়। মূল কারণ, খাদ্য বণ্টনে দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব [২]। রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য কর্মসূচির প্রধান, রালফ সুদফও এই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন ২০১৭-য় বিশ্ব গণদিবসে ভাষণ দিতে গিয়ে। তাঁর মতে, উৎপাদিত খাদ্যশস্যের অতিরিক্ত অপচয়ই আসলে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির কারণ।  
   পৃথিবীতে প্রতি বছর ১৩০ কোটি টন খাদ্যশস্যের অপচয় ঘটে। এই বাস্তবতা শিল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল, দু ধরনের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই সত্য। প্রতি বছর উৎপাদিত খাদ্যের এক তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়। যার তাৎক্ষণিক এবং উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে দরিদ্র জনসাধারণের ওপরে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় তাদের ক্রয় ক্ষমতা হারিয়ে যায়। তবে এই অপচয় উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে কিন্তু একই কারণে ঘটে না। ধনী ও উন্নত দেশগুলোয় সাধারণত ভোক্তারা খাদ্যের অপচয় করে। আর উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশে বিনষ্ট হয় দুর্বল প্রযুক্তি এবং উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে। যেমন মজুদিকরণের সুব্যবস্থা না থাকায় কিংবা প্রক্রিয়াকরণ এবং প্যাকেজিং ঠিকমতো না হওয়ায় কাঁচা মাল অনেক সময়েই পচে যায়। 

 

   অপচয়ের অনুপাতেও দুই শ্রেনীর দেশের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য এবং কৃষি বিভাগের  এক রিপোর্ট অনুসারে - ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় সাধারণভাবে ভোক্তারা (গড় প্রতি) যেখানে বছরে ৯৫ থেকে ১১৫ কেজি খাবার নষ্ট করে (উপরন্তু ফল-মূল, শাকসব্জি, মাছ, মাংস তো রয়েইছে), সেখানে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় জনপ্রতি অপচয়ের অনুপাত ৬ থেকে ১১ কেজির মধ্যে। শুধুমাত্র ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা মিলে বছরে যত খাবার নষ্ট করে (২২২ ম্যাট্রিক টন), তার প্রায় সমপরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয় সাব-সাহারান আফ্রিকার পুরো অঞ্চল জুড়ে(২৩০ ম্যাট্রিক টন) [২]।    

 

   এভাবে বিপুল পরিমাণ খাদ্য বিনষ্ট হওয়ার ফলে কেবল যে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে তাই নয়। পচা খাবার থেকে ক্ষতিকর গ্রীনহাউস গ্যাসও সৃষ্টি হচ্ছে নিয়মিত। বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বাড়িয়ে তোলায় যা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বড় আকারের দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির জন্য খাদ্যশস্যের অপচয়ই কি একমাত্র কারণ? জীববৈচিত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা অবশ্য খাদ্য বন্টনের অব্যবস্থাপনাকে খাদ্যসংকটের মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করেননি। তাঁদের মতে খাদ্যঘাটতির পেছনে রয়েছে এমন কতগুলো কারণ যেগুলো পারিপার্শ্বিকতায় ইতিমধ্যেই কঠিন প্রতিকূলতা সৃষ্টি করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও সুতীব্র হয়ে উঠবে। এগুলো হলো, (১) জনসংখ্যা বিস্ফোরণ এবং বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি।(২) দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি না হওয়া।(৩)ঘন ঘন বন্যা।(৪) উর্বর কৃষিভূমির পরিমাণ কমে যাওয়া।(৫) অতিরিক্ত সেচের ফলে জলাভাব।(৬)চরম আবহাওয়ার দীর্ঘ স্থায়িত্ব। 

 

   জলবায়ু বদলে যাওয়ার প্রভাব একুশ শতকে সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্যনীয়। অনেক দেশে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ এরই মধ্যে কমে গিয়েছে অনেকটা। খাদ্যসংকট বেশি হলে স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক জটিলটাও সৃষ্টি করে। বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের কারণে দাঙ্গার সম্ভাবনা ঘনীভূত হয়- ‘Global society essentially collapses as food production falls permanently short of consumption and world faces an unprecedented epidemic of food riotsÕ [৩].  এই বাস্তবতা জগৎ ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষও করেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যেতে পারে, ২০১০ সালে যখন অনেককালের অনাবৃষ্টিতে, উষ্ণ বাতাসের কারণে, পরপর কয়েকটি ভয়াবহ দাবাণলে রাশিয়ায় ফসল (গম) উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হয়, তখন ছয়মাসের মধ্যেই আরববিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সরকারবিরোধী গণঅসন্তোষ বিদ্রোহরূপে ছড়িয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যের ভাববিলাসিরা যে অবস্থাকে বিশেষিত করেছিলেন -“আরব স্প্রিং” বলে সম্বোধন করে। 

 

   এটা বাস্তব ইতিহাস, এই অঞ্চলে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ আগের থেকেই সীমিত। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় খাদ্যপরনির্ভরতা একুশ শতাব্দীর দুই দশক ধরে আরও বেশি ব্যাপক হয়েছে। কারণ বিরামহীন যুদ্ধের ফলে (আধুনিক সমরাস্ত্রের অতি ব্যবহারে) এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হচ্ছে। ৬৫% মানুষের জীবন বর্তমানে খাদ্য সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আলজেরিয়া, মরক্কো, ইয়েমেন, লিবিয়া, সুদান, মিশর, তিউনিশিয়া, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, সিরিয়া, লেবাননসহ প্রায় সব রাষ্ট্রই কম বেশি আমেরিকা, কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর (বিশেষত রাশিয়া) রফতানিকৃত গম, ভুট্টা আর সয়াবিনের ওপর নির্ভরশীল। তাই রফতানিকারক দেশে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রায় পুরো পৃথিবী জুড়ে তার প্রভাব পড়ে।

 

   ২০১৬ সালে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক সংগঠনগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে ১২ কোটি চল্লিশ লাখ অভুক্ত মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করতে হয়েছে। ২০১৫ এর তুলনায় এই অনুপাত ছিল ২৫% বেশি। ২০১৬ এর তুলনায় ২০১৭ তে জরুরি ভিত্তিতে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় প্রয়োজন বেড়েছিল আরও প্রায় ১৬ শতাংশ। ২০১৭ এর সবচাইতে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত দেশগুলো ছিল- নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, ইয়েমেন, জিম্বাবুয়ে, ইথিওপিয়া চাদ, মাদাগাস্কার, বুরুণ্ডি, সুদান, মোজাম্বিক, দ্য ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো, সিরিয়া, আফগানিস্তান প্রভৃতি। রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট অনুসারে যে সংবাদগুলো বারবার শিরোনাম হয়ে বেরিয়েছিল তাতেও বলা হয়েছিল, খাদ্য রফতানিকারক দেশগুলোতে পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাবে চাহিদা অনুসারে খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে না। ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে(ভুট্টা রফতানিকারক দেশ) জমির অনুর্বরতা, জলাভাব চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অতি তাপমাত্রা এবং অনাবৃষ্টিতে কৃষিজমি হয়ে উঠছে ঊষর, রুগ্ন এবং বন্ধ্যা।                 

 

   ১৮০৪ খ্রীষ্টাব্দে বিশ্বের জনসংখ্যা ১০০ কোটিতে পৌঁছুতে সময় নিয়েছিল আড়াই লক্ষ বছর। তখন প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করে আপন অস্তিত্ব রক্ষা করা নগন্যসংখ্যক মানুষের পক্ষেই সম্ভব হতো। সভ্যতার ক্রমোন্নতি মানুষকে দীর্ঘায়ু দিয়েছে ধীরে ধীরে। প্রতিকূলতা জয় করে পর্যায়ক্রমে নিজের অস্তিত্ব সংকটমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে মেধাসম্পন্ন মানুষ। কৃষিকাজের উন্নয়নে, মৃত্যুঞ্জয় মেডিসিনের নিত্য নতুন আবিষ্কারে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অসাধারণ সাফল্যে ক্রমাগত সাফল্য অর্জন করতে করতে বহুবিধ প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে নিজের চারপাশে মানুষ গড়ে তুলেছে দুর্জয় প্রতিরোধ। যার অনিবার্য পরিণতিতে বিশ্বব্যাপি ঘটে গেছে বিশাল জনসংখ্যার ব্যাপক বিস্ফোরণ। মানুষের গড় আয়ু যত বৃদ্ধি পেয়েছে, গাণিতিক হিসেবে নতুন শিশুর সংখ্যা যত বেশি সংযোজিত হয়েছে, জীবনের চাহিদার পরিমাণও ততোই সমান্তরাল বেড়ে গেছে নিয়মিত। অতএব ভবিষ্যৎ দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে সবুজ বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর নরম্যান আর্নেস্ট (মানবতাবাদী আমেরিকান জীববিজ্ঞানী, ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত), সবুজ বিপ্লব ঘটিয়ে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজেছেন। চার দশক আগে কুড়ি শতকের শেষ প্রান্তেই পৃথিবীব্যাপি শুরু হয়ে গিয়েছিল সবুজ বিপ্লব পরিক্রমা। নরম্যানের সবুজ বিপ্লব আজ জনভারে জর্জরিত ভারত, চীন, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বহু রাষ্ট্রের বেঁচে থাকার নির্ভরযোগ্য অবলম্বন।        

 

   সবুজ বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল, জৈব সারের পরিবর্তে রাসায়নিক সার(নাইট্রোজেন, পটাসিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি)প্রয়োগ করে মাটির উর্বরতা শক্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলা। যাতে সীমিত কৃষিজমিতেই দ্বিগুণ, তিনগুণ এমনকি চারগুণ বেশি ফসল ফলিয়ে বাড়তি জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো যায়। সেই সঙ্গে উৎপাদিত ফসলও যাতে অক্ষত অবস্থায় থাকে তার জন্যও ব্যবহৃত হতে থাকে রাসায়নিক উপাদানে তৈরী কীটনাশক। জমির আগাছা নির্মূলের কাজেও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার শুরু হয়। আজ এই ব্যবস্থা পৃথিবী জুড়ে ব্যাপকভাবে চলছে। খাদ্যাভাব দূরীকরণে পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশেই নোবেল বিজয়ী নরম্যানের সবুজ বিপ্লব পরিকল্পনা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। 

 

   ডক্টর নরম্যানের চাষাবাদের পদ্ধতি খাদ্য উৎপাদনে যথার্থই যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়েছে কয়েক যুগ ধরে। এখন কুড়ি শতকের চেয়ে অনেক কম সময়ে, অনেক কম জনবলে, কোথাও কোথাও একই জমিতে সারা বছর চাষাবাদ করে কয়েক গুণ বেশি ফসল উৎপন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। যেমন এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ চীন, অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে পূর্বের তুলনায় ছয়-সাত গুণ বেশি শস্য উৎপন্ন করতে সমর্থ আজ। কৃষি পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তনের ফলে গত এক দশক ধরে এখানকার কোনো কোনো অঞ্চলে ফসলের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিশ্বে সবচাইতে বেশি পরিমাণ শস্য উৎপন্নকারী দেশ হিসেবে সাফল্য অর্জন করেছে চীন।  

 

   এই প্রসঙ্গে এশিয়া মহাদেশের অন্য যে দেশটি সম্প্রতি উদাহরণ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে তার নাম, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। সবুজ বিপ্লব পরিকল্পনা অতিরিক্ত জনবহুল দেশটিকে কৃষিসমৃদ্ধ করে তুলেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সীমিত জমিতে কয়েক গুণ বেশি ফসল ফলিয়েও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যায় ভারাক্রান্ত চীন এখনো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় তার চাষের জমির পরিমাণ অপর্যাপ্ত আজ। জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ব্যাপকভবে কমে যাওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে চীনের জনসংখ্যা ১৪১ কোটি ৫০ লাখ, ৪৫ হাজার ৯২৮ জনে দাঁড়িয়ে। ভারতের সংখ্যাটিও বিশাল। ১৩৫ কোটি, ৪০ লক্ষ, ৫১ হাজার, ৮৫৪। পাকিস্তানে ২০ কোটি ৭৭ লাখ, ৭৪ হাজার, ৫২০। আর বাংলাদেশে ১৬ কোটি, ৬৩ লক্ষ, ৬৮ হাজার, ১৪৯। এই দেশগুলোর জনসংখ্যা এখানে এ জন্যই উদ্ধৃত করা হলো, এরা প্রত্যেকেই বিপুল চাহিদার প্রয়োজন মেটাতে নিষ্ঠার সঙ্গে সবুজ বিপ্লব তত্ত্বের অনুসরণকারী দেশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে মাটির ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ফসল ফলনোর প্রচেষ্টা দীর্ঘকাল ধরে সম্ভব হবে না। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, খাদ্য রফতানিকারি ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো। অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে এখানকার মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে, কোনো কোনো অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসলের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে ।             

 

   মাত্রাতিরিক্ত সার প্রয়োগের জন্য চীনের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলের পরিবেশ সম্পূর্ণ দূষিত আজ। ভারসাম্যহীন হয়ে যাচ্ছে সেখানকার পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিকতা। যার বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুধু জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেই নয়, মাটির স্বাভাবিক পুষ্টি রক্ষণেও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে কয়েকগুণ বেশি ফসল উৎপন্ন করা এসব জমিতে আদৌ সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে স্বয়ং কৃষি গবেষকদের। চীনের মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণা তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সচেতন মহলে। জীব ও উদ্ভিদজগতের অসামঞ্জস্যকর পরিস্থিতি দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে চীনের পরিবেশবিদ আর জীববিজ্ঞানীদের। মাটির পুষ্টি ফিরিয়ে আনতে, ফসল উৎপাদনের সামর্থ্য ধরে রাখতে কৃষিজমিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবসার ব্যবহারের দিকে এখন গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। 
কেননা জৈবসার ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন পদ্ধতিতে ব্যাপক বদল আনতে না পারলে তার ফলাফল মাটির জন্য যেমন ক্ষতিকর হবে তেমনি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ দূষণ ও জীববৈচিত্র রক্ষার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব হবে মারাত্মক। এছাড়া এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে চলতে থাকলে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। F A O (Food and Agriculture Organization of UN) যে অবস্থার তুলনা করেছেন ভয়াল পরিণতির সঙ্গে - ÔIf we don't make the systems involved in agriculture more resilient, food security will be in jeopardyÕ. 

 

   সুতরাং চাষাবাদের প্রযুক্তিকে এমনভাবে বর্তমান পরিস্থিতির উপযোগী করে তুলতে হবে, যাতে মাটির ক্ষতি আরও বেশি বাড়তে না পারে। এজন্য সার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে কৃষককে। মাটির নিচের জল নয়, চাষের কাজে বেশিরভাগ সময়েই ব্যবহার করতে হবে বৃষ্টি এবং বর্ষার জল। পরিবর্তিত জলবায়ুতে দারিদ্র ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করতে হলে সরকারকেও কৃষকের দিকে উদার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তা নইলে একুশ শতাব্দীর উন্নত বিজ্ঞান-প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যশস্য উৎপন্ন করার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। 


 

 

 

   কিন্তু সমস্যা হলো, সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিতে দ্রুত ও উচ্চ ফলন ফলিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পেতে কৃষকরা  এখন অভ্যস্ত রীতিমতো। কয়েক দশক ধরে কম খরচে রাসায়নিক সারের ব্যবহার তাদেরকে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। অতএব যে জৈবসার ব্যবহারের জন্য বারবার তাগিদ দেয়া হচ্ছে, সিংহভাগ ক্ষেত্রেই তা ব্যবহৃত হওয়ার বদলে গবেষকদের গবেষণার মধ্যেই আটকে থাকছে। অবশ্য গবেষকরা এটাও উল্লেখ করতে ভোলেননি - বিশ্বের ক্রমবর্ধমান শত শত কোটি মানুষের খাদ্য উৎপন্ন করতে হলে কৃষকদের সামনে রাসায়নিক সার ব্যবহার ছাড়া অন্য পথ খোলাও নেই। জৈবসার ব্যবহারে পরিবেশ দূষণ নিশ্চয়ই কমে আসবে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব সংহত হবে। মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। কিন্তু তার সাহায্যে চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে না। 

 

   এসব কারণ ছাড়াও বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ভবিষ্যতে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার পেছনে রয়েছে আরও একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। পৃথিবীর সব দেশে জনসংখ্যার বিপুল বিস্ফোরণ ঘটলেও চাষযোগ্য উর্বর জমি সর্বত্র নেই। কোনো দেশ তেলসম্পদে ধনী, কিন্তু প্রয়োজনমতো সমৃদ্ধ চাষের জমি নেই। কোথাও কৃষির পরিবর্তে রয়েছে খণিজসম্পদ। কোনো দেশ আবার শিল্পসম্পদে ধনী ও উন্নত, কিন্তু ফসল উৎপাদনে স্বনির্ভর নয়। অতএব প্রাণধারণের উপযোগী খাদ্যের জন্য এসব রাষ্ট্র প্রধানত আমদানির ওপরেই নির্ভরশীল। কৃষিনির্ভর দেশগুলিও জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে নির্ভরশীল এদের ওপরে। আধুনিক বিশ্বে বিশ্বায়নের প্রয়োজন এই ধনসম্পদের সুষম বণ্টনের জন্যই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেননা, প্রত্যেক রাষ্ট্রেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সব রকম ভোগ্যপণের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। নিজের সীমিত সম্পদ দ্বারা বিশাল সংখ্যক জনসাধারণের সব রকম চাহিদা মেটানা এককভাবে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব নয় আজ। সেটা করতে গেলে বিভিন্ন সামাজিক সংকটে পৃথিবী ভারসাম্যহীন হওয়ায় মানবজাতি ধ্বংস হবে। কিন্তু বিশ্বায়নের যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে নেতিবাচক দিকও। মানুষের ভোগবাদের বাসনা এই বিশ্বায়নের প্রভাবেই ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে।

 

   যাই হোক, আফ্রিকায় কৃষির অবস্থা আরও বেশি সকরুণ। সেখানকার ৫০% ভূমি (মরুকরণের ফলে) যে কোনো কৃষিকাজের জন্যই সম্পূর্ণ অনুপযোগী। সাব-সাহারান অঞ্চল জুড়ে বুভুক্ষু মানুষ আর গৃহপালিত মৃত জীবের ছড়াছড়ি। অনাবৃষ্টির দাবদাহে বছরের পর বছর ধরে মাটি সেখানে পাথর হয়ে আছে। এর ওপর সবুজ বিপ্লব পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে পরিস্থিতি দিয়েছে উল্টো ফল। বেশি ফসল ফলানোর প্রত্যাশায় চাষের জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে ফসলি মাটির বুক পরিণত হচ্ছে একেকটি কঠিন রসায়নের সঞ্চিত খণিতে। চাহিদা অনুসারে বিভিন্ন ধরনের শস্য উৎপন্ন করা এখানে যেমন সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি সংগৃহীত ফসলের পরিমাণও পর্যাপ্ত নয়। কারণ সুউন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে সবুজ বিপ্লবের সফলতা সেসব দেশেই এসেছে যেখানে যথেষ্ট জল সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে যথাযথভাবে বজায় রয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত মাটিতে স্বাভাবিক পুষ্টির পরিমাণ। শত সহস্র বছর ধরে গাছপালা এবং পচনশীল প্রাণীদেহ থেকে কিংবা বর্ষার পলিমাটি জমে ধীরে ধীরে যা মাটিকে পুষ্টিময় করে তুলেছে।

                      

   ওদিকে বদলে যাওয়া জলবায়ুর কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় লক্ষ বছরের হিমবাহ এবং তুষার আবৃত পাহাড়গুলো (যেমন গ্রীনল্যাণ্ড, হিমালয়ের বরফস্তর, এ্যান্টার্কটিকার আইসক্যাপ প্রভৃতি) দ্রুত গলতে থাকায় সাগর ধীরে ধীরে ফুলে ফেঁপে উঠছে। সমুদ্র কূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে জলপ্লাবনের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে উপকূলবর্তী নিচু অঞ্চলগুলোর নোনা জলের নিচে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। চাষের জমির পরিমাণ এর ফলে আরও কমে যাবে। কৃষিকাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে সম্পূর্ণ। বাসস্থান হারিয়ে বিরাট সংখ্যক গৃহহীন মানুষ উদ্বাস্তু জীবন লাভ করবে। কেননা পৃথিবীর অজস্র জনপদ এবং কৃষিভূমিগুলো সমুদ্র উপকূলবর্তী নিচু অঞ্চলেই গড়ে উঠেছে হাজার বছর আগের থেকে। 

 

   ওদিকে জনসংখ্যার ভয়াল বিস্ফোরণে বাড়তি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় বাসস্থান নির্মাণ করতে, জনসম্পৃক্ত নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে, বেকার সমস্যা দূরীকরণে কর্মসংস্থান তৈরী করতে নিয়মিত বাড়তেই থাকবে মেগাসিটির সংখ্যা। কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ ভবিষ্যতে তাতে আরও অনেক কমে আসবে। ক্ষিধে নিবৃত্তির আশায় ঝাঁকে ঝাঁকে অনাহারি, অর্ধাহারি মানুষগুলো ছুটে আসবে শহর জীবনের হাতছানিতে। সেখানে সবার বাসস্থান সংকুলান অবশ্যই হবে না। অতএব উদ্বাস্তু মানুষের সঙ্গে বস্তির সংখ্যাও অসংখ্য হবে পৃথিবীর বিভিন্ন মেগাসিটি জুড়ে।

 

  ওদিকে আরও একটি ভয়ংকর সংবাদ, জন্মনিরোধ পদ্ধতি অনুসরণের জন্য জন্মসংখ্যার হার কমলেও ৫৮টি দেশে জনসংখ্যা বরং উঁচুর দিকেই উঠছে। ১৯৫০ সালের পরে এখানকার নারীরা সবচাইতে বেশি সংখ্যক  শিশুর জন্ম দিতে যাচ্ছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, সিরিয়া, এ্যাঙ্গোলা, উগাণ্ডা, মালি, নিগার, জাম্বিয়া, বুরুণ্ডি ইত্যাদি। এসব দেশে ২১০০ সালের মধ্যে অতীতের চেয়ে তিনগুণ বেশি বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে জন্মহারের অনুপাত। এই সাবধান বাণী তাই ধারালো খাঁড়া হয়ে ক্রমেই ঝুলে পড়ছে পৃথিবীর ওপরে- মানবজাতি এমন একটি শতাব্দীর মধ্যে প্রবেশ করেছে, যখন বুভুক্ষু মানুষের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়বে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হয়ে। বর্তমানে প্রতি সেকেণ্ডে অনাহারে মৃতের সংখ্যা ৩.৬। কোনো কোনো গবেষকের অভিমত - জনসংখ্যা বিস্ফোরণে ২০৫০ সাল নাগাদ খাদ্য চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে আরও ৭০% থেকে ৯০%। যে কারণে একুশ শতকের শেষভাগে ৪০০ থেকে ৮০০ কোটি মানুষকে খাদ্যের জন্য নিরন্তর বুভুক্ষুতায় সংগ্রাম চালাতে হবে।

 

   ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বিভিন্ন দেশে জরিপ চালিয়ে রাষ্ট্রসংঘ থেকে একটি হুাশিয়ারি রিপোর্ট বেরিয়েছিল। যেখানে উপসংহারে লেখা ছিল -ÔArmed aggression is no longer the principal threat to our future. The overriding threats to this century are climate change, population growth, spreading water shortage and rising food prices'[৪]. আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এখন আর আধুনিক মারণাস্ত্র (নিউক্লিয়ার অস্ত্র) প্রধান হুংকার নয়। তাকে ছাপিয়ে প্রধান বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবর্তিত জলবায়ু, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলসংকট এবং খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। বিশেষজ্ঞদের তাই উদ্বেগ, সন্দেহ আর সংশয়, পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধের লড়াইটা শুরু হবে জীবনধারণযোগ্য খাদ্য নিয়েই।

 

  খাদ্যনিরাপত্তার অভাবে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ এই শতাব্দীতে শুরু হবে কিনা জানি না। তবে উর্বর কৃষিভূমির দখলতারিত্ব নিয়ে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। খাদ্য সংকট প্রতিহত করার নামে বিদেশি কোম্পানিগুলো এখন বিভিন্ন দরিদ্র ও অনুন্নত দেশের চাষের জমিতে কয়েকগুণ শস্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাতে দরিদ্র কৃষকের হাত থেকে জমি এদের হাতে চলে যাচ্ছে। এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম জনসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ চীনও এই প্রতিযোগিতায় সামিল হতে ব্যাকুল। কেননা তার নিজের জমির ফসল(পূর্বের তুলনায় ছ’সাতগুণ বেশি ফলিয়েও)যথেষ্ট নয় প্রয়োজনের তুলনায়। 

 

   ওদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় উদিত শক্তির প্রতীক বিরাট ভারতও ব্যাপক জনসংখ্যার ভারে টালমাটাল। ভারতে কৃষি, অর্থনীতি, শিল্পোন্নয়নে অসাধারণ সাফল্য এসেছে ঠিকই, কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি এখনও আদর্শিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গত তিন যুগ ধরে জনসংখ্যায় যুক্ত হয়েছে বিশাল একটি গাণিতিক নম্বর। ফলে কৃষিভূমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে সঙ্গতভাবে। ওদিকে ল্যাটিন আমেরিকায়, দক্ষিণ আমেরিকায় কয়েক বছর ধরেই চরম আবহাওয়া বিরাজ করায় উৎপাদনশীলতায় ঘাটতি চলছে। প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল সংগৃহীত না হওয়ায় রাষ্ট্রসংঘের খাদ্যগুদামগুলোও কয়েক বছর ধরে দ্রুত নিঃশেষিত।

 

   তারপরেও সম্প্রতি বছরগুলোয় চাহিদা বাড়ার কারণে দরিদ্র এবং কম উন্নত দেশেও কৃষি উন্নয়ন পদ্ধতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইরিগেশন ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে ৪০% থেকে ৬০% বেশি খাদ্যশস্য অনেক দেশেই উৎপন্ন হচ্ছে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের কৃষিবিভাগের ড্যাটা অনুযায়ী - বিগত পঞ্চাশ বছরে যব, ভুট্টা, গম এবং ধানের পরিমাণ ০.৯০৫ বিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে ২.০৯১ বিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু তারপরেও বিশেষজ্ঞরা ফসলের উৎপাদন বাড়িয়েই খাদ্যসংকট নিরসনের পরামর্শ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ খাদ্যের চাহিদা ক্রমশই বাড়ছে। সুতরাং দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে যেভাবেই হোক আরও বেশি খাদ্য চাই। তবে সেটা চাষের জমি, জলসম্পদ, উদ্ভিদ কিংবা জীবজগতের ধ্বংসসাধনের ভেতর দিয়ে নয় (যেটা একুশ শতকে অহরহ ঘটছে)। করতে হবে কৃষি গবেষণায় নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করে - ÔAgricultural innovation, including research and development can help boost productivity growth and make more efficient use of available natural resourcesÕ[৫], (OECD, Trade and Agriculture Director, Ken Ash). 

 

   যাই হোক, খাদ্যনিরাপত্তা সংরক্ষণের বিষয়ে যেসব পদক্ষেপ অনুসরণ করার পরামর্শ এখন দেয়া হয় সেগুলো হলো, (১)কৃষি উন্নয়নে নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার।(২)জেনিটিক্যালি মডিফাইড প্ল্যান্ট সৃষ্টি (যা পরিবর্তিত জলবায়ুতেও উচ্চ ফলন দিতে সক্ষম এবং সাগর জল ব্যবহারের উপযোগী)।(৩)জৈব সার আবিষ্কার, (যা মাটির স্বাভাবিক পুষ্টি নষ্ট করবে না। পরিবেশ দূষণ ঘটাবে না)।(৪)বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় বায়োফুয়েল(জ্বালানি তেলের পরিবর্তে ব্যবহারের জন্য) তৈরীতে কৃষিজমির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা। (৫) গ্রীনহাউস গ্যাসের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা।(৬)কৃষকদের আধুনিক কৃষিবিষয়ে শিক্ষা দান।(৭)দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে বৈশ্বিক সহযোগিতা সৃষ্টি। (৮)খাদ্যসম্পদের অপচয়রোধ।(৯)বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বড় আকারের খাদ্য সংগ্রহশালা নির্মাণ করা।(১০) খাদ্যসম্পদের সুষম বণ্টন।(১১)দুভির্ক্ষের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালা তৈরী না করা।(১২ জনসংখ্যা কোনোভাবেই যাতে আরও  প্রচণ্ড হয়ে না ওঠে, তার জন্য সর্বস্তরের জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

 

   অবশ্য ভবিষ্যৎ দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে উপরোক্ত পদক্ষেপ নিশ্চিত সমাধান দেবেই, এমন আশ্বাস বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তা পরিষদের কর্তৃপক্ষরা দিতে নারাজ। কেননা বদলে যাওয়া জলবায়ুতে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। জনসংখ্যার আকার বড় হবে আরও। ওদিকে জিন প্রযুক্তিতে তৈরী খাদ্যকেও এ্যালার্জি, অটিজম, মুটিয়ে যাওয়া কিংবা ক্যান্সারসহ বহুবিধ রোগের কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। যাঁরা একে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা দিয়েছেন তাঁদের মতে -এই ধরনের খাদ্য উৎপাদন শুধু যে পরিবেশের ওপরেই ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করছে তাই নয়। মানুষ এবং অন্যান্য জীবের জন্যও এই খাদ্যগ্রহণ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। বিভিন্ন নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ায়, জীবজগতের পরিবর্তিত আচরণে, সামাজিক মানুষের উচ্ছৃঙ্খল নীতিহীনতা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে সেটা প্রমাণিত [৬]। 

 

  বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা অবশ্য জেনিটিক্যালি মডিফাইড খাবারকে নিরাপদ সাব্যস্ত করেই রায় দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ক্যান্সার রোগের কারণ খাদ্যে নানান ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ। তার জন্য জিন পরিবর্তিত খাদ্যশস্য কোনোভাবে দায়ী নয়। কিন্তু একই সঙ্গে অন্য পক্ষের বক্তব্য হলো, এই খাদ্য গ্রহণের সঙ্গেই অটিজম, পারকিনসন, আলসাইমার বিশেষত ক্যান্সারসহ অন্তত ২২ ধরনের অসুখের সুগভীর যোগাযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে জিন প্রযুক্তির ব্যবহার তাই বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি স্পর্শকাতর বিতর্কের বিষয়। যা নিয়ে সুদূর ভবিষ্যতেও হয়তো বা অনিঃশেষ বিতর্ক চলতেই থাকবে। এবং দুই পক্ষের মতামত সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করবে সংশয় আর সন্দেহের দোলাচল। 

 

   কিন্তু তারপরেও বাস্তবতা হলো, দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে কোটি কোটি মানুষ জেনিটিক্যালি মডিফাইড খাবার (যেমন ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সয়াবিন, মাছ, মাংসসহ বিভিন্ন ধরনের ফল এবং সব্জি) খেয়েই জীবনধারণ করছে। অন্যথায় বদলে যাওয়া জলবায়ুতে বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য খাদ্য সংকটের এই দুর্জয় পরিস্থিতি মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতো।  

তথ্য নির্দেশনা:
১.  www.dw.com/en/environment-world-population...overpopulation/a-39628974 
২. www.fao.org/save-food/resources/keyfindings/en  
৩. https://thinkprogress.org/new-research-warns-of-catastrophic-food-shortages 
৪.  https://ourworld.unu.edu/en/food-scarcity-the-timebomb-setting-nation-against-nation                                                                                                                        
৫.  www.oecd.org/.../agricultural-policies/Analyzing-policies-improve-agricultural-production.                            
৬. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2408621 


 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com