দার্জিলিং এর ডায়েরি ২

 

 

গোল বাজারের দুর্গা বস্ত্রালয়। সামনে সোকেসে একটা নীল সাউথ ইন্ডিয়ান শাড়ি আর একটা মেরুন বেনারসী কাচের সোকেসের ভেতর কুচি করে পাখনার মতো মেলে রাখা। কুচির উপর দিয়ে দিব্যা ভারতীর হাসি মুখের কাটআউট। ভেতরে ডান পাশের র‍্যাকে দামী শাড়ি বাঁ দিকে ছাপা শাড়ি  আরো বাঁদিকের র‍্যাকে বাচ্চাদের জামাকাপড় তার পর গামছা লুঙ্গী আর স্যান্ডো গেঞ্জি।  আর দোকানের একেবারে বাঁ পাশটায় বড় বড় কাঠের লম্বা লম্বা মোটা লাঠিতে সার্টের থান কাপড় পেঁচিয়ে রাখা। ঢুকতেই ধুতি পরা  পুরুষ মালিকের হাসি হাসি গলার স্বরে শোনা যেত আসুন দিদি, কি দেখাবো? ভালো ধনেখালি তাঁত এসেছে দিদি, আর জানেনে হাজার বুটির দারুণ দারুণ ফুলিয়ার তাঁত। আর এই বাচ্চাটার জন্য কিছু চাইনা দিদি? এই হরি কালকেই যে শাড়িগুলো এলো না বার কর। নিয়ে আয় এদিকে, দেখাই দিদিদের,  কি ভালো জমিন দেখবেন দিদি। আরে দেখলেই যে নিতে হবে এরকম কোনো কথা আছে নাকি? আপনারা হলেন  আমাদের বহুদিনের কাস্টোমার। দিদি আপনার দাদু আসতো আমাদের দোকানে। আমার বাবা তখন বসতো তখন আমি তখন এইট নাইনে পড়ি। সেই তখন থেকে চিনি আপনাদের। দেখুন না দিদি দেখতে ক্ষতি কি?

না। এই চেনা চেনা কথা গুলো এখনকার নয়। এসব শব্দ বাক্য আমি শুনেছি আমি যখন কলেজে পড়ি ঠিক সেই অবদি হবে। তারপর আর যাওয়া হয়নি পূজোর বাজার করতে সেই সব দোকানে। ওই দোকান গুলো বাদ দিয়ে যেখানে গেলে 50% - 80% ছাড়ে জিনিষ পাওয়া যায়, একটার সাথে আবার আর একটা ফ্রি তে পাওয়া যায়, যেখানে গেলে কেউ কিছু দেখাতে এগিয়ে আসেনা সেরকম মেগামার্ট, বিগবাজার, স্টাইলবাজারে শপিং করতে শুরু করলাম। বেশ কয়েক বছর পরে দেখেছিলাম সেই দুর্গা বস্ত্রালয়ের চারটে টিউব লাইটের মাত্র দুটো আর জ্বলে। যেখানে নতুন লাল শালু কাপড়ে মুড়ে বিয়ের বেনারসি গুলো রাখা থাকতো সেগুলো পুরোনো হয়ে কালচে হয়ে ফুটো ফুটো হয়ে গেছে। বাকি ছাপার শাড়ির র‍্যাকে ওদের নিজেদের জল খাওয়ার জগটা আর ছাতি রাখা।  শার্ট বানানোর থানের সেই লম্বা লম্বা মোটা মোটা কাপড় জড়ানো স্টিকগুলো এখন শুধুই লাঠি। আরো বেশ কিছুদিন পর দেখেছিলাম দোকানের সাটার শুধু বৃহস্পতিবারেই না সপ্তাহের অন্য অন্য দিন গুলিতেও ফেলা। তার দু তিন বছর পর আবার দেখলাম দুর্গা বস্ত্রালয়ের শাটার খোলা। ভেতরের মানুষ গুলো সব আলাদা, জিন্স টি সার্ট জ্যাকেট পরা। এদের কোনোদিন আমি অশোকনগরে দেখিনি। ওপরে টিনের ওপর এনামেল কালারে দুর্গা বস্ত্রালয়ের হোর্ডিংটা সরিয়ে দিয়ে একটা ব্যাকলিট ভিনাইলে প্রিন্ট করা 'সুইট বেবি সফট টয়েস'। ভেতরে বার্বিডল বড় বড় বন্দুক, রিমোট কন্ট্রোলের বড় বড় কার। দুর্গা বস্ত্রালয়ের দুটো অচল আর দুটো সচল টিউব লাইটের বদলে এখন বড় বড় এল ই ডি লাইটে ঝকঝক করছে ভেতরটা।

আমি এখন দার্জিলিং এর বাতাসিয়া লুপে দাঁড়িয়ে আছি। গরমের  ছুটির বেশ কয়েকটা দিন এখানে কাটাতে এসেছি। দার্জিলিং আসবো আর টয় ট্রেন চড়বো না এ কখনো হয়? টয় ট্রেনের সাথে কতো কতো নস্টালজিয়া জড়িয়ে আছে। সেই কূ আওয়াজ কয়লার ইঞ্জিনের ধোঁয়া ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক শব্দ এগুলোই তো নস্টালজিয়া।  ধোঁয়া আর সেই কয়লার ইঞ্জিনের ঘষঘষ করে চলা থেকে মূক্তি পেলে কি হবে সেই স্মৃতিটা দার্জিলিং এ এসে ফিল করাটা অতুলনীয়।  অহো! অসাধারণ! শুধু এই নস্টালজিয়াটা ফিল করবো বলে এখানে আসার  কত দিন আগেই নেটে দার্জিলিং থেকে ঘুম পর্যন্ত মাত্র এই একটা স্টেশন সফর করার জন্য ১৩৬০ টাকা খরচ করে অনলাইনে টিকেট বুক করেছি। যেখানে একটা স্টেশন এম ইউ তে চড়তে লাগে মাত্র পাঁচ টাকা।তা হোক। তাতে কি?

 বাতাসিয়া লুপে ট্রেনটা কূ কূ শব্দ করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঢুকে হল্ট দিল দশ মিনিট মতো। ট্রেন থেকে নেমে পড়ে দেখলাম যে মহিলা চশমার নীচে নেপালি ড্রেসে বরের সাথে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল সেখান থেকে ছুটে চলে এলো ট্রেনের ইঞ্জিনের ধোঁয়ার পাশে। ইঞ্জিনের ধোঁয়ার সাথে ছবি কি মিষ্টি না ব্যাপারটা! এরকম পুরো বাতাসিয়া লুপের চারপাশে যেখানে যত ট্যুরিস্ট ছিল সব যে যা করছিল ছুটে এসে ইঞ্জিনের পাশে ভিড় করে ফেলল ছবি তুলতে। স্মৃতির রোমন্থন করার  সুযোগ কে আর মিস করতে চায়? আমি ড্রেস ওয়ালার কাছে ছুটে গেলাম।  তাড়াতাড়ি যদি একটা ড্রেস ভাড়া করে পরা যায়। পারলাম না।  দরাদরি করে পোষালো না। ড্রেস ওয়ালা উলটে আমাকে বলে দিল, এক দো হপ্তা কে বাদ  পরে ঝম ঝম করে বারিষ নামবে পাহাড়ে। ল্যান্ডস্লাইড হবে। হোটেলগুলো খালি হোবে।  সব ট্যুরিস্ট আদমী নীচে নেমে যাবে অফ সিসন শুরু হয়ে যাবে। সব ইনকাম বন্ধ হয়ে যাবে। আর যখন বন্ধ শুরু হয়ে যায় না দিদি কেউ কি আসেন আপনারা আমাদের ড্রেস পরতে?

আচ্ছা, এই দার্জিলিং শহরটারই কি এটা গুন? এই শহরটাইকি আমাদের নস্টালজিক বানিয়ে দেয়  তিন দিনের জন্য এখানে ট্যুর করতে এসেই?  অদ্ভুত ব্যাপার না অথচ যেখানে আমি জন্মেছি ছোটো থেকে বড় হয়েছি যেসব দোকান বাজারের জিনিষ গুলো পড়ে আমি বড় হয়ে গেলাম আমাকে বিন্দুমাত্র নস্টালজিক করতে পারেনি। এটাকি এই শহরটার গুন নাকি আমার ভেতরের দোষ যে আসলে আমি শখ করতে হুজুগে পড়তে বড্ড ভালোবাসি  নস্টালজিয়াকে নয়। তাই বদলে যাই সব সময়ে সুবিধা মতো।

ও বলাই হয়নি সেই যে সেই আমার ছোটো বেলার সেই দুর্গা বস্ত্রালয়ের হরি যে এক হাঁক পারলেই শাড়ি গুলো শোকেস থেকে নামিয়ে আনতো একটা হাফ প্যান্ট পড়া  পনেরো ষোলো বছরের ছিপছিপে ছেলেটা, এখোনো ও হাফপ্যান্টই পরেই কাড়ায়। শুধু ওর ওই মুখটায় কতগুলো ভাঁজ পড়েছে আর কাঁচা চুল গুলোর অনেক পাকা চুলে ঢেকে গেছে। এবার অশোকনগর গিয়ে দেখেছিলাম ওকে ও রাস্তার ধারের ট্যাপ কলের জলে একটা খাকি রঙের হাফ প্যান্ট পরে বসে পরোটার দোকানের এঁটো প্লেট মাজছে।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com