শিক্ষার দিক বদল: একটি প্রতিবেদন

 

 

শিক্ষা নিয়ে সেস দিচ্ছে জনগণ, অর্থ গুনছে দেশের মানুষ।আর তার সুফলের দিক নির্দেশ হচ্ছে,শিল্পের চাহিদার দিকে। নয়া উদারর্নীতির লক্ষ্য পুরণের দায় নিয়েছে সরকার।কিন্তু গোড়াটাই ভাবা হচ্ছে না। শিক্ষা ক্ষেত্রে কেবলই উপর থেকে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে।নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়লেই সমাধান হবে না।এখন যেভাবে সমগ্র নামে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে তাতে সাক্ষরতা থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার স্বার্থ সংকুচিত হবে।কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ তালিকায় আনা থেকেই সমস্যা শুরু।শিক্ষার দায়িত্ত্ব কার,সেটি সাংবিধানিকভাবে নির্দিষ্ট কিন্ত এ নিয়ে দু পক্ষের টানা পোড়েনে শিক্ষার গুণমান নষ্ট হয়েছে।সাক্ষরতার শতাংশ বাড়লেও গুণমান তাই কমেছে। শিক্ষার দিক বদল নিয়ে একটি আলোচনা চক্রে এই কথাগুলি বলেন অশোকেন্দু সেনগুপ্ত। শিক্ষার দিকবদল নিয়ে আলোচনার তিনি ছিলেন সঞ্চালক।  আলোচনাটি আয়োজন করে ফ্রেন্ডস অফ ডেমোক্রেসি।সেন্ট পলস স্কুলের অডিটোরিয়ামে এই আলোচনার  অন্যতম বক্তা কুমার রানা বলেন, শিক্ষার দিক বদল নিয়ে আলোচনার শিরোনাম নিয়ে সংশয় আছে।কারণ কিছু বদল হয়েছে এই মাত্র, কিন্তু দিক বদল হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার অধিকার আইন চালু হওয়ার পর কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে।এই নিয়ে এখনো বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয় নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। গত ১৮বছরে বেশ কিছু বদল ঘটেছে।যেভাবে বাঙালি ধরেই নিয়েছে যে সরকারি স্কুলে পড়ানো হয় না,বাড়িতে গৃহ শিক্ষকরাই পড়াবেন, এটারও ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে।গত ২০০৪ সাল থেকে  শিক্ষকদের মধ্যে স্কুলকেই ধ্যান জ্ঞান বলে অনেক ত্যাগ ও পরিশ্রম দিয়ে বাচ্চাদের উন্নতির জন্য প্রাণপাত করছেন।'শিক্ষা আলোচনা' নামে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি হয়েছে।সাতশ শিক্ষক সেখানে যুক্ত হয়েছেন।রাজ্যের আড়াই লাখ শিক্ষকের মধ্যে এই সংখ্যাটা যত সামান্য।সরকারি সাহায্য বছরে মাত্র সাড়ে বারো হাজার টাকা।dise এর হিসেবে বলে সাড়ে সতেরো হাজার টাকা, কিন্তু কোনো স্কুল পায় না। মিড ডে মিলের জন্যে  ছাত্র পিছু নূন্যতম লাগে সাড়ে সাত টাকা, সরকার দেয় সাড়ে চার টাকার আসে পাশে।প্রায় তিন টাকার কিছু বেশি মাথা পিছু ঘাটতি।এই ঘাটতি  নিজের পরিশ্রমে চাঁদা তুলে, নিজের পকেট থেকে  দিয়ে অনেক শিক্ষক মেটানোর চেষ্টা করেন।এইভাবেই ব্যক্তিগত সামাজিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছু মানুষের উৎসাহে কিছু হচ্ছে।কিন্তু পরিকাঠামোগত অভাবে প্রাথমিক শিক্ষা খুব গভীর সমস্যায় আকীর্ণ।এই রাজ্যে ৪ শতাংশ স্কুলে এক জন টিচার। যে টাকা দেওয়া হয় তার ৯৪% টাকা চলে যায় বেতন দিতে।বাকি ৬% দিয়ে কী হবে? বিকাশ ভবন ও বাস্তবের যোগসূত্র স্কুল ইনস্পেক্টররা। তারা প্রশাসনিক কাজেই আটকে থাকেন সিংহভাগ সময়ে। শিক্ষার নানা সমস্যা।শুধু টাকা নয়, এই অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে কিছু করার চেষ্টা করলে বহু বিদ্রুপ, আক্রমনের মুখে পড়তে হয়। এর মধ্যে আবার শিক্ষার উন্নতি কল্পে সরকারের ঘোষিত পুরস্কারের জন্যেও ইঁদুর দৌড় আছে।প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে তাই নানা স্তরে সমস্যা।রাষ্ট্রীয় অনৈতিকতার  অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে আসতে গেলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক নৈতিকতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যারা লড়াই করছেন,তাতে আমাদের সক্রিয় সমর্থন দেওয়া দরকার।নইলে সামাজিক অনৈতিকতা বেড়ে যাবে ,এমন আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।

 

   প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বা উচ্চ শিক্ষা বলুন, মূল সমস্যা মানসিকতার।সরকার বলুন, প্রশাসন বলুন, আমরা সমাজে যারা ভালো আছি, কোনো না কোনোভাবে, তারা কেউই ভাবি না, যা হচ্ছে তার বেশি কি করা যায়। রাষ্ট্র কোনোদিনই পরিবর্তন চায় না।সামাজিক চেতনা দিয়েই পরিবর্তন আনতে হবে।উচ্চশিক্ষার ভিত্তি হল স্কুল শিক্ষা।স্কুল শিক্ষার গোড়া শক্ত না হলে উচ্চ শিক্ষার গোড়াও শক্ত হয় না।এর জন্যে উভয় স্তরেই পারস্পরিক আদান প্রদান জরুরি।এক সঙ্গে বসে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পাঠক্রমে সমন্বয় করা হয় নি।উচ্চ শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত যারা তাদের এই নিয়ে এগিয়ে আসা দরকার ছিল।এখন ত আবার উচ্চশিক্ষার উপর আক্রমণ নেমে আসছে।এর মধ্য দিয়েই চেষ্টা করতে হবে । সকলকে সুযোগ দিতে হবে যাতে সকলে এগিয়ে আসতে পারে।মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত যাতে সব ছেলে মেয়ে পড়ে তার জন্যে সচেষ্ট হতে হবে।সকলের জন্য উচ্চ শিক্ষা সম্ভব নয়, এটা বোঝা যায়।তাই চেষ্টা করতে হবে যাতে উচ্চ শিক্ষার কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন আনা যায়।কিন্তু তার বদলে যেটা হচ্ছে সেটা অন্য রকম।ইন্টার ডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচটা বদলে একমুখীনতা আনা হচ্ছে। পছন্দ ভিত্তিক যে সিস্টেম চালুর কথা বলা হচ্ছে,  অনেক সমস্যার মধ্যে দিয়ে সেটা করতে হচ্ছে।তাই শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।তাই শিক্ষাকে কার্যকর ভাবে ব্যবহার করার উপর নজর দিলে ভাল হয়।শুধু কোনো বিষয়ে জ্ঞান নয়,যাতে সেই জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগানো যেতে পারে,সেটা ভেবে এখন ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিকটি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।এর ফলে উচ্চ শিক্ষার শুদ্ধ বিদ্যা চর্চার দিকটি ভীষণভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।গবেষণার দিকটি মুখ থুবড়ে পড়ছে।কার্যকর বিদ্যার দাপটে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ কমে যাচ্ছে।কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে যে হারে অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে,তাতে অর্থ উপার্জনের জন্যে শিক্ষা ছাড়া প্রকৃত শিক্ষার চর্চা কমে যাচ্ছে।তাতে নতুন করে অশিক্ষিত একটি শ্রেণী তৈরি করে তোলা হচ্ছে।শিক্ষাকে শিল্পের মতো করে দেখা হচ্ছে।সারস্বত শিক্ষার জায়গাটা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।আর্থিক অনটন এর একমাত্র কারণ নয়।রাজনৈতিক কারণেই এমনটা করার জন্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।হাজার ত্রুটি সত্বেও আমাদের রাজ্যের বিশ্ব বিদ্যালয়গুলিতে যে গুণমানে উচ্চশিক্ষায় সারস্বত্বের চর্চা হচ্ছে,যে মানের গুণমানে গবেষণা হচ্ছে সেটা দেশের মধ্যে সেরা।এখনও যেভাবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কতৃপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাজ হচ্ছে এই রাজ্যে, সেটা বলার মত। ইউজিসি-র নেতৃত্বে যেভাবে  রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার অনেক দোষ ত্রুটি সত্বেও কিছু স্থায়ী উন্নতির জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল।সেটি আরো অন্তত কয়েক দশক চললে, আমাদের আগামী প্রজন্ম কিছু ভবিষ্যৎ খুঁজে পেতে পারত।কিন্ত সেটিও বদলে নতুন করে যেভাবে উচ্চশিক্ষা থেকে রাষ্ট্র হাত গুটিয়ে নিচ্ছে তাতে আগামী দিনের জন্য আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com