শিক্ষার সমস্যা

 

 

শিক্ষার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার সময় নানা দিক থেকে নানা কথা বলা হয়।আসল কথাটা কেউ বলেন না।সেটা হলো, শিক্ষার লক্ষ্যটা ঠিক করে ক্ষমতা। সে তার স্বার্থেই গড়ে নিতে চায় এমন একটি অজ্ঞাবাহী দক্ষ অনুগামী যে তাঁকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে কিন্তু কখনো মাথা উঁচু করে নিজের দাবিতে সংগঠিত হবে না। এই ভাবেই এক সময় শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করত চার্চ। তারপর রাষ্ট্র।তার ক্ষমতায় যে যখন আসে সেই ই নিজের স্বার্থে শিক্ষার বদল ঘটায় রূপে-স্বরূপে-কাঠামোয়-নিয়ন্ত্রণের রকম ফেরে।শিক্ষা নিয়ে আলোচনার আগে, শিক্ষার সমস্যা নিয়ে সমাধানের কথা ভাবার আগে তাই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন শাসকের চরিত্র।শাসনের প্রকৃতি।তা না হলে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা কানা মাছি ধরার মত হয়ে যায়।

 

   এদেশে এইখানে একটা গোলমাল রয়েছে।শিক্ষা কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ তালিকা ভুক্ত।মানে এ দেশে শিক্ষা দুই স্তরের শাসকের টানাটানিতে বিপর্যস্ত হওয়ার জন্যেই সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধ।তার মানে একটা অস্থির শিক্ষা ভাবনাকেই যুক্তিসিদ্ধ বলে ভেবে নেওয়া হয়েছে।এর পিছনে প্রধান কারণ এদেশের বৈচিত্র্যের সংস্কৃতি।সেটাই এদেশের আত্মা।তাই ইউরোপীয় কাঠামোয় শিক্ষার এককেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ সংবিধান প্রণেতারা ভাবেন নি।এটা যেমন একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক, অন্য আঁধারে ঢাকা দিকটি হল বাস্তবের সংঘর্ষপূর্ন রাজনৈতিক স্বার্থের গিলটিনে ভারতীয় শিক্ষার স্বরূপহীন হয়ে যাওয়া।এরই বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া এবং তার দায় বইতে হচ্ছে এখন দেশবাসীকে।

 

   যদি বলেন কেন? উত্তরে তাহলে বলি, এদেশের রাজনীতিতে দেশীয় স্বার্থ কোনোদিনই দলগুলির কাছে গুরুত্ব পায় না।তারা চলে ভোট আর নোটের হিসেবে। শিক্ষাকে যেভাবে চালালে এ দুটিতে সফল হওয়া যায় সেটিতে ই তাদের আগ্রহ। রাজনৈতিক শ্রেণী কখনোই চায় না দেশের মানুষের অভাব মিটে যাক।কিংবা চোখ খুলে যাক।তাহলে আর জনগণ ক্ষমতার প্রসাদ পেতে ক্ষমতাসীনের পিছনে দৌড়বে না।বরং ক্ষমতায় নিজেকে বসাতে সঙ্ঘবদ্ধ হবে।সেটা ক্ষমতায় যারা ছিলেন এবং আছেন তাঁরা সকলেই জানেন।তাই ক্ষমতায় এসে কেউই দেশের শিক্ষার প্রকৃত উন্নতিতে খরচ করে না।খরচ যে টুকু না করলে নয় সেটুকুই করে, এবং তা থেকেই ভোটের বাক্সে রিটার্ন চায়।যতক্ষণ সেই চাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষিতশ্রেণী চলে ততক্ষণ তারাই হয়ে যায় ক্ষমতার রাজনীতির অংশ।কখনো ক্ষমতাসীনের পক্ষে কখনো বিপক্ষে থেকে তারা দর কষাকষি করে আখের গোছায়।বৃহত্তর সমাজ পড়ে থাকে যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই।

 

   স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষার সংস্কারে তাই যত গুলি কমিশন বসেছে তার নিট ফল ,লাভ হয়েছে শাসকের।দেশবাসী শুধু ভালো ভালো কথা শুনেছে। কাজের কাজ হয়েছে লোক দেখানো।শিক্ষার প্রসার ঘটাতে গিয়ে নিজের দলের লোক ঢুকিয়ে দলীয় রাজনীতি হয়েছে।দলের নেতা ঘুষ পেয়েছে।তাতে দল সব দিক থেকে পুষ্ট হয়েছে।যিনি টাকা দিয়ে শিক্ষক হয়েছেন তিনি ত আর পড়ানোর যোগ্যতা নিয়ে শিক্ষকতার কাজটা করতে যান নি।তাই তার দ্বারা ছাত্ররা শেখে না।অন্যদিকে যারা স্কুল সার্ভিসের মত পরীক্ষা দিয়ে সফল হয়ে চাকরি করতে এসেছেন,তারাও এসেছেন চাকরি করতে।শিক্ষা দেওয়ার মত মানসিক যোগ্যতা কার আছে? সেটা দেখতে গেলে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে।এখন বলছে, শিক্ষকতার ট্রেনিং ছাড়া শিক্ষকতা করতে দেওয়া হবে না।খুব ভালো কথা।এটাও লোক দেখানো।কারণ যে ট্রেনিং তারা নেবেন সেই প্রশিক্ষণ কাজে লাগানোর কোনো পরিবেশ ও পরিকাঠামো এদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে নেই।তার জন্যে প্রচুর শিক্ষক নিয়োগ করা চাই।তাহলে তার জন্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হয় ততোধিক।সেটাই ত করা হবে না। শিক্ষায় টাকা না দিয়ে বাজেটে কর ছাড় দেওয়া হবে শিল্পপতিদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা।প্রতিরক্ষায় খরচ বাড়ানো হবে প্রতিবেশীর আগ্রাসী অবস্থান দেখিয়ে।ওটাও রাজনীতি।যুদ্ধ কোনোদিনই হবে না।কিন্তু যুদ্ধের জুজু দেখিয়ে প্রতিরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো হবে।তাহলে দু দিকে লাভ।এক, বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলির কাছ থেকে অস্ত্র কিনে তাদের সমর্থন নিয়ে বিশ্বের বাজারে টিকে থাকতে পারলে ঘরে বাইরে মূলধন বিনিয়োগ বাড়ে। তাতে দেশের জি ডি পি বাড়ছে দেখিয়ে দেশবাসীকে কিছু চাকরি ও আয়ের সন্ধান দেখাতে  সুবিধা হবে।তাতে যারা লগ্নি করবে তারও দলের তহবিলে দেবে চাঁদা।আর যাদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনা হবে তারাও দেবে কাটমানি।সেটা নিয়ে শাসক বিরোধীর রফা হয়ে যায়। গোলমাল তাতে না হলে কোনো লেনদেন নিয়ে হৈ চৈ হওয়ার কথা নয়।হয় ও না।

 

   শিক্ষার সমস্যা নিয়ে এসব কথা বলতে আসা মানে কেউ ভাবতে পারেন ধান ভাঙতে শিবের গীত গাইছি। আদৌ তা নয়।আসলে এগুলোই মূল কারণ যা শিক্ষার সমস্যা তৈরি করে কিংবা সমস্যা রেখেই দেয়,চেষ্টাই করা হয় না দূর করার।শাসক সব জানে।কিন্তু চায় না সমাধান হোক।তাই সমস্যা চলতেই থাকে।এর জন্যে কোনো এক দলকে দায়ী করলে ভুল হয়ে যাবে।দল যেইইই হোক, এটাই রাজনীতি।রাজনীতির নিয়মেই সব দলকেই এমনভাবে চলতে হয়।তাই শিক্ষানীতি নিয়ে যা কিছু ঠিক করা হয় সেটা হয় কিছু আপ্ত বাক্য, নয়ত শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি ও অর্থ কামানোর কৌশল।অনেক ভেবেও 'কামানো'  শব্দের চাইতে কোনো ভালো ,শালীন ও রুচিসম্মত শব্দ পাওয়া গেল না।কামানোর ব্যাপারটা আগে ছিল না।নয়া উদারনীতিতে যেদিন থেকে শিক্ষায় বেসরকারি লগ্নির ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে সরকারি নীতিতেই, সেদিন থেকে পুঁজির সঙ্গে গোটবন্ধনে শিক্ষার ক্ষেত্র হয়েছে কামিয়ে নেওয়ার অবারিত মুক্ত প্রাঙ্গণ।গত ২৫ বছরে তার উৎকট প্রকাশ এতটাই বিস্তার লাভ করেছে যে রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ক্রমশ গুটিয়ে নিচ্ছে উচ্চশিক্ষায়,বদলে হচ্ছে বেসরকারি কর্পোরেট এর ব্রান্ডেড শিক্ষা।এখানে ব্র্যান্ড গুরুর নামে নয়(যেমনটি বিশ্বভারতী),এখানে ধরা হচ্ছে, শিক্ষার বাজারটা যত বড় হবে,  বেসরকারি পুঁজি আসবে তত বেশি।তাদেরকে পাওয়া মানে রাষ্ট্র ও দল উভয়েরই লাভ। জনগণ সেই বেসরকারি উদ্যোগের শিক্ষা বাজারে নিজের ক্ষমতায়  যা পারবেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হবে।এভাবেই মানুষ ভেবে নিতে শিখবে শিক্ষায় রাষ্ট্রের কোনো দায় নেই।যেমন এখন মেনে নিয়েছে যে ইস্কুলে শিক্ষক না থাকলে সেটা স্বাভাবিক। তাঁরা না পড়ালেও সেটাও স্বাভাবিক।বাড়িতে গৃহ শিক্ষক রেখে পড়ে নিতে হবে।যার ক্ষমতা থাকবে, সে তত বেশি গৃহ শিক্ষক রাখবে।রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার এই অক্ষমতা ও অদক্ষতা যতই মানুষ পেতে পেতে অভ্যস্ত হচ্ছে ততই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁকটা স্বাভাবিক চাহিদা হিসেবেই গণ্য হচ্ছে। স্কুল যদি পড়িয়ে পাঠাত,তাহলে যেমন টুইশানির বাজার তৈরি হতো না।ঠিক তেমনই রাষ্ট্রীয় শিক্ষার কাঠামো যত ব্যর্থ হবে, ততই বেসরকারি শিক্ষার রমরমা ।রাজনীতি এটাই।শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি পুঁজির বিকাশে লাভ ক্ষমতার।ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষের।দেশটা তারাই চালায়।তাই তারা নিজেদের স্বার্থেই চাইবে না শিক্ষার সমস্যা মিটুক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে।

 

   সমস্যা দূরীকরণের নয়, সমস্যা জিইয়ে রাখার রাজনীতি । সেটা এ দেশে প্রবল।এটা শুধু এদেশে নয়, সমস্ত উন্নয়নশীল দেশেই।আসলে এটাও একটি বিশ্বজনীন সত্য যে আধুনিক এই সময়ে পুঁজির বিকাশের জায়গাটা হয়ে গেছে শিক্ষা,স্বাস্থ্যের মত পরিষেবা ক্ষেত্রগুলি। পুঁজির সঙ্গে রফা করেই রাজনীতিকরা মানুষের পরিষেবা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রকে।এই যেখানে অবস্থা, সেখানে শিক্ষার সমস্যা মেটাবে কে? রাষ্ট্র আর মেটাবে না।নিজেকেই অর্জন করে নিতে হবে।যারা পারবে, তারা তাদের খরচ করার ক্ষমতা অনুযায়ী উন্নত স্কুলে পড়াবে।যারা পারবে না, তাদের জন্যে থাকবে একটা এমন ব্যবস্থা যা কার্যত ভোটের রাজনীতিতে ভোট কুড়াতে, প্রতিশ্রুতি দিতে, ইস্তাহার বানাতে কাজে লাগবে। সেটাও যদি না হয়, দলের তহবিল ফুলিয়ে তুলতে এবং  লুম্পেন বাহিনী তৈরিতে কাজে লাগবে।তাই সমস্যা যত থাকবে, তত মঙ্গল দেশ-চালকদের ও তাঁদের প্রসাদ পাওয়া অনুগত শ্রেণীর।ব্রিটিশ আমলেও এমনটা ছিল, পরাধীন ভারতের লক্ষণ এখন স্বাধীন ভারতেও। চলছে সেই একই অবস্থা।শাসক বদলায়,শোষণের জন্যে শিক্ষাকে দুর্বল ও সমস্যা জর্জরিত করে রাখা হয়।

 

   শিক্ষার সমস্যা তাই জিইয়ে রেখে দেওয়া হবে। কোনোদিন ই গোড়া পেড়ে দূর করা হবে না। কিন্তু, শিক্ষা নিয়ে নতুন নতুন কমিশন ্তৈরি হবে। নতুন নীতিও নেওয়া হবে। সবটাই ক্ষমতা ও পুঁজির স্বার্থে, গোটবন্ধনের বোঝাপড়ায়। দেশ বা জনগণ সেখানে উপেক্ষিত। 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com