বাংলার প্রতিবাদের গান ও কবিতা

 

আমাদের সর্বোত্তম সম্পদটি কী? এই যে আমরা এত সঞ্চয় করি, লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখি আমাদের পার্থিব সম্ভার , এসবই কী আমাদের একমাত্র সম্পদ?  মজার কথা হল, মানুষ কিন্তু তার সর্বোত্তম সম্ভারটিকে অনেক সময়েই সঠিক চিনে উঠতে পারে না।  সে বুঝে উঠতে পারে না, যে তার ভালোবাসা, মানবতা বোধ,বিচার ক্ষমতা আর চেতনাই তার প্রকৃত সম্পদ, এসবই তাকে  অনন্য করে তোলে।আমাদের সম্পদ আমাদের সম্পর্ক, আমাদের পারস্পরিক বন্ধন, আমাদের স্বাধীনতা। তবু যখনই এই অপার্থিব সম্পদের দিকে কোন লোভাতুর হাত এগিয়ে আসে, কুক্ষিগত করে ফেলতে চায় ছলে বলে কৌশলে-  মানুষ গর্জে ওঠে প্রতিরোধে, প্রতিবাদে। তার হৃদয় মথিত করে উৎসারিত হয় কবিতা,কণ্ঠে জেগে ওঠে প্রতিবাদের গান। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকটির কথাই ধরা যাক।  এটি একটি রূপকধর্মী বা সাংকেতিক নাটক,যার কুশীলব হলেন এক অমিত শক্তিধর রাজা আর তার দরিদ্র প্রজাবৃন্দ। রাজার চোখে তার প্রজারা স্বর্ণলাভের যন্ত্র।তারা শুধুই এক একটা নম্বর।মানুষ হিসাবে তাদের কোন মূল্য নেই। নন্দিনী রাজার কাঙ্ক্ষিতা এক সাধারণ মেয়ে। রাজার লোভ তাকে করায়ত্ত করতে পারে না।আসলে নন্দিনী হল মানুষের বোধ, স্বাধীন চেতনা। সে প্রতিবাদ করতে শেখায়। লোভকে তুচ্ছ করে মুক্তির পথ দেখায় মানুষকে।যদি একটু পিছনের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব- অন্যায় ও ভীরুতা যখনি আমাদের গ্রাস করতে হাত বাড়িয়েছে , তখনি কবির কলম আর কণ্ঠ নন্দিনী হয়ে গর্জে উঠেছে গানে আর কবিতায়। 

কবিতা ও সঙ্গীত মানুষের ভাবনার দ্বার খুলে দেয় , ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে থাকা একটি সমাজ বা একটি দেশের চিন্তা ও চেতনার আমূল পরিবর্তন  করে । ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বাংলার মাটি বাংলার জল গানটি আপাত দৃষ্টিতে একটি প্রার্থনা । অথচ এই প্রার্থনাই কেমন হাতিয়ার হয়ে ওঠে, সঙ্ঘবদ্ধ করে তোলে আপামর বাঙালিকে। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করার যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন কিছু সুবিধাবাদী স্বার্থান্বেষী মানুষ তথা ব্রিটিশ সরকার, এই গান তার বিরুদ্ধে এক দুর্বার প্রতিরোধের রূপ নিয়েছিল। 

সেইসময় স্বদেশী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল বাংলা তথা সারা দেশেই। বরিশালের নিস্তরঙ্গ জীবনেও আছড়ে পড়েছিল তার ঢেউ। বরিশালের কংগ্রেস নেতা তখন অশ্বিনীকুমার দত্ত। চারণকবি মুকুন্দদাস তাঁর কাছে দীক্ষা নিলেন। অশ্বিনীকুমার দত্তের অনুরোধেই লিখলেন যুগান্তকারী গান।ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে, মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে।। বরিশাল হিতৈষী পত্রিকায় মুকুন্দদাসের লেখা গান প্রকাশিত হল। কী অপূর্ব তেজ সেই গানে!গানটি যেন বাঙালির শিরায় শিরায় বইয়ে দিয়েছিল উন্মাদনার রক্তস্রোত। বাঙালি উদ্বুদ্ধ হয়েছিল জাতীয়তাবাদী চেতনায়-  

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার দেশাত্মবোধক গানে যোগ করেন এক নতুন মাত্রা। সংগ্রামের গান বা যুদ্ধের গান।তাঁর রচিত  “কারার ওই লৌহ কপাট” বা “এই শিকল পরা ছল” এর মতো  গানগুলি বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেয় বাংলার পথে ও প্রান্তরে। কথিত আছে, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বিদ্রোহী কবি নজরুলের গানে এমন আপ্লুত হয়েছিলেন, যে তিনি অনুগামীদের নির্দেশ দেন , ‘‘আমরা যখন যুদ্ধে যাব- তখন নজরুলের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব-তখনও নজরুলের গান গাইব।”

কবি সত্যদ্রষ্টা, তিনি কবিতার মাঝে সত্যকে প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় ব্যথিত রবীন্দ্রনাথ ১৩৪৯ সালে খ্রীষ্ট উৎসবের দিনে সৃষ্টি করলেন এক গভীর অর্থবহ গানের। “একদিন যারা মেরেছিল তারে গিয়ে,রাজার দোহাই দিয়ে...” ঈশ্বরের কাছে তাঁর প্রতিটি সন্তান বড় আদরের। তাই এক সন্তান যখন অন্য সন্তানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে উন্মত্ত হিংসায়, পূজার মন্ত্রকে কলুষিত করে তোলে স্বার্থান্বেষী আকাঙ্ক্ষায়... সেই আঘাত বারবার রক্তাক্ত করে স্বয়ং ঈশ্বরকেই । 
                   একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে 
                       রাজার দোহাই দিয়ে 
                 এ যুগে তারাই জন্ম নিয়েছে আজি,
                 মন্দিরে তারা এসেছে ভক্ত সাজি–
                       ঘাতক সৈন্যে ডাকি 
                       ‘মারো মারো’ ওঠে হাঁকি ।
                 গর্জনে মিশে পূজামন্ত্রের স্বর–
                 মানবপুত্র তীব্র ব্যথায় কহেন, হে ঈশ্বর !
                 এ পানপাত্র নিদারুণ বিষে ভরা 
                 দূরে ফেলে দাও, দূরে ফেলে দাও ত্বরা ।।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এদেশে ঘটে আরও একটি নিন্দনীয় ঘটনা। ১৯৪৩ সালে জাপান বার্মার দখল নিলে বাংলার চালের যোগানে টান পড়ে। ওদিকে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাদলের জন্য চার্চিল সরকার লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য শস্য মজুত করে। এই সুযোগে অসাধু আড়তদারের দল নিজেদের ভাঁড়ারে অন্যায়ভাবে মজুত করে স্তূপীকৃত ধান। বাংলায় শুরু হয় মন্বন্তর। না খেতে পেয়ে মারা যায় প্রায় ৩০ লক্ষ লোক। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘বিবৃতি’ কবিতাটি তার জ্বলন্ত দলিল। 

আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,
জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে,
দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল,
প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল।

আহার্যের অন্বেষণে প্রতি মনে আদিম আগ্রহ
রাস্তায় রাস্তায় আনে প্রতিদিন নগ্ন সমারোহ;
বুভুক্ষা বেঁধেছে বাসা পথের দু'পাশে,
প্রত্যহ বিষাক্ত বায়ু ইতস্তত ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাসে।

মধ্যবিত্ত ধূর্ত সুখ ক্রমে ক্রমে আবরণহীন
নিঃশব্দে ঘোষণা করে দারুণ দুর্দিন,
পথে পথে দলে দলে কঙ্কালের শোভাযাত্রা চলে,
দুর্ভিক্ষ গুঞ্জন তোলে আতঙ্কিত অন্দরমহলে!
দুয়ারে দুয়ারে ব্যগ্র উপবাসী প্রত্যাশীর দল,
নিষ্ফল প্রার্থনা-ক্লান্ত, তীব্র ক্ষুধা অন্তিম সম্বল;
রাজপথে মৃতদেহ উগ্র দিবালোকে,
বিস্ময় নিক্ষেপ করে অনভ্যস্ত চোখে।
পরন্তু এদেশে আজ হিংস্র শত্রু আক্রমণ করে,
বিপুল মৃত্যুর স্রোত টান দেয় প্রাণের শিকড়ে,
নিয়ত অন্যায় হানে জরাগ্রস্ত বিদেশী শাসন,
ক্ষীণায়ু কোষ্ঠীতে নেই ধ্বংস-গর্ভ সংকটনাশন।
সহসা অনেক রাত্রে দেশদ্রোহী ঘাতকের হাতে
দেশপ্রেমে দৃপ্তপ্রাণ রক্ত ঢালে সূর্যের সাক্ষাতে।

তবুও প্রতিজ্ঞা ফেরে বাতাসে নিভৃত,
এখানে চল্লিশ কোটি এখনো জীবিত,
ভারতবর্ষের 'পরে গলিত সূর্য ঝরে আজ-
দিগ্বিদিকে উঠেছে আওয়াজ,
রক্তে আনো লাল,
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।
উদ্ধত প্রাণের বেগে উন্মুখর আমার এ দেশ,
আমার বিধ্বস্ত প্রাণে দৃঢ়তার এসেছে নির্দেশ।

আজকে মজুর ভাই দেশময় তুচ্ছ করে প্রাণ,
কারখানায় কারখানায় তোলে ঐক্যতান।
অভুক্ত কৃষক আজ সূচীমুখ লাঙলের মুখে
নির্ভয়ে রচনা করে জঙ্গী কাব্য এ মাটির বুকে।
আজকে আসন্ন মুক্তি দূর থেকে দৃষ্টি দেয় শ্যেন,
এদেশে ভাণ্ডার ভ'রে দেবে জানি নতুন য়ূক্রেন।

নিরন্ন আমার দেশে আজ তাই উদ্ধত জেহাদ,
টলোমলো এ দুর্দিন, থরোথরো জীর্ণ বনিয়াদ।
তাইতো রক্তের স্রোতে শুনি পদধ্বনি
বিক্ষুব্ধ টাইফুন-মত্ত চঞ্চল ধমনী:
বিপন্ন পৃথ্বীর আজ শুনি শেষ মুহুর্মুহু ডাক
আমাদের দৃপ্ত মুঠি আজ তার উত্তর পাঠাক।
ফিরুক দুয়ার থেকে সন্ধানী মৃত্যুর পরোয়ানা,
ব্যর্থ হোক কুচক্রান্ত, অবিরাম বিপক্ষের হানা।।

কৃষিপ্রধান দেশ বলেই বোধ হয় চিরকাল ভারতে সর্বাধিক নিপীড়িত হয়ে এসেছে  কৃষক সমাজ। প্রতিটি দুর্ভিক্ষে কৃষকের ঘরে ঘরে মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে এসেছে।নিস্তার পায়নি একটি পরিবারও। কোণঠাসা হতে হতে একসময় কৃষক পরিণত হয়েছিল  বর্গাদারে। কৃষকের রক্ত আর ঘামে লেখা হয়েছিল বঞ্চনার ইতিহাস। ১৯৪৬ সালে কৃষকদের সংগঠিত আন্দোলনের ঝড় নতুন করে রচনা করেছিল ইতিহাসের পাতা। স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়েছিল তেভাগা আন্দোলনের সাফল্যের কথা। তাদের মনে জেগে ওঠা এই নতুন দিনের আশা আর হারানো দিনের যন্ত্রণা মূর্ত হয়ে  উঠেছিল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায়-  

এই হেমন্তে কাটা হবে ধান
আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলেরি বাণ
যদিও পরবর্তীতে গান হিসাবেই এটি বেশী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

শুধু সুকান্ত ভট্টাচার্যই নন, মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের ছবি সমসাময়িক এবং পরবর্তী প্রজন্মের আরও বেশ কয়েকজন কবির কবিতায় আমরা খুঁজে পাই। শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষের যমুনাবতী কবিতাটির কথাই ধরা যাক। কবি যেন সেই সময়ের সমস্ত বিষ ধারণ করেছেন নীলকণ্ঠ হয়ে। তার হৃদয় নিংড়ে বের হয়ে আসছে এক একটি পংক্তি। দু মুঠো গরম ভাতের জন্য ভুখা মিছিলে হাঁটতে গিয়েছিল যে কিশোরী, তার কাছে গরম ভাতের বদলে উড়ে এসেছিল গরম বুলেট। অনুভবী কবির কাছে তাই নিভন্ত চুল্লী হয়ে উঠল চিতার প্রতীক। 
নিভন্ত এই চুল্লিতে মা
একটু আগুন দে,
আরেকটুকাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে!
নোটন নোটন পায়রাগুলি
খাঁচাতে বন্দী-
দুয়েক মুঠো ভাত পেলে তা
ওড়াতে মন দিই!

হায় তোকে ভাত দেবো কী করে যে ভাত দেবো হায়
হায় তোকে ভাত দিই কী দিয়ে যে ভাত দিই হায়

‘নিভন্ত এই চুল্লি তবে
একটু আগুন দে,
হাড়ের শিরায় শিখার মাতন
মরার আনন্দে!
দু’পারে দুই রুই কাতলার
মারণী ফন্দী-
বাঁচার আশায় হাত-হাতিয়ার
মৃত্যুতে মন দিই!

বর্গী না টর্গী না কংকে কে সামলায়
ধার চকচকে থাবা দেখছো না হামলায়?
যাস নে ও হামলায় যাসনে!
কানা কন্যার মায়ের ধমনীতে আকুল ঢেই তোলে- জ্বলে না,
মায়ের কান্নায় মেয়ের রক্তের উষ্ঞ হাহাকার মরেনা
চললো মেয়ে রণে চললো!
বাজে না ডম্বরু অস্ত্র ঝনঝন করে না জানলো না কেউ তা
চললো মেয়ে রণে চললো!
পেশীর দৃঢ় ব্যথ, মুঠোর দৃঢ় কথা, চোখের দৃঢ় জ্বালা সঙ্গে
চললো মেয়ে রণে চললো!

নেকড়ে-ওজর মৃত্যু এলো
মৃত্যুরই গান গা-
মায়ের চোখে বাপের চোখে
দু’তিনটে গঙ্গা!

দূর্বাতে তার রক্ত লেগে
সহস্র সঙ্গী
জাগে ধ্বক ধ্বক, যগ্গে ঢালে
সহস্র মণ ঘি!

যমনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে
যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে
বিষের টোপর নিয়ে!
যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ-পথ দিয়ে
দিয়েছে পথ গিয়ে!

নিভন্ত এই চুল্লিতে বোন আগুন ফলেছে!! 


এদেশের কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসের সব থেকে উজ্জ্বলতম অধ্যায় হল অর্ধস্বত্বভোগী  জমিদারদের বিরুদ্ধে তেভাগা আন্দোলন। ১৯৪৬ সালে সংঘটিত এই আন্দোলনে অবিভক্ত বাংলার ৬০ লাখের বেশী কৃষক অংশ নিয়েছিল। পুলিশ ও জমিদার জোতদারের গুলিতে শহীদ হয়েছিল ৮৬ হাজার কৃষক, আহত হয়েছিল ১০ হাজার।তেভাগা আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল,  ফসলের তিনভাগের দু'ভাগের মালিক হবে কৃষক। জমিদার পাবে একভাগ।

তেভাগা আন্দোলনের দাবী কবিতার চেয়েও অনেক বেশী করে ছাপ ফেলেছে সেই সময়কার গানে। কৃষকদের চাঙ্গা রাখতে আন্দোলনের সহশক্তি হিসাবে প্রচুর গান রচিত ও গাওয়া হয়েছে৷ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও সার্থক গানগুলো রচনা করেছেন গত শতাব্দীর গণসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ সলিল চৌধুরী৷ মেহনতী মানুষের সংগ্রামকে উপজীব্য করে যেসব গান তিনি রচনা করেন, তার প্রতিটি উচ্চারণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেছিল সংগ্রামী মানুষের মন৷ সে সব গানে মানুষের ঘুমন্ত চেতনা ও বিবেক নতুন দ্রোহে জেগে উঠেছিল৷ তাঁর হেই সামহালো ধান হো গানের সাথে সাথেই গণসঙ্গীতে লৌকিক সুরের অবতারণা করেন সলিল চৌধুরী।

হেই সামালো হেই সামালো 
হেই সামালো ধান হো, 
কাস্তেটা দাও শানহো 
জান কবুল আর মান কবুল 
আর দেবো না আর দেবো না 
রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট সকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর লিটল বয় নামের নিউক্লীয় বোমা ফেলে এবং এর তিন দিন পর নাগাসাকি শহরের ওপর ফ্যাট ম্যান নামের আরেকটি নিউক্লীয় বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।  এই ঘটনায় হিরোশিমাতে প্রায় ১৪০,০০০ লোক মারা যান।[১][২] নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪,০০০ লোক মারা যান এবং পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২১৪,০০০ জন। সারা বিশ্ব নিন্দা এবং ধিক্কারে ফেটে পড়ে। বাংলায় হেমাঙ্গ বিশ্বাস লেখেন  শঙ্খচিলের গান- 

সুদূর সমুদ্দুর প্রশান্তের বুকে
হিরোশিমা দ্বীপের আমি শঙ্খচিল
আমার দু’ডানায় ঢেউয়ের দোলা
আমার দু’চোখে নীল শুধু নীল ;
সাগরের জলে সিনানের শেষে প্রবালের সিঁড়ি বেয়ে
মত্স্যগন্ধা মেয়ে
ঝিনুক নূপুরে রুণু ঝুনু ঝুনু
যেতো সে সাগরিকা
ঝিলিক মিলিক নাচিয়ে গলায় মুক্তার মালিকা।
পূর্বাচলের প্রাঙ্গনে
সাগরিকার অঙ্গনে
দিগবধুরা খেলেরে-----
সমুদ্রহিল্লোলে তার দোলে হৃদয় দোলে
শঙ্খচিলের সঙ্গীতে তার স্বপন দুয়ার খোলে
দারুচিনি বনের পাখায় সোহাগ চামর দোলে
দোলে হৃদয় দোলে---- ।
হঠাৎ সেদিন শুভ্রশরৎ সকালে
মায়াবী রোদের রূপালী ঝালর ছিন্নভিন্ন ক'রে
কোন বিষাক্ত বাসুকীর ফণা দিগন্ত দিল ঢেকে।
প্রলয়ংকর নিঃশ্বাসে তার ধ্বংস ছড়াল দিক্ বিদিক
আণবিক সে, দানবিক সে মৃত্যু-নৃত্য নেচে
ধ্বংস-নৃত্য নেচে।
দারুণ আগুন দহনজ্বালায় দগ্ধ ভস্মীভূতা----
প্রশান্তদুহিতা।
প্রশান্তদুহিতা, মরমিয়া মিতা কোথা সাগরিকা গো
বাতাসে ঝুরিছে বাদল ঝিরঝির আকাশে ঝুরিছে তারা
দিগবধূরা গুমরি গুমরি কাঁদিছে সঙ্গীহারা
বেলাভূমি বুকে আছড়ি ঢেউ কাঁদে, কোথা সাগরিকা গো।
আমার অঙ্গীকার, আমার এ অঙ্গীকার
আক্রান্ত প্রশান্তের অশান্তবিহঙ্গ দুরন্তদুর্নিবার।
ঝড়ের নিশানা আমার দু’ডানা চিরউড্ডীন, অক্লান্ত
প্রশান্ত হতে অতলান্ত
প্রতিরোধ, প্রতিশোধ, চিরক্ষমাহীন চিরক্ষমাহীন।
আমার শান্তিগানে বিদ্রোহবাণ আনে
আফ্রোএশিয়া আমেরিকায়
আমার ডানায় তোলে আঁধিয়া আকাশতলে
ঝনন ঝনন মরুঝঞ্ঝা সাহারায়,
নদনদী প্রান্তরে অরণ্য অন্তরে, পাহাড় গহ্বরে
রক্তে আদায় করি রক্তের ঋণ
আমি ভিয়েতমিন আমিই ভিয়েতমিন আমি ভিয়েতমিন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই নিষ্প্রয়োজন হয়ে উঠলেও প্রতিবাদী কবিতার প্রয়োজন কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। ১৯৪৮ সালে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা অগ্নিকোণ নামক কবিতাটি পড়লে আমরা যে বারুদের গন্ধ পাই, তা তখনও তরতাজা। 

অগ্নিকোণের তল্লাট জুড়ে দুরন্ত ঝড়ে তোলপাড় কালাপানি
খুন হয়ে যায় সাদা সাদা ফেনা
ঘুম ভাঙা দলবদ্ধ ঢেউয়ের
ক্ষুরধার তলোয়ারে

বনেজঙ্গলে ঝটপট করে প্রতিহিংসার পাখা
কাঁধের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে দিয়্যে
ধনুকের মতো বাঁকা পিঠগুলো
টান করে ঘুরে দাঁড়ায়-
পেরাকে পেনাঙে টিনের খনিতে
রবারের বনে
মশলার দ্বীপে
সোনাফলা ইরাবতীর দুধারে
উপত্যকায় বদ্বীপে,নীলকান্তমণির
ঝিকিমিকি দেশে
শ্যামে কম্বোজে
অনামী পাহাড়ে
মেকং নদীর বান ডাকা জলে
ঘুম ভেঙে ওঠা অগ্নিকোণের মানুষ।
রক্তের পাঁকে শত্রুকে পুঁতে
অন্ধকারের বুকে হাঁটু দিয়ে দুহাতে উপড়ে আনে
দুঃশাসনের ভিৎ।
মেঘে মেঘে তারা চকমকি ঠুকে
পথের নিশানা করে।
বজ্রের সুরে বেঁধে নেয় গলা ।হাঁকে
দিন এসে গেছে ভাইরে-
রক্তের দামে রক্তের ধার 
শুধবার
দিন এসে গেছে ভাই রে-
বিদেশিরাজের প্রাণভোমরাকে 
নখে নখে টিপে মারবার।
দিন এসে গেছে
লাঙলের ফালে আগাছা উপড়ে 
ফেলবার...
তাঁর কবিতার হাত ধরে দিন আসে, স্বপ্ন দেখতে শেখে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মানুষ। “পোড়া মাঠে মাঠে বসন্ত জেগে ওঠে” । 

শ্রমজীবী ঐক্যের বিরুদ্ধে স্বদেশী বিদেশী শোষকের হাতে চিরন্তন হাতিয়ার হল সাম্প্রদায়িকতা। শোষিত মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে,বিভক্ত করে লুটের স্বরাজ বাঁচিয়ে রাখার এই পদ্ধতিকে ধিক্কার জানিয়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে শ্রমজীবী মানুষকে এক হয়ে দাঙ্গার বিরুদ্ধে মিলনের সেতু বাঁধার এই আহ্বান রচিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে- 
ও মোদের দেশবাসীরে—
আয়রে পরাণ ভাই আয়রে রহিম ভাই
কালো নদী কে হবি পার।
এই দেশের মাঝেরে পিশাচ আনেরে
কালো বিভেদের বান,
সেই বানে ভাসেরে মোদের দেশের মান।
এই ফারাক নদীরে বাঁধবি যদিরে
ধর গাঁইতি আর হাতিয়ার
হেঁইয়া হেঁই হেঁইয়া মার, জোয়ান বাঁধ সেতু এবার |
এই নদী তোমার আমার খুনেরি দরিয়া
এই নদী আছে মোদের আঁখিজলে ভরিয়া
এই নদী বহে মোদের বুকের পাঁজর খুঁড়িয়া
(মোরা) বাহু বাড়াই দুই পারেতে দুজনাতে থাকিয়া
(ওরে) এই নদীর পাকে পাকে কুমীর লুকায়ে থাকে
ভাঙে সুখের ঘর ভাঙে খামার,
হেঁইয়া হেঁই হেঁইয়া মার, জোয়ান বাঁধ সেতু এবার।
বুকেতে বুকেতে সেতু অন্তরের মায়া ঘিরে বাঁধিরে
কুটিলের বাধা যত ঘৃণার নিষ্ঠুরাঘাতে ভাঙ্গিরে
সাম্যের স্বদেশ ভূমি গড়ার শপথ নিয়ে বাঁধিরে
হেঁইয়া হেঁই মারো, জোর বাঁধি সেতু বাঁধিরে
বাঁধি সেতু বাঁধিরে।

জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে যখন কেবলি প্রতিবন্ধকতা মানুষকে ঘিরে ধরে , তখন কবিতা ও সঙ্গীত আমাদের আশা জাগায়, অন্ধকারে পথ চলতে শেখায়। একটি  আপাত নিরীহ কবিতাই  অনেক সময় সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে, তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগায়, তাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট করে। তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত বন্দে মাতরম। ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসে প্রথম এই গানটি প্রকাশিত হয়। রচনার অব্যবহিত পরে লেখক যদুভট্টকে গানটিতে সুরারোপ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।তার পরের ইতিহাস আমাদের অনেকেরই জানা। 
এই লেখার উদ্দেশ্য অন্য কিছু নয়, শুধু এটুকুই মনে করিয়ে দেওয়া- যে আমাদের ঐতিহ্য অন্যায়কে মেনে নেওয়ার কথা বলে না। আমাদের ঐতিহ্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে নন্দিনীর দৃঢ়তার কথা বলে। আমরা আমাদের নিরাপত্তা আর স্বাচ্ছন্দ্যের লোভে  ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে প্রাণপণ চোখ টিপে বন্ধ করে বেঁচে আছি আজকাল। এ প্রসঙ্গে আবার ফিরে যাই শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষের কাছে। তাঁর 'ধূম লেগেছে হৃদ্ কমলে ' বই থেকে দুটি লাইন উদ্ধৃতি দিই- 

"তোমার স্বাচ্ছন্দ্য দেখি, দূর থেকে 
রঞ্জনেরা খুন হলে তুমি বলো, 'মরেনি ও , 
আমার ভিতরে বেঁচে আছে' ... "

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com