প্রাইভেট টিউশন মেধা বৃদ্ধির অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে

 

 

 

মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পরেই প্রতিটি চ্যানেলে মেধা তালিকায় থাকা ছাত্রছাত্রীদের আলোর বৃত্তে নিয়ে আসা হয়। বিষয়টি নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই দেখা যায়। পরবর্তী জীবনে এদের অনেকেই হারিয়ে যায়। মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া ছাত্রছাত্রীরা বছরের পর বছর প্রায় একই কথা বলেন। যেমন বড় হয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। তাঁদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রাইভেট টিউটর। প্রায় সকলেরই পাঁচ থেকে সাতজন প্রাইভেট টিউটর থাকে। হিসেব করলে সাবজেক্ট পিছু একজন গৃহশিক্ষক। আমার এক বন্ধু ঠাট্টা করে বলেছিল পারলে এগ্রিগেটেও গৃহশিক্ষক রেখে দিত। কেন প্রতিটি বিষয়ে গৃহশিক্ষকের প্রয়োজন হয়? স্কুলে কি পড়াশোনা হয় না? নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা এখানে ভাগ করে নিচ্ছি। আমি যে স্কুলে পড়তাম সেখানে তিনজন অঙ্ক শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন পাঠ্য বইয়ের অঙ্কগুলি করিয়ে ও বুঝিয়ে দিতেন। অন্য শিক্ষক পাঠ্য বইয়ের বাইরে কঠিন অঙ্কগুলি সমাধান করে দিতেন। আর তৃতীয় জন গণিতের ইতিহাস আর গণিত নিয়ে বিভিন্ন ধাঁধার পাঠ আমাদের দিতেন। ফলে গণিত নিয়ে আমরা বিভিন্ন খেলায় মেতে উঠতাম। সেই সব শিক্ষকরা আজ কোথায়।

সেই মেধাও আজ নেই। 

 

   অনেকেই রে রে করে উঠবেন। আগের সব ভাল এখন সব খারাপ বলার এ এক নয়া ট্রেন্ড হয়েছে। বিষয়টা শিক্ষকের মান নিয়ে নয়। প্রশ্ন শিক্ষকের আন্তরিকতা ও কর্তব্য নিয়ে। আধুনিক সমাজে সবকিছু মূল্য দিয়ে বিচার হয়। এখানে মূল্য বলতে মানবিক মূল্যের কথা বলছি না বলছি অর্থ মূল্যের কথা। ভোগবাদি সমাজে অর্থই নিয়ন্ত্রণ করে সব কিছু। শিক্ষকরাও এর বাইরে নয়। স্কুলে যে শিক্ষক সময়মতো ক্লাসে আসেন না কিংবা বিভিন্ন ছুতোয় ক্লাস কামাই করেন, তিনি কিন্তু সঠিক সময়ে প্রাইভেট কোচিংএ চলে আসেন। তিনি জানেন স্কুলে না পড়ালেও তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে না। কিন্তু একদিন কোচিং কামাই করলে পড়ুয়া ও তাঁর অভিভাবকরা ছেড়ে কথা বলবেন না। অনেক অভিভাবককেই বলতে শোনা যায়, কাড়ি কাড়ি টাকা নিচ্ছেন, সেই অনুপাতে রেজাল্ট কোথায়। নিজের ছেলের যোগ্যতা ও মেধার বিষয়টি বেমালুম ভুলে যান। টাকার সঙ্গেই সাফল্যের সম্পর্ক। ফলে সকলেই ভাবেন যত প্রাইভেট টিউটর বাড়বে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে নাম্বার। এক্ষেত্রে যে প্রাইভেট টিউটরের সাফল্য যত বেশি তার কদরও তত বেশি। যে কারণে অভিভাবকরা অনেক দূর থেকেও ওই শিক্ষকের কাছে পড়ুয়াকে নিয়ে চলে আসেন।  এই প্রবণতা দিনকে দিন বাড়ছে। সম্প্রতি প্রাইভেট টিউশনের এই রোগ নিরাময়ের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একটি সমীক্ষায় প্রকাশ, প্রাইভেট টিউশনের ব্যাপারে এই রাজ্য এক নম্বরে। অথচ বছর চল্লিশ আগেও প্রাইভেট টিউশনের এই রমরমা ছিল না। এর জন্য অভিভাবকরাই দায়ী। তাঁরা নিজেদের দায় এড়াবার জন্য ছেলেমেয়েকে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পাঠিয়ে দেয়। অনেক শিক্ষিত বাবা-মাই নিয়ম করে ছেলেমেয়েদের পড়াতে বসায় না। কিন্তু তাঁরা যদি সামান্য উদ্যোগ নিতেন তা হলে প্রাইভেট টিউটরের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত না। যে কারণে সবার আগে প্রয়োজন অভিভাবকদের চৈতন্য ফেরা। প্রথমত প্রাইভেট টিউশনে পড়ুয়াদের মেধার বৃদ্ধি ঘটছে কি?

 

   এর কথায় উত্তর,না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ছোটবেলা থেকেই পড়ুয়ারা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ছে। অভিভাবকারা ছেলেমেয়েদের কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দিয়ে নিজেরা দায় মুক্ত হন। ফলে ছোটবেলা থেকেই পড়ুয়ারা পাঠ্য বিষয়কে সঠিক অনুধাবন না করেই কৌশলে বাজিমাত করার পদ্ধতিতে রপ্ত হয়ে যায়। অনেক সময়ই বেশ কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা যায়, উনি সাজেশন দেন না। যিনি সাজেশন দেন ও যার সাজেশন মিলে যায় তিনিই মহান শিক্ষক। সম্প্রতি একটি উদ্যোগ চোখে পড়ছে যে সব ছাত্রছাত্রী প্রাইভেট টিউশন নেয় না তাঁদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। এই রকম উদ্যোগ চালু করতে চাইছে বেশ কিছু বেসরকারি স্কুল। তবে রোগটা শুধু পুরনো নয়, বেশ গভীর। সহজে নিরাময় সম্ভব নয়। বিশেষ করে অভিভাবকদের বুঝতে হবে নাম্বারই সব নয়। আর প্রাইভেট টিউটর নির্ভরতা মেধা বৃদ্ধির অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পাঠ্যবই ঠিক করে না পড়ে সাজেশন নির্ভর হয়ে পড়ছে পড়ুয়ারা। এই টেলর মেড পদ্ধতি প্রকৃত শিক্ষা দেয় না - এই বিষয়টি অভিভাবকরা যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করবেন তত মঙ্গল।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com