প্রণবের নাগপুর 'দর্শন' : দেউলিয়া রাজনীতির সেম সাইড গোল

 

 

 

প্রণব মুখার্জী গিয়ে সেম সাইড গোল খেয়ে ফিরলেন।। তাঁর আর এস এসের সদর দপ্তরে যাওয়া  নিয়ে প্রবল রাজনৈতিক বিতর্ক ওঠে। কংগ্রেসের ভিতরে বাইরে সমালোচনার ঝড় ওঠে। রাহুল গান্ধী নিজেও টুইটারে মুখ খোলেন।  মত পরিবর্তনের আর্জি জানিয়ে শেষ মুহূর্তে আর এস এসের অনুষ্ঠানে না যেতে অনুরোধ করেন প্রণব - কন্যা নিজেও। কিন্তু নিজের প্রতি অগাধ আস্থায় অটল প্রণববাবু সেখানে গেলেন।ভেবেছিলেন হয়ত ভিনি ভিডি ভিসি র মতো করে বাঘের ঘরে ঢুকেই বাঘ মেরে আসবেন।কিন্তু সেটা আর হলো না।রাজনীতির কুটিল খেলায় এতদিন অপরাজিত থেকেও শেষে তাল কেটে ফেললেন হেগরেওয়ারকে স্মরণ করতে গিয়ে।তাঁকে ভারত মাতার মহান সন্তান বলে নিজেকেই  বিতর্কের কাঠগড়ায় তুলে দিলেন নিজেই।

 

   এমনটা যে হবে প্রণববাবু কি ভেবেছিলেন? 

 

   আর এস এসের মঞ্চে নিজের জাত চেনাতে তিনি শুরু থেকেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। সংক্ষিপ্ত  অথচ ক্ষুরধার প্রাজ্ঞ ভাষণেই বুঝিয়ে দেন, কেন তাঁকে এক সময়ে ভারতীয় রাজনীতির "চাণক্য" বলা হতো। খোদ সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘকে সহিষ্ণুতা ও বহুত্ত্ব বাদের শিক্ষা দিলেন।সঙ্ঘ চালকদের প্রণব বাবু বুঝিয়ে দিলেন, কেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ প্রকৃত পক্ষে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শের বিরোধী। একটির পর একটি বাছাই করা শব্দ বন্ধে প্রমান করে দিলেন, আর এস এস কেন ভারতের ঐতিহ্য, পরমত সহিষ্ণুতা ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে না পেরে এই দেশ ও দেশের সংস্কৃতি,ইতিহাস ও পরম্পরাকে ধ্বংস করছে।গান্ধীজির নাম না করেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন কেন গান্ধীজির চোখে আর এস এস ছিলেন ব্রাত্য।একটিবারের জন্যেও তিনি ভাষণে আর এস এসের ভাবনা চিন্তা বা কর্মকান্ডের কথা নিয়ে কিছুই বলেন নি। আসলে রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতায় অন্ধকারকে আঁধার না বলে, আলো কেন ভালো আর কাকে বলে অন্ধকার সেটা বুঝিয়ে দিয়ে প্রণববাবু  কার্যত কংগ্রেসের নেহেরু দর্শনকেই তুলে ধরলেন।

 

   কিন্তু হেগড়েওয়ারের বাড়িতে গিয়ে কি করলেন তিনি? এটাও কি তার পরমত সহিষ্ণুতার সৌজন্য? নাকি ঊনিশের দিকে তাকিয়ে নতুন সমীকরণ? যে কথাই ভেবে প্রণব বাবু ও রকম লিখুন, দিনের শেষে তিনি সেম সাইড গোল খেয়েই মাঠ ছাড়লেন। নিজের ভাষণে যে তিন বৈশিষ্ট্যে এই দেশ  সকলের ভারত হয়ে উঠেছে বললেন,তার চরম বিরোধী হেগড়েওয়ারকেই ভারত মাতার গর্বের সন্তান বলে নিজের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন।সঙ্গে সঙ্গে গুগল হেগড়েওয়ারের উইকিপিডিয়াতে জীবনিপঞ্জিতে লিখে দিল,"He was a great son of mother India"as told by former President of India." যে হেডগেওয়ার ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কংগ্রেসের ডাকে আন্দোলনে যোগ না দিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে হেডগেওয়ার জাতির জনক গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরামকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেই হেডগেওয়ারকেই ভারত মাতার  মহান সন্তান বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন কে? ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি।

 

   গুগল যখন প্রণবের এমন উক্তিকে প্রণিধান করে হেগরেওয়ারের জীবনী আপডেট করছে, তখন রিপাবলিক টিভিতে  অর্ণব গোস্বামী চিল চিৎকারে বলে চলেছেন, একমাত্র তারাই জানতে পেরেছেন প্রণববাবু কেন নাগপুরে গেছেন। অর্ণবের ব্যাখ্যা, যদি আগামী ২০১৯ সালে নির্বাচনের পর দেখা যায় বি জে পি পেয়েছে ২১০ থেকে ২৪০ এর মধ্যে আসন, তাহলে মমতার মত অ-কংগ্রেসি দলগুলি যারা এখনো প্রণবের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছে তারা প্রণবকেই প্রধানমন্ত্রী করে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে একটি সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারে। তার সম্ভাবনা ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে দেখেই প্রণব আগে থেকে আর এস এসের সমর্থন পেতে নাগপুর ঘুরে এলেন। কি আশ্চর্য কষ্ট কল্পনা।তার জন্যে একেবারে সরাসরি "প্রণব : ব্যাক ইন পলিটিক্স" বলে বিতর্কের আসর জমাট করতে বসে গেলেন। নানা কথার ফুলঝুরিতে  যুক্তি সাজাতে লাগলেন। মনে রাখতে হবে, কথাগুলো বলছেন অর্ণব গোস্বামী ,যিনি  রোজ রাত্রে ডিবেট আয়োজন করে বিজেপির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করার জন্যে প্রাণপাত করেন ,সেই অর্ণব বলছেন যিনি বিজেপি সাংসদের টাকায় চলা republic টিভিতে বসে কথাগুলি বলছেন।, তাহলে কি এটা বি জে পি হিসেব করেই নিয়েছে যে আগামী ভোটে  তারা আড়াইশো র কম সিট পাবে,তার সম্ভাবনা জোরালো। মা ভৈ।  মা ভৈ। অর্ণবকে তাই নিপাতনে সিদ্ধ করেই বলতে হচ্ছে , বি জে পি কি তাহলে এটা ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছে যে অ-কংগ্রেসি নেতারা নিজেদের বাদ দিয়ে  সরকার গঠনের জন্য প্রণবকেই মাথায় এনে বসবেন!! তার জন্যে কংগ্রেসকে ঠেকাতে প্রয়োজনে সঙ্ঘ পরিবার সমর্থন দেবে কোনো অ-কংগ্রেসি জোটকেই।

 

   অর্ণব গোস্বামীর এমন  " স্কুপ "শুনে আর এস এস কি ভাবতে পারে?।মোহন ভাগবত এর উত্তর শুরুতেই  বলে দিয়েছেন।সংক্ষিপ্ত স্বাগত ভাষণে প্রণব মুখার্জিকে " জ্ঞান সমৃদ্ধ,অনুভব সমৃদ্ধ" ব্যক্তি বলে উল্লেখ করে বলেন, কে কী বলছে তা নিয়ে সঙ্ঘ কিছুই ভাবছে না।প্রণব বাবুর এখানে আসার পরেও প্রণববাবু প্রণব বাবুই থাকবেন। সঙ্ঘ "সঙ্ঘ"।

 

   যদি এভাবেও দেখতে চান কেউ তাহলেও বলতে হয় এর চাইতে বড় রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা আর কিছু হয় না একজন আজীবন কংগ্রেসির পক্ষে। প্রনববাবু অবশ্য বলেছেন, যেদিন থেকে তিনি রাষ্ট্রপতি  হয়েছিলেন, সেদিন থেকেই তিনি আর কংগ্রেসি নন, একজন ভারতীয়। তাহলেও প্রশ্ন ওঠে, প্রণব বাবু কি তাহলে দীর্ঘ রাজনৈতিক  জীবনে যত বার মন্ত্রী হয়েছিলেন ততবারই কংগ্রেসি না হয়ে ভারতীয় হয়েছিলেন? এখন জীবনের শেষে এসে হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা হেডগেওয়ারকে মহান আদর্শপুরুষ বলে ভাবার কি কারণ হয়ে পড়লো?,তাই  কি তাঁকে দেশেরও গর্বের সন্তান বলে ভাবতে চাইছেন প্রণব?

 

   হে চাণক্য !! এ আপনার কী সন্দেশ ! কি বার্তা দিয়ে গেলেন দেশবাসীকে?  ভাষণের কথায় এক, আর স্মরণ-লেখায় আরেক মতাদর্শের জয়গান। একই দিনে মাত্র কিছু সময়ের ব্যবধানে এমন স্ববিরোধিতা?  পরমত সহিষ্ণুতার দৃষ্টান্ত দেখাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠাতাকেই ভারত মাতার মহান সন্তান বলে লিখে ফেললেন যে যিনি নিজে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধী ছিলেন। যাঁর সংঘকে খোদ গান্ধীজি সন্ত্রাসবাদী বলে মনে করতেন। কোন আদর্শটা আমরা তাহলে সামনে রাখব ? হে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, আপনিই জানান, আপনি সত্যিই  কী চাইছেন ? দেশবাসী জানতে চাইছে। এটা ত আপনার  কেবলই সৌজন্য কিংবা সহিষ্ণুতার আদর্শে অসহিষ্ণুতার ধারককে প্রশংসা করা নয়। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্তঃকলহ নয়।ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িক সহনশীলতার প্রশ্নে দেশ এখন  সন্ধি ক্ষণে।আমরা বিভ্রান্ত।

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com