নীরবে নিঃশব্দে চলে গেলেন কলিম খান

   

 

 

   নীরবে নিঃশব্দে চলে গেলেন কলিম খান। সম্ভবত, তাঁর যে কাজ, তা অনুধাবন করতে আরও কিছু প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ প্রণেতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের ব্যাপ্তি ও গূঢ়তা আজও অধিকাংশের কাছে অধরা। একজন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন, হয়তো তাই কাজটা তিনি সেরে রাখতে পেরেছিলেন। যেখানে হরিচরণ শেষ করেছিলেন, কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী শুরু করেছিলেন সেখান থেকে।

 

   ভাষা নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা ধারণ করে চৈতন্য ও ইতিহাসের উপাদান। দৃশ্যগত জগতকে বোঝানোর জন্য ভাষার কোনও প্রয়োজন নেই, অদৃশ্যকে বোঝাতে ও তার নাগাল পেতেই ভাষার উদ্ভব।  তাই শব্দের শরীর যে বর্ণ দিয়ে গঠিত, সে বর্ণের রয়েছে নির্দিষ্ট অর্থ। আমরা আধুনিক কালে এসে ক্রমেই সে বর্ণের আধার থেকে চ্যুত হয়েছি। আমরা হীন হয়েছি। চোখে আঙ্গুল দিয়ে কলিম খান আমাদের তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর ও রবি চক্রবর্তীর দীর্ঘ সাধনার ফসল ক্রিয়াভিত্তিক  ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ – যেখানে বর্ণ, শব্দ, বাক্যের উৎসমুখে যে ক্রিয়া কাজ করে, সেই তার মাতৃগর্ভ। আমকে কেন আম বলে, গাধাকে গাধা – তা নিয়ে কলিম খান আমাদের বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে তা আরবিট্রারি (যেমন তেমন চয়ন) নয়, তার এক ক্রিয়াবাচক তাৎপর্য আছে। শিল্প বিপ্লবের তাড়ণা আমাদের সমগ্র অস্তিত্বকে প্রতীকী বস্তুতে পরিণত করেছে। আমরা স্মৃতি থেকে উৎখাত হয়ে ইতিহাস বিচ্যুত নামবাচক ধর্মে মুখ গুঁজেছি।

 

   গ্রামবাংলার সুজলা সুফলা কর্মভিত্তিক জীবনের যে অনুষঙ্গে কলিম খান বেড়ে উঠেছেন সেখানেই তাঁর সৃজনরসের নাড়িটি বাঁধা। সে নাড়ির সংযোগ বহুকাল হল আধুনিক অর্ধভঙ্গ মানুষ পরিত্যাগ করেছে। তাই কলিম খানের নাগাল পাওয়া তার পক্ষে দুঃসাধ্য। প্রথাগত শিক্ষাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে  যে রত্নরাজি তিনি উদ্ধার করে এনেছেন তার মূল্য বুঝতে এখনও আধুনিক জনের বহু ক্রোশ হাঁটা বাকী। প্রথাগত শিক্ষা সড়ক দিয়ে হেঁটে এলে এই ‘খুল যা সিম সিম’ মন্ত্রের হদিশ তিনি পেতেন না। যারা প্রতিষ্ঠানের গহ্বরে বসে ভাষাচর্চার বড়াই করেন, তাঁরা তাই জানেনই না ‘অ’ বা ‘আ’এর অর্থ কী, আর কেনই বা তাদের অর্থ থাকে। তাঁরা এও বোঝেন না, একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ কেন। তবুও রবীন্দ্রনাথ আমাদের কিছুটা বাঁচিয়েছেন, হরিচরণ আলো দিয়েছেন। ইংরেজি ভাষার অবস্থা তো করুণতর। সে ভাষার অধিপতিরাই আবার এ দুনিয়ার শাসক। তাই আমাদেরও অধঃপতন সুনিশ্চিত।

সমস্ত কাজের সারসংকলন করে কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী তাঁদের শেষ বইটি রেখে গেছেন এই উচ্চারণে – ‘ভাষাই পরম আলো’। সেই আলো হোক আমাদের পাথেয়। তবেই মানবজীবনের সুদিন।

 

   এই সাধককে প্রণাম।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com