“কোন রাজনৈতিক দলটা ধর্মনিরপেক্ষ বলুনতো এই দেশে?” – সমীর আইচ

 

 

 

বিদ্দ্বজনদের নিজের শিবিরে টানতে বিজেপি এসেছিল সমীর আইচের কাছে। সরাসরি প্রখ্যাত এই শিল্পী বিজেপিকে ‘না’ বলে দিয়েছেন। কিন্তু, একই সঙ্গে পরিবর্তনের দাবি তোলা অন্যতম এই মুখ আজ প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন, “সিপিএম-র চেয়ে তৃণমূল বেশি ভয়ংকর”। বলতে দ্বিধা নেই তাঁর, জাতীয় রাজনীতিতে দিল্লির ক্ষমতা পেতে গিয়ে রাজ্য কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে কংগ্রেস হাইকমান্ড। স্পষ্টবাক সমীর আইচ এইভাবেই বর্তমান রাজ্য রাজনীতির ভাষ্য তুলে ধরেছেন বিবেকের ভূমিকায়। রাজনীতি-অর্থনীতির বিশ্লেষক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারটি তাই যেমন অকপট ও বিস্ফোরক, তেমনি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।

 

প্রশ্নঃ প্রথমেই bodhmag.com-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাই। আমরা শুনলাম, আপনার কাছে বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এসেছিলেন রামলালবাবু। উনি কি একাই এসেছিলেন?

 

উত্তরঃ না, সঙ্গে রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে দিলীপ ঘোষও ছিলেন। আমি বললাম যে আমি সরাসরি রাজনীতি করতে পারব না। উনি বললেন আমাকে সরাসরি রাজনীতি করতে হবে না।আমরা একটা পুস্তিকা বের করব, সেখানে আপনার নাম থাকবে। নরেন্দ্র মোদী কী কী করছেন, তাই নিয়ে আমরা বিস্তারিত লিখব সেখানে। আমি তখন বললাম, ওনার সরকারের কাজকর্ম নিয়ে আমার প্রচুর বক্তব্য রয়েছে, সেটা ওনারা বললেন আমরা শুনতে চাই। আমি বললাম, সেকথা বলতে গেলে ছ’ঘন্টা লেগে যাবে। তারপর আমি নোটবাতিল থেকে শুরু করে একের পর এক বিষয়ে আমার নানা ক্ষোভের কথা জানালাম। ওনারা বললেন, সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে সংশোধন করা হবে। আপনারা একটু ওয়েট করুন। এগুলো সব রেকটিফাই হবে।

 

প্রশ্নঃ নরেন্দ্র মোদীর প্রতি সবথেকে বড়ো যে অভিযোগ, বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, সেটা কি তারা সংশোধন করবে?

 

উত্তরঃ আমি সমস্তটাই জিজ্ঞেস করেছি প্রশ্ন তো অনেক আছে। যেমন আপনাকে বলি, “কোন রাজনৈতিক দলটা ধর্মনিরপেক্ষ বলুনতো এই দেশে”? আমি ওদেরকে যখন একথা জিজ্ঞেস করলাম, তখন দিলীপবাবু বললেন, দেখুন, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরাও ভেবেছি। পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমাদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মুসলিম প্রার্থী পশ্চিমবঙ্গে। পলিটিক্যালি আমাদের অনেক কথা বলতে হয়, কিন্তু বাস্তবের রাজনীতিতে তা হয় না।    

 

প্রশ্নঃ পশ্চিমবঙ্গে কোথাও কোথাও ৬০-৭০ শতাংশ মুসলিম আছেন। সেক্ষেত্রে এদের রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে?

 

উত্তরঃ ওরা বলছে, ওদের পশ্চিমবঙ্গে প্রার্থীদের ৬০-৭০ শতাংশ মুসলিম।  এই নিয়ে আমার নিজেরও অনেক প্রশ্ন আছে। ওরা বলছে, এগুলো কেন্দ্রীয় কমিটি দেখে। আমি এই নিয়ে অনেক কথা বলেছি। পেট্রোপণ্যের দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে একটার পর একটা পয়েন্ট নিয়ে বলেছি। তা সত্ত্বেও বলব, বিজেপি’র নেতা-কর্মীরা তবুও সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছেন, তাঁদের সাথে যোগাযোগ করছেন, জনসংযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। আমাদের অভিযোগগুলো তো শুনছেন। অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তো সাধারণ মানুষকে পাত্তাই দিচ্ছে না। সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া দরকার।

 

প্রশ্নঃ রাহুল গান্ধী তো সারা দেশ জুড়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে যাচ্ছেন, জনসংযোগ করার চেষ্টা করছেন।

 

উত্তরঃ ভালো তো। যে যাবে সেই ভালো।

 

প্রশ্নঃ আগামী লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে আপনার কী বক্তব্য? বিজেপি দাবি করছে যে তারা ২২টি আসনে জয়লাভ করবে। আপনারও কি তাই মনে হয়?

উত্তরঃ একটা সময় এখানে মনে হত যে লেফট ফ্রন্টের সূর্য কোনোদিনই ডুববে না। তারপর কিন্তু তারা গো-হারা হেরেছিল, এগারো সালে সেটা আমরা দেখেছি। এখন তারা প্রায় নিশ্চিহ্ন। এখন যেভাবে মানুষ শাসক দলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছে, যেভাবে শাসক দল মানুষকে ভোট দিতে দিচ্ছে না, এই ম্যাজিকটা কিন্তু আবার ঘটতে পারে। তখন বিজেপি জিতবে না কে জিতবে আমি আমি জানি না, কিন্তু শাসক দলের হারার সম্ভাবনা কিন্তু প্রবল হয়ে উঠছে।

 

প্রশ্নঃ তার মানে এখন শাসক দল নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুলটা মারছে?

 

উত্তরঃ একদমই তাই। এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসক দল নিজেই জিততো, বরং সন্ত্রাস করতে গিয়েই সাধারণ মানুষ তাদের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছে। এবং আমি আরেকটা কথা বলব। এই যে তারা বিরোধীশূন্য করে দেবার হুমকি দিচ্ছে, এরফলে যেটা হচ্ছে যে শাসকদের কিছু গোষ্ঠীই বিরোধীর ভূমিকা পালন করছে। বিরোধী দলের কোনো প্রয়োজনই নেই। শাসকের একটা গোষ্ঠী ভাবছে আমরা ভোট পাব, তখন অন্য গোষ্ঠীও ভোট পেতে চাইছে। আজকে পশ্চিমবঙ্গে শাসকদলের সবচেয়ে বড়ো বিরোধীপক্ষ হল শাসকদল নিজেই এবং তারা নিজেরাই নিজেদেরকে মারছে। মানুষ বাঁচার জন্য বিকল্প সব সময়েই খোঁজে, এটাই নিয়ম। আমরা বন্যার সময় দেখি, একই গাছে সাপ মানুষ কুকুর বেড়াল সব আশ্রয় নিয়েছে। কে কোথায় বিজেপি করল, কে কোথায় সিপিএম করল, কে কোথায় কংগ্রেস করল, আমি সেটা বলতে পারব না। এটা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

প্রশ্নঃ বিকল্প উঠে আসার জন্য তো ভালো নেতৃত্ব দায়ী। সেক্ষেত্রে দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বে কি বিজেপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

 

উত্তরঃ বিজেপির নেতৃত্ব নিয়ে আমি কোনোভাবেই ভাবি না। সেটা তাদের বিচার্য বিষয়। আমার বিচার্য বিষয় হল পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা।

 

প্রশ্নঃ যারা পরিবর্তনপন্থী ছিলেন তাঁরা অনেকেই তো এখন শাসক দলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।

উত্তরঃ অনেকে একটু করে মুখ খুলেছেন, আবার টুক করে মুখ বন্ধ করে দিচ্ছেন খানিকক্ষণ পর।

 

প্রশ্নঃ পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক হানাহানি এবং পুলিশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কয়েকদিন আগে কলকাতায় মহাবোধি সোসাইটিতে চিকিৎসক এবং অধ্যাপকদের বিভিন্ন সংগঠন একটি প্রতিবাদসভার আয়োজন করেছিলেন। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ, ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন (কুটা), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন (জুটা) ইত্যাদি আঠেরোটা সংগঠনের বক্তারা জানিয়েছেন যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা একান্তই প্রয়োজন।  এখন প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই শাসক তাকে শত্রু হিসেবে ধরে নেবে এবং তাকে একেবারে দুমড়ে দেবে – এই রকম এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বের একটা ছায়া কিন্তু আবার তৈরি হয়েছে। এই বিষয়ে আপনার কী মত?

 

উত্তরঃ একদম। আমার মনে আছে, সেই সময় আমরা যখন সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে মিছিল করেছিলাম, তখন আমাদের কাছে প্রচুর ফোন আসত। প্রত্যেকে জিজ্ঞেস করত, আবার কোথায় মিছিল হবে ? কোথায় জমায়েত হবে ? এঁদের মধ্যে কলেজ শিক্ষকরা ছিলেন, বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা ছিলেন, ডাক্তাররাও ছিলেন। আবার সেই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ব্যানার্জী অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেডের আন্ডারে কতদিন মানুষ থাকবেন? এর বিরোধিতা তো হবেই। এই যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে এত মানুষ মারা গেল, এর জবাবটা কে দেবে? এর জবাব তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া উচিত।

 

প্রশ্নঃ সেই হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের তো কোনো প্রতিরোধ নেই।

উত্তরঃ এই হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। সর্বভারতীয় দলগুলো ব্যালেন্স করার জন্য আঞ্চলিক দলগুলোকে চটাতে চায় না। এটা শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয় সারা ভারতেরই সমস্যা।

 

প্রশ্নঃ পশ্চিমবঙ্গে লড়াইটা তো তৃণমূল বনাম বিজেপিই হচ্ছে। এখন সিপিএম-এর অধিকাংশ লোক তো বিজেপিতেই চলে যাচ্ছেন। তাই নয় কি?

উত্তরঃ আবার সিপিএম-এর যা যা স্টেটমেন্ট, সেগুলো আবার তৃণমূলের পক্ষে যাচ্ছে।

 

প্রশ্নঃ এরপরেও বিধানসভা নির্বাচনে কি কোনো ছাপ ফেলতে পারবে বিজেপি? বিকল্প হিসেবে কারা উঠে আসছে?

উত্তরঃ পশ্চিমবঙ্গে পলিটিকাল গ্রাফটা এত চট করে নামে আর ওঠে যে বোঝা খুব মুশকিল।

 

প্রশ্নঃ নাগরিক সমাজের মধ্যে কি হাওয়া বদলাচ্ছে?

 

উত্তরঃ নাগরিক সমাজ তো বঞ্চিত এবং দংশিত। এবং তাঁরা দংশিত হতে হতে নিজেরাই বিষাক্ত হয়ে গেছে। এই নাগরিক সমাজ এতকিছুর পরে বাঃ বাঃ বাঃ বাঃ করে যাচ্ছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি বলতে যে মুখগুলোকে বলা যায়, সেই মুখগুলো যখন ওনার পাশে বসে থাকে আর আমরা দু’চারজন তাঁর প্রতিবাদ করি, উনি কয়েকজন ফুটবলারকে দু’লাখ টাকা করে দিয়ে দিলেন কোচিং করানোর নামে, ব্যাস - হয়ে গেল। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।

 

প্রশ্নঃ তাহলে কয়েকজন ছাড়া কেউ তো শাসকের বিরুদ্ধে কোনো কথাই বলছেন না। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন হল, সিপিএমের সন্ত্রাস বেশি ভয়ানক ছিল, নাকি বর্তমান শাসক দলের সন্ত্রাস বেশি ভয়ানক?

 

উত্তরঃ বর্তমান শাসক দল তৃণমূলের সন্ত্রাস অনেক বেশি ভয়ানক। অনেক বেশি ভয়ানক, একটু আধটু নয়।

 

প্রশ্নঃ মানুষ তো বিকল্প চাইছে, কিন্তু বিকল্প আসবে কোথা থেকে?

 

উত্তরঃ বিকল্প যে কোথা থেকে আসবে, সেটা কেউ বলতে পারবে না। আমরা কি কখনও ভেবেছি যে তৃণমূল কখনও সরকারে আসবে? মানুষ যদি গড়ে ষাট বছর পর্যন্ত বাঁচে, তাহলে তো লোকগুলো পাল্টাচ্ছে না, দলগুলো পাল্টাচ্ছে। তৃণমূলের মধ্যে যারা মার খাচ্ছে এখন, তারা সব অন্য দলে চলে যাবে। সেটা গেল একদিক। আরেকদিকে যারা মার খেতে খেতে সর্বস্ব হারাচ্ছে, তারা একসময়ে ঘুরে দাঁড়াবে। 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com