সুন্দরবনের বনবিবি সংস্কৃতি - উৎসব এবং সমসাময়িক ভাবনা

 

আমেরিকার আদিবাসী এবং বাস্তুবিদ চিফ সিয়াটেল (জন্মঃ ১৭৮৬খ্রিঃ – মৃত্যুঃ ১৮৬৬খ্রিঃ) বলেছিলেন, “পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তনে মানুষের কোনো ভূমিকা নেই। আমরা মহাবিশ্বের একটি কণা মাত্র। প্রাণোজ্জ্বল এই পৃথিবীতে আমাদের প্রত্যেকটি কৃতকর্ম স্বার্থপরতার নামান্তর। এই জগতের সব সুর একই তারে বাঁধা। একে অপরের পরিপূরক”।

 

   মানুষ সামাজিক জীব, সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করবার প্রয়োজনে নানা কর্মসূত্রকে আশ্রয় করে এক একটি সমাজ সে গড়ে তোলে নিজেরই পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য। মানব জীবন এগিয়ে চলে সমাজ - সংসার – প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নিজস্ব বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে। সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়ে নিজেকে এবং নিজস্বতাকে প্রমাণ করতে চায়, তাই নিজস্বতার কারণে অন্যের থেকে স্বতন্ত্র হয়ে পড়ে। এই স্বাতন্ত্র্য শুধু ব্যক্তির ক্ষেত্রে নয়, তা সমাজেরও। এমনিই একটি সমাজ জীবন দেখতে পাব সুন্দরবনের লোকজীবনে এবং বনবিবি সংস্কৃতিতে। লোকায়ত সংস্কৃতি লোকসমাজের প্রতিটি মানুষের গোষ্ঠীগত ঐতিহ্যবাহিত এবং লালিত মহান সৃষ্টি।

 

   প্রাচীন ইতিহাস বাদ দিলে আনুমানিক ১৭৭০ সাল থেকে কালেক্টর জেনারেল ক্লড রাসেলের সময় থেকে প্রকৃতিও মানুষের অসম লড়াই শুরু হয়েছিল সুন্দরবনে। সে লড়াইয়ের ইতিহাস প্রকৃতি থেকে মানুষের জমি কেড়ে নেওয়ার লড়াই। এই লড়াইয়ের এক পক্ষে ছিলেন কিছু ভূমি কাঙাল, নিরন্ন, নিরস্ত্র মানুষ আর অপরপক্ষে এই জঙ্গলের অধিবাসী বিভিন্ন হিংস্র প্রাণী। সভ্য সমাজ থেকে একশো দেড়শো কিলোমিটারের মধ্যে যুগ যুগ ধরে লড়াই চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। এই বাংলার সুন্দরবনে তৎকালীন ১০২ টি দ্বীপের মধ্যে ৫৪টি দ্বীপে জঙ্গল পুরোপুরি ধ্বংস করে জংলীদের প্রকৃতি প্রদত্ত বসত থেকে উৎখাত করে গড়ে ঊঠেছিল প্রায় পয়তাল্লিশ লক্ষ মানুষের বাসস্থান যার বিস্তৃতি সাগরদ্বীপ থেকে সন্দেশখালি পর্যন্ত। বঙ্গোপসাগরের উপকূল জুড়ে ভারতের অধীন সুন্দরবন আনুমানিক ৪১৭০ বর্গকিলোমিটার। ৫৪টি দ্বীপে উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণার মোট ১৯টি ব্লক আছে। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানকার আবহাওয়াও অন্য ক্ষেত্রে মানুষকে প্রতিকূল পরিবেশে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। জল-জমি-জঙ্গলের একাত্মতায় তাদের জীবন ও সংস্কৃতি গড়ে ঊঠেছে।

 

   আদিম কাল থেকে দেব চেতনার পেছনে মানুষের, ভয়, বিস্ময় ও ভক্তি কাজ করেছে। আদিম মানুষ পাশের জগৎ জীবন ও তার বিস্ময়কর প্রকাশকে দেখে কোথাও বিস্মিত হয়েছে, আবার কোথাও ভয়ে বিভোর হয়েছে। সেই আকস্মিকতার ঘোর কাটাতেই ব্যাঘ্র সম্পর্কিত একটি লোককাহিনি বনবিবি দেবীর উত্থান বলে মনে করা হয়। কাহিনীটি হল, ভয়ানক হিংস্র ও পরাক্রমশালী জঙ্গলের রাজা বাঘ, তার নিজস্ব গরিমার জন্য চিরকাল সবার সমীহ আদায় করে এসেছে। ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধার জন্য হয়তো প্রাচীন কাল থেকে মানুষ বাঘকে পুজো করে এসেছে। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার ধ্বংসাবশেষে তার নিদর্শন মেলে। বঙ্গদেশে অনেক জায়গায় বাঘকে পুজো করা হয়। সুন্দরবনে বাঘ দক্ষিণারায় নামে দেবতা বলে প্রচলিত ও পূজিত। সুন্দরবনে বনবিবির মূর্তি তিনটি ধারায় বিবর্তিত হয়েছে। নদীর ধারে মাটির ঢিবি করে পূজা যেমন দেওয়া হয়ে থাকে, তেমনি ঘট পেতে পূজা করা হয়। মানত থাকলে অনেকে বনবিবির মূর্তিকে পূজা করে। আউলে, বাউলে, মোউলে, জেলে সবাই জঙ্গলে ঢোকার আগে বিশেষ ভক্তি সহকারে বনবিবির পূজা দেয়। কিন্তু বনবিবির পূজার কোনো নিয়ম নেই। ব্রাহ্মণ ছাড়াই ভক্তরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পূজা করে। হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষই কিন্তু বিভিন্ন উপায়ে বাঘ-দেবতা ও বনবিবির পূজা করে। বিশ্বাস আছে যে এদের পূজা করলে জঙ্গলের বাঘ আক্রমণ করে না। সুন্দরবনের মানুষের বাঘের প্রতি ভয়, ভক্তি ও শ্রদ্ধার জন্য বাঘ এইভাবে তাদের ধর্মীয়, সামাজিক, এবং সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিকভাবে আছে। মূলত ‘বনবিবি-র জহুরনামা’ পুঁথির কাহিনীকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে যাত্রাপালা, পালাগান, পুঁথিপাঠ, নাট্যগীতি যা বনবিবি সংস্কৃতি নামে পরিচিত।শশাঙ্কশেখর দাস তাঁর ‘বনবিবি’ নামক গ্রন্থে জানাচ্ছেন – অবিভক্ত বাংলায় খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমার ভোমরা গ্রামের বাসিন্দা স্বর্গীয় বসিরউদ্দিন গাইন ভুরকুন্ডা দ্বীপের নীলআটি গ্রামে ‘বনবিবিযাত্রা’ প্রথম সূচনা করেন।

 

   পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি উদ্যোগ এবং বস্ত্রশিল্প দপ্তরের সঙ্গে ইউনেস্কোর সহযোগিতায় বাংলা নাটক ডট কম নামক এনজিও গোসাবা ব্লকের পাখিরালয়ে তিনদিন ধরে সুন্দরবন লোক উৎসবের আয়োজন করেছিল। উদ্যোক্তারা বললেন ১৪টি হোটেল বা কটেজ প্রাঙ্গনে ১৮ টি বনবিবি দল, ২১ টি ঝুমুর নৃত্যের দল ও তিনটি ভাটিয়ালি দল তাদের শিল্প প্রদর্শন করেছে। বনবিবি দলের কয়েকজন শিল্পীকে তাদের শিল্প প্রদর্শন করে কেমন লাগল প্রশ্নের উত্তরে তারা বললেন খুব খুশী, আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েছেন এবং বহু মানুষের কাছে তাদের শিল্পকর্ম পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু উদ্যোক্তারা ভাটিয়ালি দল সুন্দরবনে কোথায় পেলেন এবং মূল মঞ্চে বনবিবি যাত্রা স্থান পেল না কেন বুঝে উঠতে পারলাম না। সত্যিই বনবিবি পালা দেখলে মনে হয় বঙ্গীয় শিল্পের এত করুণা, সততা ত্যাগ যা হৃদয়কে কোমল ও সরলতায় ভরিয়ে তোলে, যা চিরকালীন ও উচ্চমার্গের । সারা বিশ্বে লোকশিল্পে এই উচ্চমার্গের আদর্শ হয়তো বিরল। সুন্দরবনের লোকসাংস্কৃতিক জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে আমরা উৎস থেকে আজ অনেক দূরে চলে এসেছি, যে উৎস আমাদের হৃদয়ের গভীরে, জীবনের অন্তমূলে, সমাজের মননে তাকে সহজে দেখতে পাই না। আজ এই ভুবনায়নের সময়ে প্রযুক্তি-নির্ভর, পুঁজিবহুল, বাজার নিয়ন্ত্রিত নাগরিক আমোদপ্রমোদ যাকে সংস্কৃতি বলা যায় না তাও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও হানা দিয়েছে। সাময়িক বিনোদনের প্রায় প্রতিটি উপাদান পৌঁছে গেছে এই অঞ্চলের অন্তর ও অন্তরমহলে। আধুনিক মানুষের তৈরি মনোরঞ্জনের আধুনিক মাধ্যম শারীরিক বিস্তারের চেয়ে তার চৈতন্যভেদী বশীকরণ তাই অনেক বেশি ভয়ংকর। এখন বঙ্গীয় সমাজের যা পরিস্থিতি তাতে ভোগ্যপণ্যের অন্যান্য বাজারের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বাজারের প্রসার দ্রুত হচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও একশ্রেণীর ধনী বা জোতদার শ্রেণীর যে পরিমাণ সম্পদ বাড়ছে তাতে নাগরিক আমোদ-প্রমোদের উপকরণ বেশি প্রাধান্য পেয়ে যাচ্ছে। তাতে গ্রামীন সংস্কৃতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। ধনীদের জন্য বাজারি ইলেকট্রনিক প্রমোদ আর গরিবের জন্য স্থানীয় লোকসংস্কৃতি। শ্রমজীবী মানুষের জীবন্ত সংস্কৃতি ইলেকট্রনিক মাধ্যমের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারছে না। এমনই এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বদলের সামনে দাঁড়িয়ে এই অঞ্চলের মানুষ। বনবিবি যাত্রায় প্রবেশ করেছে বাংলা বা হিন্দি সিনেমার সংলাপ এবং গান বা সদ্য ঘটে যাওয়া স্থানীয় আলোড়নকারী কোনো ঘটনাপ্রসঙ্গ। বাজারের জন্য তৈরি এইসব মিশ্রণ অনবরতই জনবিরোধী চাটুকারতায় পর্যবসিত হচ্ছে। বর্তমানে এই উৎসব বেশিরভাগ সময়ে পৃষ্ঠপোষকতার বাণিজ্যিক অরণ্যে লুপ্ত হচ্ছে এবং যার গতিতে বাস্তবের সামাজিক চেহারার কোনো ছন্দও নেই।  সামাজিক বদলের সাথে বনবিবি যাত্রার বাহ্যিকরূপের যে পরিবর্তন এসেছে তা সুদূর ভবিষ্যতে কোনো বিষম ফলে পরিণত হবে নাতো? বর্তমান সময়ে সরকারি কিছু সাহায্য ও বাজারি নাগরিক সংস্কৃতির চাপে কালের মাপকাঠিতে শিল্পীদের নিজস্বতাও হারিয়ে যাচ্ছে। তারা ক্রমশই চটকদার দৃশ্যগ্রন্থনা, বশ্যতা ও সম্মোহনের কারিগরে পরিণত হচ্ছে। আমার মতে এই সংস্কৃতির যারা স্রষ্টা ও ধারক –বাহক তাঁরা অন্ধকারে থাকুন, নিরক্ষর থাকুন, শিকার করুন নৌকো চালান চাষ করুন, স্বল্প বাস পরে থাকুন – আর সাঁঝের আলো আঁধারে দাওয়ায় বসে লোককথা শোনান, প্রাণের আনন্দে গান করুন। এদের জীবনে নিশ্চয়ই বন্যা আসে, এলাকা ভাসে, খরায় জমি ফুটিফাটা হয়, ঝড় তুফালে ঘরের চাল উড়ে যায়। আবহমান কাল ধরে তো এভাবেই চলে আসছে, তাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে – এখনও সেভাবেই চলুক। তবু নাগরিক সুখ-সুবিধে তাঁদের নাগালে না আসে। ওদের নিস্তরঙ্গ জীবনে যেন বাইরের ঢেউ না লাগে। ঢেউ লাগলেই সারল্যে ভরা এই সংস্কৃতির বিকৃতি দেখা দেবে কিংবা লোকায়ত ভাবনার বিলুপ্তি ঘটবে। সহজ ও সাধারণ মানুষরা বাজারি সংস্কৃতির লোভে অসৎ হয়ে উঠবে।   

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com