“পরিবর্তনের গতি আমার ক্যানভাসে উঠে আসে” - জহর দাশগুপ্ত

 

 

এক তপ্ত রোববারের দুপুরে চিত্রশিল্পী জহর দাশগুপ্তের সাথে ঘন্টাখানেক আড্ডা দিলাম তাঁরই মধ্যমগ্রামের বাড়িতে। অন্তরঙ্গ কথাবার্তায় উঠে এল শিল্পীর ছবি আঁকার দর্শন, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সবকিছু ছাড়িয়ে একজন আত্মভোলা উদার মানুষের জীবনকাহিনি।    

 

প্রশ্নঃ একজন শিল্পীর সৃজন সম্পর্কে বুঝতে গেলে সবার প্রথমে বুঝতে হবে শিল্পীর জীবনকে, তার কারণ, সৃষ্টির রসদ আসে জীবন থেকেই। সবার প্রথমে আপনার শৈশব এবং কৈশোর সম্পর্কে জানতে চাইব।  

 

উত্তরঃ  আমার  ছোটোবেলা  কেটেছে  বিহারের  জামসেদপুরে।  আমার  বাবা  টাটা কোম্পানিতে  চাকরি  করতেন।  সাইন্টিস্ট  ছিলেন।  খরকাই নদী ছিল সামনে। ক্লাস ফোর অবধি সেখানে ছিলাম। ১৯৪২-এ জন্মেছি। তার থেকে বুঝে নাও ক্লাস ফোরে কোন সময় চলছিল। নদী পেরিয়ে আমরা ওপারটা যেতাম। ওপারে ছিল শালবন। সেই শালবনে ছিল আদিবাসীদের বাড়ি। টাটার লেবাররা ওখান থেকে আসত। আমরা ওদের ঘর অবধি যেতাম না। নদীর জল কম থাকত। তা সত্ত্বেও জামা-কাপড় খুলে নদী পারাপার করতাম। অবশ্যই সাথে বন্ধুবান্ধব থাকত। একা তো নিশ্চয়ই যেতাম না। সেসব দস্যিপনা ছোটোবেলায় করেছি। তারপর বাবা চাকরি ছেড়ে চলে আসলেন সিএফআরআই (সেন্ট্রাল ফুয়েল রিসার্চ ইন্সটিটিউট)-এর অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেকটর হিসেবে জয়েন করেন। তিনি ছিলেন দুর্গাপুর কোক প্ল্যান্টের যে মিনি পাইলট প্ল্যান্ট, তার প্রধান দায়িত্বে। টাটা কোম্পানির যে অভিজ্ঞতা ওনার ছিল, সেটার ফলে তাঁকে সেই চার্জে রাখা হয়েছিল। সাধারণভাবে ধানবাদের পরিবেশ রুক্ষ, রোপওয়ের লাইন, বালি যাচ্ছে, কয়লা যেখানে খনন করা হয়, সেই জায়গাটা বালি দিয়ে ভর্তি করা আবশ্যিক। চারিদিকে ধূসরতা ছিল, সেই ধূসরতার মধ্যে আমরা ক্রমে ক্রমে বড়ো হয়েছি। ওখান থেকে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে আমি চলে যাই শান্তিনিকেতনে। স্বাভাবিকভাবেই একটি সাইন্সের বাড়ি, দাদারা ছিলেন ওয়েস্ট জার্মানিতে, একজন দাদা সেখানে কোক প্ল্যান্টের ট্রেনিং নিচ্ছেন। আরেকজন দাদা কিছুদিন পরে লন্ডনে চলে গেলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। পড়াশোনার প্রতি আমার অনীহা বাবা দেখেছিলেন নিশ্চয়ই। আর ছবি আঁকার একটা ব্যাপার ছিল আমার মধ্যে, ছোটোবেলাতেই আমার উৎসাহ একটা গিফট দিয়েছিলেন আমার জামাইবাবু, একটা জলরঙের বাক্স।  সেটা দিয়ে ছবি আঁকতাম। সারদামণি, লেনিনের ছবি এঁকে এক্সিবিট করেছি, ছোটোবেলার ছবি যেমন প্রশংসিত হয়, তেমনি প্রশংসা পেয়েছি।

 

প্রশ্নঃ সারদামণি আর লেনিন তো পরস্পরের বিপরীত, এই দুজনকে মেলালেন কীভাবে?

 

উত্তরঃ সেই রকম গভীরতা তো ছিল না ওই বয়সে, ভালোবাসা থেকেই ওগুলো হয়। আর এখনও সেইরকম মানসিকতা নিয়েই চলি। স্ট্যালিন-লেনিন বা কার্ল মার্কস যেমন আমাদের কাছে বুদ্ধিগতভাবে গ্রহণীয়, ঠিক তেমনিই স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনের সংস্কার বলো,  আমাদের বেড়ে ওঠা বলো, সেখানে সারদা-রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দও আছেন। সেই অর্থে কোনো তথাকথিত ফ্যানাটিসিম আমার নেই, আমার যেটাকে ভালো মনে হয়েছে সেটাকে গ্রহণ করার মধ্যে কোনো দৈন্যতা নেই।

 

প্রশ্নঃ আপনার পরিবারের মধ্যেও নিশ্চয়ই সেই উদারতা ছিল।

 

উত্তরঃ হ্যাঁ ছিল। বাবা সাইন্টিস্ট হয়েও ঠাকুর ঘরে বসতেন। তথাকথিত পুজোআচ্চা করতেন না, কিন্তু বাবার সবের প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল।   

 

প্রশ্নঃ আপনার পরিবারে ছবি আঁকার চর্চা আর কারো মধ্যে ছিল?

 

উত্তরঃ না, আর কারো মধ্যে ছিল না।  শান্তিনিকেতনে চলে গেলাম, সেখানে অন্য পরিবেশ, অন্য পরিস্থিতি। সেখানে গিয়ে কলাভবনে ভর্তি হলাম। ছবি আঁকা তো সেভাবে শেখা যায় না, কিছু টেকনিক হয়তো শিখলাম। বেশ কিছু লোকের সান্নিধ্যে এসেছি। তখনও নন্দলাল বসু বেঁচে, তিনি আমাদের ক্লাস নিতেন না, রিটায়ার করে গেছেন। তাঁর বাড়িতে আমরা যেতাম ছবি দেখতে। জাপান থেকে এসে আমাদের পড়াতেন ম্যাডাম ফুকুয়াকিমো, আমাকে খুব ভালোবাসতেন, তাঁকে নিয়ে নন্দলাল বসুর বাড়ি গেছি, বেশ মনে আছে। এ রামচন্দ্রন,  ধর্মনারায়ণ দাশগুপ্ত আরও অনেকে আমার খুব ঘনিষ্ট ছিলেন ওই সময়। শান্তিনিকেতনের আম-কাঁঠাল-জামরুল-সোনাঝুরি-সপ্তপর্ণীর মাঝে আমরা বড়ো হয়েছি। সৈয়দ মুস্তাফা আলির মতো লোকের সাথে কেলোর দোকানে চা খেতে বসার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওই সময়ে আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে দিক্‌পাল ছিলেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মন, আমাদের প্রিন্সিপাল ছিলেন। রামকিঙ্কর বেইজ আমাদের ভাস্কর্য শেখাতেন। আর থিয়োরি পড়াতেন বিনোদ মুখার্জী। আমরা সবাই থিয়োরির ক্লাস করতে বিনোদদার বাড়িতে যেতাম। একটা বড়ো রিলিফ, বাউলের ভাস্কর্য করেছিলাম ফোর্থ ইয়ারে। ওটা মোহরদি নিয়ে গেছিলেন।  শান্তিনিকেতন থেকে পাশ করলাম, আমাদের সপ্তপর্ণী দিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। তারপর কলকাতায় এসে আরেক যুদ্ধ, এখানে চাকরি পাওয়া খুবই মুস্কিল।  জ্ঞানভারতী নামে একটা স্কুলে আর্টের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম। জীবনের একটা বড়ো সময় ওখানে চাকরি করেছি। সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে আমার নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু হয়। তারপর আমাদের একটা গ্রুপ তৈরি হয়, সেই গ্রুপের নাম ছিল Painters Orchestra, এই নামটা ধর্মদা দিয়েছিল। এই গ্রুপে পার্থপ্রতীম দেবও ছিল। প্রথম বিদেশে এক্সিভিশন করতে গেলাম নরওয়েতে।   পরে তো লন্ডনেও করেছি, ফ্রান্সে করেছি, তারপর বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেলাম আমেরিকাতে, স্পনসরও পেলাম, সেখানে তিনদিন থেকে চলে গেলাম ভাইপোর বাড়িতে। ভাইপো তখন আমেরিকায় থাকে, ওর কাছে মাসখানেক ছিলাম। এছাড়া সুইৎজারল্যান্ডে আর সিঙ্গাপুরেও একবার করে গিয়েছিলাম। সিঙ্গাপুরের প্রদর্শনী একজন ভদ্রমহিলা আয়োজন করেছিলেন। সেখানে অবশ্য খুব তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়, ওই ভদ্রমহিলা আমার কমপক্ষে পনের লাখ টাকার ছবি হাপিস করে দিয়েছিলেন। কেন করেছিলেন, তিনি বাধ্য হয়ে করেছিলেন কিনা, নাকি ইচ্ছা করে করেছেন, আমি জানি না।

 

 

 

 প্রশ্নঃ কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি?

 

উত্তরঃ সুদূর সিঙ্গাপুরে গিয়ে অতকিছু করা সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে। সেরকম ধুরন্ধর লোক হলে অবশ্য ছাড়ত না। আমি অতটা ধুরন্ধর হতে পারিনি এখনও। এরই মধ্যে একদিন কাকতালীয়ভাবে আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসের সাথে যুক্ত হলাম।  একবার আমি আর আমার এক বন্ধু রুশি মোদির সাথে যোগাযোগ করতে গিয়েছিলাম।  সেই বন্ধুরই কিছু ডোনেশন আর কালেকশনের জন্য রুশি মোদির সাথে দরকার ছিল। রুশি তো আমার পরিচয় পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তিনি বললেন, “তুমি একজন এনার্জেটিক এবং ডায়নামিক আর্টিস্ট, কেন তুমি আমাদের সাথে আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে যুক্ত হচ্ছ না?” তিনি প্রথম আমাকে অফারটা দিলেন। অতোবড়ো মাপের লোক, আমাকে বলছেন, “তুমি কখন ফ্রি আছ?”, আমি বললাম, “আপনি বলুন আপনার সুবিধে মতো”। যতদূর মনে পড়ছে, তিনি আমাকে বুধবার দেখা করতে বলেছিলেন। রুশি মোদি যেহেতু টাটা কোম্পানিতে ছিলেন, ওনার গল্প বাবার মুখে অনেক শুনেছি। বাবার ইংরেজি বক্তৃতা শুনে রুশি বাবার প্রশংসা করেছেন, এগুলো গর্বিত ভঙ্গিতে আমাদের বলতেন। বাবা যে রুশির প্রশংসায় গর্বিত হতেন, সেই রুশির সাথে আমি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ষোল বছর ছিলাম আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে। রুশি ছিলেন তখন প্রেসিডেন্ট। সেই সময় তো কতো এক্সিভিশন করলাম। তারপর রুশি মারা গেলেন। ঘটনাচক্রে রুশি আমার ভালো বন্ধু হয়ে গেছিলেন। তাঁর বাড়িতে থাকত আদিত্য কাশ্যপ, তাঁর ছেলের মতো, সেই আদিত্যও আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছিল। আদিত্য আর রুশি দু’জনেই আমার ছবি কিনেছেন। রুশি মারা যাবার পর সাড়ে চার বছর আমি প্রেসিডেন্ট ছিলাম। এদিকে তো আকাদেমিতে নানান পলিটিক্স। একটা স্পষ্ট কথা তোমায় বলে দিই, সবাই জানত যে আমি সিপিএম মাইন্ডেড। সেই সময় সিটুর একটা পলিটিক্স ছিল। তারপর তৃণমূল আসল। সিটুর নোংরামিকে তৃণমূল দশগুণ বাড়িয়ে দিল। সেটা এখনও চলছে, যে কারণে এখন আর আকাদেমিতে অতটা যাই না।   তখন বিজেপি হচ্ছে তৃণমূলের একনম্বর শত্র, সিপিএমের কোনো পাত্তাই নেই। একদিন তর্কর মধ্যে দিয়ে তৃণমূলের ওরা আমাকে চ্যালেঞ্জ করল, আমি রাগের মাথায় বললাম, “আমি বিজেপি হয়ে গেছি, তোদের যদি কিছু করার থাকে তো কর”। এটা বলে তো দিলাম আমি। কিন্তু এর প্রভাব যে কতদূর যাবে সেটা আমি বুঝতে পারিনি। ওরা পোস্টারিং করে দিল যে আকাদেমিতে পলিটিকাল লোককে রাখা যাবে না। তারপর এবিপি আনন্দ এসে হাজির, বাইট নিল, সেখানে আমার বসতে হল দু’দিন। তখনকার বিজেপি রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা আমাকে খবর দিয়ে ডাকাল, বিজেপির সাথে বসতে হল, সামনে পঞ্চাশটা প্রেস, এইভাবে রাতারাতি আমি বিজেপি হয়ে গেলাম।

 

প্রশ্নঃ আপনি কি মন থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন?

 

উত্তরঃ না, মন থেকে যোগ দিইনি। ধান্দা না থাকলে মন থেকে কোনো পার্টিতেই যোগ দেওয়া যায় না।

 

প্রশ্নঃ রাজনীতি কখনও আপনার ছবিকে প্রভাবিত করেনি?

 

উত্তরঃ সিঙ্গুরে যখন টাটার মোটর কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেল, তখন চারদিকে ছিল হতাশা। সেই হতাশার থেকে একটা ছবি এঁকেছিলাম, যে একজন লোক একটা লাল ছাতা দিয়ে একটা মোটর গাড়িকে ধরে আছে। আরও কিছু ছবি এঁকেছি ছাতা নিয়ে আর মধ্যে কিছু বিক্রি হয়ে গেছে, কিছু বিক্ষিপ্ত এদিক ওদিক আছে।

 

প্রশ্নঃ লাল ছাতা আপনার কাছে বামপন্থার প্রতীক ছিল?

 

উত্তরঃ লাল ছাতা  হল সাধারণ জনগণের আশ্রয়। সেই আশ্রয়ই হচ্ছে বামপন্থী দর্শন। তারপর যখন সিপিএম ধ্বংসের মুখে যাচ্ছে, তখন দু’একটা ছাতা ফুটো করে দিয়েছিলাম।  

 

প্রশ্নঃ আপনার কখনও মনে হয়নি, যে সিপিএম আস্তে আস্তে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে?

 

উত্তরঃ মনে হবে না কেন? বাস্তব দৈনন্দিন জীবনের সত্যি এটা। সব খববই পেতাম। লক্ষ্মণ শেঠের খবর পেতাম, ইউনিয়নের তোলাবাজির খবর পেতাম। পলিটিকাল ছবি কমই এঁকেছি। আমার ছবির মধ্যে মুখ্য চরিত্র হচ্ছে নারী। আমি এটাই সব সময় বলে এসেছি যে নারী প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতির সৌন্দর্যের সাথে নারীর সৌন্দর্যকে একাত্ম করে দেবার মধ্যে আমার একটা প্যাশন কাজ করত।  নারী নিয়ে আঁকা ছবির সংখ্যাই আমার বেশি। এর বাইরেও নানারকম ছবি এঁকেছি। রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের মাধবী দেখে আমি এত ইন্সপায়ার্ড হয়ে গেলাম যে মহাভারত থেকে মূল গল্পটা পড়ে দু’টো ক্যানভাস মিলিয়ে বারো ফুট সাইজের একটা ছবি আঁকলাম। এই ‘মাধবী’ ছবিটা এক্সিবিশনেও গেছে। এরমধ্যে আমার ছবির মধ্যে ফরাসি দার্শনিক হেনরি বের্গসঁ’র এসে গেছেন। প্রতি মুহূর্তে পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে, তার মানে আমরাও প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছি, কিন্তু বাইরে থেকেও বোঝার উপায় থাকে না। আমার মনের মধ্যে স্ট্রাইক করল, আমরা যদি ভেতরে ভেতরে পরিবর্তিত হই, তাহলে আমাদের স্নায়ু, শিরা-ধমনী এগুলোও খুব ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। আমার তখন মনে হল, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ডিজাইন তৈরি হচ্ছে। এগুলোকে সারফেসে নিজের স্টাইলে আমি এঁকেছি।

 

প্রশ্নঃ আপনার ছবিতে যেভাবে শরীরের প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ধরা পড়েছে, তেমনি আমাদের মনেও যে প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন ঘটছে, সেটা কি কোনোভাবে ধরা পড়েছে?

 

উত্তরঃ মনকে সাহিত্যে যেভাবে বর্ণনা করা যায়, ছবিতে তো সেভাবে করা যায় না। ছবির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, আবার ছবিতে অনেকগুলো প্লাস পয়েন্ট আছে যেগুলো সাহিত্যে নেই।  সাহিত্যে বলার স্কোপ বেশি থাকে বলে বর্ণনা অনেক বেড়ে যায়, কিন্তু ছবিতে সেটা কমে যায়। ছবি তাই সাহিত্যের থেকে অনেক বেশি পিওর। সঙ্গীত এবং ছবি অনেক সূক্ষ্ম। আমার কাজের মধ্যে বের্গসঁ যেমন আছেন তেমনি রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’ও আছে।  বের্গসঁ বিজ্ঞানের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, তিনি এই পরিবর্তনের কোনো পরিণতি দেখতে পাননি।  সেই পরিণতি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন উপনিষদের মাধ্যমে।   

 

 

 

প্রশ্নঃ  আপনি এই পরিবর্তনের কোনো পরিণতি দেখতে পেয়েছেন?

 

উত্তরঃ পরিণতি তো আমাকে খুঁজতেই হবে। পরিণতি ছাড়া আমি ছবি আঁকব কী করে? ছবিকে তো আমাকে একটা জায়গায় বাঁধতেই হচ্ছে।

 

প্রশ্নঃ আমি দার্শনিক দিকটার কথা জানতে চাইছি। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে গতির একটা সমাপ্তি খুঁজে পেয়েছিলেন পরমসত্তা বা ব্রহ্মের মাধ্যমে, বের্গসঁ কোনো সমাপ্তি খুঁজে পাননি। সেক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কীরকম?

 

উত্তরঃ এটা বিশ্বাসের ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে উপনিষদকে গুলে খেয়েছেন, ওনার পক্ষে এই বিশ্বাসটাতে স্টিক করা সহজ। আমরা সেভাবে পড়াশোনা করিনি। একটা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরার মধ্যেও একটা ব্যাকগ্রাউন্ড দরকার। আমি রোজ ঠাকুর ঘরে বসি, কিন্তু তারপরেও যদি আমি বলি যে আমার বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে বুঝেছি যে ভগবানের অস্তিত্ব আছে, তাহলে আমি মিথ্যা কথা বলছি।

 

প্রশ্নঃ অর্থাৎ সেই গোঁড়ামিটার মধ্যেও আপনি ঢুকতে চাচ্ছেন না।

 

উত্তরঃ আসলে একেবারে অন্ধ লোক না হলে, নাস্তিক হতে গেলেও যেমন মনের শক্তি লাগে,  ঠাকুরে বিশ্বাসী হতে গেলেও সেই মনের জোর লাগে। আমি অসামান্যের কথা বলছি না, যাদের সামান্য জ্ঞানগম্যি আছে, পড়াশোনা আছে, তাদের পক্ষে ঈশ্বরকে নস্যাৎ করা যেমন কঠিন, গ্রহণ করাও কঠিন।

 

প্রশ্নঃ এই শিল্পীর ক্ষেত্রে তো এই দ্বন্দ্বটা সৃষ্টির ক্ষেত্রে জ্বালানী হিসেবে কাজ করে। তিনি চরম আস্তিকতার দিকেও যেতে পারছেন না, আবার চরম নাস্তিকতার দিকেও যেতে পারছেন না। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে হয়তো ঈশ্বর নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না, কিন্তু অন্য দ্বন্দ্ব তো প্রবলভাবে ছিল তাঁর মনে।   

 

উত্তরঃ দ্বন্দ্ব ছাড়া কোনো মানুষেরই চলবে না। রবীন্দ্রনাথের লেখা ভালো করে পড়লে অনেক রকম দ্বন্দ্বের খোঁজ পাওয়া যাবে। বিবেকানন্দ যে এত ধার্মিক ছিলেন, ওনার কথাতেও প্রচুর দ্বন্দ্ব। আমি কিন্তু বলব না যে আমার কোনো ধর্ম নেই। আমি হিন্দু। কিন্তু অন্য ধর্মের প্রতি কোনো বিদ্বেষ নেই বলে আমার একমাত্র ছেলের বৌ খ্রিস্টান। আমি পছন্দ করে নিয়ে এসেছি তাকে।

 

প্রশ্নঃ ইউরোপের যে বিভিন্ন আর্ট মুভমেন্ট, যেমন এক্সপ্রেশনিজম, ইমপ্রেশনিজম, সুররিয়েলিজম ইত্যাদি ইত্যাদি – এগুলো কি কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে।

 

উত্তরঃ দেখো, এত বছর ধরে এত ইজম হয়ে গেছে পৃথিবীতে, তুমি খুঁজতে চাইলে কোনো না কোনো মিল পেয়েই যাবে।  এখনও পর্যন্ত বের্গসঁর গতিবাদ বা ‘বলাকা’-র গতিবাদকে আশ্রয় করে কোনো শিল্পীই ছবি আঁকেননি। তার থেকে উদ্ভূত যে স্টাইল, যে ফর্ম, যে কারুকার্য, সেটাও অন্যরকম হতে বাধ্য। সেখানে পুরো ব্যাপারটাই আমার নিজস্ব। আমাকে হয়তো কলকাতা শহরের ছোটো-বড়ো সব শিল্পীরা চেনে, দিল্লি-বোম্বেতে বিক্ষিপ্তভাবে কেউ কেউ জানে।  কিন্তু, সেভাবে আমাকে কেউ চেনে না তার কারণটা হচ্ছে শিল্পীদের ইন্ডিয়া লেভেলের স্পনসর দরকার হয়, যারা ব্যবসা করা জন্য শিল্পীদের জনসমক্ষে নিয়ে আসে। যেমন পার্থর ক্ষেত্রে হয়েছে। ধর্মনারায়ণ দাশগুপ্ত পার্থকে দিল্লির আশিস আনন্দের সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। আশিস আনন্দ তিন লাখ টাকা দিয়ে পার্থর অর্ধেক ছবি কিনে নিয়ে চলে গেলেন, নিজেই দিল্লির কাগজগুলোতে অ্যাড দিলেন। আকৃতি আর্ট গ্যালারি দেখল ওখানে আশিস আনন্দ পার্থর পাবলিসিটি করছে, আমরা যদি পার্থর একটা এক্সিভিশন করি, তাহলে আমাদের লাভ। আকৃতিতে পার্থর পঁচিশ লাখ টাকার ছবি বিক্রি হল।

 

প্রশ্নঃ আমার শেষ প্রশ্ন, আপনার নিজের মতে আপনার আঁকা সেরা ছবি কোনটা? কোন ছবিটা এঁকে আপনি সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি পেয়েছেন?

 

উত্তরঃ সেরা ছবি বলে সেরকম কিছু হয় না। প্রত্যেকটা ছবি আঁকার সময় একটা অতৃপ্তি কাজ করে। আঁকতে আঁকতে একটা সময়ে এসে মনে হয় এই ছবিতে আর কাজ করার কিছু নেই। সেটাকে বলতে পারো শেষ। তারপর আরেকটা ক্যানভাস তুলে নিই। আবার আরেকটা অতৃপ্তি, আরেকটা গতি, আরেকটা এগিয়ে যাওয়া। এইভাবে আরেকটা ছবি শুরু হয়। তাই বিচ্ছিন্ন করে বলা মুস্কিল, যে এই ছবিটা এঁকে আমি বেশি তৃপ্তি পেয়েছি।  তবে ‘মাধবী’ এঁকে আমার খুব ভালো লেগেছে। কারণ ‘মাধবী’র সাথে বর্তমান সময়ের একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে।

 

 

 

       

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com