নগর পরিচালনা চ্যালেঞ্জ: প্রেক্ষিত ঢাকা (প্রথম পর্ব)

 

একটি পরিবারে আমরা সাধারণত দেখতে পাই, একজন প্রধান থাকেন। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও যে সকল পরিবারে সুপ্রতিষ্ঠিত, সেখানেও নারী কিংবা পুরুষ একজনকে ঠিকঠিকই মূখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেই হয়। আর এটাও নির্ধারিত হয়ে যায় অনেকটা গণতান্ত্রিকভাবে পূর্ণ সমর্থন ও মতামতের ভিত্তিতেই। পরিবারকে সুখি, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ রাখার স্বার্থে প্রয়োজনীয় অনেক নিয়ম-কানুনও প্রণীত হয় এবং সেগুলো যথাযথভাবে অনুসারিত হবার ক্ষেত্রে আলাদা একটা গুরুত্বও লক্ষ্য করা যায়। যেমন: পরিবারকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন; পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন ইত্যাদি। 

 

পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হলে পরিবারকে সুশৃংঙ্খল রাখার প্রয়োজনেই অন্যান্য সকল সদস্যের ভূমিকা হয় সহায়কের। অন্যান্য সদস্যরাও ছোট-বড় নানান কাজ-কর্ম ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে একটি পরিবারকে ভবিষ্যত সুখ ও সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। পরিবারেরও বাজেট থাকে, থাকে বিভিন্ন মেয়াদী পরিকল্পনা। আর পরিবারগুলোতে সবচাইতে বড় যে বিষয়টা একসময় লক্ষ্য করা যেতো সেটা হলো মূল্যবোধ। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসহ নানান মূল্যবোধসমূহ যে সকল পরিবার থেকে উৎসারিত হতে দেখা যায়, সে সকল পরিবারেই প্রকৃত অর্থে সুখ ও ভবিষ্যত উন্নতি বিরাজ করে। সে সকল পরিবারই সময়ের পরিক্রমায় আধুনিক থেকে আরও আধুনিকতর হয়ে ওঠে। আর এ সবকিছুই নির্ভর করে পরিবার পরিচালন কাঠামো ও পরিবার পরিচালন ব্যবস্থা এবং  ব্যবস্থাপনার ওপর।

 

একটি নগরও ঠিক যেন একটি পরিবারেরই মতন। তবে প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে, সবকিছুরই ভালো এবং মন্দ থাকে। তাই ওপরের বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোকে যদি মূল্যবোধসমুন্নত একটি পরিবারকে আদর্শ পরিবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে সে পরিবারের অনেকগুলো দিক নগর পরিচালনের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন প্রযোজ্য কিংবা অনুসরণ করা যেতে পারে। অন্যদিকে পরিবারের এমনও অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে যা হয়তো নগর পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সেগুলোও সচেতনভাবে খেয়াল রাখার প্রয়োজন আছে, যেমন: স্বজনপ্রীতি।

 

যাহোক, এই আলোচনায় নগর পরিচালনের সামগ্রিক দিকটি তুলে না ধরে বরং ঢাকাকে একটি উদাহরণ হিসেবে নিয়ে নগর পরিচালন ব্যবস্থার সমস্যা ও করণীয় দিকগুলোকে চিহ্নিত করার একটি প্রয়াস চালানো হয়েছে। যা একদিকে নীতি-নির্ধারক, রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় সরকার নিয়ে যারা ভাবেন ও সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের চিন্তার খোরাক যোগাবে অন্যদিকে এসডিজি বাস্তবায়ন তথা ২০৩০ সালের মধ্যে মানব বসতি ও শহরগুলোকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখার যে লক্ষ্যমালা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তা অর্জনেও নানাভাবে উপযোগী হবে বলেই প্রত্যাশা করি।   

 

ঐতিহ্যগত ঢাকা আর এখনকার ঢাকা

ঢাকা যেন বর্তমানে ঢেকে গেছে অথবা ঢেকে আছে। অন্যভাবে বলতে গেলে অনেক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ঢেকে গেছে আর সম্ভাবনার চারাগুলো ঢেকে আছে বিধায় সেখানে থেকে কোন চারা গজাতে বা বাইরে মুখ বের করতে পারছে না। বিষয়টা কয়েকটা দৃষ্টান্ত দিলে আরও পরিষ্কার হবে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান শহর এবং বিশ্বের অন্যতম বিশটি জনবহুল মেগাসিটির অন্যতম (১১তম)১ হওয়া সত্ত্বেও এই শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়মিত নয়, ট্রাফিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলতা বিদ্যমান, যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা। নেই পাবলিক পরিবহনের জন্য সুব্যবস্থা কিংবা ব্যবস্থাপনা। ইউএস এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় এবারও (২০১৮) ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে। আইনের শাসন তথা সুশাসন না থাকায় নগরের ভূমির অপব্যবহার, দখল ও বেদখলের প্রতিযোগিতায় প্রাকৃতিক ও চারপাশের পরিবেশের যেন করুণ এক অবস্থা, বসবাসের অনুপযুক্ত শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি হতে যেন আর খুব বেশিদিন সময়ের প্রয়োজন হবে না।

 

একসময় ঢাকা ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের রাজধানী হিসেবে গর্বের নতুন দিগন্ত, ঐতিহ্যের শহর, নতুন গতি ও প্রাণ ফিরে পাবার শহর, সারাদেশের মানুষের স্বপ্নকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ঢাকা যেন এখন সারাদেশের মানুষের অস্থিরতা, হতাশা ও ক্ষোভের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ঢাকাকে একটি নগর বা মহানগর হিসেবে পৃথকভাবে খুঁজে পেতে এখন খুব কষ্ট হয়। এ নগর থেকে যদিও সারাদেশের শাসন পরিচালিত হয়, কিন্তু নগরের স্বতন্ত্র প্রশাসন ও সেবা পরিকাঠামোর পৃথক সত্তা নিজস্ব মহিমায় বিকাশের পরিবর্তে তা যেন ক্রমশ জাতীয় সরকারে বিলীন হয়ে গেছে। জাতীয় সরকারের সর্বব্যাপীতার কাছে নগর সরকার কাঠামোটি যেন প্রায় ম্রিয়মাণ  ও নিস্প্রভ হয়ে আছে। রাজনৈতিক ঢাকা, প্রশাসনিক ঢাকা, শিল্প-অর্থ-বাণিজ্যের ঢাকা এবং ঢাকার নাগরিকদের ঢাকা এভাবে একাধিক সত্তায় বিকশিত ঢাকা থেকে ঢাকাকে উদ্ধার করা এ মুহূর্তে অত্যন্ত দুরূহ।

 

`ঢাকা` একটি মহানগর বা একটি জেলা, একটি বিভাগ এবং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের রাজধানী। কিন্তু এ ঢাকার আরও অন্তত চারটি এলাকা ও কার্যক্রমগত পৃথক সত্তা বিরাজমান। যার সাথে নগর উন্নয়নের এবং নাগরিক সেবার গূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। এ চারটি পৃথক ঢাকার প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও কাঠামোসমূহ হচ্ছে যথাক্রমে Ñ (১) ঢাকা সিটি করপোরেশন (বিভক্তি পূর্ব) যার আয়তন ১৪৫ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৮০-৯০ লক্ষ। এ সিটি করপোরেশন সাম্প্রতিককালে উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত হয়ে দু`টি পৃথক সংস্থায় রূপান্তরিত। (২) ঢাকা স্ট্যাস্টিসটিক্যাল মেট্রোপলিটান এরিয়া (ডি.এস.এম.এ) যার আয়তন ১৩৫০ বর্গ কিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। (৩) রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যার আয়তন ১৫৩০ বর্গ কিলোমিটার ও জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ। এবং (৪) ঢাকা স্ট্রেটিজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এস.টি.পি) যার আয়তন ৩৫০০ বর্গ কিলোমিটার এবং অনুমিত জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লক্ষ।১ অপরদিকে ঢাকা শহরের পানি, পরিবেশ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক, আইনশৃঙ্খলাসহ অন্যান্য রেগুলেটরী কার্যক্রম, ট্রাফিক, আবাসন, পরিকল্পনা, গবেষণা প্রভৃতি সেবা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত প্রায় পঞ্চাশটি প্রতিষ্ঠান।২

 

এসবের মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশন নামক একটি একক প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে পাওয়া কিংবা সিটি করপোরেশন নিজেকে খুঁজে নিয়ে একটি নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। ঢাকার সাধারণ নাগরিকগণ সিটি করপোরেশনকে প্রধানত চারটি বিশেষ অবস্থায় কিছুটা খুঁজে পায় বা খুঁজে নিতে চেষ্টা করে। (১) প্রধানতঃ রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে একটি অত্যন্ত উৎসমুখর অথবা সংঘাতমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থায় যেখানে তারা তিনটি ভোট এস্তেমালের মাধ্যমে (মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের কাউন্সিলর) নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করে। (২) শহরের ময়লা আবর্জনা ও বর্জ্য অপসারণ (৩) সড়কবাতি জ্বালানো (৪) নিয়মিত হোল্ডিং এ বসবাসকারীগণের কর প্রদান। এখানে ভোটে প্রায় ৩৮ লাখ লোকের সম্পৃক্ততা থাকলেও হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদানকারীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হোল্ডিং বা খানা সংখ্যা দুই লাখ পঁয়ষট্টি হাজারের নিচে। এ মহানগরে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক যানবাহন চলে প্রায় ১৫ লাখ। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদ, জাতীয় সংসদ সদস্য (প্রাক্তন ও বর্তমান) উচ্চপদস্থ আমলা, সকল শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবী ও শ্রমিকদের বৃহদাংশের বসবাস এই একটি মহানগরে। এ মহানগর দেশ ও সমাজ শাসন করে। পরিচালনা করে রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি। কিন্তু এ নগরের কোন শাসক নেই, নেই সার্বিক অর্থে কোন পরিচালক। এখানে এক অর্থে সবাই নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে রাজা। ওয়াসা ওয়াসার রাজত্বে, পুলিশ তার থানায়, বিদ্যুৎ-গ্যাস সবাই যার যার ক্ষেত্রে রাজা। অনেক রাজার শাসনের অধীন সাধারণ মানুষ শুধুই এক অসহায় প্রজা।৩  (চলবে)

তথ্যসূত্র:

১.         Dhaka in 2050 শীর্ষক Centre For Urban Studies (CUS) Bulletin, No 58-59, January, 2010 

২.         নগরায়ণ ও নগর সরকার, তোফায়েল আহমেদ ও বিধান চন্দ্র পাল, আগামী প্রকাশনী ২০১৮    

৩.        নগরায়ণ ও নগর সরকার, তোফায়েল আহমেদ ও বিধান চন্দ্র পাল, আগামী প্রকাশনী ২০১৮    

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com