স্বাস্থ্য ও ওষুধের নিয়ন্ত্রণ পুঁজিবাদীদের হাতে

 

 

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব নয়। আর সে কারণেই বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ওষুধ বিভ্রাট, একচেটিয়া মুনাফা, মুনাফার বাজারে অন্য কাউকে ঘেঁষতে না দেওয়া সবই হল ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত রূপ। সব দেশেই জনগণকে বোঝানো হয় – বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। এটি একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংগঠন। কিন্তু আসল রহস্য হল বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা চলে পুঁজিবাদী দেশের টাকাতে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বেশিরভাগ টাকা আসে আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, জার্মানি ও ইউরোপের মতো পুঁজিবাদী দেশের সরকার ও পুঁজিবাদীদের কাছ থেকে। ফলে ওইসব দাতা দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থই অগ্রাধিকার পায়।

 

   এই সুযোগে উন্নত দেশগুলি – যাদের হাতে পৃথিবীর আশি শতাংশ ওষুধ – তারা কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে অবিরত। তারা একবারও গরিব তৃতীয় বিশ্বের গরিব মানুষদের রোগ নিয়ে চিন্তিত নন। বরং তৃতীয় বিশ্বের হাসপাতালের আউটডোরের রোগীদের ট্রায়ালের স্পেসিমেন হিসাবেই দেখেন। ওষুদের মনোপলি ব্যবসা সম্পূর্ণটাই ধনতান্ত্রিক দেশগুলির হাতে কুক্ষিগত। আর এই কুক্ষিগত রাখার জন্যই বিশ্বায়নের ফাঁদ। সেই ফাঁদের চার হল পেটেন্ট আইন, লোনের শর্ত প্রয়োগ, অবৈজ্ঞানিক রাসায়নিক মিশ্রণের ওষুধের ব্যবহার, চিকিৎসকদের প্রলুব্ধ করা, আরও অনেক কৌশলই ওষুধ বাজারকে গরম করে তুলেছে।

 

   ভারতের স্বাস্থ্যবাজার হল বিশাল। স্বাস্থ্যব্যবসায়ীর সংখ্যাও কম নয়। অ্যাপেলো, এসকর্টস, নারায়ণ হৃদয়ালয়, লাইফ হেলথ কেয়ার, ফর্টিস, লিথা হেলথ কেয়ার, আমরি ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালে ভারতের স্বাস্থ্যবাজার গিয়ে দাঁড়াবে ২৩৮.৭৬ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার। ভারত সরকার স্বাস্থ্য বাজারে বিদেশী বিনিয়োগ ১০০ শতাংশ করে দিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে ভারতের পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিস (ফিকি)-এর সম্পাদক বলেন, আমরি মালিকদের গ্রেপ্তার দেশে পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করবে। আশা করি আমরি হত্যাকাণ্ডের কথা কেউ মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি। সেখানেই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে দেশের প্রশাসন ভয় পাচ্ছে। অর্থাৎ বিদেশীদের যেনতেন প্রকারে ব্যবসা করে টাকা লুটেপুটে নিয়ে যাক। আর দেশের কিছু ছেলেমেয়ে সামান্য টাকায় চাকরি পাক। সেখানে সকাল থেকে রাত ৮-৯ পর্যন্ত ডিউটি। ঠাঁট, বাট সামাল দিয়ে সেই কর্মী কতটুকুই বা সংসারকে সাহায্য করতে পারে – তা সহজেই অনুমেয়। শ্রমিক আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলেছে ঐসব কর্পোরেট। দিনের পর দিন শোষণ ও বঞ্চনার শিকার আমাদের দেশের শিক্ষা, দীক্ষায় তৈরি মানব সম্পদ। রাষ্ট্র, নেতারা পুঁজি বিনিয়োগের জন্য দেশ বিদেশে ছুটে বেড়ান – তাদের চ্যালাচামুণ্ডা নিয়ে সফল হলে ফলাও করে পার্টি দেওয়া হয়। এবং হাল হয় – দেশের মানব সম্পদের অপচয়। একবারও কেউ বেঙ্গল কেমিক্যালস্‌-এর মতো কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগের কথা ভাবছে না। দিনের পর দিন এইসব কোম্পানিগুলি মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদী সমাজ দেশের চিকিৎসকদের দু’দলে ভাগ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের পক্ষে ও বিপক্ষে। একদল মনে করেন যে পেশাগত স্বার্থ রক্ষা করা ও ব্যক্তিসম্পদ বৃদ্ধি করা কোনো দোষের কাজ নয়। এঁদের ধারণা – এঁদের হাতেই রয়েছে স্বাস্থ্য বিতরণের একচেটিয়া অধিকার।

 

   বর্তমান ব্যবস্থায় উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলি তাদের মুনাফার অফুরান ক্ষুধা মেটানোর উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং পণ্য উৎপাদনের ওপর তাদের একচ্ছত্র মালিকানা বজায় রাখার বন্দোবস্ত করবে। এই ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে পেটেন্ট আইন বা মেধাজাত সম্পত্তির অধিকার। কোনো বস্তু বা তার প্রস্তুত প্রণালীর আবিষ্কার, যা এই বস্তুর শিল্পোৎপাদনকে সম্ভব করে তোলে। সে ধরণের আবিষ্কারকে বিভিন্ন দেশের সরকার পেটেন্ট অনুমোদন করে। সহজ করে বললে দাঁড়ায় আবিষ্কর্তাকে একটা নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য তার আবিষ্কারের ওপর একচেটিয়া অধিকার দেয়, ফলে আবিষ্কর্তা ছাড়া অন্য কেউ নির্দিষ্ট ওই বস্তু বা প্রস্তুতপ্রণালী  প্রস্তুত বা ব্যবহার করতে, নকল করতে বা বিক্রি করতে পারে না।

 

   দেশ বিদেশের ল্যাবরেটারিগুলিতে বিজ্ঞানীদের ফান্ডিং করে সাম্রাজ্যবাদী দেশের পুঁজি। ফলে বিজ্ঞানীর সম্পূর্ণ আবিষ্কারই সেই দেশের অধিকারে চলে যায়। তাহলে বিজ্ঞানী বা অন্যান্যরা সকলেই কর্মচারী ছাড়া তো কিছু নয়। অর্থাৎ টাকা যার সম্পদ তার। পেটেন্ট ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবার জন্যই বিদেশে গিয়ে তাদের খুশি করে বিনিয়োগ আনতে হয়।

 

   উন্নত দেশে যে ওষুধ চলে না, এদেশে চালানোর জন্য একচেটিয়া আঁতাত। ওষুধ কোম্পানিগুলি সরকারি সহায়তায় ভারতে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয়, অবৈজ্ঞানিক ও নিষিদ্ধ ওষুধ চালু রেখেছে। জনগণের অসহায়তাকে কাজে লাগিয়ে গাঁটের পয়সা ছিনিয়ে নিচ্ছে এবং জানা অজানা শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখীন করে তুলেছে। ওষুধ কোম্পানি ও সরকারের যৌথ প্রতারণার তালিকাতে পাইরাসেটাম (Piracetam) ও বুক্লিজিন (Buclizine)-এর ঘটনা আরেক সংযোজন। দেশের ওষুধ আইন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতিমালাকে (Ethics) বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে পাইরাসেটাম ও বুক্লিজিন ফরমুলেশন বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ পাইরাসেটাম বিক্রির জন্য মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে – ফ্যাট ক্ষয় হয় অর্থাৎ মোটা কমায়, সমাজে মানিয়ে চলতে সাহায্য করে, আচরণের সমস্যার সমাধান, বাচ্চাদের কথা বলা ও শেখার সমস্যা রোধ করে। অথভ ব্রিটেনে পাইরাসিটামকে কেবল Cortical Myoclonus এ ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে। এই ব্যবহার আবার ১৬ বছরের নীচের বাচ্চাদের জন্য নিষেধ রয়েছে। আমেরিকাতে পাইরাসিটাম বিক্রি হয় না। বাজারে চালু পাইরাসিটামের ফরমুলেশন হচ্ছে Nootropil: UCB India Ltd.

 

   বুক্লিজিন একটি অ্যান্টিহিস্টামিনিক। ভারতের ড্রাগ কন্ট্রোল সংস্থা বুক্লিজিনকে এলার্জির বিরুদ্ধে ব্যবহারের ছাড়পত্র দিয়েছে। কিন্তু UCB India Ltd. বে-আইনিভাবে Longifene নামে ১৯৯৩ সাল থেকে ক্ষিদে বাড়ানোর ওষুধ হিসেবে বিক্রি করছে। অথচ সারা পৃথিবী জুড়ে এই ওষুধটির যথেচ্ছ ব্যবহার আটকানো হয়েছে। যেমন – সুইজারল্যান্ড ১৯৮৯ সালে ওষুধটি বাজার থেকে তুলে নেয়।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com