দেশের উন্নয়নেই তো ক্ষমতায় থাকা, দলের স্বার্থে নয়

   

 

 

   সমস্ত সাংবিধানিক রীতিনীতিকে নস্যাৎ করে ক্ষমতাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন নরেন্দ্র মোদি। সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে ভরাডুবির পর উনিশের দেওয়াল লিখন যে তাঁর জন্য “আচ্ছে দিন” আনছে না এটা বোধ হয় তিনি বুঝে গেছেন। তাই এখন থেকেই দিল্লি থেকে নির্দেশ গেছে দুটি স্তরে – সমস্ত রাজ্য বিজেপি’র শাখায় দলীয় কর্মীদের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, তারা যেন জনগণের কাছে গিয়ে কেন্দ্রিয় প্রকল্পের সুবিধাগুলি বুঝিয়ে মোদি সরকারের সাফল্য তুলে ধরে। একইভাবে প্রশাসনিক স্তরে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে , দেশের সকল জেলার শাসকরা যেন সেই জেলার ১০-১৫ জন মানুষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কথা বলিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চান। যে সমস্ত প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ দেয়, তার সুফল ভোগীদের কাছে কেন্দ্রের জনদরদী ভূমিকা তুলে ধরাই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য। মুশকিলটা এখানে। ক্ষমতায় থাকতে হলে জনগণের জন্য কাজ করতে হবে, দেশের জন্য উন্নয়ন করাটাই কর্তব্য, এটা যেন ভুলে না যায় কেন্দ্র। গোলটা বেঁধেছে তখনই যখন একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী কি এভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে সরাসরি কেন্দ্রের ভূমিকা তুলে ধরতে পারেন? এটা সাংবিধানিক রীতিনীতিরও প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্ন, যে প্রকল্পের অংশীদার কেন্দ্র ও রাজ্যগুলি উভয়েই, আর্থিকভাবে ৬০:৪০ অনুপাতে টাকা দেয়, সেখানে কি কেন্দ্র রাজ্যকে এভাবে একতরফা সরিয়ে নিজে জনগণের কাছে প্রকল্পের সাফল্য এককভাবে দাবি করতে পারে? উভয়ের আর্থিক দায় ও দায়িত্ব থেকেই এখন প্রশ্ন উঠে আসে।

 

   গোল বাঁধার কারণটা অন্য। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার মুদ্রা যোজনা, বিনামূল্যে রান্নার গ্যাস সংযোগ (উজালা স্কিমে) যারা গ্যাস পেয়েছেন তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সেগুলি বিলি করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে। তাই প্রতিবাদ বা প্রশ্ন তোলার অবকাশ হয়নি। এবার গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা রূপায়নে রাজ্যকেও সাথে নেওয়া হয়েছে। সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে দায় নির্দিষ্ট করে ক্ষমতার বিভাজিত তালিকা আছে। কিন্তু যৌথ অংশগ্রহণের মধ্যে থেকে পরিচালিত প্রকল্পে একে অপর বাদ দিতে পারে না। সেই জন্যই কেন্দ্র-রাজ্যের জন্য পৃথক পৃথক তালিকা সত্ত্বেও রয়েছে একটি যৌথ তালিকা। সেই যৌথ তালিকার ৪৭টি বিষয় ছাড়াও কেন্দ্র যখন তার নিজের তালিকাভুক্ত ৯৭টি বিষয় নিয়ে কাজ করে, সেক্ষেত্রে কেন্দ্র যদি আর্থিক দায় রাজ্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়, রাজ্য কেন কেন্দ্রকে ফাঁকা মাঠে গোল করতে দেবে? টাকা দিতে বাধ্য করাবে, অথচ কৃতিত্বের ভাগ দেবে না, এমনটা কীকরে হয়? কেন্দ্রের আবাস যোজনায় ২৮০০ কোটি টাকা দিয়েছে কেন্দ্র। আর রাজ্য দিয়েছে ১৮০০ কোটি টাকা। তাই (সারা দেশ মোদির নানা প্রকল্পে মোদিকে সরাসরি উপভোক্তার সঙ্গে কথা বলতে দিয়েছে, বাদ সেধেছে শুধু বাংলা) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন: টাকাটা যখন রাজ্যও দিয়েছে, তাহলে রাজ্যকে বাদ দিয়ে কেন্দ্র কেন কথা বলবে? দেশের অন্য সব রাজ্য সেখানে চুপ, খুব যথার্থ ও সঙ্গত এই প্রশ্নটি শুধু বাংলাই করে দেখাতে পারল। আসলে ক্ষমতায় এসে মোদি রাজ্যগুলির ক্ষমতাকে সংকুচিত করে কেন্দ্রের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করে চলেছেন। তারই প্রতিবাদ এল বাংলা থেকে।

 

   এবার আসি রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্নে। কেন্দ্রীয় সরকার দেশের উন্নয়নে কাজ করবে। রাজ্য সরকারও। তারা কেউই নিজ স্বার্থের প্রতিভূ নয়। জনগণের আশা আকাঙ্খার ও দাবির রূপায়নে তারা সকলেই দায়বদ্ধ। এই রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়েই একটি দলকে ক্ষমতায় আসতে হয়। মোদি কি সেই নৈতিকতাকে বিসর্জন দিতে চান? আমরা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর দলের নেতা হিসেবে দেখতে চাই না। তিনি সকলের। কিন্তু এহেন রাজনৈতিক প্রচারলোভী পদক্ষেপে মনে হতেই পারে জনগণের সরকার কার? বিজেপির না জনগণের? কার টাকায় সরকার চলে? বিজেপি’র না জনগণের করের টাকায়? তাহলে এত প্রচারের চেষ্টা কেন? ৮৩২৩ কোটি টাকা খরচ করে কেন্দ্রীয় সরকার প্রচার করছে কোথায় তারা কি করেছে, কোন প্রকল্পে তারা কত মানুষকে সুফল পৌঁছে দিতে পেরেছে? এই কারণেই এখন তারা চাইছে, রাজ্যে রাজ্যে আবাসন প্রকল্পগুলি করেছে যেন শুধু তারাই। পারলে বাড়ির গায়ে বোর্ড ঝুলিয়ে দিতে চায় – লিখে দিতে চায়: “কেন্দ্রের টাকায় তৈরি” বলে। খুব স্পষ্টই সুপ্রিম কোর্ট এ প্রসঙ্গে নিষেধ করে রায় দিয়েছে। একমাত্র রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রি ছাড়া কোনও নেতার নামে সরকারি প্রকল্পগুলির প্রচার করা যাবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যদি নিজেই ওই আসনে বসে দলের নির্বাচনী মুখ হয়ে ওঠেন, তার সীমা কে টানবে? এই প্রবণতা স্বাধীন ভারতের পথচলার শুরুর থেকেই চলছে। নেহরুর ছবি দিয়ে প্রচার করে দেখানো হত আধুনিক ভারতের উদার ভাবমূর্তির রূপকার তিনি। এরপর একইভাবে নিজের ব্র্যান্ডিং করে নিজেকে এশিয়ার মুক্তিসূর্য করে তোলেন ইন্দিরা গান্ধী। বরং রাজীব গান্ধী, মনমোহন, সোনিয়ারা তুলনায় অনেক স্বাভাবিক। অটল বা অন্যরা যাঁরা মাঝে ‘প্রধানমন্ত্রী’র আসনে বসে নির্বাচনের মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরা কেউই সরকারের ‘মুখ’ হয়ে নিজেকে তুলে ধরেন নি। নরেন্দ্র মোদি সেই অর্থে একেবারে ভিন্ন। নেহরু ছিলেন স্বাধীনতার পর নতুন আশার প্রতীক, ইন্দিরা ছিলেন যেন তিনি নিজেই সরকারার মোদি হলেন সরকার নামক রাষ্ট্রীয় মহাসংগঠনের “আধুনিক কর্পোরেট প্রধান”। তিনি সরকার হতে চান না, তাতে দায় বেশি। । কিন্তু সরকারের সব সুবিধেটা নিজের পকেটে নিতে চান এবং ক্ষমতাকে ব্যবহার করেই দলকে ব্যবহার করেই দলকে ফের ক্ষমতায় ফেরানোর জন্য সরকারের অর্থ ব্যবহার করেন রাজনীতির কৌশলে। দুঃখিত, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এমন অভিযোগ নয়, অভিযোগ তিনি যখন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি হয়ে উঠতে চান।

 

    এই সমস্যার প্রতিভূ শুধু মোদি নন। এদেশের রাজনীতিতে এখন এটাই ‘ট্রেন্ড’। এমনই একটা ঝোঁক প্রথম তৈরি হয়েছিল দক্ষিণী রাজনীতি থেকে। সেখানে দলের নেতা দেশেরও উর্দ্ধে। সরকার তো তার হাতের যন্ত্র, মানুষের পরিষেবা দেয় সরকার না, দেয় তাঁর ইচ্ছে, তাঁর উদ্যম, তাঁর নেতৃত্ব। এরকমই একটা ব্যক্তিত্বপ্রধান ‘কাল্ট’ রাজনীতির জন্মদাতা ছিলেন করুণানিধি, এনটি রামা রাও, জয়ললিতারা। পরে এমনটা ধীরে ধীরে চলে আসে জাতপাতে বিভাজিত গোবলয়ের রাজনীতিতেও। সেখানে লালু কিংবা বহেনজি মায়াবতী প্রত্যেকেই সরকার চালাতে এসে সরকারের মুখ হয়ে উঠেছেন এবং শেষে সরকার মানে তিনি আর তিনি মানে সরকার হয়ে উঠেছেন। এবার বাকি বিভিন্ন রাজ্যে একই প্রবণতা। এই রাজ্যেও সর্বত্র চোখে পড়বে লেখা – “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায়...” এভাবেই এখানে ছড়িয়ে পড়ছে। রাজনীতিকদের সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেকে ‘লার্জার দ্যান গভর্নমেন্ট” করে তোলার দৃষ্টান্ত। মোদি কেন্দ্রে বসে এইসব আঞ্চলিক নেতা ও রাজ্য সরকারের প্রধানদের মতো আচরণ করছেন। প্রতিটা ক্ষেত্রেই তিনি জনগণকে বোঝাতে চান সবই চলছে কেন্দ্রের টাকায়। আরে বাবা, বাপ যদি ছেলেপুলেদের খাইয়ে প্রচার করে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যে তাঁর টাকায় এই বাড়িটা হল, (যদিও বাড়ির ৪০শতাংশ দিয়েছে ছেলেরা) তাহলে সেই বাপকে লোকে কী বলবে?

 

   সবকিছুই এখন দেশটায় নেতানেতৃদের “অনুপ্রেরণায়” চলছে ফলে গণতন্ত্রটাও একটা সার্কাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে! মানুষ এবং নেতা সকলেই ভুলে যাচ্ছে, কারুর ইচ্ছেতে নয়। সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাতেই ক্ষমতাসীনরা জনগণের উন্নয়নে বাধ্য। এর জন্যই তাদেরকে ক্ষমতায় পাঠিয়েছে সাধারণ মানুষ, এটা ভুলে যাচ্ছেন নেতারা। ভাবছেন তাঁরাই সব, তাই তাঁরাই সব করে দিচ্ছেন।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com