আমরা কি সত্যিই তাঁকে চিনেছি?

 

 

 

গান্ধীজীকে আমরা সত্যিই চিনতে পেরেছি কি? এত বছর পরেও? কারণ, “যাঁরা মহাপুরুষ তাঁরা যখন আসেন আমরা ভালো করে চিনতে পারি না তাঁদের। কেননা, আমাদের মন ভীরু অস্বচ্ছ, স্বভাব শিথিল, অভ্যাস দুর্বল। মনেতে সেই সহজ শক্তি নেই যাতে করে মহৎকে সম্পূর্ণ বুঝতে পারি, গ্রহণ করতে পারি। বারে বারে এমন ঘটেছে। যাঁরা সকলের বড় তাঁদেরই সকলের চেয়ে দূরে ফেলে রেখেছি”। - গান্ধীজী সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের ওই উক্তি একটু অন্যভাবে সমর্থন করেছিলেন মোৎসার্টের চিরবিদ্বেষী – স্যালিয়েরি। তিনি বলেছেন, “মাঝারিরা চিরকালই মহৎ মানুষদের নিজেদের মাপে ছেঁটে ছোট করতে চায়”(আমাদিউস)।

 

   যাঁকে রবীন্দ্রনাথ মহাত্মা আখ্যা দিয়েছিলেন, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তুলনা করেছিলেন সোক্রেতিসের সঙ্গে, সুভাষচন্দ্র স্বীকার করেছেন ‘জাতির জনক’ বলে, তাঁকেই মায়াবতীর মতো ভুঁইফোড় রাজনৈতিক নেত্রী ‘শয়তানের সন্তান’(শয়তান কী অওলাদ) বলতে দ্বিধা করেন না।

 

   করবেন নাই বা কেন? হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে আপন ভূমিকা ভুলে কি দেশভাগের জন্য তাঁকে দায়ী করিনি? দরিদ্র কৃষক মজুর শ্রেনীর বঞ্চক, দলিতদের শত্রু বলে কি নিন্দা করিনি? জিন্নাহ্‌-র মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, পুরোনো বিপ্লবী, সাম্যবাদী, সুভাষপন্থী, আধুনিকতা ও প্রগতির ধ্বজাধারী – কেই বা তাঁকে ছেড়ে কথা বলেছে, নীরদ সি চৌধুরী xenophobia-র অপবাদ দিয়েছেন (যেমন খুসবন্ত সিংয়ের মতো তৃতীয় শ্রেণীর লেখক রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি ভাষার অজ্ঞতা নিয়ে)।

 

   জন্মের এত বছর পরও গান্ধীজীর কোনো পূর্ণাঙ্গ জীবনী প্রকাশিত হয়নি, অথচ বহু আগে জওহরলাল নেহরুর সে সৌভাগ্য হয়েছে। একদা হয়েছে বীরভজনা, আজ হচ্ছে অবমাননা, যাকে  debunking  বলা হয়। সত্যিকারের মূল্যায়নের জন্য কি আমাদের ভবভূতিকথিত “কেহপি সমাধানধর্মা’-র জন্য অপেক্ষা করতে হবে?

 

   কাজটি অত সহজও নয়। কারণ ব্যক্তি হিসেবে এমন জটিল চরিত্র ইতিহাসে দুর্লভ। ‘মহাত্মা’ উপাধি বহুল ব্যবহৃত হলেও তিনি বুদ্ধ, চৈতন্য বা যিশুর সমগোত্রীয় ছিলেন না। তাঁর মধ্যে বিচিত্র, এমনকি আপাতবিরোধী চৈতন্যের স্তর লক্ষ করি। কখনও তিনি ভিক্টরীয় যুগান্তের সুভদ্র উদারতন্ত্রী, কখনো বা আপসহীন নৈরাজ্যবাদী (বাকুনিনের অর্থে নয়), কখনও গীতার স্থিতপ্রজ্ঞ, আবার কৌটিল্যপম ঝানু রাজনীতিজ্ঞ, কখনও নিজেকে বর্ণাশ্রমী রক্ষণশীল হিন্দু বলেছেন, কখনও হরিজনদের মন্দিরে প্রবেশাধিকার আন্দোলনের পুরোভাগে, অসবর্ণ বিবাহে উৎসাহী, প্রার্থনাসভায় রাম-রহিমের সমীকরণ করেছেন।

 

   স্বদেশীয় শিল্প প্রগতির স্বার্থে ধনিক-বণিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছেন এই কৃষক শ্রমিকদের সহযোদ্ধা। জাতীয়তাবাদের অনমনীয় এই প্রবক্তা কোনোদিন জাতিবৈরিতাকে প্রশ্রয় দেননি, আবার ইংরেজদের সবচেয়ে বড়ো দুর্দিনে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন করতে দ্বিধা করেননি। খিলাফৎ আন্দোলনে মুসলমানদের এত বড় বন্ধু কেউ ছিলেন না। বিহার, কলকাতা, দিল্লি, নোয়াখালির দাঙ্গার সময় তাদের ধন-প্রাণ রক্ষার্থে জীবন দিতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। আবার ধর্মের অজুহাতে বিভেদকামী মুসলমানের এতবড় প্রতিবাদীও কেউ ছিলেন না। সহযোহিতার সঙ্গে অসহযোগের, বিরোধের সঙ্গে আপসের, ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে নিরাসক্তির অদ্ভুত মিশ্রণ এই চরিত্র নানা শ্রেণীর, নানা স্বার্থের মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছে শুধু সততা ও ভালোবাসার জোরে।

 

   এক সময়ে তিনি বলছে, “ঈশ্বরই সত্য”, শেষে বলছেন – “সত্যই ঈশ্বর”। আর এ ঈশ্বর ঈশোপনিষদের ভাষায়, সকলকে ব্যপ্ত করে আছেন। যিনি সর্বভূতহিতে রত। মানুষের মঙ্গলসাধনের লক্ষ্যে অবিচল, তিনিই প্রকৃত ধার্মিক। কারো ধনে তাঁর লোভ নেই, ত্যাগ দ্বারা ভোগ করেন তিনি। কিন্তু এ ধর্ম হিংসা ও অসত্য দ্বারা সাধিত হয় না। উপায় শুদ্ধ না হলে লক্ষ্যও সিদ্ধ হয় না। আবার এ ধর্মকে রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে।

 

   ম্যাকিয়াভেল্লির সময় থেকে রাজনীতির যে সংজ্ঞা চলে আসছিল, তাকে বাতিল করে দিলেন। তিনি বললেন, রাজনীতি নয় দুর্নীতি, ব্যক্তিস্বার্থপূরণ, স্বজনপোষণ, শ্রেণীশোষণ, পরিবেশ বিনষ্ট করে ধন উৎপাদন, এবং দরিদ্র ও দুর্বলদের ধনবণ্টনের ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা। ছলের বদলে ছল নয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোভ নয়।

 

   বৃহৎ রাষ্ট্র, বৃহৎ যন্ত্রের দাসত্ব নয়। কিন্তু অন্যায় ও অত্যাচারকে অহিংস প্রতিরোধ করবার সুমহান দায়িত্ব। রবীন্দ্রনাথ কেন তাঁকে মহাত্মা আখ্যা দিলেন? প্রচলিত অর্থে নয়। “মহাত্মা তিনিই, সকলের সুখ দুঃখ যিনি আপনার করে নিয়েছেন, সকলের ভালোকে যিনি আপনার ভালো বলে জানেন, আমাদের শাস্ত্রে ঈশ্বরকে বলে মহাত্মা, মর্তলোকে সেই দিব্য ভালোবাসা, সেই প্রেমের ঐশ্বর্য দৈবাৎ মেলে। মহাত্মা তিনি, কারণ আমাদের মজ্জাগত ভীরুতাকে নিজে জয় করে, জয় করতে শিখিয়েছেন, মহাত্মা – কারণ তিনি দেখিয়েছেন কোনখানে আমাদের বিপদ – মানুষ যেখানে মানুষকে অপমান করে, মানুষের ভগবান সেখানে বিমুখ”।

 

   হাজার বছর ধরে অপমানের ভার চাপিয়ে দিয়েছি কোটি কোটি মানুষের ওপর। সেই পাপে আমরা নিজগৃহে পরবাসী, তাই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারি না। নির্ভর করি পরদেশীয় কামান-বন্দুক, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থার ওপর। ভাইকে ভাইয়ের সম্মান দিইনি, বিদেশী শাসক বা দর্শকও আমাদের সম্মান দেয়নি। মহান তিনি, কারণ আমাদের সকলের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে বসেছেন, যাতে তাঁর তপের আগুনে আমরা জ্বলে উঠি। রাষ্ট্রীক পরাধীনতা বা আর্থিক দীনতা সামাজিক ভেদবিচ্ছেদকে অবলম্বন করেই পুষ্ট। মহাত্মাই দেখালেন মুক্তির পথ মানুষের ঐক্য সাধনায়, মানুষের আত্মজয়ে। তাতেই নিদ্রিত দেশ জেগে ওঠে। জাপান-জার্মানের সশস্ত্র সাহায্য ছাড়াই ব্রিটিশ বিতারণ সম্ভব। তাই তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্রের শেষ বিচারে – ‘জাতির জনক’।

 

   নবীন প্রজন্মের জওহরলাল নেহরু তাঁকে কীভাবে দেখলেন, তা পড়ে শোনাই ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’র থেকে – “টাটকা হাওয়ার একটা প্রবল প্রবাহের মতো ছিলেন তিনি। আমাদের জাগিয়ে দিলেন, গভীর নিঃশ্বাস নিলাম আমরা। তিনি ছিলেন আলোর ঝলকের মতো যা অন্ধকার ভেদ করে আমাদের চোখের সামনের পর্দাগুলো খুলে দিল। ঝড়ের মতন এলেন তিনি, তাতে কত কী যে উড়ে গেল। সব থেকে উড়ে গেল মানুষের চিন্তাধারার পুরনো পদ্ধতি। তিনি ওপর থেকে নেমে আসেননি। তিনি যেন ভারতের কোটি কোটি মানুষের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন, তাদেরই ভাষায় কথা বললেন, তাদেরই ভয়াবহ অবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর শিক্ষার সার কথা – অভয় (ভয়কে জয় করা), সত্য এবং কর্ম, যা গণকল্যাণমুখী”।

 

   বিদেশী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের সামরিক সাহায্য নয়, কারণ তারা তারজন্য কঠিন মূল্য দাবি করবে। অপরের সাহায্যে দেশ স্বাধীন হলেও তা টিকিয়ে রাখা যাবে না, যদি না আমাদের দেশবাসী নিজেরা তৈরি হয়। গান্ধীজী তাই নিজের দেশকে প্রস্তুত করবার কথা বলেছিলেন সুভাষচন্দ্রকে। আন্দামান-নিকোবর (শহীদ দ্বীপ-স্বরাজ দ্বীপ) জয় করবার পরেই বস্তুত জাপান মূল্য দাবি করেছিল। আমরা বুঝিনি গান্ধীজীর ওই কথার তাৎপর্য, বুঝেছিলেন এক বিদেশী, হো চি মিন। ভারত সফরে এসে কলকাতা বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আমরা বিশ্বের সকল বিপ্লবীই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গান্ধীজীর শিষ্য। নিজের দেশবাসীকে প্রস্তুত না করে, বিদেশীদের সামরিক সাহায্যে দেশের স্বাধীনতা এলেও তা স্থায়ী হয় না, সাহায্যকারী চরম মূল্য নিয়ে নেয়। তারাই স্বাধীনতা গ্রাস করে। ভিয়েতনাম তার সাক্ষী”(১৯৭১)।

 

আমরা বাঙালি তো। কিছু কি বুঝলাম? এবং কিছুমাত্র চিনলাম কী?

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com