ভালোবাসা অন্তহীন

 

ভালোবাসার জন্ম আছে। মরণও আছে। তবু অন্তহীন.....

 

   ভালোবাসা প্রত্যাশাহীন হয়েই জন্মায়। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রত্যাশার জন্ম দেয়। তখন থেকেই ভালোবাসা চাওয়া-পাওয়াতে বদলাতে থাকে। ক্রমশ চাওয়া-পাওয়ার দোলদুলুনিতে ভালোবাসায় টানাপোড়েন শুরু হয়। না পাওয়ার পাল্লা ভারী হলে সেই টানে ভালোবাসা যন্ত্রণাময় হয়ে ওঠে।

 

   বিশ্বাসের ভিত্তি হল বোঝাপড়া। একটি মন অন্য কোনও মনকে সঙ্গী হিসেবে চায়। মানসিকতা ও মূল্যবোধ যদি মিলে যায় তখন বোঝাপড়া তৈরি হয়। যদি সাড়া মেলে অন্তরে, তার প্রতি তখন বোঝাপড়া তৈরি হয়।

 

   ভালোবাসার কোনোও বয়স লাগে না। শিশু থেকে বৃদ্ধ মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু সারা জীবনই মন থেকে কিছু চায়। এই চাওয়ার ভিত্তিতে বোঝাপড়া তৈরি হয় যার সাথে, ভালোবাসা তার সাথেই হয়। বিশ্বাস থেকে যদি বোঝাপড়া আরও দৃঢ় হয়, তখন দু’টি মন ভালোবাসতে শুরু করে।

 

   এই বিশ্বাসেরও নানা রকমফের আছে। সম্পর্কের ভিত্তিতে সেই জন্য মানসিকতা, চাওয়া-পাওয়ার মূল্যবোধ সমস্ত কিছু বদলে যায়। একজন মানুষ যতগুলি মানুষের সঙ্গে মেশে তাদের প্রতি তার চাহিদা, মানসিকতার দৃষ্টিভঙ্গি সবই বদলায় সম্পর্কের ভিত্তিতে। এই সম্পর্কটা যেমন মনের – অর্থাৎ আত্মিক, তেমনই সমাজ দ্বারা তৈরি – অর্থাৎ সামাজিক। আত্মিক টান থাকলেও সমাজ তাকে অনুমোদন না দিলে সেই ভালোবাসা লোকসমাজে লোকচক্ষুতে লজ্জার বা গল্পের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আর আত্মিক ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সর্বজন অনুমোদনে যে সম্পর্ক তৈরি হয় ভালোবাসা তাতে যে থাকবেই তার কোনও মানে নেই। ভালোবাসা সম্পর্ককে আধার করে তৈরি হয় না, যদিও সম্পর্কের আধার না পেলে ভালোবাসা প্রকাশ করা শক্ত। তাই বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয় হলেও সামাজিক অনুমোদনেই একটি ভালোবাসা স্বীকৃতি পায়, তা না হলে ভালোবাসার চোরাস্রোতে একটি জীবন বয়ে চলে সকলের অন্তরালে।

 

জীবনের লক্ষণ ভালোবাসা:

 

তবু ভালোবাসা থামে না। এমনই দুরন্ত এর প্রকৃতি। জীববিজ্ঞানীরা মানুষকে জৈব বিশ্লেষণে যদি রক্ত-মাংসের পিণ্ড ভেবে ব্যাখ্যা করেন, তাহলে বলতে হয় ভালোবাসা তার হর্মোনাল প্রতিক্রিয়া। পিটুইটারি গ্রন্থীর একটি হর্মোন ক্ষরণ চলতেই থাকে। তাই মানুষ ভালোবাসতেই থাকে। তাই জীবন যতদিন, ভালোবাসাও ততদিন। অত্যন্ত স্বাভাবিক। এই হর্মোন ক্ষরণ যত বেশি হয় যার, ভালোবাসার তীব্রতা তার তত বেশি। আবেগ বাড়ে কিংবা কমে হর্মোনের ক্ষরণ বাড়লে বা কমলে। ভালোলাগা বোধ থেকে একটি উদ্দীপনাবোধ তৈরি হয়, তখন ভালোবাসার হর্মোনটির ক্ষরণ হতে শুরু করে। যত সেই ভালোবাসা বাড়তে থাকে, ততই সেই ভালোবাসার হর্মোন বাড়ে বলে তীব্র হয় ভালোবাসার ইচ্ছে। যদি বিশ্বাসে আঘাত লাগে, মস্তিষ্কে তখন একটি বিশেষ বার্তা পাঠায়। সংবেদনশীল ঐ গ্রন্থী থেকে তখন ভালোবাসার হর্মোন আর ক্ষরণ হয় না। ক্রমশ কমতে থাকে।

 

   মনের মধ্যে যে ছবিটি প্রতিদিনের আচরণে কথায় আশ্বাসে-কর্মে তৈরি হয় তাই-ই বিশ্বাসবোধ তৈরি করে। নতুন বিশ্বাস জন্ম দেয়। পুরোনো বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জও করে। এক্ষেত্রে সামাজিক শুধু নয়, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং অর্থনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও মানুষের বিশ্বাসের গঠনকে প্রভাবিত করে যা থেকে সুকুমার প্রবৃত্তির রূপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণাগুলিও বদলাতে থাকে। এই কারণেই রোমান্টিকতা নিয়েও মানুষের চিন্তাভাবনা ও প্রকাশের আঙ্গিক বদলেছে সময়ের সাথে সাথে। বিশ্বাসের ভিত্তিও এভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। ভালোবাসাও তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়।

 

ভালোবাসা শাশ্বত:

 

কিন্তু কিছু কিছু ভাবনা বদলায় না। যা বদলায় না, তাই শাশ্বত। তাই কিছু শাশ্বত ভাবনাকে ঘিরে গড়ে ওঠা শাশ্বত বিশ্বাস শাশ্বত ভালোবাসাকে জন্ম দেয়। যে গোষ্ঠী যে দেবতার অর্চনার মধ্যে নিজের আশা-আকাঙ্খার মুক্তি খুঁজে পায়, সেই গোষ্ঠী সেই দেবতাকে ভালোবাসে। এ তার শাশ্বত ভালোবাসা। ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা তাই শাশ্বত ভালোবাসা। তেমনই সন্তানের প্রতি ভালোবাসাও বেশিরভাগ সময়ই শাশ্বত ভালোবাসা। আসলে যে ভালোবাসা কোনোও ভাবনা নির্ভর তা তৈরি হয় যিনি ভাবছেন তার মনোগঠনের ভিত্তিতে। তার মনের সেই গঠনটা যতদিন বদলাবে না, ততদিন সেটা তার কাছে শাশ্বত। শাশ্বত তাই একপ্রকার ব্যক্তিনির্ভরও। যারা ঈশ্বরবিশ্বাসী নয়, কোনও ঈশ্বরবাদী ভাবনাও তার কাছে শাশ্বত নয়। এই কারণে ব্যক্তি যখন ব্যক্তিরহিত হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, তার নিজের ভাবনার মধ্যে থেকেই একটি স্থায়ী রূপকল্পকে আশ্রয় করে ক্রমশ একটি অবয়বের মধ্যে তাকে ধরার চেষ্টা করে। সেই অবয়ব হতে পারে কোনও কল্পিত দেবমূর্তি, কোনও প্রাকৃতিক বস্তু। দেবদেবীর প্রতি টান, হিমালয়ের প্রতি টান, খেলাধুলোর প্রতি টান, কোনো ভালোলাগা বস্তুর প্রতি টান, সবই কোনও কোনও ব্যক্তি বা সমাজের কাছে শাশ্বত। আমরণ।

 

   সেই শাশ্বত ভাবনাকে আশ্রয় করেই তার ধর্মীয় অস্তিত্ব। সেই একটি চেতনাকে আশ্রয় করেই তার প্রকৃতি চেতনা। এমনকি তামিলনাড়ুর জাল্লিকাট্টু বা স্পেনের ষাঁড়ের লড়াইয়ের মতো ষাঁড়ের সঙ্গে একটি জাতি খুঁজে পায় অস্তিত্ব। তার সমগ্র ভাবনা-চিন্তা-ঐতিহ্য গড়ে ওঠে একটি বিশেষ ক্রীড়া বা অনুষ্ঠানকে ঘিরে। বাঙালির দুর্গাপূজার প্রতি টানটাও একই রকম। আসলে এই টানটাই ভালোবাসা। সেটা কখনও কোনও বিষয়ের প্রতি, কখনও কোনও ভাবনার প্রতি, কখনও কোনো বিশ্বাসের প্রতি, কখনও কোনও ঐতিহ্য, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসাকে সমগ্রর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তাহলে বোঝা যায়, মানুষ তার ঐতিহ্যকে খোঁজে বলেই ভালোবাসে। মানুষের অস্তিত্ব অন্তরে-বাইরে। অন্তরে যে যার প্রতি টান অনুভব করে, তার সঙ্গে তার ভালোবাসা। নিজের যে ভাবনা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে সে চলতে চায়, তার সঙ্গে যার মিল, তাকেই সে ভাবে মনের মানুষ। মনের মানুষকে আশ্রয় করেই সে বাঁচতে চায়। আসলে সে যে সেই মনের মানুষের মধ্যে নিজেকেই খোঁজে।

অন্তহীন ভালোবাসা মানে অন্তহীন নিজেকে খোঁজা......

 

   যে সাথীকে নিয়ে এই আত্মানুসন্ধান চলতে থাকে, সে-ই হয়ে উঠতে পারে মনের মানুষ। ভালোবাসার অনেক মাত্রা, অনেক রূপ। যখন তা ব্যক্তি থেকে সমগ্রের আত্মানুসন্ধানে প্রবল হয়ে ওঠে, তখন তার মধ্যে পাওয়া যায় অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বের সাধনা – পূর্ণ হয়ে ওঠার আকুতি। এটাই মানুষের জীবনের চরম সত্য। সে খুঁজছে....খুঁজছে....নিজের প্রকৃতিকে.....নিজের প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে একটি অবয়ব। যার মধ্যে সে নিজেকে বিলীন করেই দেখতে চায়। এই চাওয়ার জন্যেই তার ভালোবাসা। ক্রমশ এই চাওয়াটাই তার ভালোবাসা হয়ে ওঠে। কখনও কোনও ব্যক্তির প্রতি, কখনও বিষয়ের প্রতি, কখনও সমগ্র জগতের প্রতি, কখনও বা ব্যক্তি-সমাজ, বিষয়-প্রকৃতি-জগতের গণ্ডি পেরিয়ে মহাজাগতিক হয়ে ওঠার তীব্র আকুলতায় সে অতিমানবিকও হয়ে উঠতে চায় এই ভালোবাসার টানেই। তাই অচেনা কাউকে বাঁচাতেও জলে ঝাঁপ দেয় কোনও কোনও মানুষ। আবার ভালোবাসাহীন হয়ে সমস্ত নির্লিপ্ততার শিকার হয়ে জড় জীব হয়ে যায় এই মানুষই। তখন তার পাশে ক্রন্দনরত সাহায্যের হাত বাড়ানো অসহায় মানুষটিও হয়ে যায় বিড়ম্বনা। জীবনও এইভাবে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে থাকলে সৃজনশীল হয়ে থাকে। নিত্য নতুন ভাবনায় কর্মের ফলে তার ডালপালা সুগন্ধ ছড়ায়, নয়তো ভালোবাসাহীন জীবন হয়ে ওঠে একমাত্রিক বোঝা, যেন বয়ে বেড়ানোটাই সেখানে দায়। ভালোবাসাকে তাই স্বাভাবিকভাবেই বাঁচিয়ে রাখাটা জীবনের স্বার্থেই প্রয়োজন। নয়ত ধ্বংস অনিবার্য।

 

ভালোবাসা ‘প্রেম’ নয়:

 

কোনও প্রত্যাশা থেকে ভালোলাগা, বা তা থেকে ভালোবাসা তৈরি হয় না। কিন্তু প্রেম জন্ম নেয় প্রেমাস্পদকে তীব্রভাবে প্রত্যাশা করে। তাই ভালোবাসা থেকে প্রেম জন্ম নেয়। কিন্তু প্রেম ভালোবাসা নয়। ভালোবাসা একতরফা। প্রেম একতরফা নয়। চাওয়া-পাওয়ার দাবি থাকে প্রেমে। সেটা না মিটলে প্রেম টেকে না। ভালোবাসা টিকে থাকে প্রেম ভেঙে যাওয়ার পরেও। কিন্তু ভালোবাসা থাকলেও প্রেম হয় না। যদি না প্রেমাস্পদকে সেখানে তীব্রভাবে কাছে পাওয়ার ইচ্ছেটা না থেকে। ভালোবাসা যখন তীব্র হয়, মন তখন তার প্রিয় বস্তু বা ব্যক্তিকে নিজের মতো করে পেতে চায়। এটাই নিয়ম। তাই অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ভালোবাসা যত পুরোনো হয়, যত বিশ্বাস দৃঢ় হয়, যত বোঝাপড়াটা সাবলীল ও আস্থায় ভরে ওঠে, ততই মনের টান তীব্র হয়। এই তীব্রতা এতটাই চঞ্চল করে তোলে যে মনের আকাঙ্খিত সেই বস্তু বা ব্যক্তিকে না পেলে তার বেদনায় মানুষটি মর্মাহত হয়ে থাকে। কেবলমাত্র ভালোবাসা থেকে কিন্তু এত তীব্র প্রেম জন্ম নেয় না। ধীরে ধীরে মানুষের ভালোবাসার প্রকৃতিটা ভিতরে ভিতরে বদলাতে থাকে। ক্রমশ যখন কোনও ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি মানুষের মন ‘ফোকাসড’ হয়ে পড়ে, যখন ব্যক্তিগত সময়ে সেই ব্যক্তি বা বস্তুকে পেতে ইচ্ছে করে ক্রমে ক্রমে , সেই ব্যক্তি বা বস্তু ছাড়া জীবনের ব্যক্তিগত সময়গুলো যখন অর্থহীন বলে বোধ হতে থাকে, তখন মানুষ সেই ব্যক্তি বা বস্তুর প্রেমে পড়ে। তার প্রিয় ব্যক্তি বা বস্তুর থেকে চায় অন্তরের তৃপ্তি। সেই তৃপ্তির খোঁজেই মানুষ কেবলমাত্র ভালোবাসার প্রশান্তির অনুভব পেরিয়ে, আত্মানুসন্ধানের আকাঙ্খা ত্যাগ করে। কিন্তু অনেক সময় মানুষ প্রেমাস্পদকে পাওয়ার জন্য হিতাহিত জ্ঞানশূন্যও হয়ে পড়ে। ভালোবাসা শান্তির, যেমন গঠনমূলক, প্রেম ততটাই অশান্তির, ধ্বংসমূলক হয়ে উঠতে পারে।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com