যাদবপুরের সংগ্রামী বন্ধুদের প্রতি খোলা চিঠি

 

 

যাদবপুরের ছেলেমেয়েরা দেখিয়ে দিলেন যে ছাত্র আন্দোলন এখনও সজীবতা হারায়নি।  বিশেষ করে ক্ষমতাদম্ভী শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার মতো লোকজন নতুন প্রজন্মের থেকেও উঠে আসছে, বিশ্বায়িত  পুঁজিবাদী সংস্কৃতি এখনও প্রতিরোধের  অত্যাবশ্যকীয়তাকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি, তাতে এখনও যথেষ্ট আশার সঞ্চার হয় বইকি! স্বশাসনের জয়ে  বুক ভরে আবার খানিকটা সতেজ নি:শ্বাস গ্রহণ করা যেতেই পারে।  আনন্দ তো আছেই, তার সাথে আত্মসমালোচনার অভ্যেস না থাকলে জয়ের গৌরব অনেকটাই কমে যায়। সাফল্য উদযাপনের সাথে সাথেই আন্দোলনের  সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও লড়াইয়ের স্বার্থে বন্ধুদের একটু ভাবা প্রয়োজন। এই সীমাবদ্ধতা হল  গণতন্ত্রের প্রয়োগে ত্রুটি।   

 

   স্বশাসনের জন্য আন্দোলন তো গণতন্ত্রের পক্ষেই, নয় কি?  সেক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হল বিরুদ্ধপক্ষকে সম্মান দেওয়া, তাদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখেই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।  সেটা কতখানি এই আন্দোলনে বজায় রাখা হয়েছে? 'চামড়া গুটিয়ে নেওয়া'-র অভ্যেস তো ফ্যাসিবাদী শাসকের থাকে, তার বিরুদ্ধেই যখন লড়াই, তখন এটাও তো মাথায় রাখা উচিত যে লড়াইটা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, তাই ফ্যাসিবাদীর ভাষাকেও ত্যাগ করতে হবে, নইলে লড়াই করেই বা লাভ কীসের?  তাহলে একজন ফ্যাসিবাদীকে উৎখাত করে তো আরেক ফ্যাসিবাদী আসবে এবং তারা নতুন উদ্যমে জনগণের চামড়া গোটাবে।  যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে রয়েছেন, তাঁদের হাত-পা তো বাঁধা।  লড়াই তো তাঁদের বিরুদ্ধে নয়, লড়াই তো শাসকের বিরুদ্ধে।  এঁদেরকে তাই 'দালাল' কিংবা 'চামচা' বলে আদতে আন্দোলনেরই ভাবমূর্তি নষ্ট করার সার্থকতা কোথায়?  এমনকি যে শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই, তাকেও সম্মান করাটাই গণতন্ত্রের দস্তুর। এমন কিছু আচরণ করা ঠিক নয় যাতে আন্দোলনের সহিষ্ণুতাকেই ব্যহত করে। আর সহিষ্ণুতা ছাড়া গণতন্ত্রও যে অর্থহীন।  গণতন্ত্র মানে কিন্তু শুধু ভোটাধিকার নয়, গণতন্ত্র মানে সবার সমান মর্যাদা, সমান সুযোগসুবিধা, সমান মতপ্রকাশের অধিকার।  গণতন্ত্র এক ধরনের সাংস্কৃতিক অনুশীলন। 

 

   ছাত্রছাত্রীরাই গণতন্ত্রের প্রহরী, সব দেশেই।  ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নতুন রক্তই সবার আগে রুখে দাঁড়ায়, তাই নিজের আচরণে যে ফ্যাসিজম লুকিয়ে থাকে, তার বিরুদ্ধে লড়াইটাই সবার আগে করা প্রয়োজন।  আন্দোলনের ভেতরে ফ্যাসিজম কিন্তু অনেকদিন ধরেই যাদবপুরে বাসা বেঁধেছে। তাই সাধু সাবধান! ক্যাম্পাসের ভেতরে মার্কসবাদীর যতটা মত প্রকাশের অধিকার থাকবে, ঠিক ততটাই বাকস্বাধীনতা গান্ধিবাদীরও থাকা উচিত, ব্রাহ্মণ্যবাদীরও, শরিয়ৎপন্থীরও এবং বাকিদেরও। লড়াইটা হোক ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভের, সেটা যেন কারো মুখ বন্ধ করে দিয়ে না হয়।  'পদ্মাবত' দেখাতে যারা বাধা দেয় আর 'বুদ্ধ ইন এ ট্রাফিক জ্যাম' দেখাতে যারা বাধা দেয় দু'পক্ষই ফ্যাসিস্ট।  যারা লেনিনের মূর্তি ভাঙে আর যারা শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি ভাঙে, দু'পক্ষই মৌলবাদী। আপনি যদি মৌলবাদীর স্বর রুদ্ধ করে দেন, তাহলে ফুটেজ খেয়ে তারা জনগণের সহানুভূতি আদায় করে নেবে।  তাই মৌলবাদের বিরুদ্ধে মৌলবাদ নয়, দাঁড় করাতে হবে বহুত্ববাদকে।  একইভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে হবে গণতন্ত্রকে।   ফ্যাসিবাদ একধরনের শাসনব্যবস্থার সাথে সাথে এক ধরনের মানসিকতাও বটে।  নিজের ভেতরের ফ্যাসিস্টকে শুরুতে চিহ্নিত করে প্রথমে যদি তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, তাহলে লড়াইয়ের আগেই বাইরের ফ্যাসিস্ট অর্ধেকটা পরাজিত হয়ে পড়ে।  

 

   সব শেষে একটা কথাই বলব, যারা কাজ করে তারাই ভুল করে। ভুল করার মধ্যে তাই অগৌরবের কিছু নেই। বরং নিষ্ক্রিয় থাকার চেয়ে ভুল করা ভালো। কিন্তু সঠিক সময়ে যদি ভুল শুধরে না নেওয়া হয়, তাহলে সেটা বিরুদ্ধশক্তির হাতেই অস্ত্র তুলে দেওয়ারই নামান্তর। তাই  যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী বন্ধুদের জন্য বহুত্ববাদী অভিনন্দন তো রইলই, এর সাথে পরবর্তীকালে আন্দোলনের পদ্ধতি আরও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠুক, সেটারই কামনা থাকবে। 

 

ভালোবাসার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা সহ,
শ্রেয়ণ 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com