আমার বইবেলা

আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো আমিও ক্রিকেট ,ডাং গুলি,লুকোচুরি ইত্যাদি হরেক কিসিমের খেলা খেলতাম ছেলেবেলায়। তবে রোগা পাতলা নড়বড়ে চেহারার জন্য পাত্তা পেতাম না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। তাই আমার আমার প্রিয় অবসর বিনোদনের মাধ্যম ছিল গল্পের বই। খুব ছোটবেলা থেকেই হাতের কাছে পেয়েছিলাম কাহিনীর বিশাল জগৎ। আমার কল্পনাবিলাসী মন বুঁদ হয়ে থাকতো সেই রোমাঞ্চের জগতে। একদম ছেলেবেলায় অর্থাৎ থ্রি ফোরে পড়ার সময় আমার অবসর জুড়ে থাকতো 'চাঁদমামা','হাঁদাভোঁদা','বাটুল দি গ্রেট','চাচা চৌধুরী' ইত্যাদি হরেকরকম কমিকসের বই। তারপর যখন প্রাইমারী ইস্কুলের গন্ডি পেরিয়ে উত্তর ভগবানপুর নবারুণ বিদ্যাপীঠে ভর্তি হলাম তখন আমার সামনে বইয়ের এক বিশাল জগৎ খুলে নবারুণ পাঠাগারের মাধ্যমে। ওখানে শুরুটা করেছিলাম কিশোর সাহিত্য দিয়ে-- 'বিশে ডাকাত,' সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত 'দুই বাংলার সেরা ডাকাতের গল্প', শশধর দত্তের 'দস্যু মোহন' সিরিজের কিছু বই শিবরাম চক্রবর্তীর 'বাড়ি থেকে পালিয়ে' ,এছাড়াও ফেলুদা ,ঘোনাদা,টেনিদা,পিন্ডিদা,ব্যোমকেশ,কিরিটি,অর্জুন,কর্নেল,জয়ন্ত মানিক,পাণ্ডব গোয়েন্দা থেকে শুরু করে হালের মিতিন মাসি পর্যন্ত এককথায় যাকে বলে যা পেয়েছি গোগ্রাসে গিলেছি। হ্যাঁ আর একটা কথা মেলা থেকে কেনা ছোট ছোট ভুতের গল্পের বইও পড়েছি খুব।

 

   আগাথা ক্রিস্টি বা শার্লক হোমস ও পড়েছি কিছু কিছু,তবে অনুবাদ সাহিত্য হওয়ায় খুব বেশি ভালো লাগেনি। আর একটা কথা আমার পছন্দের গোয়েন্দা কিন্তু ফেলুদা বা ব্যোমকেশ নয়, কর্নেল আর অর্জুনকেই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। গোয়েন্দা গল্পের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ থাকলেও সিক্স সেভেনে ওঠার পর থেকেই মূলধারার উপন্যাস পড়তে শুরু করেছিলাম। সেইসময় আমার খুব পছন্দের লেখক ছিলেন ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়।চিতা বহ্নিমান,শাপমোচন,আকাশ বনানী জাগে ,আশার ছলনে ভুলি ,বহ্নিকন্যা ,ভাগীরথী বহে ধীরে ,মন ও ময়ূরী ,জলে জাগে ঢেউ ,মীরার বধূয়া ,বধূ,ফুলশয্যার রাত ইত্যাদি উপন্যাস গোগ্রাসে গিলেছি । সাহিত্যমূল্য যাইথাক না কেনো এই উপন্যাস গুলোর প্রেম,পরকীয়ার বর্ণনা ইচড়ে পাকা কিশোর মনকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। একবার তো 'চিতাবহ্নিবান' এর নায়িকা 'তপতী' শব্দের অর্থ নিয়ে আমার আর সঞ্চারীর এমন ঝামেলা হয়েছিল শেষপর্যন্ত বাংলা শিক্ষক সচি বাবু সমাধান করেছিলেন।তবে সেই যে শুরুটা হয়েছিল আর ফিরে তাকাইনি। মাধ্যমিক দেওয়া পর্যন্ত চুটিয়ে পড়েছি কোনোরকম বাছবিচার ছাড়াই।মাধ্যমিকের পর ছুটিটা কাজে লাগিয়েছিলাম বাবার বইয়ের স্টকটা শেষ করে। শরৎ রচনাবলীর সবকটা খন্ড(শুধু 'শ্রীকান্ত' উপন্যাস টা পুরোটা শেষ করতে পারিনি।),বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী,কপালকুণ্ডলা,মৃণালিনী,বিষবৃক্ষ,ইন্দিরা,যুগলাঙ্গুরীয়,চন্দ্রশেখর,রাধারানী,রজনী,কৃষ্ণকান্তের উইল,রাজসিংহ,আনন্দমঠ,দেবী চৌধুরানী(সব শব্দের অর্থ তখন বুঝিনি)এছাড়াও তারাশঙ্করের গণদেবতা, ,পঞ্চগ্রাম, আরোগ্য নিকেতন, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা,পদ্মানদীর মাঝি আর অল্প কিছু রবীন্দ্রনাথ( রাজর্ষি,ঘরে বাইরে,শেষের কবিতা)পড়েছিলাম এই সময়টায়। তিনটে লাইব্রেরী ছিল আমার বইয়ের ভান্ডার। একটার কথাতো আগেই বলেছি দ্বিতীয়টি হলো ভগবানপুর সাধারণ পাঠাগার আর অন্যটি আমার মামার ক্লাব বাড় বাসুদেবপুর দেশপ্রাণ প্রগতি সংঘের লাইব্রেরি। প্রচুর বই পড়েছি ,তবে তার মধ্যে অতিন বন্দোপাধ্যায়ের 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে', 'ঈশ্বরের বাগান', প্রফুল্ল রায়ের 'কেয়া পাতার নৌকো' সিরিজ ,'সসাগরা' সমরেশ বসুর 'প্রজাপতি','বাঘিনী','দেখি নাই ফিরে','কোথায় পাবো তারে',সমরেশ মজুমদারের 'কালবেলা','কালপুরুষ', 'উত্তরাধিকার','উজানগঙ্গা', 'সাতকাহন' ইত্যাদি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীললোহিত সিরিজ, 'প্রথম আলো','অরণ্যের দিনরাত্রি','সেই সময়','নিঃসঙ্গ সম্রাট'(শিশির ভাদুড়ির জীবন নিয়ে লেখা) ইত্যাদি।বিভূতিভূষণের লেখা 'চাঁদের পাহাড়','আরণ্যক' আর 'পথের পাঁচালি' ছাড়া সেভাবে কিছু পড়া হয়নি।তেমনি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখাও খুব বেশি পড়া হয়নি।যেমন শঙ্করের লেখা 'চৌরঙ্গী'টাই শুধু পড়েছি।নীহার রঞ্জন গুপ্তের কিরিটি সমগ্র ছাড়া খুব বেশি কিছু পড়িনি।

 

    তবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষত তিন বন্দোপাধ্যায় পরবর্তী যুগের যে সাহিত্যিকের লেখা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে তিনি হলেন বুদ্ধদেব গুহ। তাঁর লেখা 'কোজাগর','আয়নার সামনে','অববাহিকা','বাবলি','বাজে চন্দনপুরের কড়চা','বাংরিপোসির দু রাত্রির','বাসনাকুসুম','চান ঘরে গান','একটু উষ্ণতার জন্য','হলুদ বসন্ত','জগমগি','যাওয়া-আসা','ঝাঁকিদর্শন','পলাশতলির পড়শি','জঙ্গল মহল','বনোবাসার','লবঙ্গীর জঙ্গলে','কোয়েলের কাছে','মান্ডুর রুপমতী','নগ্ন নির্জন','পামরি','জলছবি','কুর্চিবনে গান','সুখের কাছে' গোগ্রাসে গিলেছি বলতে গেলে। তবে আমায় সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে 'মাধুকরী' আর 'চাপরাশ'।আমার বনে জঙ্গলের প্রতি টানটা ওনার উপন্যাসের বর্ণনা থেকেই। এছাড়াও হালফিলের লেখকদের মধ্যে স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর 'পাতাঝরার মরশুমে','ক্রিসক্রস','আমাদের সেই শহরে','পালটা হাওয়া','বুদ্বুদ','দোয়েল সাঁকো','ফানুস','পরির বাড়ি' ইত্যাদি খুব ভালো লেগেছে। এছাড়াওসুচিত্রা ভট্টাচার্য,তসলিমা নাসরিন, মতি নন্দী,প্রচেত গুপ্ত,সঙ্গীতা বন্দোপাধ্যায়,রূপক সাহা,তিলোত্তমা মজুমদার ইত্যাদির লেখা উপন্যাসগুলো বিভিন্ন পূজাবার্ষিকী পত্রিকায় পড়েছি। খুব সম্প্রতি কবি শ্রীজাতর লেখা 'তারা ভরা আকাশের নিচে ' উপন্যাসটি বেশ ভালো লাগলো। 

 

   তবে কবিতা আর ছোটগল্প সেভাবে পড়া হয়নি। মানে ওই স্কুল কলেজে আবৃত্তি করার জন্য কিছু আধুনিক কবিতা আর সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত ছোটগল্প ছাড়াও কিছু কিছু পড়েছি কিন্তু সেভাবে তৃপ্তি পাইনি। ওই যে চট করে শেষ হয়ে যাবে ভাবলেই পড়তে ইচ্ছে করে না। আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ,জসিমউদ্দিন,আর নজরুলের কবিতা খুব ভালো লাগে। সমকালীন কবিদের মধ্যে জয় গোস্বামী,শুভ দাশগুপ্ত,ব্রত চক্রবর্তী, শ্রীজাত,সুবোধ সরকার ইত্যাদির কবিতা আবৃত্তি করতে ভালো লাগে।আর একটা না বললেই নয় আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র নই, তাই লেখার গুনাগুন বিচার করার ধৃষ্টতা না দেখিয়ে শুধু ভালোলাগায় বুঁদ গল্প উপন্যাস পড়েছি। আক্ষেপ একটাই গ্রামের ছেলে হওয়ায় অনেক ভালো লেখকের বই পড়ার সুযোগ পাইনি। তবে দুঃখ হয় এখনকার প্রজন্মের জন্য যারা বাংলা সাহিত্যের অফুরন্ত মনিমুক্তার স্বাদ পেলোনা। ছেলেবেলা কাটছে টিউশন আর কার্টুন চ্যানেলে, কৈশোর মা বাবার অপূর্ণ চাহিদা মেটাতে আর যৌবনে মুখপৃষ্ঠার দেওয়ালে মুখ গুঁজে।লাইব্রেরিগুলোয় ধুলার পাহাড় জমছে আর সহজে বিপথগামী হচ্ছে যুব সমাজ। তাই যারা আজ ধর্ম নিয়ে চুলোচুলি করছে তাদের হাতে বই তুলে দিন, যারা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে তাদের হাতে বই তুলে দিন, যারা হতাশায় ভুগছে তাদের হাতে বই তুলেদিন,যারা একাকীত্বে জীবন কাটাচ্ছেন তাদের হাতে বই তুলে দিন।পরিশেষে বলি বাংলা সাহিত্য পড়ুন, ভালো থাকুন।

('বাংলা, বাঙালি ও বাঙালিয়ানা' ফেসবুক পেজ থেকে গৃহীত)

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com