নগর পরিচালনা চ্যালেঞ্জ: প্রেক্ষিত ঢাকা (তৃতীয় পর্ব)

 

নগর পরিচালন ব্যবস্থা পরিবর্তনে তথা ঢাকার ইতিবাচক অবস্থান নির্মাণে কি করণীয়! 

 

   মানব বসতি ও শহরগুলোকে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলা এবং স্থিতিশীল রাখাটা আমাদের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা পূরণে এ মুহূর্তে কী চাই, কীভাবে চাই এবং কার কাছে চাই সবটাই অস্পষ্ট। তবে এটি সত্য যে, যা পাচ্ছি তা পুরোপুরি কাম্য নয়, তাই নিঃসন্দেহে কল্যাণমুখী, সেবামুখী এবং গণতন্ত্রমুখী পরিবর্তন চাই। আমাদের প্রচলিত নগর ব্যবস্থাপনা কাঠামো যা পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে-এর আদলে পরিচালিত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক শাসন ও সেবা ব্যবস্থার বা আধুনিক নগর ব্যবস্থা বিকাশে তা কতখানি অনুকূল তা বারবার আমাদের বিভিন্ন রকম প্রশ্নের মুখোমুখি করছে। ইদানিংকালে বাংলাদেশে নগরায়ণ ও নগর উন্নয়ন নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে আলোচনাসমূহে নগর সরকারের আইনগত, প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত তথা প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক বিষয়সমূহ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে না। এখানে নগরের বৃদ্ধি ও ব্যাপকতা, উন্নয়ন ও পরিকল্পনা, পরিবেশ, স্থাপত্য, যোগাযোগ ও যানবাহন, আবাসন, দারিদ্র্য, অভিবাসন এসব বিষয় অনেক বেশি প্রাধান্য পায়। এ বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় শাসন কাঠামোর আলোচনাটাও সমতালে অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল।

 

   বাংলাদেশে নগরনীতির খসড়া প্রণয়ন যা একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০৫ সালে সূচনা করা হয়। তাতে আমাদের বিকাশমান নগরসমূহকে ছয়টি বিভিন্ন আকার ও ধরনের নগরে শ্রেণীবিন্যাসের সুপারিশ করা হয়। সেই সকল সুপারিশ অনুসারে সারাদেশের পুরো এলাকাকে যদি বিভক্ত করা হয়, তাহলে গ্রাম ও শহরের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার যে বিভাজন তা আর থাকে না। থাকে না উপর-নীচ প্রশাসনিক এককের স্তরবিন্যাস। সাথে সাথে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে সৃষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহেরও আর প্রয়োজন থাকে না। খসড়া নগরনীতি ও নগরের এ শ্রেণীবিভাগটি কার্যকর করলে আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় গ্রাম-শহরের বিভাজনটি উঠে যাবে এবং একটি এক স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো তৈরির সদূরপ্রসারী পরিকল্পনা শুরু হয়ে যাবে।

 

   ঢাকা এবং বাংলাদেশের নগর সংস্থাগুলোর কাঠামোর দিকে তাকালে কলকাতা, লন্ডন, দিল্লী, মুম্বাই আর বাংলাদেশের নগরের পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। আমাদের শহরগুলোর করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়রগণ প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত এবং এককভাবে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। এখানে সাধারণ কাউন্সিলরদের ক্ষমতা খুবই সীমিত। আমাদের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো মূলত মেয়রসর্বস্ব। মেয়রই এখানে এককভাবে সকল ক্ষমতার অধিকারী। সাধারণ কাউন্সিলরের অংশগ্রহণে সাধারণ সভা সবসময় সঠিকভাবে হয় না। স্থায়ী কমিটিগুলো প্রায়ই নিস্ক্রিয়। দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের শহর-নগরসহ সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের আদলে পরিচালিত হয়। এ কারণে এখানে কাউন্সিলর নির্বাচনে ভালো পেশাদার ব্যক্তির সমাবেশ ঘটে না। এখানে ঢাকার ক্ষেত্রে মেয়র পূর্ণমন্ত্রীর এবং চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরের মেয়রগণ প্রতিমন্ত্রীর ও বাকীগুলোর ক্ষেত্রে উপমন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হয়। কিন্তু কাউন্সিলরগণ এখানে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয় না। তাছাড়া বাংলাদেশে অঞ্চল বা ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকরভাবে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কোন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি। উন্নয়ন বরাদ্দ, নিয়োগ, বদলি ইত্যাদির সুবাদে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ সর্বাধিক। এসব নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা কোথাও আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষিত হয় না, সরকারীভাবে নিরীক্ষা ও মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্থ, নগর পরিকল্পনার আইন কাঠামোও বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রায় না থাকারই মত। তাছাড়া শহরাঞ্চলে শহরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নাগরিক সংগঠনের কার্যক্রম সর্বোপরি নাগরিক সংস্কৃতি এবং সিভিক সেন্স তুলনামূলকভাবে নিম্ন মানের। তাই সামগ্রিকভাবে নগর সরকার ব্যবস্থাকে সুচারুরূপে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, সভ্য ও সংস্কৃতিবান মানুষের কর্ম ও আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখানে নানামুখী সংস্কার প্রয়োজন। নগর সরকারের ধারণা ও কাঠামোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পশ্চিম বঙ্গব্যাপী পরিচালিত পুরসভা কাঠামো এবং কলকাতা সিটি করপোরেশন ব্যবস্থাটি পর্যালোচনা করে দেখতে পারে। তাছাড়া রাজধানী শহর ঢাকার ক্ষেত্রে একাধিক কাজ-কর্ম সমন্বয়ের জন্য পুরো রাজউক এলাকাকে নিয়ে লন্ডন শহরের মত একটি বিশেষ ধরনের নির্বাচিত কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি হতে পারে। অন্ততঃ দিল্লী ও লন্ডনের দুটি ব্যবস্থাও তাই সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

 

তথ্যসূত্র:

১.      Dhaka in 2050 শীর্ষক Centre For Urban Studies (CUS) Bulletin, No 58-59, January, 2010 

২.       নগরায়ণ ও নগর সরকার, তোফায়েল আহমেদ ও বিধান চন্দ্র পাল, আগামী প্রকাশনী ২০১৮    

৩.      নগরায়ণ ও নগর সরকার, তোফায়েল আহমেদ ও বিধান চন্দ্র পাল, আগামী প্রকাশনী ২০১৮    

৪.      সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন-২০১৫ 

 

(বিঃদ্রঃ গত ১৩ মে, ২০১৮ তারিখে নগর গবেষণা কেন্দ্রের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা শীর্ষক বিশেষ সেমিনারে প্রবন্ধটি উপস্থাপন করা হয়।)

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com