সরকার কেন ঠিক করবে বিচারক কে হবেন?

 

 

আইনসভা না আইন? বিচারপতি না বিচার ব্যবস্থা? গণতন্ত্রে কার অগ্রাধিকার? মানুষ কার প্রতি আস্থা রাখবে?

 

   সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে  বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক বিতর্ক একটি যথার্থ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। বিচারপতি নিয়োগ কিংবা অপসারনে সরকারের কোনো ভূমিকা থাকা উচিত কিনা? সংবিধান রচয়িতারা নিজেরাই এ নিয়ে  সকলেই এক মত ছিলেন না। যারা সরকারের অধিকারের পক্ষে ছিলেন, তাদের ভাবনা ছিল এরকম যে, আইনসভার সদস্যদের নির্বাচিত করেছে  জনগন,তাই জন স্বার্থেই বিচারপতিদের নিয়োগ ও অপসারণে সরকার অধিকারী থাকবেন,তবে অপসারণের ক্ষেত্রে  দলমত নির্বিশেষে দুই তৃতীয়াংশ এর সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক।এই কথা ভাবার সময় সংবিধান প্রণেতারা ভাবতে পারেন নি যে আইনসভার দুই তৃতীয়াংশ আসনে জিতে এসে কোনো দল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়াতে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ করবে।শুধু তাই নয়,অন্য দলের সংসদদের আনা ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব উত্থাপনেও নাকচ করে দেওয়া হবে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাবে কেউ ভাবে নি যে খোদ প্রধান বিচারপতিকে কেন্দ্র করে বিচার ব্যবস্থায় রাজনীতির জল ক্রমশ ঘোলা হতে থাকবে।এ বছরের শুরুতে তাঁর বিরুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে পক্ষপাতের অভিযোগ এনে চমকে দিন সুপ্রিম কোর্টের চার প্রবীণ বিচারপতি।তারপর যেটা হল সেটা আরও লজ্জাকর।দেশের প্রধান বিচারপতিকে সরাতে উদ্যোগী হয়ে উঠলো বিরোধী দল কংগ্রেস সহ আরো কিছু দলের সংসদ । শেষমেষ তা হলো না, কিন্তু প্রশ্ন, কেন প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এভাবে বিতর্ক ? দায়ী কি তিনি নিজে না   বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি?

 

   বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাতের শুরু নোট বাতিল নিয়ে। তাতেই কেন্দ্রের বিরাগভাজন হয় সুপ্রিম কোর্ট। এরপর অরুণাচল ও উত্তরাখণ্ডে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে আদালতে প্রবল ধাক্কা খায় নরেন্দ্র মোদির সরকার। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত।উত্তরাখণ্ডে রাষ্ট্রপতি শাসনের বিরুদ্ধে যিনি রায় দেন, তাঁকে সুপ্রিম কোর্টে আনতে চায় বিচারপতিদের নেতৃত্বাধীন কলেজিয়াম। আপত্তি কেন্দ্রের।এই আপত্তি যে রাজনৈতিক,সেটা স্পষ্ট।একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট মনোভাব। সেটা বিচারপতিরা মানবেন কেন? বিচারবিভাগ তার স্বাধীনতা রাখবে নিজের উদ্যোগে,সংবিধান এ ব্যবস্থা করাই আছে।প্রয়োজনে সংসদের আইন বা সরকারের সিদ্ধান্তকে তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সঙ্কোচনকারী মনে করলে বাতিল করে দিতে পারে।এই কারণেই ১৯৯৩ সালে ভারত সরকারের একটি মামলার রায় দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার বলে দেয় যে,বিচারপতি নিয়োগে শেষ কথা বলবে আদালত।তখনই বিচারপতি নিয়োগে বিচারপতি দ্বারা গঠিত  কলেজিয়ামকেই চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করা হয়। সেই ঐতিহাসিক রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট এক তরফাভাবে সরকারের বহু সিদ্ধান্তকে নাকচ করে বেআইনি ঘোষণা করেছে,কিন্তু কোনো বিচারপতির নিয়োগ বা সার্ভিস নিয়ে কিছুই করতে পারে নি সরকার।

 

   মোদি সরকার ক্ষমতায় এসে বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে বিচারপতিদের নিয়োগ ও প্রমোশন নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ।সেই উদ্দেশ্যে তারা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে  সংবিধান সংশোধন করে National Judicial Appointments Act এনে বিচারপতি নিয়োগে ছয় সদস্যের কমিটি তৈরি করে।সুপ্রিম কোর্ট তাকে বেআইনি ঘোষণা করে ফের বিচারপতিদের নেতৃত্বে কলেজিয়ামের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।এভাবেই বিচারবিভাগ তার স্বাধীনতা রক্ষায় সক্রিয় হয়।কিন্তু এটুকুতে যে সেই আকাঙ্খিত স্বাধীনতা থাকে না, পরবর্তী কালে তা সরকারের আচরণে স্পষ্ট।

 

   সমস্যার গোড়া এই খানেই।তৎকালীন প্রধান বিচারপতি লোধা স্পষ্টই বলেন," সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে যদি  সরকার বা আমলাদের ভূমিকা থাকে, যদি সাংসদদের বা সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে  বিচারপতির নিয়োগ হয় তাহলে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা বলতে যা আমরা বলে থাকি তা আর থাকে না।"তিনি অবসর নেওয়ার পর এসেছেন আরো চার প্রধান বিচারপতি।তাঁদেরও একই কথা।সকলেরই বক্তব্য, বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ,সরকারের অনুমতি কিসে প্রয়োজন? এই নিয়ে টানাপোড়েন তাই নতুন নয়।

 

   এর সমাধানে  দরকার ছিল বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা। সেটা কেবলমাত্র বিচারক নিয়োগে নয়, সার্বিকভাবেই।  প্রথমেই দরকার শুধুমাত্র বিচারকদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি বা ব্যবস্থা যেখানে কোন রকম  রাজনৈতিক সংস্পর্শ থাকবে না। বিচারক নিয়োগ তথা সমস্ত বিষয় তারাই দেখবেন। সংসদে এনে কোনো বিচারকের ইমপিচমেন্ট হবে না। গ্রেট ব্রিটেনে এমনটাই হয়।তাই  সেদেশের আদালতের সঙ্গে সেখানকার শাসকের সংঘর্ষ হয় না। শুধু নিয়োগে নয়, দেখতে হবে বিচারক তার কাজের ক্ষেত্রে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন এবং তার রায় দানের জন্যে তাকে কোনোভাবে এই রাষ্ট্র বা রাজনীতির শিকার হতে হবে না ,একই ভাবে দায়বদ্ধ থাকতে হবে নিরপেক্ষ বিচার কমিশনের প্রতি,যার নেতৃত্বে থাকবেন সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণতম সাত বিচারপতি।

 

   এদেশে এই নিয়ম চালু করতে চান না রাজনীতি মহল। বিচারবিভাগকে কেউই  প্রকৃত স্বাধীনতা দিতে চায় না। বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা  প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার বিভাগের সমস্ত কর্মকাণ্ডে সরকারের থেকে আর্থিক দিক থেকে স্বাধীনতা দিতে হবে। নইলে তার প্রভাব পড়ে বিচার ব্যবস্থার উপর। যার ফলে আঘাত আসে গণতন্ত্রে,আক্রান্ত হয় জনগণের অধিকার।বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে বিরোধ হওয়ায় বিজেপি সরকার হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছিল টাকার অভাব দেখিয়ে।শেষ পর্যন্ত চরম প্রতিবাদী অবস্থান নিয়ে প্রধান বিচারপতি টি এস  ঠাকুর যখন আইন মন্ত্রক ও প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা ঠুকবেন বলে হুমকি দেন,তখন প্রবল মানসিক চাপে প্রকাশ্যে এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামনেই ক্ষোভে কেঁদে ফেললেন।। তিনি প্রকাশ্যেই জানালেন যে সরকারের অসহযোগিতায় বিচার ব্যবস্থা নিত্য জমতে থাকা মামলার চাপে ভেঙে পড়তে বসেছে। মোদি সরকার নতুন বিচারপতি নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়ায় দেশের শীর্ষ আদালত ও হাইকোর্টগুলিতে তখন মামলা জমে ছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ!!দেশের সব হাই কোর্টেই  বিচারপতি ছিলেন প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক!! তবুও বারংবার আবেদনের পরেও এই চার বছর ধরে বিচারপতি নিয়োগ করা হয় নি। কদিন আগে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর তাদের দুটি দাবি মানা হলেও নতুন বিচারপতি নিয়োগে তেমন সাড়া মেলে নি। এখন সুপ্রিম কোর্টে নতুন বিচারপতি নিয়োগের সময়ে উল্টে সরকারের অহেতুক হস্তক্ষেপে সংঘাত এতটাই তীব্র হয়ে উঠলো যে বিচারপতিরা বুঝেই নিলেন, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।তাই আইনের রাস্তায় মোকাবিলা করেই কেন্দ্রের এই অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানবিরোধী আচরণের জবাব দিতে এক কাট্টা হয়েছেন সব প্রবীণ বিচারপতি।

 

   এতে কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা? সংবিধান প্রণেতারা চেয়েছিলেন আইনসভা ও বিচারবিভাগ যেন একটা লক্ষনরেখায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখে গণতন্ত্রের মৌলিক আদর্শকে রক্ষা করে।কিন্তু  ক্ষমতার রাজনীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, তার প্রভাবে বিচার ব্যবস্থার মধ্যেও বিভাজনের সমীকরণ প্রবল হয়ে উঠেছে।সেই কারণেই খোদ প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নির্ঘোষ শোনা গেল অন্য সহযোগী প্রবীণ বিচারপতিদের কাছ থেকে। তাতে মামলা বন্টনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির কাছে রাখাই যেন দায় হয়ে উঠেছে।মনে পড়ে যাচ্ছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে উদ্ধৃত করে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সন্তোষ পালের লেখা সেই কথাটি,শীর্ষ আদালতে সব বিচারপতিই এক সাথে বসুন।যত বেশি বেঞ্চ,তত বিভাজন।( দ্রষ্টব্যঃ 'Choosing Hum murabi. ----Debate on Judicial Appointment by Santosh Paul)।এ নিয়েও সংস্কার জরুরি।

 

   বিচারপতি নিয়োগের জন্য কলেজিয়ামের হাতেই সবটুকু ছেড়ে দিয়ে সরকার বরং বিচার বিভাগের সুষ্ঠু কাজকর্মের জন্যে বরাদ্দ বাড়াক। হাইকোর্টগুলিতে প্রায় ৩০শতাংশ বিচারপতির আসন শূন্য। নিয়োগ বন্ধ রেখে সরকার কি প্রমান করছে? নিত্য ধর্ষণ,খুন --সমাজ বিরোধীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে জামিন নিয়ে। বিচারের বিলম্বের সুযোগ নিচ্ছে তারা।এভাবেই রাম রাজত্ব হবে? বিচারপতির নিয়োগ আর বেতনের জন্যে কেন সরকারের কাছে হাত পাততে হবে?  নির্বাচন কমিশনের মতোই জুডিসিয়াল এপয়েন্টমেন্ট কমিশনের চূড়ান্ত সাংবিধানিক অধিকার থাকা জরুরি।

 

   সুষ্ঠু প্রশাসনের স্বার্থে যে এটা জরুরি সেটা বোঝেন সকলেই।, কিন্তু করবে তা কে?এখন রাজনীতি চলে পুঁজি আর ক্ষমতার জোট বন্ধনে। তা থেকে তৈরি হওয়া দলতন্ত্র আর রাজনৈতিক হেজেমনির মধ্যে আটকে বিচার বিভাগ।সময়ের বদলের সাথে সাথে রাজনীতি সমাজ তার আগ্রাসনের রূপ বদলাচ্ছে।বিচার বিভাগের সক্রিয়তা ও স্বাধীনতা তাই আরও বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।  গণতন্ত্র রক্ষার জন্যেই জনস্বার্থে তা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com