মায়া মৃদঙ্গের সুর

 

 

প্রান্তিক লোকায়ত জীবন নিয়ে রচিত উপন্যাস গুলির সঙ্গে মায়ামৃদঙ্গের যে স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়ে তা শব্দের বিভঙ্গের জন্য নয়, ঘটনার বিন্যাসের  জন্য নয়, এমন কি বিষয় নির্বাচনের জন্যও নয়। উপন্যাসটি আলাদা কারণ মায়ামৃদঙ্গ লেখা হয়েছে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। সিরাজের আলকাপ দলের সঙ্গে কাটানোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁকে যে বিচিত্র জীবন মায়ার সন্ধান দিয়েছিল তাই  হয়ত এ উপন্যাসকে এমন এক আবেষ্টনে জড়িয়ে রাখে।   কাজেই মনে হয় সিয়াজের অনুভূত এই মায়াময় জগৎ যখন অক্ষর থেকে প্রত্যক্ষ  হয়ে উঠে আসে মঞ্চে কোথাও হয়ত চ্যূত হবে এ উপন্যাসের স্বাতন্ত্র মান।

 

   কিন্তু রাকেশ ঘোষের নাট্যরূপ ও পরিচালনায় দমদম শব্দমুগ্ধ নাট্যকেন্দ্রের নাটক মায়ামৃদঙ্গ  সমর্থন করে না উক্ত ধারণাকে। আমাদের জানা নেই সিরাজের মতো  দিনের পর দিন আলকাপ দলের সঙ্গে কাটানর অভিজ্ঞতা রাকেশ বা তাঁর দলের কারোর আছে নাকি। কিন্তু মানুষকে জোর করে প্রান্তিক করে তোলার, প্রকৃতিদত্ত ধরনকে অবলুপ্ত করার যে বর্বর প্রচেষ্টা আমাদের সমাজে আছে সেই অভিজ্ঞতাই এঁদের নাটকের প্রতিটি দৃশ্যে প্রতিটি মুহুর্তে আমাদের চোখে পড়ে। আমাদের চোখে পড়ে এ নাটকের মধ্য দিয়ে এদের বিরুদ্ধে এক মায়াময় প্রতিবাদ। 

পরিচালক রাকেশ নাটকটিতে কোথাও গিমিকের আশ্রয় নেননি কোথাও অকারণ লাফ ঝাঁপ নেই, বার্তি আক্রোবাট নেই টেকনোলজি যা আছে তাও অত্যন্ত মৃদু, যথাযথ। এককথায় নাটকটিতে এক ধরণের কনশাস সিমপ্লিসিটি আছে। যা যে কোন লোকনাট্য, লোকশিল্পেরই বৈশিষ্ট এমন কি লোকায়ত জীবনের ধারাটিও তাই। আর যে কথা এ প্রযোজনায় উল্লেখ্য তা হল  মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহের নানাভাবে ব্যবহার। এই প্রয়োগ নতুন কিছু নয় কিন্তু এঁরা যেহেতু নাটকটি একটি নির্দিষ্ট মঞ্চে করেন না তাই প্রতিবার নতুন নতুন জায়গায় গিয়ে সেই অনুসারে অভিনয় আলো শব্দ ইত্যাদিকে ব্যবহার করতে যথেষ্ট দক্ষতার প্রয়োজন এবং সে ব্যাপারে প্রযোজনাটি অত্যন্ত সফল। আরো একটি কারণে এই ধারাটি উল্লেখ্যোগ্য এ নাটকে তা হল আলকাপকে কেউ কেউ হঠাৎ নাটক বলে অর্থাৎ যে দেশে যে পরিবেশে নাটকটি পড়বে সেই অনুসারে আলকাপকে বেঁধে নেওয়া।  সে দিক থেকে এই প্রয়াস একেবারে যথাযথ বলা চলে।  

 

   প্রযোজনাটি দেখতে দেখতে কখনো কখনো মনে হয় নাটকের মূল যে প্রতিপাদ্য তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীকভাবে জুড়ে আছে যে আলপে, সেই আলকাপের আঙ্গিক এ নাটকে আসেনি তেমন করে। এমনকি সনাতন আর সুবর্ণর করা শিখণ্ডী আখ্যানেও নয়। মনে হয় এ একদিক দিয়ে মন্দ হয়নি। মূল উপন্যাসটির এমন একটা কাব্যিক গুণ আছে যে পাঠক তার আপন দৃষ্টিতে, মননে তার বিশ্লেষণ করতে পারে। একটি নাট্যধারার অবলুপ্তির, পরাজয়ের গল্পের চেয়ে জীবন্ত চরিত্রগুলির সঙ্কট হয়ত অনেক বেশি নাড়া দিয়েছে রাকেশকে। আর হবে নাই বা কেনো আলকাপের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া জীবনগুলির  মত বিচিত্র জীবন আর কোনো শিল্পমাধ্যমে, বড় একটা দেখা যায় না।

 

 

 

   আলকাপের অন্যতম  বৈশিষ্ট এর ছোকড়া বা নারীরূপী  পুরুষ অভিনেতারা। পুরুষদের মহিলা চরিত্রে অভিনয়ের রীতি আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু নিঃস্তন, নিঃযোনি একজন মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে নারীত্বকে গেঁথে দেওয়ার, শয়নে, স্বপনে, জাগরণে, নিজের বিশ্বাসে নিজেকে নারী ভাবতে শেখার যে রীতি তা ভূভারতে আর কোনো নাটকে আছে কিনা জানা নেই আমার। আলকাপের বিশিষ্টতা তার আঙ্গিকে নয়, অভিনয়ে নয়। এর বিশিষ্টতা অভিনেতার প্রস্তুতিতে, এর ছোকড়ারা এর বৈশিষ্ট্য, এর সদস্যরা এর বৈশিষ্ট্য। যাদের কাছে লিঙ্গের চেয়ে, ধর্মের চেয়ে, সংসারের চেয়ে  শিল্প অনেক উচ্চে।  তাই এরা ছোকড়াদের মনে প্রাণে নারী ভাবে, তাই মুসলমান হিন্দু, চাঁই সম্প্রদায় সকলের একটাই পরিচয় এরা আলকাপ করে। রাকেশের নাটকেও বারে বারেই সে কথা ঘুরে ফিরে এসেছে। কখনো ঝাঁকসুর মুখে, কখনো সনাতনের মুখে, সুবর্ণ আর শান্তির নিবেদনে, সুধার আত্মত্যাগে আবার কখনো কালাচাঁদের আক্ষেপে। আলকাপে যে কাম, প্রেম, শিল্প, ধর্ম মিলে মিশে এক হয়ে যায় সে মিলন আমরা প্রত্যক্ষ করি মঞ্চেও প্রায় প্রতিটি চরিত্রের ভিতর দিয়ে। 

 

   এ নাটকে ছোকড়া সুবর্ণ আত্মবাসনা আর বিরহ চেতনার এক অদ্ভুত মিলন ঘটায়, সুধার আত্মপীড়ন আমরা দর্শক আসনে বসেও অনুভব করতে পারি। আনিস, কাদের, ঝাঁকসু সনাতনদের আলকাপে মজে ওঠা জীবন আমরা প্রত্যক্ষ করি স্পষ্ট। কিন্তু এ নাটক তো কেবল কোনো আলকাপ দলের গল্প নয়,  আলকাপের ছোকড়ার আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের গল্পও নয়। এ এক মায়া বিস্তারের নাটক। যে মায়ার কাছে পরাজিত হয় সনাতনের শহুরে জীবনের শিক্ষা, সনাতন সুধার বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষণ, যে মায়ার কাছে ঝাকসুর মনের ভাবটি হয় - সমাজ সংসার মিছে সব। তাই তো মাঠে বসে শান্তির সঙ্গে চাঁদ দেখাকে মনে হয় ঝাঁকসুর এ দেখা যেন পরমকে দর্শন। তাই হয়ত সনাতন সুধার সঙ্গীত কানে নিয়েও সুবর্ণর পায়ে বাঁধতে পারে নূপুর। এ নাটকে বারেবারে এ ধরনের ঘন মুহুর্ত তৈরি হয়েছে, আর তা পরিচালক তৈরি করেছেন পরম কোমলতায়। আবার এ মায়া ভেদ করে দাম্পত্য প্রেমকে ছুঁতে চাওয়ার যে করুণ হুঙ্কার আমরা মেজো মোল্লানের মধ্য দিয়ে দেখতে পাই তা অন্তরকে স্পর্শ করে। আবার শরীর দিয়ে এ মায়াকে ভ্রষ্ট করার গঙ্গার ব্যর্থ প্রচেষ্টা আমরা এ নাটকে দেখি। এ মায়াকে ঘিরে বেঁচে থাকা সুরেলা ঝাঁকসু যখন 'আমারো নয়নে নয়ন রেখ অন্তর মাঝে' গাইতে গিয়ে সুর পায় না তখন দর্শক বাধা পড়ে যায় এক অন্য মায়ায়। আবার সুবর্ণ যখন মৃদু গলায় বলে ওঠে 'মাধব মিলন তরে আমার রাধা বাসর সজ্জা করে' তখন যন্ত্রনায় দর্শকের মনও গুমরে ওঠে। 

 

   রাকেশ মূল উপন্যাসের থেকে খানিক বদলেছেন এ নাটককে। বিশেষত শেষের দিকে এসে। উপন্যাসের মত তিনি সুধাকে ধর্ষিত হতে দেননি। সনাতন মাষ্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেননি সুবর্ণকে। এ নাটক শেষ হয় সুবর্ণর প্রতিবাদে। রঙ্গে এবং অন্তরে নারী সুবর্ণ বিসর্জন দেয় তার নারীসত্তার প্রতীককে। একেবারে শেষ দৃশ্যে উদ্বাহু সুবর্ণর দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শ্রী চৈতন্যের রাধা রূপ। নাটকের শেষে হয়ত আলকাপের ছোকড়া সুবর্ণর প্রেমের পরাভব আছে, সনাতনের দোলাচলচিত্ততা কখনো আমাদেরও স্থির থাকতে দেয় না ভাবনায়, ঝাঁকসুর আজীবনের সাধনার, বিশ্বাসের ধ্বংসের ইঙ্গিত বহন করে এ নাটক। তবু নাটকের শেষে একধরনের ট্রাজিক মহিমার সৃষ্টি হয়। কুল, শীল, জাতি, মান এ সমস্তের উর্ধে উঠে  কাম, প্রেম ও শিল্পের এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটায় এ নাটক।

 

   এ নাটকে অভিনেতারা প্রায় প্রত্যেকেই অত্যন্ত কুশলতায় নিজেদের উপস্থাপন করেন। পরিচালক মঞ্চ জুড়ে যে মায়ার সৃষ্টি করতে চেয়েছেন এঁরা সকলেই তার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করেছেন। তবু ঝাঁকসু, সনাতন, সুধা, সুবর্ণ ও মেজো মোল্লান রূপী অভিনেতারা ওইদিন আলাদাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আমাদের। নীল কৌশিকের মঞ্চ এ নাটকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। মহঃ ইস্রাফিলের অঙ্গসজ্জা এবং রঞ্জন বোসের পোশাক পরিকল্পনা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। বাবলু সরকারের আলো প্রায় গোটা নাটক জুড়েই যথাযথ। কেবল ঘন ঘন স্মোকলাইটের  ব্যবহার নিয়ে আর একটু ভাবনা চিন্তার অবকাশ থেকে যায় বলেই মনে হয়। অনির্বাণ রায় ও অভিজিৎ আচার্য যদি লাইভ মিউজিক ব্যবহার করতেন তবে তা নাটকটিকে আলাদা মাত্রা দিত। কারণ সঙ্গীত এ নাটকে কখনো কখনো সংলাপের মতই ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষত ঝাঁকসুর উদাত্ত কণ্ঠের মধ্য দিয়ে এক অন্য মায়ায় প্রবিষ্ট হই আমরা। এলোকেশীর গানের মধ্য দিয়ে শিল্পীর চিরন্তন যন্ত্রনা স্পর্শ করে আমাদের।

 

   পরিচালক রাকেশ ঘোষ তাঁর নির্মানের মধ্য দিয়ে আমাদের যে মায়া মৃদঙ্গের সুর শুনেয়েছেন তা প্রেম, কাম, নিষিদ্ধ, পরকীয়া,  দাম্পত্য  সমস্ত কিছুর উর্দ্ধে উঠে আমাদের মনে ধ্বনিত হতে থাকে  নাটকের শেষেও।    

 

 

    

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com